"সালাম সালাম হাজার সালাম,শহীদ স্মৃতির স্মরনে,
আমার হৃদয় রেখে যেতে চাই,তাদের স্মৃতির চরনে"
ত্রস্তপায়ে কয়েকজন যুবক স্কুল আংগিনায় প্রবেশ করে।গরমের দাবদাহে পানির তিয়াসে ফেটে যায় ওদের বুক।আজলা ভরে শীতল জল খেয়ে নিদারুন তৃপ্তি পায়।তারপর ধীরে ধীরে হাঁটে প্রধান শিক্ষকের রুমের দিকে।শিক্ষক মহোদয় শ্রেনীকক্ষে পাঠদানে রত।
বর্ষীয়ান, প্রধান শিক্ষক মুহম্মদ মোতালিব ছাত্রদের বলেন-আজ মন ভালো নেই রে।বুঝতে পারছিস বাংলা বর্ণমালা আজ কেমন অসহায়। তোদের একটা গল্প বলি শোন। এ আমার জীবনেরই গল্প।
ক্লাসের সবাই নিশ্চুপ ।
স্যার বলেন-আমার বয়স তখন বার কি তেরো। সন্ধ্যার আগে আগে বাপের সাথে ঘরে ফিরছি ।শুরু হলো প্রচন্ড ঝড়।দেখলাম, জমিনের আইলের পাশে একটা ছোট তোতাপাখি পড়ে আছে ,কোনো নড়ন চড়ন নেই।আমি পাখীটিরে বাড়ী নিয়ে আসলাম।বুক দুরু দুরু করে কাঁপছে।ঠিক আমাদের আজকের অসহায় বাংলা বর্ণমালার মতো ।ডানা ভাংগা, উড়ার কোনো শক্তি নাই। এতুটুকু বলার পর স্যার একটু জিরিয়ে নেন।তারপর ,দীপুকে বলেন ,দীপু যাতো আমার জন্য এক গ্লাস পানি নিয়ে আয়।
দরজার বাইরে যুবকেরা ও স্যারের গল্প তন্ময় হয়ে শুনে।
ওরা জানে , গল্পের শেষে এমন কিছু আছে, যার জন্য স্যারের এ গল্পের অবতারনা। নাহয়, স্যার ,সামান্য একটা তোতাপাখীর গল্প এতো আগ্রহ এনিয়ে বলবেন কেন?
দিন যায়,আমি পাখীটিরে সুস্থ করে তুলি। একদিন,সুন্দর সকাল। রোদ জলমলে ফুরফুরে দিন।আমি পাখীটিরে খাঁচার বাইরে নিয়ে আসি।আমাদের বাড়ীর পিছনে ছিলো ছোট একটি কদমের গাছ। হাত বাড়ালেই ডাল ছোঁয়া যায়।আমি আলতো করে ধরে পাখিটিকে একটি ডালের ওপর রাখি।
ওমা, দেখি ,এ পাখী ওড়তেই পারেনা। শুধু লাফায়,এতোদিনে উড়া ভুলে গেছে। প্রতিদিন ,আমি কাজটি করি। কয়েক সপ্তাহ পর,দেখি পাখীর নতুন পালক গজিয়েছে।এখন একটু একটু ডানা ঝাপটায়।
আমি পাখিটি বাড়ীর বাইরে আনি। কদম গাছের উপর রাখি।এবার ও উড়ে দূরে একটা গাছে গিয়ে বসলো। আনন্দ যেন আর ধরেনা।এ গাছ থেকে ও গাছে নেচে বেড়ায়।
সপ্তাহ খানেক পর, ও কে আমি খাঁচা থেকে বের করে মুক্ত নীলিমার নীচে আনি। ও স্বপ্নের খোলা আকাশে ডানা মেলে।
এদিকে বিকেল হয়ে গেলো, ওর কোনো খবর নেই। আমি গাছের ডালে ডালে ওকে খুঁজি বেড়াই।দুইদিন পর ফিরলো।তবে বাড়ীতে ঢুকার আর নাম নেই।
আমি অনেক চেষ্টা করি।খড়কুটো সামনে এনে রাখি।ঘটিতে পানি রাখি। ও আসেইনা,আসেইনা, তবে , একেবারে দিবাবসানে আসলো।দেখতে দেখতে পাখীটির প্রতি কেমন যেন মায়া জমে গেলো রে।
এভাবেই চলতেই থাকে। সারাদিনমান ওড়ে বেড়ায়, সন্ধ্যার আগে বাড়ী চলে আসে।একমাস পর দেখি, পাখীটি যেন কেমন অসুস্থ।কোনো কিছুই আর খেতে চায়না।আমাদের পাড়ায় ছিলেন,পশু ডাক্তার মল্লিক বাবু।উনি বললেন, তোতাপাখিটি দূরে কোথাও অন্য পাখির সাথে মিশেছে যেখানে ওর শরীরে ভাইরাস ঢুকেছে।হয়তোবা আর বেশীদিন বাঁচবেনা। সত্যি সত্যি দু,দিনের মাথায় পাখিটি মারা গেলো।
আমি সারাদিন না খেয়ে থাকলাম। মনটা বিষন্নতায় ভরে গেলো।নিজেকে খুব অপরাধী মনে হলো।কীযে ভুল করলাম।আহাঃ যদি পাখিটিকে ওড়তে না দিতাম। যদি খাঁচায় থাকতো।তাহলে ও বাইরে যেতোনা, ভাইরাস ও ওর শরীরে দানা বাঁধতোনা। আরো কতদিনে বেঁচে থাকতো। না জানি আরো কতদিন।
রাতে আমার স্নেহময়ি মা ,আমার পাশে এসে বসেন।বললেন, এতো কষ্ট পাচ্ছিস কেন। আর অপরাধীই বা ভাবছিস কেন নিজেকে। পাখিটিকে উড়তে দিয়ে তুই ভালো কাজই করেছিস রে বোকা।।যে পাখী আকাশের নীলিমায় ডানা মেলে উড়লোনা,তার পাখী হওয়ার স্বার্থকতা কি?সে তো তেলাপোকা।
যে মাছ অবারিত জলের মাঝে সাঁতার কাটলোনা তার মাছ হওয়ার স্বার্থকতা কি? সে তো ব্যাংগাচি।
ও পাখিটি যেদিন প্রথম মুক্ত আকাশে বিচরন করেছিলো,সেদিনই ছিলো ওর পাখি হওয়ার স্বার্থকতা।
কে কতদিন পৃথিবীতে বেঁচে রইলো তা বড় কথা না রে, তার গুনের কতটুকু পরিস্ফুটন হলো সেটাই আসল কথা।
আর মানবজীবনের মূল কথা হলো-কী জানিস।শুধু একটা চিহ্ন.।একটা আলোর নিশানা রেখে যাওয়া ।জীবনের শেষ মোহনায় এসে আজ আমি বুঝি,
মানুষ আসে, মানুষ চলে যায়। হাজার হাজার ডাক্তার ,ইন্জীনিয়ার,ব্যারিস্টার ও হাজার হাজার ডাক্তার ইন্জিনীয়ারের ভীড়ে হারিয়ে যায়। কিন্তু জন্মভুমির মাটিতে দাগ রেখেছে কজনা। ক'জন মানুষ দেখিয়েছে মুক্তির আলোর নিশানা। কজন মানুষকে আমরা মনের মনিকোটায় যুগ যুগ ধরে স্মরি।
স্যারের গল্প শেষ হয়। যুবকেরা কদমবুচি করে বের হয়ে যায়। যেতে হবে যে দূর বহু দূর। রক্তে রক্তে দানা বাঁধছে আগুনের ফুলকি। ভোরের আকাশে আলো ফুটছে একটু একটু করে। আজকের সূর্য্যটি কেমন যেন।মনে হচ্ছে কিছুক্ষন পর ফোটা ফোটা রক্ত ঝরবে।ওরা আসে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে। দানবের উল্লাস ,হায়েনার নগ্ন নৃত্য চারপাশে। বেজে চলছে দমিয়ে রাখার সাইরেন।মারনাস্ত্রের দাতব নলের রক্তপিপাসু জীব কেউটের বিষাক্ত ছোবল নিয়ে হুংকার ছাড়ে। মিছিল চলতে থাকে সামনে। কাঁপতে থাকে রাজপথ। যুবকেরা মিছিলের একেবারে সামনে চলে আসে। যুথিবদ্ধ হাত, বাহুর সাথে বাহু মিশে সিনায় সিনায় হয়েছে বর্ণ রক্ষার দেয়াল। প্রথম গুলি এসে লাগে যুবকের একজনের গায়ে।ফিনকি দিয়ে বের হয় লাল শিমুলের রক্ত।লুটিয়ে পড়ে সালাম। লাল রক্তের মাঝে রাজপথে জন্মভূমির মাটিতে বর্ণমালার প্রথম দাগ অংকিত হয়।
পাশের যুবকেরা বজ্র আক্রোশে ফেটে পড়ে। লুটিয়ে পড়ে বরকত,রফিক,শফিক ,জব্বার সহ যুবকের কয়েকজন।তাদের মুখ থেকে বের হয় বিশুদ্ধ বর্ণমালা ,আ মরি বাংলা ভাষা।সে শব্দ অনুরনন তোলে ইথারে ইথারে। ছড়িয়ে পড়ে রুপসা থেকে পাথুরিয়ায়।পদ্মা,মেঘনা, যমুনা, ধলেশ্বরি,আড়িয়াল খাঁ,সুরমা,কর্ণফুলি,কুশিয়ারার উর্মিমালার সাথে মিশে যায় সেই ডাক, আ মরি বাংলা ভাষা।
লাল রক্তজবার রংগে, দোয়েলের শীষে, আম্রমুকুলে, বদ্বীপ বাংলার উজান ভাটির গাংগে, পাল তোলা নৌকায় ,রাখালের বাঁশীতে, কিষানীর গানে, কিষানের গামে মিশে যায় সেই ডাক আ মরি বাংলা ভাষা।
পরদিন ,সকালে প্রধান শিক্ষক মোতালেব ছাত্রদের জড়ো করে বলেন-ওরে,শুনেছিস,তোরা, গতকাল ঢাকার রাজপথে আমাদের মুক্তির আলোর নতুন নিশানা রচিত হয়েছে। আর,দেখ দেখ পলাশের দিকে চেয়ে , দেখ দেখ শিমুলের দিকে চেয়ে ,ওগুলো আর কোনো লাল লাল ফুল নারে ,পুরো বৃক্ষের মাঝে ছড়িয়ে আছে আমার সাধের বর্নমালা ক,খ,অ,আ।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ৯:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


