বাড়িতে আনন্দ আর বাঁধভাংগা উচ্ছ্বাস।ভাইয়া,ভাবী আর আদরের ছোটবাবু লন্ডন থেকে দেশে এসেছে।এক সপ্তাহ হয়ে গেলো,তবু গল্প চন্দ্রিমার মতো বড়ো হচ্ছে,দিন দিন।গল্পে গল্পে কেটে যায় সারারাত। ভাবীর হাতে সুন্দর একটি জার্নাল।প্রচ্ছদে ডায়মন্ড দ্যুতি ছড়াচ্ছে। ভাবী,Department of History At University college of London এ নিয়মিত ক্লাস নেন।
ময়না জার্নালটা নেড়েচেড়ে দেখে।কিন্তু প্রচ্ছদ থেকে চোখ সরাতে পারেনা।
ভাবী, বলেন-তোমাদের সবার জন্য বিশাল এক সারপ্রাইজ আছে।কল্পনাও করতে পারবেনা ,আমি যে কী নিয়ে এসেছি।
আমাদের আগ্রহ ও চন্দ্রিমার মতো বাড়ে। ভাবী, জার্নালের প্রচ্ছদ দেখিয়ে বলেন-এটা কি বলতে পারো?
ময়না বলে,ভাবী কোনো ডায়মন্ডের ছবি কি?
ভাবী বলেন- এ শুধু ডায়মন্ড নারে,The most beautiful ,priceless gem on the planet.
নামটা কী বলবেতো।
এর নাম হলো কুহিনূর। এর সাথে জড়িয়ে আছে হাজার বছরের রোমান্স,ভালোবাসা,চাল-চাতুরী
রাজাদের সিংহাসন,মিথ,পৌরানিক কাহিনী,বিশ্বাস অবিশ্বাসের ইতিকথা।
ভাবী আমাদের সবাইকে গল্পের মাঝে বেঁধে ফেলেন।আমরা সময়ের সুড়ংগের ভিতর দিয়ে দূর হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসে হারিয়ে যাই।
এর কথা লিখা আছে হিন্দুদের পুরানে,ভগবদ গীতায়। আজ থেকে আনুমানিক ৩৫০০ বছর আগে শ্রীকৃষ্নের প্রেমের নিদর্শন ছিলো এ অপূর্ব পাথর।কৃষ্নের সখী ছিলো মোট ১৬১০৮ জন । কৃষ্ন একদা রাধার সাথে অভিসারে মত্ত।ঠিক তখনি তাদের ই কোনো একজন চল চাতুরী করে তা চুরি করে।যার আর কোনো হদীস মেলেনি।এ হলো পৌরানিক কাহিনী।
বাবা বলেন, বুঝলাম, তবে বউমা আসল ইতিহাসটা কী ?
কহিনূরের একটা গ্রহনযোগ্য ধারাবাহিকতা পাওয়া যায় দিল্লীতে খিলজী রাজ বংশের শাসনামল থেকে।১৩২০ সাল থেকে ১৫২৬ সাল পর্যন্ত এ মহামূল্যবান পাথরের তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো নাম পাওয়া যায়না।১৫২৬ সালে পানি পথের যুদ্ধের মাধ্যমে মোঘল সাম্রাজ্যের যখন সূচনা হয়-তখন এ পাথর তাদের অধিকার আসে।প্রথমবারের মতো এর নাম হয় Babur's Diamond.
তখন থেকেই দেখা যায়-যারাই এ ডায়মন্ড ব্যবহার করেছেন দূর্ভাগ্য তাদের আর পিছু ছাড়েনি।বাবুর কখনই এ ডায়মন্ড ব্যবহার করেন নি।হুমায়ুন তার অধিকারে রাখেন। শের শাহের হাতে রাজ্য হারা হয়ে মোঘল সাম্রাজ্যের ২য় অধিপতি হুমায়ুন পালিয়ে পালিয়ে বেড়ান।
এর কর্তৃত্ব আসে শূরি বংশের প্রতিষ্টাতা শের শাহ সূরীর।হায়রে ,নিয়তি !তিনিও আগুনের গোলায় পুড়ে মারা যান।এরপর পুত্র জালাল খান যখন ক্ষমতায় আসে এ মহামনির লোভ তিনি ও ছাড়তে পারেন নি।পরিনাম-আপন শ্যালকের হাতে নির্মমভাবে খুন।
শুরি বংশের পতন ঘটে হুমায়ুনের পুন ক্ষমতা অধিকারের মধ্যে দিয়ে।
তারপর ক্ষমতায় আসেন আকবর। আকবর কখনোই এ ডায়মন্ড ব্যবহার করেননি। তার শাসনামলের পুরো সময়ই তা মুঘল ট্রেজারিতে সংরক্ষিত ছিলো।
আকবরের পর ক্ষমতায় আসেন জাহাংগীর। নিষ্কন্টক ছিলো শাসন কাল।ক্ষমতায় অভিষিক্ত হওয়ার চতুর্দশ বছরে সেই ডায়মন্ড নিজের হাতে নেন। তারপর থেকে আর রোগ পিছু ছাড়েনি। ক্রমান্বয়ে শরীর দূর্বল থেকে দূর্বলতর হতে থাকে। চিকিতসরা পরামর্শ দেন ভূস্বর্গ কাশ্মীরে বায়ু পরিবর্তনে যেতে।
কাবুল হয়ে কাশ্মীর যান। কিন্তু লাহোর আর ফিরা হয়নি।পথিমধ্যে মারা যান।
এরপর আসেন শাহজাহান। সে এক হৃদয়বিদারক কাহিনী। ডায়মন্ড নিজে ব্যবহার করতে শুরু করেন। পরের ইতিহাস ,তোমাদের সবার জানা।পু্ত্র আওরংগজেব পিতাকে আগ্রা ফোর্টে গৃহবন্ধী করেন। শাহজাহান ,পুত্রকে অনুরোধ করেন -তার সাধের তাজমহল যেন তাকে দেখতে দেয়া হয়, আর বাবুরী ডায়মন্ডের ভূবনমোহিনী শোভা থেকে যেন তিনি বন্চিত না হন।আওরংগজেব তার সে আশা অপূর্ন রাখেন নি।
ডায়মন্ডটিকে গবাক্ষের পাশে এমন এক জায়গায় স্থাপন করা হয়, যেখান থেকে তাজমহলের ছবি রিফ্লেকশান হতো, আর সেখান থেকেই তিনি তাজমহলের সুধা নিতেন।সেই আগ্রা ফোর্টেই শাহজাহান দেহ ত্যাগ করেন।
এরপর ১৭৩৯ সালে নাদির শাহ পারস্য থেকে এসে দিল্লী আক্রমন করেন।
দিল্লী অধিকারের পর পরই তিনি এ পাথর দেখে এতো বেশী অভিভূত হয়ে যান যে, চিতকার করে বলতে থাকেন "কুহ -ই-নূর" lকুহ-ই-নূর "Light of mountain." তখন থেকেই তা কহিনূর নামে পৃথিবী ব্যাপী পরিচিতি লাভ করে।
কিন্তু হায়রে নিয়তি!১৭৪৯ সালে নাদির শাহ ও নির্মম ভাবে নিজের বিছানায় খুন হন।
এরপর ১৮৩০ সাল পর্যন্ত তা আফগানিস্তানে আহমদ শাহ আবদালীর অধিকারে ছিলো।
শাহ সুজা পালিয়ে যখন আফগানিস্তান থেকে পান্জাবে আসেন-তখন একমাত্র মহামূল্যবান এ কহিনূর সাথে করে নিয়ে আসেন।রনজিত সিং এর দরবারে অম্লান বদনে সাহায্য কামনা করেন।রাজ্য হারা হয়ে রাজার চোখে অবিরাম অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। রনজিত সিং বলেন-শুধুমাত্র একটি জিনিসের বিনিময়ে আমি আমার পুরা বাহিনী দিয়ে তোমায় সাহায্য করতে পারি।শাহ সুজা বুঝতে পারেন , রাজা কীসের কথা বলছেন। একদিকে হারানো রাজ্য , আর অন্যদিকে ভূবন ভুলানো দ্যুতিময় পাথর। তিনি উপঢৌকন হিসাবে তা রাজা রনজিত সিং কে দান করেন। বিনিময়ে রাজা ততকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সৈন্য দিয়ে শাহ সুজাকে পুন ক্ষমতা দখলে সাহায্য করেন।
১৮৩৯ সালে রাজা রনজিত সিং নিজের কাছে তা না রেখে উড়িষ্যার জগন্নাত টেম্পলে তা উইল করে দেন।
১৮৫৯ সালে পুরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী পান্জাব অধিকার করলে তা Treaty of lahore এর চুক্তি অনুযায়ী কুইন অফ ইংল্যান্ডের কাছে সমর্পন করার অংগীকার করা হয়। রাজা রনজিত সিং এর পুত্র দিলীপ সিং ১৮৫১ সালে তা আনুষ্ঠানিক ভাবে রানী ভিক্টোরিয়ার কাছে অর্পন করেন।
১৮৫১ সালেই লন্ডনের হাইড পার্কে এ মহামূল্যবান কহিনূরের প্রদশন করার ব্যবস্থা করা হয়।যা দেখার জন্য ততকালীন সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম লাইন হয়েছিলো ।
সেই থেকে আজ অবধি যা tower of london এ সংরক্ষিত আছে।
বাবা বলেন-যাকে নিয়ে এতো আলোচনা তার মূল্য কত হবে?বউমা।
এর মূল্য সঠিক ভাবে এখনো নিরুপন করা যায়নি,বাবা। তবে আমি "বাবুর নামা" থেকে একটি উদাহরন দিতে পারি।ততকালীন সময়ে এমন ধারনা করা হতো-এর মূল্য দিয়ে পুরা পৃথিবীর মানুষকে আড়াইবেলা আহার করানো যেতো।
এর মূল্য নির্ধারনে আরেকটি উদাহরন এসেছে ঠিক এভাবে-বাবুরের মতো শক্তিশালী মানুষ........................
ময়না,ভাবীর মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বলে,ভাবী বাবুরের মতো শক্তিশালী মানে, বাবুর কেমন শক্তিশালী ছিলেন?
বাবুর তার যৌবন কালে দুই হাতে দুইজন পুরুষ মানুষ নিয়ে শরীর চর্চার জন্য প্রতিদিন কাবুলের পাহারে ওঠানামা করতেন।
ঠিক সে রকম কোনো বলবান মানুষকে যদি পাঁচটি পাথর দেয়া হয় এবং বলা হয় তা পূর্ব -পশ্চিম, উত্তর -দক্ষিন, এবং উপরের দিকে ছুঁড়তে ,তার ফলে যে জায়গাটুকু নির্ধারন হবে, এবং সেই জায়গাটুকু যদি পুরো স্বর্নে মুড়ে দেয়া হয়, তার দাম যা হবে তা কহিনূরের সমান হবে।
তবে হ্যাঁ,যে দূর্ঘটনা, আর মৃত্যু একে জড়িয়ে আছে,এ মহামনির গায়ে কালিমা লেপে দিয়েছে তা কাকতালীয় হবার সম্ভাবনাই বেশী।
মজার কথা হলো-আকবরের জ্যোতিষি বলেছিলেন-এ রত্ন যার কর্তৃত্বে থাকবে সে পুরা দুনিয়া শাসন করবে।ব্রিটিশের ক্ষেত্রে কথাটি একেবারে সত্য।
হুমম।
বাবা, বলেন-তাইলেতো এখন তা ব্রিটিশের হাতে না থেকে আমেরিকার অধিকারেই থাকার কথা।
ভাবী বলেন,বাবা-ব্রিটিশতো আমেরিকারই আগ্গাবহ।টনি, আর গর্ডন তো বুশকে জ্বি হুজুর জ্বি হুজুর করেই চলছেন।
ময়না বলে, ভাবী যাই হোক, রাজাদের কথা বাদ দাও।
কিন্তু ,তুমি যে বললে-আমাদের জন্য আশ্চর্য্য এক উপহার নিয়ে এসেছো তা কি?
ভাবী-তার ব্যাগ থেকে ৫টি টিকিট বের করেন।ময়না হাতে নিয়ে দেখে ।Earls Court London এর ছাপ সম্বলিত টিকেট।ভাবী বলেন-
মার্চ মাসের ২৬ তারিখ এর প্রদশনী হবে। বাবা -মা অনেকদিন লন্ডন যান নি। প্লেনের টিকেট করা আছে। অনেক কষ্টে আমি টিকেট গুলো সংগ্রহ করেছি ,একেকটি টিকেটের কত দাম তা না হয় আর নাইবা বললাম।
আমি, মা খুশীতে আটখানা। আসলেই সারপ্রাইজ।
দেখলাম, বাবা কিছু বলছেন না। বললাম কী বাবা তুমি খুশী হওনি?
বাবা বললেন না?
ছোটবাবুকে আমি নিয়ে এসেছি লন্ডন থেকে বাংলাদেশে।কারন-বছরের এই একটি দিন রূমী আমার জন্য অপেক্ষা করে।ছোটবাবু যুদ্ধ দেখেনি,স্বাধীনতা দেখেনি কিছুই দেখেনি।এবার আমি স্বাধীনতার প্রথম প্রহরে ওকে রুমীর লাল রক্তে ভেজা শার্ট দেখাবো,আর কবরের পাশে গিয়ে বলবো-রুমি দেখে যা, তোর আদরের নাতি আজ কত বড় হয়েছে।
আর রুমির কবরের ধূলি ছোট বাবুর হাতে দিয়ে বলবো-
যে বিচার আমি পারিনি,
আমার সন্তান পারেনি,
তুই ও পারবিনা ,এমনতো হতে পারেনা। এই কবরের ধূলিও কোটি বছরের ইতিহাস হবে।স্বাধীনতার বীজ যে শহীদের রক্তস্নাত মাটি থেকে উতসরিত হয়েছিলো।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম জানবে এই মাটিতে এমন একজন ঘুমিয়ে আছে যার কবরের সামান্য ধূলিকনাও মহামূল্যবান কহিনূরের চেয়ে অনেক অনেক দামী।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

