মঞ্জুর প্রশ্নÑ অবৈধ সরকারের কার্যক্রম বৈধ হয় কীভাবে?
শামছুদ্দীন আহমেদ: দীর্ঘ দুই বছর এক মাস পর গতকালই প্রথমবারের মতো দলীয় সভামঞ্চে উঠলেন জাতীয় পার্টি (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। দীর্ঘদিন পর দলীয় ফোরামে তাকে পেয়ে উৎফুল্ল, আবেগাপ্লুত হলেন জেপি নেতারা। সবাইকে একসঙ্গে দেখে তিনিও আনন্দিত। বক্তব্যে উল্লেখ করলেন ওয়ান ইলেভেনের আগমন, নিজের নির্বাসনের স্মৃতি, দেশে-দেশে সামরিক শাসনের কুফল এবং নির্বাচন, নির্বাচিত সরকার, গণতন্ত্র ও মানুষের মৌলিক অধিকারের ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখার প্রয়োজনীয়তা। বক্তব্যের ফাঁকে ফাঁকে স্বভাবসুলভ রসিকতা করতেও ভোলেননি।
সাবেক এই মন্ত্রী বললেন, প্রায় দুই বছর দেশের বাইরে ছিলাম। এটা শুধু দুঃখজনক নয়, অপমানজনকও ছিল। আমি স্বেচ্ছায় বাইরে গেলাম, না-কি বের করে দেয়া হলো সেটি একটি প্রশ্ন। নির্বাসনে থাকার সময় কখনো মনে হয়েছেÑ দেশ থেকে চলে আসা ঠিক হয়নি। দেশে ফেরার পর যেসব ঘটনা শুনলাম এবং কারাবন্দিদের ওপর যে নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ করা হয়েছে, এর একশ ভাগের এক ভাগও যদি সত্যি হয়Ñ তাহলে আবার মনে হয়, যে বা যারা আমাকে দেশ থেকে বের করে দেয়ার নীলনকশা করেছেনÑ তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।
তিনি বলেন, পৃথিবীতে অনেক নেতার বিরুদ্ধেই মামলা হয়েছে। তারা বিচারের মুখোমুখিও হয়েছেন। অভিযোগ থাকতেই পারে। তবে একটি অনিয়মকে আরেকটি অনিয়ম দ্বারা শুদ্ধ করা যায় না। এখানেও অনিয়মকে অনিয়ম দ্বারা শুদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছে বলেই সমাধান মেলেনি।
গতকাল ধানমণ্ডির ‘জিনডিয়ান’ রেস্টুরেন্টে জেপির কেন্দ্রীয় নির্বাহি কমিটির বর্ধিত সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের ২২ মার্চ বিশেষ পরিস্থিতিতে আকস্মিকভাবে রাজনীতি থেকে অবসর নেন অনোয়ার হোসেন মঞ্জু। প্রায় দুই বছর বিদেশে নির্বাসনে থাকার পর সম্প্রতি দেশে ফেরেন তিনি।
সভা শেষে দণ্ডিত পলাতক ভিআইপিদের নিুআদালতে আত্মসমর্পণের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সম্পর্কে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জেপি চেয়ারম্যান বলেন, আইন অনুযায়ী যা করার আমি তাই করবো। তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বাতিল সম্পর্কিত অপর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ফাইস্যা গ্যাছি মাইনক্যা চিপায়। আমরা কি সেদিন সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি চাইনি? জামায়াত কি দাবি করেনি যে এটা তাদের চিন্তার ফসল?’
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, ৯০ দিনকে দুই বছর করাকে রাজনীতিবিদরাই অবৈধ বললেন। তাহলে সেই অবৈধ সরকারের কার্যক্রম বৈধ হয় কীভাবে? কারো কর্তৃত্বই যদি অবৈধ হয় তাহলে তার কার্যক্রম বৈধ হবে কেন? যদি ডকট্রিন অব নেসেসিটি’র কথা বলা হয় তাহলে আমরা তাকে অবৈধ বললাম কেন? যারা ওই কর্তৃত্বের শিকার হয়েছে তাদের এটা মানতে কষ্ট হয়।
জেপি চেয়ারম্যান বলেন, রাজনীতিতে উত্থান, পতন ও সংকট আমরা বারবার দেখেছি। রাজনীতিকরা বারবার অপমানিত, বিপদগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের চরিত্রহরণ করা হয়েছে। কিন্তু ভাত ও ভোটের অধিকার, মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার এবং পছন্দের নেতা-নেত্রী নির্বাচনের অধিকার রক্ষায় মানুষ সবসময় ওই শক্তিকে মিথ্যা প্রমাণিত করেছে। কিছু টাই পরা লোক, যারা ঠিক মতো বাংলাও বলতে পারে না, তারা উড়ে এসে জুড়ে বসে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ব্যাহত করে, মানুষের মৌলিক অধিকার বারবার কেড়ে নেয়। তবে জনগণের অধিকার হরণ করে এখানে কেউ বেশিদিন টিকে থাকতে পারেনি।
তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি কিছু মহল তাদের পছন্দের বিষয় চাপিয়ে দিতে চায়। শুধু দুই বছর নয়, এর আগেও যারা উড়ে এসে রাজনীতিবিদদের নসিহত করেছেন, তারা কোত্থেকে কিভাবে আসেন, মানুষ জানে না। মানুষ তাদের চেনেও না। চেনে দাতারা। জরুরি অবস্থার সময় দেখলামÑ সরকার প্রধান কে হবেন? অমুক এনজিও’র নেতা। অমুক ডক্টরেট হবেন। মানুষ যাকে চেনেন না। মানুষ তাকে সুদখোর হিসেবে জানেন। যিনি ৩৭ পার্সেন্ট সুদ নেন। কাপড়-চোপড়ে দেখতে বুদ্ধিজীবীর মতো। গ্রামীণ চেকের কাপড় পরে তারা গরিব মানুষের লোক সাজেন।
সাবেক মন্ত্রী মঞ্জু বলেন, বিশেষ আইন জারি, বিশেষ আদালত তৈরির মাধ্যমে রাজনীতিকদের চরিত্র হরণের ঘটনা এবার নতুন নয়। ’৭৫, ’৭৮ ও ’৮২ সালেও এরকম শক্তি নসিহত করতে আসে। আবারো জঘন্যভাবে রাজনীতিকদের চরিত্র হরণ করা হলো। এসব লৌহমানব ও তথাকথিত মহানায়করা যেসব রাজনীতিককে জেলে ঢুকিয়েছিলেন, যাদেরকে রাজনীতি থেকে বিতাড়িত করতে চেয়েছেন, শেষ পর্যন্ত সেই রাজনীতিকদেরই হাত-পা ধরে সমঝোতা করেছেন।
তিনি বলেন, আমি সমঝোতায় বিশ্বাস করি না। যুদ্ধেও বিশ্বাস করি না। এমনকি সন্ত্রাসেও বিশ্বাস করি না। কিন্তু যুদ্ধ কিংবা সন্ত্রাস যদি চাপিয়ে দেয়া হয়, যদি মানুষের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয় তাহলে এই বয়সেও আপস না করে লড়াই করার দৃঢ় মন-মানসিকতা আমার আছে।
পাকিস্তানের প্রসঙ্গ টেনে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, যারা নানারকম পরিবর্তন ও ভাগ্য উন্নয়নের কথা বলেন; তাদের সেই শাসনের ফল কী বিষময়, ধ্বংসাত্মকÑ তা পাকিস্তানের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। পাকিস্তান যতটুকু টিকে আছে সেটুকুও আজ বিপন্ন হওয়ার পথে। এটা রাজনীতিতে একটি বিশেষ শক্তির বারবার অবৈধ হস্তক্ষেপের ফল। দুই-তৃতীয়াংশ সময় ধরে যারা পাকিস্তানকে শাসন করলেন তাদের আজ নাম-গন্ধ নেই। সব দোষ রাজনীতিকদের। কারণ রাজনীতিকরা কোনো চমক দেখাতে পারেন না।
ভারতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ঠিক মতো নির্বাচন হলে, রাজনীতির ধারাবাহিকতা থাকলে একটি দেশ কী শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে, এর বড় প্রমাণ ভারত। সেখানেও জঙ্গিবাদ, গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি আছে। খুনি, বদমায়েশ, চোর, লুটেরারা সেখানেও এমপি নির্বাচিত হয়, তারা সরকার গঠন করে, মন্ত্রীও হয়। তাই বলে তাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কেউ ব্যাহত করতে পারেনি। তাদের নির্বাচন কেউ ঠেকাতে পারে না বলেই দেশটির ভিত এত মজবুত।
মঞ্জু বলেন, আমরা যারা বাংলাদেশ-পাকিস্তানের নাগরিক তারা বিষ্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করিÑ মুম্বাইতে ভয়াবহ বোমা হামলার এক সপ্তাহের মাথায় ৭/৮টি প্রদেশে নির্বাচন হল। সেই ঘটনা এখানে হলে কোন শক্তির আবির্ভাব হতো বলা মুশকিল। তারা এসে আমাদের নসিহত করতো, সংস্কারের ফর্মুলা শেখাতো, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সততার কথা বলতো। আসলে গণতন্ত্র সম্পর্কে ধারণা নেই বলেই তারা উড়ে এসে জুড়ে বসেন। তার মতেÑ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা থাকবে, কিন্তু মানুষের অধিকার হরণ করে এর সমাধান সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, জানি আমাদের মাথার ওপর কালো ছায়া, কালো মেঘ সবসময় থাকে। মুরব্বিরা এসে কখন কী বলে সে ভয়ে তটস্থ থাকতে হয়। এরপরও বাংলাদেশ কত ভালো ও সুন্দর দেশ তা নির্বাসনে না থাকলে বুঝতাম না। এখানে সবসময়ই কেবল অভিযোগ। তারপরও আপদে-বিপদে সবাই মিলে-মিশে থাকি। এটাই সুখ।
জেপি চেয়ারম্যান বলেন, কোন জোট বা মহাজোট সরকার গঠন করেছে সেটি আমার কাছে মূখ্য নয়। ১৫ কোটি মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার ফিরে পেয়েছে সেটিই মুখ্য। সরকারের কোনো বিভাগ বা পেশীশক্তি যদি অন্যায় করে, থানা যদি মামলা নিতে না চায়, তারপরও আদালতে প্রতিকার চাওয়ার অধিকার মানুষ এখন পেয়েছে। মানুষ তার ভোটের অধিকার ফিরে পেয়েছে। নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করছে। জনগণ যদি মনে করে সরকার পারছে না তাহলে তারাই আবার সরকারকে সরিয়ে দেয়ার অধিকারও ফিরে পেয়েছে।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আরো বলেন, বাংলাদেশে এখন কোনো রাজনৈতিক দলই বড় দল নয়। জোট-মহাজোট না করে কেউ এখন আর ক্ষমতায় যেতে পারে না। যদি ক্ষমতা থাকতো তাহলে ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তারা কোন কারণে আমাদের মহাজোটে নিয়েছেন? জেপি এখন মহাজোটে। এর আগে চারদলীয় জোটেও গিয়েছিল। সব সিদ্ধান্তই হয়েছে জেপির প্রেসিডিয়ামে। এই দলে গোপনে বা চিরকুটের মাধ্যমে কোনো সিদ্ধান্ত হয় না। এইভাবেই দলটির গঠনতন্ত্র রচিত। কাউকে উড়ে এসে জুড়ে বসে এটা চাপিয়ে দিতে হয়নি। সম্পাদনা: জুলফিকার রাসেল
লিংকঃ
Click This Link
সুদখোর কিন্তু নোবেল প্রাইজও পাই!!
আর মজ্ঞুর কথা কি বলব সব শিয়ালের একই রা!
আর আমি শুধু ব্লগেই ব্লগায়

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

