ইংল্যান্ডে নারীদের হিজাব পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হলে বাংলাদেশেরই এক সাহসী মেয়ে সাবিনার দায়ের করা মামলায় সেদেশের আদালত হিজাবের পক্ষেই রায় দেয় এবং ব্রিটেনে মুসলিমরা হিজাব পালনের অধিকার ফিরে পায়। অথচ সাবিনার মাতৃভূমি বাংলাদেশে যে কান্ড ঘটেছে তা শুনে বিশ্বের কোটি মুসলিম হৃদয় যে আঘাত হেনেছে তা নিশ্চয় বাংলাদেশের জন্য লজ্জাজনক। ফ্রান্স কিংবা ইউরোফের কয়েকটি দেশে হিজাব পরার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়ে কথা উঠলে বাংলাদেশ সহ মুসলিম বিশ্বেও প্রতিবাদের মুখে তা বারবার হোঁচট খায়। গত ৩ জুলাই পিরোজপুর জেলার জিয়ানগর উপজেলায় এমন একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে যা শুনলে মনে হবে এটি বাংলাদেশের কোন ঘটনা নয়। এ যেন ফ্রান্স, জার্মানি কিংবা ইউরোফের অথবা ইন্ডিয়া বা ইসরায়েলের কোন ঘটনা। যদিও ঐ সকল দেশে হিজাব পরার অপরাধে কাউকে জেলে যেতে হয়েছে কিনা তা আমার জানা নেই। কিন্তু সেই অবাক করা ঘটনাই ঘটেছে বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম দেশ আমাদের এই বাংলাদেশে। তিনজন বোরকা পরিহিতা নারী বাড়ী যাওয়ার পথে বৃষ্টি জনিত কারনে প্রায় জনশূন্য রাস্তায় বখাটে কিছু যুবক তাদের সাথে বর্ণনাতীত বাজে আচরণ করে এবং তাদের চরম ভাবে উত্ত্যক্ত করে। অশ্লীল কথা বার্তা বলেই তারা ক্ষান্ত হয়নি বরং হাতে থাকা মোবাইল কেড়ে নেয়ার মত জঘন্য কাজটিও করতে ছাড়েনি। শুধু তাই নয় আগত এক পথিকের কাছে মহিলারা ঘটনা বলার কারনে ঐ ব্যক্তিকে অপমান করে এবং মহিলাদের অপদস্ত করার জন্য ধাওয়া করে। অসহায় মহিলারা লম্পটদের হাত থেকে সম্ভ্রম রক্ষার জন্য একটি মাদ্রাসা গিয়ে আশ্রয় নেয়। আর এই বখাটেপনার নেতৃত্ব দেয় গনি শেখের লম্পট ছেলে মনির শেখ যার বিরুদ্ধে এলাকায় নারী ঘঠিত সহ বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ আছে। কিছু দিন আগে নারী সংক্রান্ত ঘটনায় মনির শেখকে এলাকার সালিশদারগন জুতা পেটা করে, যা বিভিন্ন পত্রিকায় ফলাও করে ছাপা হয়েছে। যাই হোক ঘটনা যদি এই পর্যন্তই হতো তাহলেও সমস্যা ছিলনা। আমরা মনে করতাম এই সমাজে কিছু বখাটে, লম্পট যুবক আছে এবং তাদের নির্যাতনের শিকার যে কেউ হয়ত হতে পারে। কিন্তু আমরা পরবর্তীতে যা দেখলাম তা যে বখাটেপনার চাইতে কোন অংশেই কম নয়। ভাবতেই অবাক লাগে একদল বখাটে লম্পট যুবকদের হাতে লাঞ্চিত কয়েকজন পর্দানশীন মহিলাকে এর ছেয়েও মারাত্বক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে প্রশাসনের কাছে। এলাকাবাসী খবর পেয়ে যখন বখাটে যুবকদেরকে পাকড়াও করার উদ্যোগ নিচ্ছিল ঠিক তখনই বখাটেরা বাঁচার জন্য পথ খুঁজতে থাকে। তারা পুলিশকে খবর দেয় যে কয়েকজন জঙ্গি মহিলা স্থানীয় মাদ্রাসায় জড়ো হয়েছে। ব্যাস, জঙ্গি খুঁজতে তৎপর পুলিশকে আর পায় কে। ধপাধপ গিয়েই কোন কিছু জি¹েস না করেই থানায় নিয়ে আসে। পুলিশ নাকি এসব না করেও পারছেনা কারন বখাটে হলেও তারা যে সরকারী দলের লোক। মহিলারা বখাটেদের উৎপাতের বিবরণ দেওয়ার পরও বখাটেদের গ্রেফতারতো দুরে তাদেরকে সেই বিষয়ে কিছু জিগ্গেস করারও প্রয়োজন মনে করেনি পুলিশ। সবছে অবাক করা বিষয় হলো জিগ্গাসাবাদ ও সার্চ করে কোন কিছুই না পাওয়ার পরও ঐ নির্যাতিত মহিলাদেরকে কোর্টে পাঠানো হলো। কিসের ভিত্তিতে, কোন অপরাধে তাদের কোর্টে পাঠানো হলো, ওসি সাহেব, পুলিশ সুপার দয়া করে বলবেন কি? এমনকি জঘন্য যেই কাজটি হয়েছে তা হলো তাদেরকে বোরকা খুলতে বাধ্য করা হয়েছে, ফলে পর্দানশীন মহিলাদের চিরায়ত অভ্যাসের বিপরীতে এক মারাত্মক বিব্রত অবস্থায় তাদেরকে পড়তে হয়েছে। পর্দানশীন নারীদের নিকট হিজাবই হলো সবছে বড়। তারা জেল যুলুমসহ সবই সয্য করতে পারেন কিন্তু সম্পদের চেয়েও বড় মান সম্মান ইজ্জত আব্র“ সম্ভ্রমই হলো তাদের হিজাব। তারা সব ছাড়তে পারেন কিন্তু হিজাব ছাড়তে পারেন না। তাদের সেই সর্বোচ্চ মর্যাদার বস্তু হিজাব খুলতে তাদের বাধ্য করা হয়েছে। বখাটেরা মহিলাদের সাথে উত্যক্ত আচরণ করেছে কিন্তু পুলিশ করেছে তারছে বেশী। পুলিশ মহিলাদের সর্বোচ্ছ সম্মানের হিজাবই কেড়ে নিল। পুলিশের অপরাধ বখাটেদের ছেয়েও কম কিসে। ওসি সাহেব বললেন তাদের কাছে কোন কিছুই পাওয়া যায়নি, তারপরও কোন অপরাধে তাদেরকে জেলে পাঠানো হলো? শুধুমাত্র সরকারী দলের বখাটেদেরকে এই জঘন্য ঘটনা থেকে বাঁচাতেই পুলিশ নিরিহ পর্দানশীন মহিলাদেরকে মিথ্যা ও বানোয়াট জঙ্গি বানিয়ে জেলে পাঠালো। বাংলাদেশে বোরকা পরা নারীদের সংখ্যা কয়েক লক্ষ নয় বরং কোটিরও উপরে। বোরকা পরলেই যদি জঙ্গি হয় তাহলেতো দেশের লক্ষ কোটি নারীই জঙ্গি হয়ে যাবে। দেশের শপিংমল, বিশ্ববিদ্যালয় সহ সর্বত্রই হিজাব পরা মেয়েরা এই ঘটনার পর তাদের মান সম্মান নিয়ে এখন উদ্বিগ্ন। কারন কখন যে কাকে কেউ এসে জঙ্গি বলে পুলিশে দেয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে বখাটেরা মেয়েদেরকে উত্যক্ত করার সংবাদ আমরা পত্রিকায় প্রায় দেখছি আবার এও দেখছি যে সব স্থানেই বখাটেদের বিরুদ্ধে সাধারণ ছাত্রছাত্রী, স্থানীয় জনগন, মিডিয়া এবং প্রশাসন বিভিন্ন ভূমিকা পালন করছে এবং বখাটেদের অনেকেই জেলে গেছে কিন্তু এই প্রথমই অত্যন্ত আশ্চার্য্য হয়ে দেখলাম যে বখাটেদেরতো কিছুই হয়নি উল্টো নির্যাতিতা মহিলারা গেছে জেলে। বখাটেরাতো এখন আরও সুযোগ পাবে। হয়ত একজন বোরকা পরা মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দিল, আর সেই মেয়ে প্রত্যাখান করলো, তখনি হয়ত সেই বখাটে চিৎকার দিয়ে পুলিশ ঢাকবে যে একটা জঙ্গি মহিলা ধরা পড়ছে, অমনি পুলিশও তাকে থানায় এনে জেলে পাঠিয়ে দিবে। তাহলে বোরকা পরাইকি তাদের অপরাধ? হায়রে দেশ! হায়রে প্রশাসন! হায়রে নিয়তি! এভাবে পুলিশ বখাটেদের উস্কে দিচ্ছে নাকি বোরকার বিরুদ্ধে এ্যাকশন নিচ্ছে। এটাতো মুসলমানের দেশ। এখানেতো বোরকা পরা নারীদের নিষিদ্ধ নয়। বোরকাতো আমাদের দেশের মা বোনদের মর্যাদার ও ব্যাক্তিত্বের প্রতীক। বখাটে দ্বারা নির্যাতিত হয়েও পর্দানশীন তিনজন উচ্চ শিক্ষিত মহিলাকে বোরকা খুলে জেলে যেতে হয়েছে, এত বড় একটি ঘটনা জানার পরও সরকারের উচ্চ মহল থেকে কোন পদক্ষেপই লক্ষ্যকরা যাচ্ছেনা তাহতো এটাই প্রমান হচ্ছে যে এই ভূমিকা পুলিশের নয় বরং সরকারের। এই হয়রানী বোরকার বিরুদ্ধে নয় ইসলামী অনুশাসনের বিরুদ্ধে। পনের কোটি মুসলমানের দেশে ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সরকার মানুষের আস্থা নিয়ে টিকে থাকতে পারবে না। এক জন স্বাধীন নাগরিককে কোন প্রকার অপরাধ ছাড়া কোন ধরনের হয়রানি বা সম্মান হানী করার অধিকার কোন ব্যক্তি, প্রশাসন, সরকার বা রাষ্ট্রের নেই। উক্ত নারীদের ন্যুনতম অপরাধ না থাকার পরও তাদের সাথে যে আচরণ করা হয়েছে তার দায়িত্ব সরকারকেই বহন করতে হবে। এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর কোথাও আছে কি? ঐ মহিলাদের সাথে যে বর্বর আচরণ করা হয়েছে তা নিঃসন্দেহে মানবাধিকারের পরিপন্থী। এতে দেশের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম ভাবে আঘাত করেছে। মানবাধিকার ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা শাস্ত যোগ্য অপরাধ। এই ঘটনার প্রতিবাদে জিয়ানগর, পিরোজপুরের গন্ডি পেরিয়ে রাজধানী সহ সারাদেশে বোরকা পরা হাজার হাজার ছাত্রী ও নারীরা যদি মানববন্ধন সহ অন্যান্য আন্দোলনে নামে তাহলে তা নিশ্চয় দেশের ভাবমূর্তি ও আইন শৃংখলার জন্য সুখকর হবেনা। প্রশাসন কঠিন কাজে নিশ্চয় তাদেরকে নামাবেনা। এছাড়া কোন বিক্ষুব্দ ব্যক্তি যদি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ এনে হাইকোর্টে মামলা করে এর প্রতিকার চান তাও সংশ্লিষ্টদের জন্য বিব্রত হবে। সুতরাং অবিলম্বে ঐ নিরিহ মহিলাদেরকে মুক্তি দিতে হবে এবং বখাটে লম্পট যুবকদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তি দিতে হবে। শুধু তাই নয় পুলিশের অতি উৎসাহী ভূমিকার ফলে মহিলাদের এবং তাদের পরিবারের যে সামাজিক ক্ষতি হয়েছে এবং সর্বত্র প্রশাসন ও সরকারের যে ভাবমূর্তি ক্ষন্ন হয়েছে সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে, যেন ভবিষ্যতে এহেন জঘন্য ঘটনা পরিস্থির উদ্ভব না ঘটে। সেই সাথে মহিলা গনের সামাজিক ভাবে যে অপুরনীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে এবং সারা দেশে সরকারের ও বিশ্বব্যাপী দেশের যে ইমেজ ক্ষুন্ন হয়েছে সে জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরকে ক্ষমা চাইতে হবে। যদি এর ব্যাত্যয় ঘটে এবং সরকার তার বখাটে যুবকদের বাঁচানোর জন্য নিরপরাধ পর্দানশীন মহিলাদেরকে হয়রানী করা অব্যাহত রাখে তাহলে বলবো সব দিন এক যায়না। এই দিন এক দিন বদলাবে। সেদিন হয়ত মানুষ তাদের সামনে দলীয় ষন্ডাদের বাঁচাতে নিরিহ মানুষের উপর নির্যাতনের প্রতিশোধ নিবে। সংশ্লিষ্টদের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক। সেই প্রত্যাশায় রইলাম।
লেখকঃ মানবাধিকার কর্মী ও কলামিষ্ট।