পথপ্রীতির বাসায় পথিকের অবাধ একসেস থাকলেও রাতেই প্রীতি ফোনে বলে দিয়েছে সকালে বাসায় না এসে বাইরে কোথাও মিট করার ব্যাপারটা।
প্রীতির এই ব্যাপারটা পথিকের কাছে কিঞ্চিত আশ্চর্য জনক হলেও কখনও জিজ্ঞেস করে নি সে। আজও করেনি। তবে মিথ্যে কথাটা শোনার খুব সাধ জাগায় সকালে দেখে হতেই জিজ্ঞেস করেছিল 'বাসায় কি বলে এলে?'
পথিকের সাথে কোথাও ঘুরতে গেলে কোন এক অজানা অভ্যাসে পথপ্রীতি বাসায় মিথ্যে বলেই আসবে। এবং পথিকের জিজ্ঞাসার তোয়াক্কা না করেই এসে মিথ্যেটা পথিক বলতে বলতে সে তার অদ্ভুত সুন্দর দাঁতগুলো বার করে হাসতেই থাকবে। সে হাসির ছটায় দিনের শুরুতেই পথিক পড়ে যায় মনের গহীন খাদে। সেটা অবশ্য দুজনেই বোঝে আবা কেউ বোঝেনা।
বরাবরের কোন ব্যতয় হয়নি আজ সকালেও। তবে আজ সকালে দুজনার অনুক্ষণ মিটিং প্লেসটা নির্বাচনের ব্যাখ্যাটা ছিল একটু আলাদা রকম অদ্ভুত এবং সেটা নির্ধারন করেছিল প্রীতি। রাতেই বলে দিয়েছিল প্রীতির বাড়ীর দুটো গলি ছাড়িয়ে ডান দিকের ঘুর পথটা দিয়ে এগোলে চোখে পড়বে তিনটে কৃষ্ণচূড়া গাছ। যার মাত্র একটিতেই এই বসন্ত অবশেষে ফুল ফুটেছে। বাকী দুটো আজও বন্ধ্যা। ফুল ফোটেনি। ফুল ফোটা কৃষ্ণচূড়ার তলে পশ্চিমমুখী হয়ে দাড়াঁতে হবে পথিককে। তারপর দূরে তাকিয়ে সেই জিনিসটা খুঁজে বার করতে হবে যা পেলেই প্রীতিকে পাওয়া যাবে খুঁজে। প্রীতি আরও বলে দিয়েছিল ঐ খোঁজা খুঁজির জন্যে সর্বোচ্চ ৫ মিনিট সময় লাগবে। পাঁচ মিনিট পরে অবশ্যই পথপ্রীতির দেখা পাবেই।
পাঁচ মিনিট হতেই পথিকের কাঁধে হাতের স্পর্শ ছিল যার সে পথপ্রীতিই। পথিক তখনও পশ্চিমে তাকিয়ে রহস্য উদঘাটনে ব্যস্ত ছিল। সামনে অনেক বাড়ী আর গাছপালার মাঝে কি রহস্য খুঁজতে বলেছিল পথিক বুঝতেই পারছিলনা। আসল ব্যাপারটা যখন খোলাশা করল প্রীতি, পথিক বোকা বনে গেলো।
আসলে ঐ গাছটির তলা থেকে পশ্চিমে ২০০/২৫০ গজ দূরে একটা বাড়ীর একটু অংশে একটা জানালার একটা কাঁচ দেখা যায়। ওটা পথপ্রীতির ঘরের জানালার অংশ। এত এত বাড়ীর মধ্যে পথিকের চোখে ওটা ধরা পড়পর কথাই নয়। কিন্তু পথিক যখন খুঁজছিল , প্রীতি ঠিকই জানালার ফাঁক দিয়ে দূরে পথিককে গাছতোলার বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বাড়ী থেকে গাছ তলায় এসেছে । আর ওখান থেকে ওতটুকু আসতে ঠিক ৫ মিনিটই লাগে।
পথিককে এভাবে একটু ভাবগত উপায়ে চমকিত করার প্রচেষ্টার দ্বারা প্রায়ই প্রীতি পথিকের এবং পথিকের উদাস আচরণের প্রতি তার সূক্ষ্ম আবেগ আর ভালবাসার উৎসরণই বুঝাতে চায় সম্ভবত । পথিকও সেই সুযোগে মনে মনে আকেটু এনজয় করে নেয়। কিন্তু আসলে কেউ কাউকে কিছূ বুঝতে দিতে চায়না।
প্রীতিদের বাড়ী সীমানা দ্রুত পেরিয়ে মেইন রোডে উঠে এল দুজন। যদিও ঐ এলাকায় এই দুই যুবক যুবতীর সখ্যতা বাহ্যিক দৃষ্টিতে এমন গোপনীয় বা এমন প্রকাশ্যও নয় যাতে দৃষ্টিকটূ বলার পাযতারা করতে পারে দুষ্টু মনের কেউ।
'কোথাও ঘুরতে যাওয়া যায়’' - এই বিষয় নিয়েই দুজনে তর্ক জুড়ে দেয় । সমাধানের দিক ছিল ইনফাইনাইটের দিকে। অবশেষে অবশ্য পথিকের একটা প্রস্তাব মেনে নিয়েছিল পথপ্রীতি। ও প্রস্তাবে পথিকের যুক্তিছিল বেশ কয়েকটি এবং কয়েকটি প্রীতির সাথে একই মতের।
পথিকের যুক্তিতে প্রথমত ছিল; ঢাকা শহরে ডেটিং করার মতো বা ঘুরার মতোই কোন জায়গা নেই। তাই এমন জায়গা খুঁজতে হবে যেখানে সাধারণত কেউ সচারচর যায়না।
দ্বিতীয়ত; তারা দুজন যেহেতু প্রচলিত অর্থে প্রেমিক যুগল নয় তাই তাদের এই ভ্রমন পর্বটাকে সেই অর্থে ডেটিং বলাও যাবেনা। তাই অন্য যুগলদের মতো পার্কের আড়ালে বা `ফার্নেস` এর মতো কোন নিরব ফাস্টফুডের শপে আঁধারে বসার চিন্তা তাদের মাথায় আসলে হবে না।
তৃতীয়ত; যেখানেই যাওয়া যাবে এই শহরে কেবল মানুষ আর মানুষ। সবার চেহারায় কেমন জান দুষ্টু ছাপ অথবা হাতাশার প্রকাশ। দেখতে দেখতে অতীষ্ট নিত্যদিন। তাই মানুষের ভীড় পরিহার করতে হবে।
একারনেই পথিকের চিড়িয়াখানা যাওয়ার প্রস্তাবটা গ্রানটেড হলো।
পথপ্রীতর বলেছিল ,' হ্যাঁ, ভালোই , চল, জীবজন্তুর ইনোসেন্ট মুখ গুলো দেখে একটু ইনোসেন্ট হওয়ার চেষ্টা করি। '
কিন্তু চিড়িয়াখানায় ঢুকেই দুজন ভীষন অবাক হয়েছিল। ওখানেও সেই মানুষ আর মানুষের মুখ। তবে সেটা ছাড়াও চিড়িয়াখানাতেও তার আবিষ্কার করেছিল অসংখ্য প্রেমিক যুগল।
ণিকের প্রেমিক যুগল ছদ্মবেশে দুজনে লেকের ধারে নিরিবলিতে অন্যদের মতোই ঘাসের উপর বসে পড়ল বাধ্য হয়ে।
'পথিক, মাথাটা ঝিমঝিম করছে। ইস কত দূর। ঠান্ডা পানি পাওয়া যাবে রে আশেপাশে।
আচ্ছা থাক পরে দেখিস। ঐ দেখ লেকে কি সুন্দর হাসগুলো হাসছে , চড়ছে। ওয়াউ। '
'তোর বেশী মাথা ধরলে ইচ্ছে করলে আমার কাঁধে মাথা রাখতে ...'পথিকের বলা শেষের আগেই প্রীতির মাথা ছূঁয়েছিল পথিকের কাঁধ। স্পর্শ করেই বলে উঠল, ' তোর বলায় না, আমার ইচ্ছে তেই রাখলাম। মাথা ধরেছে বলেই। '
এই তো সুযোগ। পথিক দেরী করলো না। কথার পিঠে কথা বলেই ফেলল,' তাহলে আমার ইচ্ছে করছে তোর সুন্দর ঠোঁ...'
সাহসী কথাটা বলার আগেই মোবাইলের বিশেষ সুর বেজে উঠল। প্রীতিও জানে এই সুরের মাহাত্ম।
'উঠছিস কেন? আমার সামনেই বল না , শুনি প্রভাকে কি বলিস তুই।'
'চুপ, বয়। একটু ..'
উঠে দাড়িঁয়ে লেকের ধারটাতে গিয়ে দাঁড়াল পথিক। প্রীতির সামনে কোন সমস্যা নেই । তারপরও আনইজিনেস।
প্রীত একবার পথিকের দিকে তাকিয়েই হেসে ফেলল। পথিক দেখে ফেলে পাচে তাই মুখ ঘুরাল সাথে সাথে হাসগুলোর দিকে।
' কেমন আছ , প্রভা।'
'এইতো আছি। শোন, ও এক্ষুনি চলে আসবে। দোকানে গেছে। ও সেটে সিম ঢুকিয়ে কথা বলছি।'
'তোমার সেট?'
' ভেঙে ফেলেছি আছাড় মেরে।'
' কেনো, কিভাবে?'
'আরে বাবা, শোনোই না , সময় নেই। তোমার সাথে দেখা করব। '
'কোথায় , কবে , কখন...'
`Ôপরে ফোন করে জানাব। আমার এক বান্ধবীর বাসায়। এখন রাখি। মাথায় রেখ বিষয়টা।'Õ
'আরকেটু কথা বলি। অনেকদিন তো ফোন করোনা । আর বান্ধবীর বাসায় কেনো যাবো?'
' চুপ , পরে আমি ফোন দেবো।
ওখানে যাবো গল্প করতে। ওকে। বাই।'
কেটে দিল পথপ্রভা।
ফিরে এল প্রীতির পাশে। পথপ্রীত বলতে যাচ্ছিল , 'কি যেন বলছিলি পথিক', কিন্তু না থেমে গেলো পথিকের শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে।
প্রীতি পথিকের এই রূপটা সম্পর্কে তেমন অবগত ছিলনা। আজকে দেখে নিল। প্রভার সাতথ কথা বলার পর তার চেহারায় একটা বেদনার ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, একটা অপরাধীর মুখোশ যেন হেসে ওঠে সেখানে।
জিজ্ঞেস করল, ' কি হয়েছে, কি বলল রে?'
' দেখা করতে বলেছে ওর সাথে।'
'গুড। তো কবে। আজকেই নাকি?'
' না পরে জানাবে...'
' ও আচ্ছা । বস । দেখি ঐ দোকান থেকে একটা ঠান্ডা পানির বোতল নিয়ে আসি।'
বলেই উঠল প্রীতি এবং পেছনে ঘুরেই আবার বলল, 'সিগারেট লাগবে নাক ?'
২৯/০৫/০৭
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে এপ্রিল, ২০০৭ সকাল ১১:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



