রত তখন আটটার কিছূ বেশী ই প্রদর্শন করছিল দরজা বরাবর দেয়ালে টানানো ঘড়িটা। উত্তর দিলাম একটু জোড় গলায় ‘মা, এইতো বড় রাস্তায় কপির জন্য যাচ্ছি।’
কাছেই খাবার জন্য ব্যবহৃত চৌপায়াখানা গোছাচ্ছিল ঐ মেয়েটি, যাকে গৃহসহায়িকা বলে সম্মানিত করার চেষ্টা করা যেতে পারে কিন্তু তদাপি আদৌতে বাস্তবিক কাজের মেয়ে পরিচয় টিই তার স্বীকৃত হয়ে আসছে। তার কানেও গেলো আমার উচ্চ উচ্চারণ আর তাতেই বলে উঠল,
‘ ভাইজান , আপনে কপি আনবেন, ও আল্লাহ! খুব ভালা হইবো, তয় বাসায় কইলাম দুইটা বড় বড় ফুলকপি আছে, বাধা কপি লইয়া আইসেন, বড় আপায় সকালে বাধাকপির ভাজি দিয়া রুটি খাইতে পছন্দ করে। ওল কপি আবার আইনেন না কইলাম, এহনও পোক্ত হইবার সময় হয়নাই, আপনেরে কইলাম ফাঁকি দিয়া দিব, বাধা কপি কইলাম টিপ্পা টিপ্পা আইনেন টাইট দেইখ্যা...’
আর শোনা হয়নি। সিড়িতে তখন ছন্দহীন আওয়াজ তুলে আমি নিচে...কাজের মেয়েটাকে মা’র মজার বকা দেওয়ার ভাষ্যটুকু শোনার সময় হবে কি করে টেনশন মাথায ফটোকপির দোকান টা খোলা থাকে কিনা। ধার করা নোটখাতা খানা অর্ধেকও লিখে শেষ করতে পারিনি। অথচ কাল সকালেই ফেরত দিতে হবে।
ফটোকপির দোকান খোলা পাওয়া গেলই না। আটঘটিকা বন্ধ আইন বলবত বিষয়টা মাথায় ছিলনা। শুধুশুধু নষ্ট হলো ৩০ টি মিনিট। বাসায় ফেরার সময় বাজারের সামনে ওল কপি দেখে ভাবলাম নিয়েই নেই। কিন্তু কাজের মেয়েটির বোকামীটা কপি করতে ইচ্ছে করল না। এমনেতেই সরারাত জাগতে হবে হ্যান্ড কপির জন্য বুঝতে পারছিলাম। ফটো মাধ্যমে দ্রত আর হুবুহ কপিটা করতে পারলে ঘুমের সাথে নিরব কোপাকপি ব্যাপারটা ঘটাতে হতোনা।
সার রাত জেগে হাতের কব্জিতে চিনচিনে ব্যাথা ধরিয়ে সেই নোটখাতা খানা কপি বা নকল করার ফলটা অবশ্য খারাপ হয়নি। নকল করতে করতে অনেকটা পড়াও হয়ে গিয়েছিল আর দুইদিন পরের পরীক্ষাতে সেই খাতার নোটগুলোর ভুমিকাই মুখ্য ছিল- ভাল নম্বর পাওয়াতে। ধন্যবাদ- খাতা ধার দেনে ওয়ালা।
এই দেখো কপির নাকি বাংলা প্রতিদশব্দ নকল। অথচ স্কুলে পরীক্ষার হলে একবার এক সিনিয়র ভাই, দুক্লশ উপরে পড়ত , সিট পড়েছে আমার পাশের সিটেই। শিক্ষক মহাশয় একটু দূরে গেলেই ওনার হাতে দেখা যাচ্ছিল ছোট এক টুকরো কাগজ। ভাবছিলাম আমি মাথা থেকে খাতায় কপি করছি আর উনি করছেন কাগজ দেখে দেখে, দুটোই তো কপি অথচ হঠাৎ শিক্ষক মহাশয় খপ করে চিলের মতো উড়ে এসে ছোঁ মেরে কেড়ে নিলেন সিনিয়র ভাইজানের সেই হাতের টুকরো কাগজ। বেচারা নকল করা দোষে একেবারে রেড হ্যান্ডেড কট , ওমা, ধুম করে ভাইজান বেঞ্চের উপর পড়ে গেলেন, জ্ঞান উধাও, বেহুস...অভিনয়টাও ভাল নকল করা শিখেছিলেন বলেই সেদিন বোধহয় রাস্টিগেট হওয়া থেকে বেঁচে গেলেন। আর অতি সন্নিকটে ঘটে যাওয়ো সে ঘটনায় আমার মাথা হুবুহু কপি করার খেমতা লোপ প্রাপ্ত হলো সেদিন।
হুবুহ নকল শব্দটির ইংরেজী কি তে পারে ভেবে দেখেছেন. ডুপ্লিকেট কপি হবে বোধহয়। কিন্তু তাইলে রেপ্লিকা শব্দটি আবর কেনো?
আসলে তো এত প্যাচানোর দরকারই নেই। অক্সফোর্ড ডিক্সনারীতে কপি শব্দটির দ্বিতীয় অর্থটিই দেখুন ঠিক নিচের মতো-
- - to write something exactly as it is written else where.....
নকরের জন্যে ধরা খাওয়া এবয় বেহুশ হয়ে পড়া সেই ভাইজান কি কাগজের টুকরো থেকে হুবুহু দেখে দেখে খাতায় তুলছিল। যদিত তুলে থাকে তাইলে ঐ সংগা মতে সেটা কপি মানে নকল আর একটু যদি বুদ্ধি করে ঘুরিয়ে লিখে থাকে তাইলে কি আর নকল বলা যাবে। দেখে লেখার দোষটার জন্য দায়ী করা যেতে পারে সেক্ষেত্রে কেবল। মাথার থেকে যা কপি করছিলাম আমি সেটাও তাইলে আর কপি বলা ঠিক হবে না। তাইলে কি বলব..শুধু লেখা বলাই সেফ সাইট মনে হয়।
ফটো কপি এর দিকে একটু আলোকপাত করাই। ফটোকপি শব্দটাকে ভাঙলে কি হতে পারে। ফটোকে কপি , না ফটো দ্বারা কপি। পরেই টাই অব্যশই যুতসই বা মানানসই। ঠিক না? তাইলে ফটো কে যখন ঐ ফটো দ্বারা কপি করা হবে তখন নিশ্চয় তাইলে বলতে হবে ফটো ফটোকপি।
সে যাই বলুন না কেনো। সেবার ভারতে গিয়ে পড়েছিলাম মহা সমস্যায়। হ্যাচ মোবাইলের সীম দরকার। কিনতে পাসপোর্ট জমা দিতে হবে। তথাস্থ। বিদেশ বিভূইয়ে হিসেবের টাকা থেকে কতগুলো টাকা নষ্ট হবে আর কি। তা না হয় হোক। কিন্তু দুই তিন রোড ঘুরেও কোথাও দেখলাম না লেখা আছে ফটোকপি । কি আজব। এরা কি কপিই করেনা। নাকি ফটো ছাড়া আরও অন্য কোন উপায় ব্যবহার করচে ওরা। ভাবছি আর ভাবছি। হঠাৎ মনে হলো একটু দোকানের ভেতরেই উঁকি ঝুকি মারতে মারতে দেখতে থাকিনা। ব্যাস , অনেক দোকানেই দেখি সেই একই মেশিন যা আমাদের নীল ক্ষেতে রাশি রাশি । সেই অতি চেনা ফটোকপি মেশিনই তো। কিন্তু ওরা বলছে জেরোক্স , দোকানের গায়েও লেখা জেরোক্স । বলেন তো , আবার এই শব্দের পোষ্টমর্টেম করি কখন।
ওদিকে ইঁদুর মারার কল কে আবার কারা যেন নাম দিয়েছে কপিকল। আরে কপি কল নামটা তো হওয়া দরকার ছিল ফটোকপি মেশিনটার। তাই না?
শেষে একটা সত্যি কথা বলতে খুব ইচ্ছে করছে। একবার গ্রাম থেকে এক গ্রামতোতো মুরুব্বি এসেছেন। কে জান তার হাতে আমার লেখা অখাদ্য ( তার জন্য তো অবশ্যই) কবিতার বই ধরায়ে দিয়েছে। বইটা হাতে নিয়ে উনি আমার মাকে যা বললেন তার হুবুহু কপিটা ছিল এমন--‘ এত লেখাপড়া কইরা তোমার পোলা তাইলে কপি হইছে , কপি।’

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

