যাব যাব করে আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি কেবল সঙ্গীর অভাবে। আসলে মন যতই পথিক হোক , জীবন যতই হয়ে উঠুক একাকীত্বের পূজারী ;বাস্তবতা একাকীত্ব সাপোর্ট করেনা সর্বত্র। তার উপর ছুটি পেলেই তো দৌড়াতে হয় ঢাকায়। সঙ্গী সম্বল সফর , বান্দরবান ভ্রমনের সাধ তাই অপূর্ণই ছিল।
পরকিল্পনা যত দ্রুত নেয়া হলো, পরিকল্পনার বাস্তবায়নের সময়ও ততই স্বল্প। মাত্র দেড়দিন হবে সফর।
বান্দরবান যাব - মুখ্য পরিকল্পনা সেটাই ছিল। বগা লেক যাওয়া হবে কি হবেনা ,ঠিক ছিলনা। আসলে ছিল না বগা লেক সম্পর্কে তেমন কোন সম্যক জ্ঞানও কারও। অথচ শেষ পর্যন্ত বগা লেকই হয়ে উছেছিল আমাদের ঐ অনুক্ষণ ভ্রমনের মূল প্রাণ।
বগা লেকের সৌন্দর্য যেমন অসাধারণ মধুর এর যাত্রা পথের ধকলও তেমন অসাধারণ বিষাদের। এই অসাধারণ বিশ্লেষনই ম্লান করে দিয়েছে বান্দরবানে মন কাড়া আরও অনেক মুগ্ধতাকে।
তবুও ভুলিনি প্রিয় এই ভ্রমনের প্রতিটি ক্ষণ। ক্রমানুসারে আপন বর্ননায় তাই এগিয়ে যাব ডুব দিতে বগা লেকের স্বচ্ছ জলে।
( একটু খেয়াল করে দেখবেন , আমি এখানে বান্দরবন না লিখে বান্দরবান লিখছি। হয়তো সকলেই জানেন, আমি জানতাম না। সারা জীবন স্কুল কলেজে লিখে এসেছি ‘বান্দরবান’। ঐ স্থানে গিয়েই জানলাম আসলে শব্দটি বন নায় বান হবে। )
যাত্রা শুরু আর মেঘলায় জুড়াল চোখ
-------------------------------
গত ১৯ শে এপ্রিল শুক্রবার সকালে ঢুলু ঢুলু চোখে উঠে গোছাতে লাগলাম। চোখে তখন গতরাতে বাংলাদেশ ক্রিকেট টীমের শোচনীয় পরাজয়ের লাল ছাপ।
৮টার মধ্যেই রওয়ানা হয়ে গেলাম আমরা বান্দরবানের পথে। মোট ৬ জন। আমি , সুমন, করিম, আশফাক ভাই, জীবন আর নাসিম। ড্রাইভার নুরু সহ অবশ্য ৭ জন।
চকোরিয়ার সুরম্য ইনানী রিসোর্টে জমপেষ প্রাত ভোজন ( আমার আর সুমনের ২য়বার) সেরে আর সিল্ক লাইন থেকে নামা মিষ্টি মেয়েটার মিষ্টি হাসিতে মন ভরিয়ে চকোরয়িার বন পথ দিয়ে ছুটে চলছিল গাড়ী আর দেখছিলাম ডানে বন পেরিয়ে ঐ দূরে আবছা পাহাড়গুলো। ভাবছিলাম ঐগুলোই বান্দরবানের পাহাড়। কিন্তু তখনও একটুও ভাবিনি আগামী ৩০/৩৫ ঘন্টা ঐ পাহাড়গুলোতেই চরম ঝুকি নিয়ে এক টা হতে আরেকটা তে ছুটবো আমরাই। আর ভাবিও নি ওখানেই চরম আনন্দে ৩০০০ ফুট উপরে নান্দনিক বগা লেকে ফুটেছে শাপলা ফুল আমাদেরই জন্যে।
লোহাগড়া উপজেলার কেরানীহাট স্থানটিতে হাইওয়ে ডান দিকে চলে গেছে বান্দরবানের পাবর্ত্যে। মাইল ফলকে দেখলাম মাত্র ১৯ কিমি বান্দরবান।
আরও কিছুদূর যেতেই যেন পথ ধীরে ধীরে হতে লাগল উচুঁ। পাল্টে যেত লাগল দ্রুত সমতলের পরিবেশ। ডানে বামে পাহাড় গুলো হঠাৎ চলে এল খুব কাছে। হঠাৎ বামে বেশ মনোরম আর্কিটেকচারে গড়া বান্দরবান টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনিস্টিটিউট দেখে বুঝে ফেললাম শহরের সন্নিকটে পৌঁছে গেছি।
ধারণা আরও পোক্ত হলো আরেকটু এগিয়ে পাহাড়ী পথের ধারে পর্যটনের হোটেল আর হোলিডের কটেজ গুলো দেখে। ইতোমধ্যে দুবার পুলিশ আর আর্মির প্রশ্নের উত্তর দিয়ে পথের কিয়ারেন্স নিতে হয়েছে। তাতে একটা জিনিস বোঝা গেলো-বান্দরবান শহরের চরম সতর্কতার আড়ালে প্রচ্ছন্ন ভয়াবহতা।
উপর থেকেই প্রায় ২০০/২৫০ ফুট নিচে চোখে পড়ল সুদর্শন লেক। আমাদের মধ্যে কে জান চিৎকার দিয়ে উঠল, থাম থাম লেকর ছবি তুলব। তখনও আমরা জানিনা একটু পরে ওখানেই ঘুরব।
লেকটাই আসলে ‘মেঘলা’ নামের পর্যটন কেন্দ্র এবং সাফারী পার্ক। ঢুকতে পার পারসন ৯ টাকা করে লাগে।
দু দুটো সুদর্শন ঝুলন্ত সেতু নজড় কেড়ে নিল প্রথমেই। বামের সেতু দোলুনির আনন্দ মনে সঞ্চার করে হেঁটে পাহাড়ের উপর উঠে যেতে লাগলাম। তারপর খেয়াল হলো পথটা বেশ ঘুরে আরও কটা পাহাড় হয়ে অন্য সেতুর উপর দিয়ে ফিরে এসেছে। এনার্জি সেভ করার মানসে আমরা মাঝের একটা শটকার্ট খাড়া ঢাল বেয়ে নিচে নেমে এলাম । মাঝের এই এলাকাটা বা দ্বীপটা একটা ছোট খাট চিড়িয়াখানা । কয়েকটা বন্য জীব খাঁচায় বন্দী। লেকের ওপাশে হাই ভলিউমে বাজতে থাকা গানের তালে তালে ভাল্লুকের শরীর দুলুনীটাকে নাচ বলেও চালানো যাবে। বেশ মজা।
চারদিকে পাহাড় ঘেরা এই লেক আর ঝুলন্ত ব্রীজ, উঁচু সিড়ি আর ঢাল বান্দরবান ভ্রমনের প্রারম্ভেই মুগ্ধ করল আমাদের হৃদয়।
---
//
ছবিতে--
বামে ১মটি বগালেকর
তার নিচে পাহাড়ে আগুন ( চিম্বুকে যাবার পথে)
তার নিচে -শৈল প্রপাত।
উপরে ২য় ছবিটি বান্দরবান শহরের বৌদ্ধ মন্দির
ডানে ১ম ছবিটি মেঘলায় শিমুল তুলার গাছ
২য় টি মেঘলার বামদিকের ঝুলন্ত ব্রীজ
৩য় টি হোটেলে ম্যাপ
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা মে, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


