somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অসাধারণ মুগ্ধতায় দেখে এলাম বগা লেক ( ৯ম পর্ব)

০৭ ই মে, ২০০৭ রাত ৮:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বগা লেকের সৌন্দর্যে ভুলে গেলাম সব ক্লান্তি
---------------------------------------

রুমা বাজারের পর বেশ কিছুদূর এই উপজেলার রেষ দেখা গেলো। কারন অনেক সমতল আশেপাশে। একটা বেশ বড় জলাশয়ও দেখলাম। সমতলে এখানে জমিতে দেখলাম তামাক আর আদার চাষ হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে। এদিকে রাস্তারও কাজ চলছে। হয়তো ভবিষ্যতে কখনও এলে এদিকেও পীচ ঢালা রাস্তা খুঁজে পাব ।

সমতলটুকু পেরিয়ে গেলেই আবার রাস্তা উপরে উঠতে শুর করলো। কোথাও হঠাৎ করে একদম খাড়া ও উঠে গেছে রাস্তা। গাড়ী পেছনে পড়ে যায় যায় প্রায়। ডানে বয়ে যাচ্ছে সাঙ্গু নদী। এদিকটার প্রকৃতি আরও ভীষণ প্রাকৃতিক। মানুষ এর পদচারণা কম বলে বোধহয়। কোন কোন পাহাড় কেবলই বিশাল বিশাল গাছ আর গাছে ভরপুর। অসাধারণ সবুজ।
মাঝে সাঙ্গুর একটা সরু ধারার উপর দিয়ে দ্রুত চলে গেলে গাড়ী। তারপর আবার দ্রুত উঠে গেলো রাস্তা অনেক উপরে।

রাস্তা যেমন এবড়ো থেবড়ো তার বাঁক ও তেমন ভয়ংকর আর একটু পর পরেই। যেন কেবলই প্যাচিয়ে প্যাচিয়ে উঠছি উপরে আর উপরে। উঠছিই কেবল। এখন আর নামার কোন নাম নেই। সবচেয়ে ভয়ংকর স্থান টিতে উঠে গেলাম একসময়। হাতের ডানে নিচে তাকালেই আত্মার পানি শুকিয়ে যায়। নিচে ছোট বড় পাহাড় গুলোকে অনেক নিচেই মনে হচ্ছিল। এবং আসলেই তাই। কিছু পাহাড় জ্বলছিল নিচে। ধোয়া উপরে উঠেও যেন ছুঁতে পারছিলনা আমাদের। বামে পাহাড় আর ডানে খাদ। হাজার ফুটের বেশী। সরু পথ। হঠাৎ বাঁক নিলেই মনে হয় দেহ নেমে ডাচ্ছে খাদে। চরম থ্রিলিং এক পথ। তারপরও চারপাশে মনকাড়া সব দৃশ্য।

এই উর্ধ্ব পথটুকু পেরোলেই পথ আবার কিছুটা নিচে নেমে এল। এর পরের দৃশ্য আরও অসাধারণ। বর্ননা করা সম্ভব নয়। সে কেবলই দেখার জন্যে। মাঝে মাঝে রাস্তার কোল ঘেঁষে অনেক উঁচুতে উঠে গেছে পাহাড়। পাথরের ভাঁজ। এরই মাঝে প্রায় স্থানেই সোনালী আর সবুজের এক অভাবনীয় মুগ্ধ সমাবেশ। দেখার মতো। আসলে বাঁশ গাছ শুকিয়ে ঝকঝকে সোনালী রং ধারণ করেছে। আর মাঝে মাঝে আবার কচি সবুজ গাছও এরই সাথে একসাথে জেগে আছে। অসাধারণ এক অভিব্যক্তি জেগে ওঠে চোখে সে দৃশ্য দেখে ।

এইরকম নিবিড় নিরিবিলি আর সৌন্দর্যের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে হঠাৎ দূরে স্পষ্ট হলো একটা উুঁ পাহাড় । ঐ তো ওটার উপরেই উঠতে হবে। ও পাহাড়ের উপরেই সেই কাঙ্খিত বগা লেক।

আরও কিছুক্ষণ ধূলো ওড়ানো পথে এগিয়ে ঐ পাহাড়ের গোড়ায় এসে থামলো আমাদের গাড়ী। সামনে আর গাড়ী যাবার পথ নেই। একটা পথ অবশ্য কিছু আগে কেটে চলে গেছে সামনে তবে সেটা জুয়েল ব্যোমের ব্যক্তিগত পথে উঠে গেছে বগা লেকে। ও পথে অনেক রিস্ক।
তার চেয়ে হেঁটে উঠাই ভালো। নেমে দেখলাম ঘড়িতে তখনও ১০টা বাজেনি। এই তো আরেকটু। এই পাহাড়টার উপরে হেঁটে উঠতে হবে। বেশী উঁচু নয় এখান থেকে। ২০০ ফুট বড়ো জোর। অনেক উঁচুতে তো এমনেতইে চলে এসেছি। সমুদ্র পৃষ্ঠ হতে বগা লেকের পাহাড়ের উচ্চতা ৩৫০০ ফুটের কম না।

ড্রাউভারের আর তার সাথের লোকটি( রুমা থেকে উঠেছিল ড্রাউভারের সাথে) পাশের বাঁশ বন থেকে আমাদের সবাইকে সরু বাঁশ কেটে হাতে ধরিয়ে দিল। আসলে সামনের ঢাল পথে উপরে উঠার জন্যে এর খুবই প্রয়োজন।
হাঁটা শুরু হলো। একে তো দীর্ঘ যার্নির কান্তি তার উপর সিগারেটের প্রভাবটাও বোঝা গেল একটু পর পর থামতে বাধ্য হয়ে। পথটা সুর একটু সাবধানেই হাঁটতে হলো এবং ভালোমতোই সকলে উপরে পৌঁছালাম।

উপরে উঠে সামনে তাকাতেই অবাক। অসাধারণ মুগ্ধতা মুহূর্তে পেয়ে গেলো মন। চারদিকে পাহাড় আর পাহাড় আর মাঝে সেই বগা লেক। সেই স্বচ্ছ পানির আবদ্ধ জলাশয়। মুহূর্তে সবাই ভুলে গেলাম যেন সব কষ্ট কান্তি।

বামে আর্মি ক্যাম্পে যেতে হলো পানির কাছে যাবার আগেই। ওখানে আবার সবার নাম ধাম, কতণ থাকব সব বিস্তারিত জানাতেই কেটে গেলো ১৫ মিনিট। সেই সুযোগে অবশ্য একটা হালকা বিশ্রাম ও হয়ে গেলো। আর্মিরা বেশ গল্প করল। জানলাম তাদের কষ্টের কিছু কথা। এখানে পাহাড়ের উপর একটা হেলি প্যাড আছে। মাসে একবার রেশন দিয়ে যায় হেলিকপ্টার তাদের। আর অন্য কিছু প্রয়োজন হলে তাদের যেতে হয় পায়ে হেঁটে রুমা বাজারে। অবশ্য পায়ে হাঁটা পথ পাহাড়ী পথের মতো ঘুর নয় , কিছূটা কমই হবে সোজাসুজি গেলে। পাহাড়ে পাহাড়ে ক্যাম্পগুলোতেও তাদেও প্রায়ই যেতে আসতে হয় হেঁটে হেঁটেই। দেখলাম অ্যান্টিনা লাগিয়ে মোবাইল নেটওয়ার্ক খোঁজার প্রানন্ত চেষ্টা। সিটিসেল নাকি পাওয়ায় যায় বললো। আশ্চর্য ! খাবার পানি বলতে লেকই সম্বল। নিচ থেকে মটর দিয়ে পানি উঠানোর ব্যবস্থা করেছে তারা।

আর্মি দের কাছ থেকে ইনফরমেশন পেলাম কেওকারাডাং যাবার পথে। এখান থেকে দেখা যায় না পাহাড়টা; লেকের ওপাশের একটা উঁচু পাহাড়ে দৃষ্টির বাধ । দেখতে হলে আরও ঘন্টাখানেক হাঁটতে হবে। আর উঠতে হলে মোট ঘন্টা দুয়েক। কাছাকাছি নাকি গাড়ীও নিয়ে যাবা যায় রিস্ক নিয়ে। অবশ্য যেতে হলে ট্রাকিং করেই যাওয়া বেটার। রুমা হতে হেঁটে বগা লেক আসতে পারলে আরও ভালো হতো। রাস্তার ধকল সইতে হতো না। তার জন্যে অবশ্য ট্রাকিংয়ের অভ্যাস থাকতে হবে। আধঘন্টা হেঁটেই যে কান্তি । পা চলতেই যাচ্ছিলনা। আর অত পথ! তারউপর আর্মি ক্যাম্প থেকে নির্দেশ দিল ২টার মধ্যে না গেলে আজকে আর ফিরতে দেবে না তারা।

ভুল হয়ে গেছে । এত কাছে এসে কেওকারাডং যাবোনা, তাই কি হয়। কিন্তু তাই হবে। সময় নাই। আর পূর্ব পরিকল্পনাও তো নাই। গাড়ীতে মাত্র চার লিটার পানি আছে অবশিষ্ট। তাও নিচে রেখে এসেছি আর উপরে উঠেছি নিয়ে দুই লিটার। লেকের পূর্ব পাড়ে দেখলাম ছোট একটা উপজাতি গ্রাম। ওখানে থাকার ব্যবস্থা আছে। নতুন কটেজ বানাতে দেখলাম। ভাড়া খুবই সস্তা । মাত্র ৩০ টাকা এক রাত। খাবার খরচও ওমনই। লেকে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। সে মাছই ধরে খাওয়াবে ওরা।

আর্মিরা গোসল করতে নেমেছিল কয়েকজন , আমরাও চারজন নেমে গেলাম। করিম, জীবন আর রহিম নামলোনা। শীতকালে শুনলাম প্রচুর পর্যটক আছে । দলে দলে আসে। এখন অবশ্য আমরাই একমাত্র আগন্তুক। ঠিক আমরাই, নয় রহিম ভাইয়ের পরিচিত বান্দরবানের এক স্কুল মাষ্টারকে পাওয়া গেলো , তিনি অন্য কোন গাড়ীতে এসেছেন। কাঠের গাড়ী তে মনে হয়। যাবার সময় অবশ্য আমাদের সাথেই ফিরেছেন বান্দরাবান।

পানিতে নেমে দেখলাম আসলেই অনেক স্বচ্ছ এই আবদ্ধ জলাশয়ের পানি। নিচে পুরোটাই পাথরের মেঝে । এবং খুবই দ্রুত নেমে গেছে অনেক গভীরে। শুনেছি মাঝে নাকি অতল গভীর। ৪০০/৫০০ ফুট দড়ি ফেলেও তল পাওয়া যায়নি। তারপরও অর্ধসাতাঁরু আমরা সাঁতার কাটার দুসাহস করেই ফেললাম। লেকে অনেক সুন্দর শাপলা ফুটেছে , নজর কাড়ল।

একদল আর্মিকে দেখলাম রুমা বাজার থেকে এসেছে। সেই সকালে রওয়ানা হয়েছে তারা। তাদের সাথে একটা উপজাতি তরুন। তার বাড়ী কেওকারাডং। এতদূর হেঁটেছে আবার হাঁটবে।

গোসল সেরে গ্রামটিতে ঢুকে আমরা এক বাড়ী থেকে কলা কিনলাম। পাহাড়ী কলা। বেশ মিষ্টি । একটা পিচ্চি কে জিজ্ঞাস করলাম- তোমার নাম কি?, বুঝলোনা। বললাম, বাংলা বোঝোনা, এইবার সে বলল মানে বুঝালো , না বোঝেনা।
খুব ইচ্ছে হচ্ছিল এইখানে এই বগার পাড়ে রাত্রে থেকে যাই, মিশে যাই পাহাড়ের মাঝে রাতের গহনে। উপায় নেই। ফিরতেই হবে রাতের মধ্যে কক্সবাজার।

মন ভরে না , তবুও যেতে হবে। ১২ টার মধ্যেই আমরা রওয়ানা দিয়ে দিলাম । আসার সময় আবার ইনফর্ম করে আসতে হলো ক্যাম্পে।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মে, ২০০৭ রাত ৮:৩১
২১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×