এইমাত্র অঙ্কন ভাই কে একটা মেসেজ পাঠিয়েছে নিশিতা । উত্তর আসবে কি না, আসলেও তা কী হতে পারে এই চিন্তাই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। একটা ভুল বোঝা-বুঝির সূত্র ধরে তাকে নিয়ে অঙ্কন ভাই সঙ্গীতা’র সাথে কাউন্টার গেম খেলছে। সঙ্গীতা বিকেলে মেসেজ পাঠিয়ে যা ইচ্ছে তাই বলেছে তাকে। ব্যাপারটা মোটেই পছন্দ হচ্ছেনা তার। খুব শক্ত ভাষায় মেসেজ পাঠিয়ে তাই জবাব চেয়েছে অঙ্কন ভাইয়ের কাছে । পড়াতেও মন বসছেনা এইসব ভাবনায়। কোনো কাজ খুঁজে না পেয়ে সে তাই টিভি ছেড়ে বসে। ইতস্তত টিভি চ্যানেলগুলোতে টিউন করতে থাকে। একটা মুভি চ্যানেলে গিয়ে থামে। 'লিগ অব এক্সট্রা-অর্ডিনারি জেন্টলম্যান' দেখাচ্ছে। সেটাই দেখতে থাকে। কিন্তু মনোযোগ বসে না। মনের ভেতর অজানা একটা অনুভূতি হা-হা-রব তুলে যায়। সেই অনুভূতির অর্থ সে খুঁজে পায়না।
এমন সময় মা'র মোবাইলে মেসেজ টোন বেজে ওঠে। নিশিতা জানে এটা অঙ্কন ভাই এর মেসেজ। এই মুহুর্তে সে-ই একমাত্র মেসেজ পাঠাতে পারে। কিন্তু মোবাইলটা হাতে নিয়ে একটু হতাশ হয় সে। অপরিচিত নাম্বার। ভাবে মা'র কোনো মেসেজ। কিন্তু,মেসেজটা পড়ে এবার সে একই সাথে বিরক্ত আর বিস্মিত হয়। সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন একটা জরুরি মেসেজ পাঠিয়েছে, কিন্তু ভুল নাম্বারে। আরো মজার ব্যাপার, একটা ছেলে, এবং সে নিশিতার ব্যাচমেট!...ঘটনার কাকতাল তাকে বিস্মিত করে। মেসেজের বক্তব্যটা এমন, " Rifat, it's Anik.it's my new mobile number. my balance is only seven taka that's why i couldn't phone you. i have called you because i have heard that at saturday our HSC admit will be given."
নিশিতা দ্বন্দ্বে পড়ে যায়, তার কী করা উচিৎ। উত্তর পাঠাবে কি না তা নিয়ে ভাবতে থাকে। অপরিচিত নাম্বার, বিরক্ত করার জন্যও মেসেজ পাঠাতে পারে। আবার তার মন হয়, যদি সত্যি সত্যি সে ভুল করে পাঠিয়ে থাকে তাহলে তো সমস্যায় পড়বে। কী যেন হতে থাকে তার ভেতর। ভাবতে থাকে ছেলেটা কে হতে পারে। ওর সাথে এরকম যোগাযোগ হবার মানে কী??...নাটক-সিনেমার মত প্রেম কাহিনী হবেনা নিশ্চয়ই...আবার যদি হয়??...তবে কি অনিক নামের কারো সাথেই তার প্রেম হতে যাচ্ছে???......
নিজের মনেই হাসে নিশিতা। এসব কী ভাবছে!...সাত-পাঁচ ভাবতে থাকে। একবার মনে হয়, যদি নটরডেম এই পড়ে ছেলেটা, তাহলে সালমানকে একবার ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করবে নাকি, এই নাম্বারের মালিক আসলেই অনিক নামের কেউ কি না, আর ওদের অ্যাডমিট কার্ডও পরীক্ষার এক মাস বাকি থাকতেই দিয়ে দিচ্ছে এই কথাটা সত্যি কি না......তাহলেই তো হয়!
তারপর কি মনে করে সালমান কে ফোন দেয়না নিশিতা। মনের মাঝে ভাবনা হয়, যদি শোনে ওই নামের কোনো ছেলে নেই, নাম্বারটা ভূয়া!...নিশিতা এই যোগাযোগের মজাটা হারাতে চায়না। তাই সালমানের নাম্বার ডায়াল করতে গিয়েও ছেলেটাকেই রিপ্লাই দেয়, '' Hi, Anik, for your kind information you have tuned in wrong channel! check the number again, ok! it's HCC court, not NDC..."
নিশিতা ভেবে নেয় ছেলেটা সত্যি সত্যি ভুল নাম্বারে মেসেজ পাঠিয়ে থাকলে আর উত্তর দেবেনা। কিন্তু আবারও সেই নাম্বার থেকে মেসেজ আসে। এবার ছেলেটা খুব জোর দিয়ে বলে নাম্বার ভুল হতেই পারেনা। '' 01715...it is obviously Rifat's mob. who are you?..are you his elder brother???please bhaia give this mob to Rifat and plz sent that is it true that will given at that day or not....."
এবার নিশিতা নিশ্চিত হয়ে ভাবতে থাকে কেউ জেনে-বুঝে তার সাথে নাটক করছে। না হলে নাম্বার ভুল বলার পরও কেউ এত জোরাজুরি কেন করবে??...সে উত্তর পাঠায়, “Excuse me, this number belongs to me. Elder brother ? Funny! Are you consciously testing my nerves?”
তারপর আর কোনো উত্তর আসেনা। নিশিতা মনে মনে নিজেকে বিজয়ীর মুকুট পরায়, বিরক্তির হাত থেকে বেঁচেছে বলে। মনের ভেতর আবার ভিন্নমাত্রার অনুভূতিও খচ্খচ্ করতে থাকে। যদি আসলেই সে ভুল করে মেসেজ পাঠায়!...কী নাটকীয় ঘটনাই না হতো, যদি সত্যি সত্যি ছেলেটা ভুল করে মেসেজ পাঠাতো! এই ভাবনায় বিভোর হয় সে।হয়তো ছেলেটার সাথে আজকের পর আর যোগাযোগ হবে না। ছেলেটার পরিচয় হয়তো কোনোদিন জানা হবে না। হয়তো সে সত্যিই অনিক নামের কেউ, কিংবা আসলে তার নাম মোটেই অনিক নয়। কিন্তু তার এই ১৮ বছরের জীবনে আজকে সন্ধ্যার ঘটনাটা একদমই অন্যরকম ছিল।
তার ভাবনায় ছেদ পড়ে। কারণ একটা মেসেজ আসে। সেই নাম্বার থেকেই। নিশিতার মনে একটা আনন্দের শিহরণ খেলে যায়। উৎসাহিত হয়ে পড়ে ছেলেটার মেসেজ। “ Just now i have refilled my balance and ensure that the actual number should be 00 in lieu of 01. i beg you pardon. sorry. But who are you and why should i test your nerves?”নিশিতার মনে যে বিরক্তিটুকু ছিলো তা খুব দ্রুত মিলিয়ে যায় উচ্ছ্বসিত হাসির আড়ালে। ছেলেটার কথা সে বিশ্বাস করে। অবিশ্বাস করার কোনো উপকরণ খোঁজেনা সে... কিংবা খুজঁতে চায় না। একটু আগেই তার মনে হচ্ছিল ছেলেটা মিথ্যে বলেছে। সেই সব নিয়ে তার মনে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়না। সে যাচাই করতে যায়না, কথা ঘুরানোর জন্যও হয়তো ছেলেটা এবার এভাবে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। ছেলেটার জন্য তার মনে একটা ধনাত্মক অনুভূতির জায়গা তৈরি হয়ে যায়। সে উত্তর পাঠায়, ‘I felt disturbed, so told that....sorry…I am Tisha, Holy Cross, HSC candidate…I think we are not gonna be disconnected, are we?....i am not going t forget the funny intro of us!”
মেসেজটা পাঠিয়ে নিশিতা আবার ভাবতে থাকে, ছেলেটা যোগাযোগ রাখবে তো?...তার ভাবনার অনেকটুকু জায়গা ছেলেটা দখল করে ফেলেছে, কিন্তু সেটা নিয়ে চিন্তিত হয়না সে। মনে মনে ভাবে, এই প্রথম কোনো অপরিচিত ছেলের সাথে এভাবে যোগাযোগ হলো। আসলে কোনো ছেলের সাথেই তো তার কথাই হয়না। অঙ্কন ভাই, কিংবা আসিফ ভাইদের কথা আলাদা। সালমান কিংবা ইমনের কথাও আলাদা। ওদের সাথে তো সম্পর্কটা কাজের কিংবা বন্ধুত্বের। এর বাইরে বিশেষ কিছু নয়। এই ছেলেটা হয়তো......নিশিতা অবাক হয়ে ভাবে, কী হলো তার!...হঠাৎ অজানা, অচেনা একটা ছেলেকে নিয়ে ওর উৎসাহ হচ্ছে কেন!...
ছেলেটার সাথে আরো কিছু কথা হয়। সে নিজেও যোগাযোগ রাখতে উৎসাহী হয়। ছেলেটা শর্ত বেধে দেয়, যোগাযোগ সেও রাখতে চায়, কিন্তু, তারা কেবল মেসেজই আদান প্রদান করবে। কথা বলবেনা। নিশিতা তাতে খুশিই হয়। তার মনের কথাটাই ছেলেটা বলেছে! ফোনে কথা বলাটা নিশিতার জন্য কঠিন। ফোনটা তার নয়, মা’র। তার বয়সী অন্য মেয়েদের মতোই তাকে মা’র সতর্ক চোখের আড়ালে থাকতে হয়। অঙ্কন ভাই কিংবা সালমানের সাথেও তার মাঝে মাঝে কথা হয়। কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই লুকিয়ে লুকিয়ে। এই ছেলেটা অপরিচিত। ওর সাথে কথা বলতে গেলে আরও সতর্ক থাকতে হবে। ফোনে পরিচয় হওয়া একটা অপরিচিত ছেলের সাথে মেয়ে কথা বলছে, সেইটা তার মা মোটেই ভালো চোখে দেখবেনা। নিজের ফোন থাকলে তাও একটা স্বাধীন সুযোগ পাওয়া যেতো ঘরের বাইরে গেলে। নিজের ফোন নেই বলে এবার সে দুঃখ বোধ করে। ভাবে, তাহলে হয়তো যোগাযোগটা অনেক ভালো হতো।...
এই রকম সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে রাতটা কেটে যায় নিশিতার। পড়া-শোনা আর হয়না। অঙ্কন ভাইয়ের মেসেজের জন্যও তার আর অপেক্ষা থাকেনা। সবকিছু ছাপিয়ে অনিকের সাথে তার পরিচয়টা ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে যায়। সে ভাবতে থাকে তার কী করা উচিৎ।
একটা অজানা মোহগ্রস্ততায় নিশিতা আবৃত হয়। সেটা হয়তো সে টের পায়না...অথবা টের পেয়েও সেটা টের পেতে চায়না...।
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জানুয়ারি, ২০০৯ সকাল ৮:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


