নিশিতা ভাবতে থাকে, কাজটা কি ঠিক হচ্ছে?...ছেলেটা সম্পর্কে তার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। শুধু নাম জানে। আর জানে নটরডেম কলেজে পড়ে। অথচ তার সাথে এভাবে যোগাযোগ করে যাচ্ছে!...এতদিন তার আশে-পাশের মেয়েগুলো যখন মোবাইলে পরিচয় হওয়া নাম না জানা মানুষদের সাথে যোগাযোগ করেছে, সেটা সে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেছে। এই ক’মাস আগেই অনন্যা, ইথাররা যখন বসুন্ধরা সিটিতে গিয়ে একদল অপরিচিত ছেলের সাথে বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেললো, তখনো সে ব্যাপারটা ভালো চোখে দেখেনি। আর সে ই কিনা এখন ভাবছে একজন অপরিচিত ছেলের কথা!...যার সাথে তার পরিচয়ের বয়স ২৪ ঘন্টাও না, তাকে ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসছে। নতুন কিছু পেলে মানুষ যেমন বার বার সেটা হাতে নিয়ে দেখে, তার অবস্থাটাও যেন তেমন। আগেরদিনের মেসেজগুলো ইতিমধ্যে অনেক বার করে পড়া হয়ে গেছে। মুখস্তও হয়ে গেছে প্রায়। মোবাইল নিয়ে সে হঠাৎই তার ব্যস্ততা বেড়ে যায়...। কী যেন একটা মোহ তাকে বার বার টেনে নিয়ে যায়। নিশিতা ভাবে, অন্যদের বেলায়ও তাই বুঝি হয়। রাসায়নিক বিক্রিয়াটা বুঝতে চেষ্টা করে। পারেনা। ‘নতুন পরিচয় হওয়া ছেলেটা’ ছাড়া মাথায় আর কোনো ভাবনা আসেনা।
এর মাঝে অনেক কথা হয়ে যায় তার অনিক এর সাথে। দিন শেষ হবার আগেই মোবাইলের মেসেজ বক্স ভর্তি হয়ে যায়। পারস্পরিক তথ্য আদান প্রদান চলতে থাকে সমানতালে। ছেলেটা ছল করছেনা। এই ভাবনাটা তার মনে আরো গাঢ় ভাবে প্রোথিত হয় যখন কথা প্রসঙ্গে বের হয় অনিক নামের ছেলেটা সালমানকে চেনে। শুধু চেনেনা, এক সাথে ছোটোবেলা থেকে স্কুলে পড়েছে, এখন কলেজেও এক গ্রুপে! নিশিতা নিজের মনে ভাবে, ‘কী কাকতালীয় ঘটনা!...ছেলেটা আবার সালমান এরও বন্ধু!...সালমান তার ভালো বন্ধু। সুতরাং ছেলেটাও নিশ্চয়ই ভালো হবে!...পৃথিবীতে কত মজার মজার যোগাযোগই না ঘটে!...” নিশিতা ভাবে সালমান কে এবার ফোন দেবেই, জিজ্ঞেস করবে অনিকের কথা!...কিন্তু ফোন দেয়া হয়না। ভাবে, সালমান তাহলে এটা নিয়ে নিশিতাকে অনেক ফাঁপরে রাখবে!...অনিক নিজে থেকেই বলুক সালমানকে!...
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হতে না হতেই ছেলেটার বাবা-মা কি করে, কয় ভাই-বোন, কি করে, কি পছন্দ-অপছন্দ এরকম তথ্যগুলো জানা হয়ে যায়। ছেলেটাকে কত পরিচিত লাগতে থাকে নিশিতার!...মনে হয় যেন কত দিনের পরিচিত!...তাদের পরিচয়ের বয়স যে এক দিনেরও কম সেটা তার কাছে মনেই হয়না...। আবার সালমানের সাথেও ছেলেটার বন্ধুত্ব!...পৃথিবীটা আসলেই গোল মনে হয় তার কাছে, না হলে ঘুরতে ঘুরতে এরকম যোগাযোগ কীভাবে হয়????
ছেলেটার সাথে মেসেজ পাঠানো এক প্রকার নেশার পর্যায়ে চলে যায় নিশিতার কাছে। গ্রামীন এর অ্যাকাউন্টে একটার পর একটা মেসেজ এর চার্জ যোগ হতে থাকে। একটা মেসেজ পাঠিয়ে উত্তর পেতে একটু দেরি হলে ভালো লাগেনা!...কেমন অস্থির লাগতে থাকে তার!...
ছেলেটা নিশিতার কাছে জানতে চায়, তার কোনো প্রেম আছে নাকি, কাউকে ভালোবাসে কি না। প্রেম তার নেই, কিন্তু ভালোবাসার প্রশ্নে সে কি বলবে বুঝতে পারেনা। মাঝে মাঝেই যে নাহিয়ান কে সে ভাবে, সেটাকে কি সে ভালোবাসা বলবে? নাহিয়ানের কথা তো সঙ্গীতাকেও বলেছে। গত দুই বছর ধরেই তো ছেলেটা তার ভাবনার বেশ খানিকটা জ়ায়গা দখল করে আছে। কোনোদিন ছেলেটার সাথে একটা কথাও হয়নি। অথচ তাকে নিয়ে কল্পনার জাল বুনতে তো ভালোই লাগে নিশিতার। কিন্তু সেটাকে কি ভালোবাসা বলবে? তার কাছে নাহিয়ান এর চাইতে দুই দিনের পরিচিত অনিক কেই বেশি সহজলভ্য মনে হয়!! তাই নাহিয়ানের কথা সে বলেনা। উত্তর দেয়, ‘না’। সালমান ছাড়া তার কোনো ছেলে বন্ধু আছে কিনা জানতে চায় ছেলেটা। নিশিতা ছল করে উত্তর দেয়, ‘সালমান আমার একমাত্র বন্ধু, আমার আর কোনো বন্ধু নেই। যারা ছিল তারা সবাই চলে গেছে’...সে বলে না ইথার, অনন্যাদের কথা। নিজেকে ‘একা’ প্রমাণ করতে চায়, যার কোনো বন্ধু নাই, যাকে কেউ ভালোবসেনা! ছেলেটা তাকে বলে সে তার বন্ধু হবে। তবে অদৃশ্য বন্ধু। এই অদৃশ্য বন্ধুত্বের মানে বোঝেনা নিশিতা। অনিক কে জিজ্ঞেস করে। সে বলেনা। তাও নিশিতা খুশিই হয়!...বন্ধু তো হচ্ছে!...নিশিতা জানতে চায় তার প্রেম এর কথা, ভালোবাসার কথা। ছেলেটা রহস্য করে। স্পষ্ট কিছু বলেনা। নিশিতা মনে মনে ভাবে, ছেলেটা যেন কাউকে ভালো না বাসে। কারও সাথে যেন তার প্রেম না থাকে। ফাঁকা মাঠে এবার গোলটা নিশিতাই মারবে, এমনটা ভাবতে থাকে!...
এই নিশিতাই দুই দিন আগে পর্যন্ত ভাবতো এসব ভালোবাসা-প্রেম ফালতু জিনিস। এগুলো সময় নষ্ট করার উপাদান। ক্যারিয়ার সবচেয়ে বড় কথা!...এমনকি এই নাহিয়ান কে নিয়েও তার ভাবনাও তাকে বিন্দুমাত্র উদ্বেলিত করতোনা। ভাবনা যেমন করে আসছিলো, তেমনি চলেও যাচ্ছিল। কিন্তু সেই নিশিতাই এগুলো কি ভাবছে!!...মনে মনে প্রেম করার ইচ্ছে, ভালোবাসার ইচ্ছেরা বাসা বাঁধছে! এমন করে কোনো ছেলের সাথে কখনো কথা হয়নি, সেই জন্যেই কি??......
নিজের ভেতরের এই হঠাৎ পরিবর্তন নিশিতার মনোযোগ কাড়ে, কিন্তু পাত্তা পায়না...নিশিতা যেন দেখেও দেখেনা, বুঝেও বোঝেনা, সে পালটে যাচ্ছে!......অথবা দেখতে চায় না, বুঝতে চায় না......

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



