বলতে পারেন আমি অসামাজিক, কিংবা আমাকে আঙ্গুল তুলে বলতে পারেন আমি সমাজের ভেতর থেকেও সমাজকে মেনে চলছি না...। সবাই যখন 'দেশের কি হলো' ভেবে চিন্তিত হচ্ছেন, সামাজিকতার কড়ি-কোষ্ঠী মেনে চলছেন, সমাজ সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন আমি তখন বাসায় বসে ভাবছি 'কবে বের হবো বাসা থেকে'...ক্যামেরা হাতে নিয়ে কাঁধে ব্যাগ চাপিয়ে বের হয়ে যেতে চাচ্ছি রাস্তায়...ফ্রেমে বন্দী করতে চাচ্ছি অস্থির মুহুর্তগুলো। মা বাধা দিচ্ছে। বলছে, 'এত সাহস ভালো না!...তোর যদি কিছু হয়!...আমি মেয়ে পাবো কই?'...
কিংবা আমি তখন বাসা থেকে বের হতে পারছি না বলে বসে বসে ব্লগ থেকে ফেসবুক, ফেসবুক থেকে ব্লগে ঘুরছি, টিভি'তে দেশের অবস্থা সংক্রান্ত আপডেটগুলো জানতে চেষ্টা করছি। প্রতি ১ ঘন্টা পর পর লোডশেডিং এর সময়টুকু ছাড়া বাকী সময়টুকু ব্লগে অনলাইন থাকছি সর্বশেষ পরিস্থিতি জানার জন্য।
কিংবা হয়তো বসে সিনেমা দেখছি...গুডবাই লেনিন... এমিলি... টেক্সাস চেইন স' ম্যাসাকার!...
কিংবা বন্ধু অনিক, যে মুন্সিগঞ্জ গেছে, তাকে ফোনে বার বার ট্রাই করেও পাচ্ছি না বলে মন খারাপ হচ্ছে। ভাবছি, 'দুই দিন ধরে ছেলেটার সাথে যোগাযোগ হচ্ছে না'...
কিংবা...দুই ঘন্টা কিংবা তারও বেশি সময় ধরে বন্ধু রূপকের সাথে কথা বলছি যে গত রাতে হঠাৎ আবেগপ্রবণ হয়ে আমার প্রতি ওর দুর্বলতা [ কিংবা ভালোবাসা ] প্রকাশ করে ফেলেছে, অথচ আমি 'হ্যাঁ' বা 'না' কিছু বলতে পারছি না...হয়তো ভাবছি 'কী হয়ে গেলো এটা!'...
কিংবা আমার ভাইকে ফোনে ট্রাই করে না পেয়ে টেনশন করে ছোটখালা যখন ৩ মাসের মেয়েকে বাসায় বুয়ার কাছে রেখে আমাদের বাসায় চলে আসছে, তখন ভাবছি, 'কেন হচ্ছে এসব?...মানুষের জীবন কেমন অস্থির হয়ে গেছে'!
সবই হচ্ছে...জীবন কিন্তু থেমে থাকছেনা। ...জীবন চলছে...আমার...আপনার...আমাদের সবার......পথচারীও হাঁটছে প্রতিদিনের মতো...রিকশা চলছে...গাড়ি চলছে...আবার গুলির শব্দ শুনে সবাই কিছুক্ষণের জন্য রাস্তা ফাঁকা করে চলেও যাচ্ছে। গাড়ি-রিকশাগুলো একজন আরেকজনকে পারলে টপকে যাচ্ছে, সবাই আগে আগে চলে যেতে যায় দূরে। সারাক্ষণ যেই গলিটা প্রায় ফাঁকা পড়ে থাকে, আজকে সেই গলিতে সারাদিন ধরে জ্যাম। কারণ সবাই গ্রিন রোড, ধানমন্ডি যাবার জন্য এখন হাতিরপুলের রাস্তা ব্যবহার করছে, এলিফ্যান্ট রোড এর গাড়ি গুলোও আসছে হাতিরপুল-সেন্ট্রাল রোড দিয়ে। সবার ভেতরেই টেনশন।
আমার ভেতরেও আছে। আমিও ভাবছি আমার ক্লাসমেটগুলোর কথা, যারা ধানমন্ডি এলাকায় থাকে। গতকাল যারা একরাশ দ্বন্দ্ব আর ভয় নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। ভারসিটি বাস ট্রিপ দেয়নি বলে যাদের অনেক কষ্ট করে বাড়ি ফরতে হয়েছে। কুয়েত-মৈত্রী কিংবা ফজিলাতুন্নেসা হলে থাকা মেয়েগুলোর কথা ভেবে আমিও চিন্তিত হয়েছি......আমিও ভাবছি বিডি আর এর জওয়ানদের কি হবে যখন তারা অস্ত্র সমর্পণ করবে?...আমিও ভাবছি ভেতরে আটকে পড়া মানুষগুলোর কথা...সেই ৯ মাসের গর্ভবতী মহিলাটার কথা, যিনি বের হতে পারছেন না...যার স্বামী অসহায়ভাবে ক্যামেরার সামনে কাঁদছেন...
কিংবা সেই বাচ্চা ছেলেটার কথা, যে বেড়ীবাঁধে তার বাবা'র লাশ শনাক্ত করেছে, যেই বাবাকে সে পাঁচ-ছয়দিন ধরে দেখে না, যেই বাবা'র মৃত্যুকে সে মেনে নিতে পারছেনা। কাঁদতে কাঁদতে যেই ছেলেটা বলছে, 'আমি নিজেকেই সান্ত্বনা দিতে পারছি না, আমার ছোটো ভাইটাকে আমই কি বলে বুঝাবো?'
কিংবা যেই মানুষগুলো এই আতঙ্কের মাঝেও গেটের সামনে ভীড় করে আছে ভেতরে আটকে পড়া স্বজনদের জন্য...
আমার কাছে এখন আর এই দৃশ্যগুলো ভালো লাগে না। আমি নিতে পারি না। খুব কষ্ট হয়। দেশটার কি হচ্ছে?...মানুষগুলো কি করছে দেশটার?...সবাই কেমন ধৈর্যহারা হয়ে যাচ্ছে। নিজের ভালোটা একটু বেশিই বুঝছে। তাতে কে বঞ্ছিত হলো, কে ন্যায্য প্রাপ্য হারালো, এগুলো কোনো ব্যাপারই না...
অরাজকতার দেশে বাস করছি আমরা সবাই। কয়েকদিন আগে জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কি বিশ্রী কিছু ব্যাপার ঘটে গেলো। সাধারণ ছাত্রগুলো পর্যন্ত সাফার করেছে। আমার দুই বন্ধু, যারা একদমই পলিটিকাল নয়, হল রেইডের সময় তাদের কম্পিউটার, এমনকি কাপড়-চোপড় পর্যন্ত নিয়ে গেছে!
হলটা ছাত্রদের আবাস, সেখানেই তাদের নিরাপত্তা নেই!...
ঢাকাতেও, এমনকি খবর অনুযায়ী দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও বিডি আর-আর্মি গোলাগুলি চলছে। এই গৃহযুদ্ধ কেন?...নিজেদেরকে কিভাবে আমরা প্রকাশ করছি বিশ্বের কাছে?...দুর্নীতিবাজ বলে আমাদের এম্নিতেই দুর্নামের শেষ নেই, এখন বিশ্ববাসী এটাও জানবে যে দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর ভেতরেই একতা নেই, তাহলে আর এই দেশের প্রতিরক্ষা কতই বা আর শক্তিশালী!......
আমি এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে চাচ্ছি না। ভাবতে পারছি না। ভাবতে গিয়ে খুব ডিস্টার্বড হচ্ছি। আমি আমার দেশকে অনেক ভালোবাসি। দেশকে নিয়ে ভাবি...তবে আমি সোশ্যাল কনফরমিস্ট নই।...সবার সাথে তাল মিলিয়ে 'হায় কি হলো' বলে চোখের জলে ভাসতে পারি না, কিংবা সারাক্ষণ খুব চিন্তিত চিন্তিত চেহারা করে বসে থাকতে পারি না। পোস্ট করে কিংবা মন্তব্য লিখে নিজের অনুভূতি জানানোর জন্য ব্লগের পাতায় ব্যস্ত হয়ে যেতে পারি না।...ঠিক এই মুহুর্তে সবাই যেই টেনশনটার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আমিও যাচ্ছি। কিন্তু আমি টেনশনটা একা একা নিচ্ছি। বাসাতেও আমি হেসে-খেলে বেড়াচ্ছি ঠিকই, কারণ আমি তাদের জানতে দিতে চাই না, তাদের মেয়ে'র মন এত নরম......তাদেরও বুঝতে দিতে চাই না যে তাদের ছেলে হলে আছে, বাড়ির বাইরে, তাই তাদের মেয়েরও টেনশন হচ্ছে......
আমি খুব স্বাভাবিক থাকতে চেষ্টা করছি। সবাই যেখানে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে একের পর এক পোস্ট দিয়ে যাচ্ছে, আমি তখন আমার চলমান গল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রাখছি। গল্পের নতুন পর্ব পোস্ট করছি। আশা করছি না সবাই পড়বে, কিংবা কেউ পড়বে, নিজে স্বাভাবিক থাকার জন্যই দেয়া।
[কিছু মানুষ দেশের চিন্তা ফেলে আমি কেন এমন পোস্ট দিয়েছি তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে গেছেন। এক-দুইজন আবার অশ্লীল ভাষায় মন্তব্যও করে গেছেন। তাদের দেশাত্মবোধ দেখে আমি আপ্লুত। এমন অবস্থায় আপনিই বা আগ্রহ পান কেন পোস্ট পড়ার?...কিংবা সময় পান কোথায় মন্তব্য করার?...]
আমি স্বাভাবিক থাকতে চাইছি। এখন দুর্বল হওয়া চলবে না যে আমার। ......আমাদের......আমাদের সবার......
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ১১:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


