( চলছে)
আমি ভেবে নেই, রাতের শেষ স্বীকারোক্তি হয়তো আমাদের ব্যপারটাকে আরেকটু সহজ করে দেবে। পরস্পরের মনে যে ঘোলাটে আবহাওয়াটুকু তৈরি হয়েছে সেটাকে একটু হলেও হাল্কা করবে। ... সকালটা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস দিয়ে শুরু করি...। ‘সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে’ এরকম একটা ভাবনায় আক্রান্ত হই। মেসেজ আদান-প্রদানও চলতে থাকে..
- ভালোবাসা একটা ফুলের মত; কেউ বীজ বোনে, পানি দেয়, আগাছা পরিষ্কার করে, চারা গাছ দিনের পর দিন বাড়ে, তারপর একদিন ফুল ফোটে ! ভালোবাসা এমনই!...ফুল ফোটাতে হলে তোমাকে আগে বীজ বুনতে হবে!
ছেলেটা বেশ কিছুক্ষণ পর উত্তর দেয়-
- তোমার তো অনেক টাকা দরকার, তাইলে আগে অনেক টাকা পয়সা আয় করে নেই, তারপর ২৭-২৮ বছরে তোমাকে বিয়ে করবো! কেমন?...যদিও তখন তুমি বুড়ি হয়ে যাবা। বিয়ের পর তুমি তো তখন আমাকে ভালোবাসবা না, আমার টাকাকে পছন্দ করবা। আমাকে তখন জুতা মারবা, তাই না?
আমার ক্যারিয়ারিস্ট সত্তা জেগে ওঠে তখন, ‘আগে ক্যারিয়ার তারপর বিয়ে’ থিওরি আবার জীবন্ত হয়-
- বিয়ে কিন্তু আমিও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেই করবো, ২৭-২৮ বছর বয়সেই। তাই বলে কি ১০ বছর ধরে প্রেম করা যাবে না?...যাবে!...জানো তো, ভিত যখন শক্ত থাকে, তখন কোনোকিছুই একটা সম্পর্ককে ভাংতে পারে না।
- হা বুঝসি! গতকাল রাত জেগে তোমার মাথা বিগড়ায় গেছে। আমার মাথা নষ্ট হইসে যে ২৮ বছরের বুড়িকে বিয়ে করবো?...সবাই আমার পাশে তোমাকে দেখে বলবে বড় বোন। আমি তো বিয়ে করবো ২১/২২ বছরের মেয়েকে। একদম ফ্রেশ অ্যান্ড টাইডি...গ্রেট টু ইউজ...তার চেয়ে তুমি আমার বিয়ের ঘটকালি করো। জোশ হবে!
- হাহ!...আমাকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করার কথা স্বপ্নেও ভাইবো না!...আমি মাত্র ৫`১`` , কিন্তু দেখতেও কিউট। একটু শুকানো লাগবে, অতদিনে তা-ও হয়ে যাবে। তাই, মোটেই তোমার বউ ছাড়া কিছু লাগবে না।
- ওকে তাহলে শোনো, ফ্যামিলি প্ল্যানিং। প্রতি বছর একটা করে বাচ্চা নেবো, ১১ বছরে ১১ টা!...পুরা একটা ক্রিকেট টিম খুলবো, রাজি তো?...তারপর তুমি হবা ফিজিও, আমি ট্রেইনার।
আমি যখনই খুব সিরিয়াস হয়ে কথা বলতে যাই, তখনই ছেলেটা আমার সাথে মজা করতে শুরু করে। আমি খুব আহত হই প্রতিবার। কিন্তু কিছু বলি না তাকে। ভাবি, তাহলে হয়তো ও রাগ করবে। শেষে দেখা যাবে আমও যাবে, সেই সাথে ছালাও যাবে...তাই আমিও পালটা মজা করেই জবাব দেই। ভাবখানা এমন যেন, তার সাথে আমিও আসলে মজাই করি...!
- হা হা!...জনসংখ্যা বিস্ফোরণ কনফার্ম। যদি কোনো বার যময হয়?...ওরা কি সাবস্টিটিউট??......কিন্তু এইসব বাচ্চা নেয়ার ব্যাপারগুলা আমার কাছে খুব ঝামেলার মনে হয়!
[ আবারও আমার ক্যারিয়ারিস্ট সত্তা জেগে যায়। বাচ্চা-কাচ্চা সামলাতে হবে! পড়াশোনা, চাকরি’র ক্ষতি হবে!!...কি ভাবে কি!...]
- ঝামেলা?...কিসের ঝামেলা রাজন এর বউ?...ওহ সরি! নাহিয়ানের বউ?...আচ্ছা আমাদের ব্যাপারে তুমি কি কখনো তোমার কোনো ফ্রেন্ডকে কিছু বলসো?
আমার যেন পায়ের নিচ থেকে মাথা পর্যন্ত একটা গরম শিহরণ বয়ে যায়!...এতকিছুর পর আবারও ‘নাহিয়ান’!!...পায়ের রক্তই যেন মাথায় উঠে যেতে থাকে!...সবকিছু কেমন যেন ধোঁয়াশা লাগতে থাকে। আমি কিছু বলতে পারি না। বলার খুঁজে পাই না!...উত্তরও পাঠাইনা মেসেজ এর। দুপুর গড়িয়ে রাত হয়ে যায়...আমি রাগ [ কিংবা অভিমান???!!] কে শান্ত করার জন্য ঘুমিয়ে পড়ি। এর মধ্যেই ছেলেটা মেসেজ পাঠায়-
- কি তুমি কি আমার উপর রাগ করলা নাহিয়ানের বউ বলসি যে? লক্ষ্মী বাবু, রাগ করে না। সরি সরি!...
- তুমি যখন এমন করো, আমার তখন খুব মন খারাপ হয়। তুমি যদি আমাকে কেয়ার করো, তাহলে এটা কেন বোঝোনা যে তুমি যতবার আমার ফিলিংস নিয়ে মজা করো, আমি আঘাত পাই?
আমি উত্তর দেই। কিন্তু কোনো জবাব আসে না। আমি চিন্তিত হই। আমি কি একটু কড়া কথা বলে ফেললাম?...নাকি কোথাও একটু হলেও আবারো দুর্বলতা প্রকাশ পেয়ে গেলো??...এসব ভাবতে ভাবতে আমি ঘুমিয়ে যাই রাতের বেলা। শেষ রাতে ছেলেটা মেসেজ পাঠায়...
- কি?...তোমার প্রবলেমটা কি? তুমি কি আমার ওপর ওইজন্য রাগ করসো? আমি তো বলসি সরি! এই মেসেজ এর উত্তর দাও, নইলে তুমি কল্পনা করতে পারবা না, আমি কতটা রাফ হবো! তুমি কি আমার রাফনেস দেখতে চাও? আমার হেড কুল, বাট একবার গরম হলে তোমার মতো হাজার জনও কিছু করতে পারবে না!
আমি বেশ অবাক হই! ছেলেটা কি আমার রাতের রিপ্লাইটা পায়নি! ও ভেবে বসে আছে আমি দুপুর থেকে এখনো রাগ করে আছি! রাগ করে মেসেজেরও জবাব দেইনি!!...আমি জবাব দেই-
- আমি তো একটু আগে রিপ্লাই করলামই যে আমি রাগ করেছিলাম। তোমার রাফনেস আমি দেখতে চাই না। কারণ এখন যেটুকু দেখালা তাই অনেক।।আমি খুবই সফট মাইন্ডেড মেয়ে?...প্রচন্ড। আর তুমিই যদি আমার সাথে রাফ হও, তাইলে আমার এই হৃদয় কীভাবে তার ভার নেবে?...কারণ আমি...
তারপরও কোনো জবাব আসেনা। সেদিন পহেলা বৈশাখ। নেটওয়ার্ক পাওয়াই খুব সমস্যা হয়ে যায়। মেসেজ গিয়েছে কি না সেই রিপোর্টটাও আসে না। আমি প্রচন্ড টেনশনে সময় কাটাতে থাকি!...
- প্লিজ, আমার সাথে আর রাফ হইয়ো না!...আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। প্লিজ ! শুভ নববর্ষ !...
কিছুক্ষণ পর একটা মিসকল আসে। লিপন!...আমি নিশিন্ত হই!...যাক, রাগ করে বসে নেই!...আমি মেসেজ পাঠাই-
- সকালে এস.এম.এস পাইসো ? রাফনেস এখনো কাটেনাই ? ইউ নো , আই হ্যাভ অলওয়েজ বিন ড্রিমট অফ হ্যাভিং সামওয়ান লাইক ইউ ইন মাই হার্ট ! কজ দে আর রিয়েলি ফ্রেশ বাই মাইন্ড!
[ এই কথাটা আমি তাকে বলি কারণ ওর রাগ কিংবা বিরক্তিগুলো ও সরাসরি প্রকাশ করে ফেলে...এটা আমার পছন্দ হয়।]
- শুভ নববর্ষ। না এস.এম.এস পাই নাই! ওটা কি ছিলো? ... ‘দে আর রিয়েলি ফ্রেশ বাই মাইন্ড’ মানে কি?...রাফনেস কাটসে, কিন্তু মন খারাপ কারণ যার কথা তোমাকে বলসিলাম, ওই রিয়া’রা হোল ফ্যামিলি নেক্সট মান্থে কানাডা চলে যাবে, আর আসবে না। গতকাল শুনলাম ওর কাছ থেকে ওরা ভিসা পাইসি। আফটার অল, ১৫ বছরের বন্ধুত্ব, একটু তো খারাপ লাগবেই...
[ আমি রিলিভড হই। তাহলে এ কারণেই হয়তো আমার মেসেজের রিপ্লাই দেয়নি...কিংবা শেষ রাতের মেসেজটা এত রাফ ছিলো। ]
- তা ঠিক মন আমারো খারাপ। সালমান এর আজ এস.এম.এস ফ্রি! তাও আমাকে মনে পড়লো না! [ যে কোনো ওকেশনে সালমান আমাকে মেসেজ পাঠায়। সেদিনই পাঠায়নি। তাই খারাপ লাগছিলো।] আমি বলসি যে তোমার মতো মানুষের মন খুব ফ্রেশ হয়! শুভ নববর্ষ- সকালে এই লিখসিলাম। আর লিখসি যে তোমার রাফ বিহেভ এ কষ্ট পাইসি।
- আল্লাহই জানে এই সারা জীবনে তোমার মন কয়বার ভালো করতে হবে। সালমানের ওই বাংলালিংক নাম্বারটা আর মোবাইল সেট আমিই ওকে ওর বাবা মরার পর গিফট করসি। সঙ্গে আমিও একটা বাংলালিংক সিম কিনসিলাম, কিন্তু ওটা এক ফ্রেন্ড চাইসে বলে দিয়ে দিসি। নইলে আজ আমারও এস.এম.এস ফ্রি হতো। মেসেজ পাইলে মিসকল দিও কারণ আজ ডেলিভারি রিপোর্ট আসে না।
- তুমি যত আমার মন ভালো করবা আমি তোমাকে তত ভালোবাসবো !! ... এই, আগামীকাল আমি ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে যাচ্ছি? ভাষা প্রতিযোগে। চলো না, দেখা করি! আই অ্যাম ডাইং টু সি হুম আই ওয়ান্ট সো মাচ। প্লিজ...
- প্লিজ প্লিজ না। তাছাড়া আমার কাল ৬ ঘণ্টা’র দুইটা পরীক্ষা। আসলে আমি এখন চাচ্ছি না তোমার সাথে দেখা করতে। যদি তোমাকে ভালো লেগে যায় তাইলে সমস্যা। শুধু তোমাকে চিন্তা করবো! পরীক্ষা খারাপ হবে। জাস্ট হোল্ড ফর টু মান্থস। তারপর আমরা দেখা করবো ইনশাল্লাহ!...
[ আমি দমে যাই!...এতবার করে অনুরোধ করি তারপরও একটা ছেলের মন গলে না! আমার জিদ চাপতে থাকে। আজ ওকে মানতেই হবে, এরকম একটা ভাব!]
- কাউকে ভালো লাগতে তার চেহারাটা এতো ইম্পোরট্যান্ট ? যদি আমাকে দেখে তোমার ভালো না লাগে তখন কি তুমি আমাকে না করে দিবা? আমার তো তখন মরা ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না। তুমি কেমন ভাবতে গিয়ে যদি আমার পরীক্ষা খারাপ হয় ???
- দ্যাখো, আমি সিরিয়াসলি বলতেসি, তুমি যদি এরকম জিদ করতে থাকো, তাইলে কিন্তু আমি আর কখনো দেখা করা দূরে থাক, একবারও মেসেজ পাঠাবো না। বোঝার চেষ্টা করো, প্লিজ প্লিজ...। তুমি যদি সত্যি আমাকে ভালোবাসো তাইলে প্লিজ এমন জিদ করো না। প্লিজ। আর শোনো, দুনিয়াতে আমার চেয়ে অনেক ভালো মনের ছেলে পাবা।
ওকে আমি ভালোবাসি, এটা প্রমাণ করার জন্যই যেন আমি জিদ করা বন্ধ করে দেই!......নমনীয় হয়ে যাই...
- আমি জিদ করতেসি না। আই কান্ট ওয়েইট। কিন্তু তুমি এমন কথা কেন বললা? আর অত ভালো ছেলের আমার দরকার নাই। আমি তো কাউকে ‘আই লাভ ইউ’ বলার কথা ভাবতাম না। বাট, অ্যাজ আই গেট ইউ অ্যাজ দ্য রিফ্লেকশন অব মাই ড্রিমম্যান, তাই এখন...
[আসলে লিপন আমার স্বপ্নের কিংবা কল্পনার ‘রাজপুত্র’র সাথে কতটা মিলছে তা আমি ভেবে দেখি না!...ওকে যতরকম কথা বলে কনভিন্স করা যেতে পারে, সেই চেষ্টা করি। তাকে বোঝাতে চাই, তার অবস্থান কতটা উপরে!...]
- এই তো লক্ষ্মী মেয়ে...আই লাইক ইট। ... আলতু ফালতু চিন্তা বাদ দাও। ইভেন আমার চিন্তাও। শুধু পরীক্ষা নিয়ে ভাবো।
আমিও লক্ষ্মী মেয়েই সেজে থাকি। কিন্তু এর মধ্যেই সন্ধ্যার দিকে আমার জ্বর আসে। অনেক বেশি জ্বর। হয়তো সিজন চেঞ্জ এর জন্য...। মাথা তুলতে পারি না জ্বরে। নেতিয়ে থাকি। সন্ধ্যায় টুকটাক কথা-বার্তার ফাঁকে তাকে জানাই অসুস্থতার কথা। রাতের দিকে মেসেজ পাঠিয়ে সে খোঁজ নেয় অসুস্থতার।
- কি? জ্বর কমসে? শরীরের অবস্থা কেমন? হঠাৎ জ্বর আসলো কেন? রেস্ট নাও। যেখানে তোমার মনই ভালো থাকে না, সেখানে শরীর খারাপ থাকা স্বাভাবিক। কজ ফ্রেশ মাইন্ড লাইজ অন ফ্রেশ বডি।
- একে তো গরম, তার ওপর ঠান্ডা কিছু সহ্য হয় না। তারপরও আইসক্রিম খাই, কোল্ড ড্রিঙ্কস খাই, শাওয়ারে গোসল করি। তাছাড়া ওই যে বললা মন খারাপ থাকে!...এত অনিয়ম কি সহ্য হয়? জ্বর আরো বেড়েছে। মাথা এত ব্যথা করে মনে হয় যেন মরে যাই।
- এক কাজ করো তুমি আমার বাসায় চলে আসো...সারারাত মাথা টিপে দিবো। আরো কত কিছু করবো! দেখবা জ্বর ভ্যানিশ, কিন্তু কয়েকদিন পর দেখবা পেট ফুলে গেছে!!...হা হা!
- হুমম...বিয়ের আগেই বাসর রাত, না?...খারাপ না!
এরকম মজা করতে করতে একটা দুইটা কথা হয়। আমি শেষ মেসেজ পাঠাই। কিন্তু উত্তর আসে না। ভাবি ছেলেটা বোধহয় ঘুমিয়ে গেছে। আমিও ঘুমিয়ে পড়ি। জ্বরের জন্য পরদিনও নেতিয়ে থাকি। মেসেজ পাঠাতে গিয়েও কেন যেন পাঠানো হয় না...ছেলেটাও মেসেজ পাঠায় না। আমি ভাবি হয়তো আমার অসুস্থতার জন্য...কিংবা নিজেও হয়তো ব্যস্ত...কীভাবে কিভাবে একটা দিন কেটে যায়, কোনো মেসেজ, মিসকল ছাড়া...
আমি মনে মনে ছেলেটাকে মিস করি......সত্যিই যদি ছেলেটা এখন আমার মাথা টিপে দিতে পারতো!...নেতিয়ে থাকি...আর ভাবি.....
( চলবে)
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

