সচরাচর কোন কাজ সমাপ্ত হলে কিম্বা কোন সমস্যা থেকে পরিত্রান পেলে আমার বাপ-কাকাদের দেখতাম বেশ স্বস্তির সাথে বলে উঠতেন- দুগ্গা দুগ্গা। অর্থাৎ যাক বাবা পার পেয়ে গেলাম; এখনো দেখি আমার ঠাকুরমা ঘর থেকে বের হওয়ার আগে দুয়ারে কাছে এসে হাত জোড় করে প্রার্থনা করেন দুগ্গা দুগ্গা বলে- যেন তাঁর যাত্রাটি নির্ভিঘ্ন হয়। এই ভাবে মোটামুটি সমস্ত ধার্মিক হিন্দুদের যাবতীয় দুগর্তি থেকে মুক্তির জন্য বারে বারে বিভিন্ন সময় উচ্চারিত এই শব্দদ্বয় হচ্ছে: দুগ্গা দুগ্গা। মুলত শব্দ দুটি হবে দুর্গা দুর্গা। কিন্তু চলিত উচ্চারনে তা দুগ্গা রূপ লাভ করেছে। তাতে অবশ্য উচ্চারন জনিত ত্রুটি ছাড়া আর কোন সমস্যা হয় না। হওয়ার কথাও নয়।
গত কয়েকদিন দুর্গতি নাশিনী এই দশভূজা স্বশরীরের এসে বিরাজ করেছেন তার ভক্তদের বিশ্বাসের চৌকাঠে। জননী রূপী এই দেবতাটি ঠিক একা আসেন না। সংস্কৃত ভাষায় বলতে গেলে শ্লোকটি এমন হয়, স্বপরিবারাঐ, সাঙ্গপাঙ্গাঐ, স্ববাহনাঐ... অর্থাৎ স্বপরিবারে, আসেন তিনি। আসেন সাঙ্গপাঙ্গ সহকারে। এবং নিজস্ব বাহনে। তার বাহনটি বেশ শৌর্যের প্রতীক; সেটি আমাদের বনরাজ সিংহ মহাশয়। সাথে দুই পুত্র যথাক্রমে গনেশ এবং স্বস্ত্রীক কার্তিক আর দুই কন্যা লক্ষ্মী ও স্বরস্মতী। এবং স্বামী কৈলাশপতি মহামহিম দেবাদিদেব খ্যাত মহাদেবও আসেন শশুড়বাড়ির মধুর আনন্দে। সাঙ্গপাঙ্গ হিসাবে আসে দেবীর পুত্রকন্যাদের নিজস্ব বাহন, কার্তিকের বৌ; এমনকি মহিষাসুর নামে যে অসুরকে তিনি বধ করে বিখ্যাত হয়েছিলেন, সেও বাদ পড়ে না। সাঙ্গপাঙ্গসমৃদ্ধ দেবীর মুর্তিতে কিম্বা প্রতিমায় ভরে উঠেছে তার ভক্তকুলের মন্ডপ। বিশেষ করে বাঙ্গালী হিন্দুদের সামর্থের উঠানে। যেহেতু দুর্গাপুজা মুলত বাঙ্গালী হিন্দুদের প্রধান উৎসব; অবাঙ্গালী হিন্দুদের নয়।
কথিত আছে, একদা রাম (সুশাসক হিসাবে মহাকবি বাল্মিকীর এ চরিত্রটির বেশ সুখ্যাতি রয়েছে) তার সুলক্ষাণা স্ত্রীর অপহরণকারী রাবণকে পরাজিত করার জন্য দারস্থ হন এই দুর্গতিনাশিনীর। আবাহন করেন দেবী দুর্গার। কিন্তু সেই সময়ে দুর্গার আবাহন করার হতো বসন্ত ঋতুতে। কিন্তু রাবণকে পরাজিত করার জন্য নিরুপায় রাম অকালে, অর্থাৎ শরতকালে দেবীর আরাধনা করতে বাধ্য হ'ন। এবং দেবীর কৃপা লাভ করেন। সেই থেকে বসন্ত কালের বদলে দেবীর পুজা শরতকালের অনুষ্ঠিত হয়। অকালে দেবীর এই শারদীয় আরাধনা হয় বিধায় এই আরাধনাকে অকালবোধনও বলা হয়। কিন্তু আজও কোথাও কোথাও বসন্তে দুর্গা পুজা অনুষ্ঠিত হয়। বসন্ত কালে হয় বিধায় সেটির নাম অবশ্য এখন বাসন্তী পুজা।
আমি যে অঞ্চলটায় থাকি সেটা আংশিক হিন্দু অধ্যুষিত বিধায় মহালয়া থেকে শারদীয় দশমী তিথি পর্যন্ত দুর্গা দেবীর আরাধনা চলে বেশ সারম্বড়েই। আমাদের বাড়ীর সামনেই হয় এই অঞ্চলের প্রধান পুজাটি। এছাড়া কাছাকাছি আরো দুইটি পুজা সংগঠিত হয়। তিনটি মন্ডপে শরতের প্রথমার্ধের ষষ্ঠী তিথি থেকে দশমী তিথির পুর্বাহ্ন পর্যন্ত চলে দেবীর আরাধনা। আয়োজনে এবং ব্যাপ্তিতে বৃহত্তর বলে এটি হিন্দুদের প্রধান পুজা হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। পাঁচ দিন বিভিন্ন আয়োজনে চলে দেবীর আরাধনা। পুজাটি ব্যক্তি উদ্যোগে না হয়ে সকলের আর্থিক অংশগ্রহনে সম্মিলিত ভাবেই মুলত অনুষ্ঠিত হয়। একে বলে বারোয়ারি আয়োজন। তবে যারা ঐতিহ্যগত ভাবে একটু ধনী তাদের কেউ কেউ পারিবারিক ভাবে এ পুজা করে থাকে।
প্রযুক্তির অভাবিত উৎকর্ষতার ছোঁয়া থেকে এই সব ধর্মীয় পুচা অর্চনাও ব্রাত্য নয়। মন্ডপের আলোকসজ্জা থেকে শুরু করে দেবী প্রতিমাতে লেগেছে প্রযুক্তির ছাপ। প্রায় পাঁচদিনই প্রতিটি মন্ডপে লাউডলি গান বাজানো হয়। বাজানো হয় ধর্মীয় কাহিনী নির্ভর কথিকা, নাটিকা প্রভৃতি। এমনকি চিরায়ত ঢাকঢোলের বোল ছাপিয়ে বর্তমান সময়কার হাবিব মিলা মেটাল ব্যন্ডও বাদ যায় না।
হিন্দুদের একটি সাধারন প্রবণতা হচ্ছে ভারতপ্রীতি এবং অন্ধ ভারতীয় অনুকরন। (ব্যতিক্রম নিশ্চই আছে। কিন্তু, নাস্তিক হলেও যেহেতু আমি উঠে এসেছি হিন্দু কমিউনিটি থেকে, দুঃখজনক ভাবে হিন্দুদের এই প্রবণতা আমাকে ব্যথিত করে ভীষন ভাবে। অথচ এদের শাস্ত্রেই বলা হয়েছে জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী) সর্ব ক্ষেত্রে। ইন্ডিয়ার অন্ধ অনুকরনই হচ্ছে এতদ্দেশের হিন্দুদের মোক্ষ লাভ। যেন ইন্ডিয়াই তাদের কাছে স্বর্গ আর ইন্ডিয়ানরা তাদের দেবতা উপদেবতা ইত্যাদি। ইন্ডিয়ানদের ময়লা আবর্জনা মলমুত্রও তারা সাদরে গ্রহন করে অমৃত রুপে। গ্রহন করে দেবতার প্রসাদ হিসাবে। ফলে মন্ডপে মন্ডপে দুর্গার আরাধনায় লাউড স্পিকারে বাজতে থাকে হিন্দি গান, হিন্দি ছবির অশ্লীল আউটেম গান সমুহ। আর বাংলা বলতে ভারতীয় ফটাবাজ উত্তেজক গান সমুহ। ভারতীয় বাংলা ছবির আইটেম গান।
যেহেতু ধর্মচার কিম্বা ঈশ্বর চিন্তায় আমি নাস্তিক সেহেতু স্বভাবতই এই সব আয়োজনে আমি কিছুটা বিরক্ত বোধ করি। কিন্তু পাছে তাদের তথাকথিত সংবেদনশীল ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগে তাই নিরবেই এইসব সহ্য করি। গত পাঁচ দিন নিরবিচ্ছিন্ন শব্দ দুষনে আমি ঘুমোতে পারিনি। সকলের মধ্যে অতিমাত্রায় ধর্মভাব প্রবল হওয়াতে, এমনিক সবচেয়ে লম্পট ছেলেটিও মাথায় সিঁদুর দিয়ে যখন আমাকে তিরস্কার করে নাস্তিকতার জন্য, করুনা বোধ করে, এবং সিদ্ধান্ত দেয় আমার স্থান হবে সবচেয়ে ভয়াবহ রৌরব নরকে, ঘরে বাবার নিরন্তর চাপ, পাড়া প্রতিবেশীর বক্র দৃষ্টি, সব মিলিয়ে খুব সাইলেন্টলি অস্পৃশ্য ঘোষনা করে আমাকে একঘরে করার প্রবণতা আমার নগরীক অধিকারকে ব্যহত করে। দুঃসহ করে আমার বেঁচে থাকাকে। আমি তারপরও কিছুই বলিনা। পাছে তাদের ধর্মানুভুতি নামক ঐ বিশেষ সংবেদনশীল অংশে আঘাত লাগে। আমাদের সরকার আমাদের মৌলিক অধিকারসমূহ নিশ্চিত করতে না পারলেও, আমাদের যৌক্তিক অপরাপর চাহিদা সমুহ নিশ্চিত করতে না পারলেও, আমাদের মুক্তচিন্তাকে অবাধে প্রকাশ করার নিশ্চয়তা দিতে না পারলেও অন্ধকারাচ্ছন্ন ঐ বিশেষ সংবেদনশীল অনুভূতি রক্ষায় সদা সচেষ্ট। এবং এদেশে খুনের শাস্তি না হলেও, ধর্ষনের শাস্তি না হলেও, এমনকি এদেশের অস্তিত্বের বিরোধী সক্রিয় শক্তির শাস্তি বিধান না করতে পারলেও মুক্তচিন্তাকে ঐ বিশেষ অনুভূতির বিপরিতে দাঁড় করিয়ে একে অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করে তার (যদিও মুক্তি চিন্তা কখনোই অপরাধ নয়) শাস্তি ঠিকই নিশ্চত করে তড়িৎ বেগে। তাই আমিও নিশ্চুপ থাকি। আমার অধিকার আর কন্ঠস্বরকে রোধ করে প্রতি বছর পুজা শেষ হলে হাফ ছেড়ে বাঁচি আমি। স্বস্তির নিশ্বাস নিয়ে আপন মনে বলি দুগ্গা দুগ্গা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

