অবশেষে তিনি মারা গেলেন।
তিন জন পাওনাদার মিলে তাঁর কাছে মাত্র ৬০ হাজার পেতো; এক বন্ধু পেতো একটি অসমাপ্ত চিঠি। বন্ধুপত্নী পেতেন একটি জমজমাট রাতের আশ্বাস; চলমান প্রেমিকা পেতেন প্রতিশ্রুত সন্ধ্যার ঘনিষ্ঠতা; আর সাবেক একজন প্রেমিকা তার বিয়ের দিন, যদি তিনি নিমন্ত্রনটি রক্ষা করতেন, তবে একটি উপহার পেতে পারতেন। অথচ এইসব বকেয়ারা রেখে তিনি মরে গেলেন।
*
তিনি যে মারা যাবেন এটা মোটামুটি আমি জানতাম। গত কয়েক বছর ধরেই তিনি একটি মহত্তম রোগে ভুগছিলেন। তার বুকে ছিলো গভীর গোপন বাষ্প। এই বাষ্প বুকে ধারন করে দিনে দিনে তিনি অগ্রসর হচ্ছিলেন একটি কাঙ্খিত মৃত্যুর দিকে। তিনি প্রায়ই আমাকে বলতেন, দ্যাখ, মানুষের জন্মে তার নিজের হাত নেই। কিন্তু চাইলেতো মৃত্যুর ব্যপারে কিছু করতে পারে।
*
তার প্রেমিকার নাম ছিলো গহন। প্রায়ই তিনি গহনের কাছে চুম্বন প্রার্থনা করেতেন। প্রেমিক তার প্রেমিকর কাছে চুম্বন প্রার্থনা করবে এটা উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। কিন্তু গহন কোন মানবী ছিলো না। মুলত তখন থেকেই মহত্তম রোগটি তার মধ্যে সংক্রমিত হতে শুরু করে। তিনি যে রোগটি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না এমন নয়; রোগটিকে বরং সাদরে গ্রহন করেছিলেন।
*
তাকে প্রতি সন্ধ্যায় থরথর করে কাঁপতে দেখতাম। সন্ধ্যায় সড়কের পাশে পথচারীদের বিবিধ দৃষ্টির সামনে একা একা কাঁপতেন তিনি। সকলেই ভাবতো নেশায় পড়ে লোকটা শেষ হয়ে গেল। তবে ঠিক কোন নেশাবস্তুটি গ্রহন করতেন কেউ জানতো না। আমি জানতাম; শুধু আমি- নিজের সৃষ্টির নেশায় এ রকম কাঁপতে আমি আর কাউকে দেখিনি কোন দিন।
*
পিতা তাকে বর্জন করেছিলো; অথচ গহনকে ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু শেখেন নি তিনি। বন্ধুপত্নীর মুগ্ধ আব্দার রক্ষা করতে যেয়ে ৩ জন পাওনাদর সৃষ্টি করেছেন অবলীলায়। এটা কেবল তিনিই পারতেন কারন ততো দিনে তার বুকের ভেতরের বিষন্ন বাষ্পে এ রোগ ছড়িয়ে পড়েছিলো। ফলে তিনি আরো বিশুদ্ধ ও নিখুত হয়ে উঠছিলেন। এর মধ্যে একদিন তিনি আমাকে জানালেন সহজতম মৃত্যু সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে; মৃত্যুর সময় যন্ত্রণাজনিতন ব্যঘাত যেন না ঘটে।
*
আমি যখন মৃত্যু বিষয়ক কাজে ব্যস্ত, তিনি ফোন দিলেন একদিন; কি পেয়েছ কোন উপায়? আমি আমতা আমতা করতেই তিনি বললেন, খুঁজতে থাকো; তোমাকে যে কারনে ফোন দিয়েছি তা হ'ল, আমার ভেতরে যে বাষ্প ঘনিভূত হচ্ছিল, বিকশিত হচ্ছিল আশ্চর্য সৌন্দর্য, অবিলম্বে তার সমাপ্তি দরকার। আমি আর সহ্য করতে পারছিনা। এই ভয়াবহ সুন্দর থেকে আমি মুক্তি চাইছি। এবং আমার সময় হয়েছে ব্যধিকে মহত্তম সংহতি দেওয়ার।
*
তিনি বলতেন, মানুষ জন্মগ্রহন করে না। মানুষের জন্ম হয়। ঘাস-লতাপাতা-গরু-ভেড়া-সিংহ-শুয়োরের মতো মানুষও জন্মায়। নিজের জন্মকে গ্রহন করার সুযোগ মানুষের নেই। তবে মৃত্যুকে গ্রহন করার সুযোগ আছে। আমি মৃত্যুকে গ্রহন করবো।
হ্যাঁ, মৃত্যুকে গ্রহন করার ব্যপারে তিনি যথেষ্ট সিরিয়াস ছিলেন। আমরা প্রায়ই দেখতাম কীটসের যন্ত্রণা বুকে নিয়ে তিনি হাঁটছেন শহরের সব চেয়ে নির্জন রাস্তায়। তার একটি বাইক ছিলো। সেই বাইকে চড়ে তিনি মাঝে মাঝেই চলে যেতেন বোদলেয়ারের মেঘেবাড়িতে। গভীর দুপুরের বৃষ্টি থেকে ফোটা ফোটা দুঃখ তুলে নিতেন। আমরা আশ্চর্য হয়ে দেখতাম তার ভেতরের বাষ্প কিভাবে উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হচ্ছিল। এসব করতে করতে তিনি নেশাগ্রস্থের মতো দুলতে থাকতেন; তখন তার কাঁধ স্পর্শ করতো একটি তন্বী হাত। যে হাতের স্পর্শে স্থিরতা নামক আরোগ্য লাভ করতেন।
*
কিন্তু এইসব স্থিরতা, নৈঃশব্দ্য আর স্পর্শ উপেক্ষা করে বাষ্প আর বেদনার আহ্বানে সাদরে গ্রহন করে নিলেন মৃত্যুকে। স্বপ্ন ও মৃত্যু যে এত নৈকট্যময় তার ঝুলে থাক শরীরের দিকে তাকিয়ে এই প্রথম টের পেলাম।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


