প্রকাশ্যে মানুষগুলোকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তারা আর ফিরে আসে না। বলা হয় বিভিন্ন সংস্থার নাম। আটককৃতদের স্বজনরা সম্ভাব্য সব স্থানে ধরনা দেন। কোথাও তাদের সন্ধান মেলে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তাদের গ্রেফতারের বিষয়টি অস্বীকার করে। এরপর সময় গড়িয়ে যায়। দুই-একজন নিখোঁজ ব্যক্তির স্বজন সংবাদ সম্মেলন ডেকে অন্তত লাশ পাওয়ার দাবি করেন। সরকারের উচ্চমহলে কেউ কেউ যোগাযোগ করেন। কোনো কোনো ঘটনা খতিয়ে দেখার চেষ্টা হলেও তা মাঝপথে থেমে যায়। বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি বা নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান না করতে স্পষ্ট হুমকি দেওয়া হয়। ফলে স্বজন হারিয়ে কেউ কথা বলতেও সাহস পান না। এরপরও একজন স্বজন মামলা করেছিলেন। কিন্তু তার পরিণতি হয়েছে একই। মামলার বাদীকেও একইভাবে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি দেশে এভাবেই লোকজনের গুম হওয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এ তালিকায় শীর্ষসন্ত্রাসী থেকে শুরু করে নিরীহ লোকজন রয়েছে। যত দিন যাচ্ছে তালিকায় বেড়ে যাচ্ছে নিখোঁজ ব্যক্তিদের নাম। সাপ্তাহিক বুধবারের অনুসন্ধানে গত বছর দুইয়েক সময়ে ২৩ ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে চলতি বছরে মে পর্যন্ত অন্তত ১০ ব্যক্তি রয়েছেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর, নিখোঁজদের স্বজনদের সংবাদ সম্মেলন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী এদের নিখোঁজ ব্যক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে। এর বাইরেও অনেকে রয়েছেন যাদের স্বজনরা ভয়ে চুপ করে রয়েছেন। অথবা একটি সংবাদ সম্মেলন করার সামর্থ্য নেই। এ ছাড়া আরো বেশকিছু লোককে অপহরণের বেশ কিছুদিন পর খুন করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে রাখা হয়। যাদের হত্যার দায় কেউ স্বীকার করেনি।
র্যাব গঠনের পর শুরু হয় ক্রসফায়ার। সব ক্রসফায়ারের গল্প ছিল একই ধরনের। পরে ক্রসফায়ার শব্দের বদলে এনকাউন্টার শব্দটি প্রয়োগ করা হতো। এরপর বর্তমান সরকারের আমলে এর নাম হয় বন্দুকযুদ্ধ। কিন্তু উচ্চ আদালত বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধে সোচ্চার ভূমিকা নেন। তবে চূড়ান্ত শুনানির আগেই সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ ভেঙে দেওয়া হয়। আদালতের এ অবস্থানের কারণে দৃশ্যত ক্রসফায়ার কমলেও শুরু হয় গুপ্তহত্যা আর অন্তর্ধান। দেখা গেছে, পরিবারের কেউ একজন চোখের সামনে গুম হয়ে গেলে বাকি সদস্যদের জীবনধারণও দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। অপেক্ষার পালা যেন কোনো দিনও শেষ হয় না। তারাও জীবন্মৃত হয়ে বেঁচে থাকার কষ্ট ভোগ করেন। গুম প্রবণতা চালু হওয়ার আগে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার লোকজনের লাশ ফেরত পেতেন স্বজনরা। এখন আর তাও পাওয়া যায় না।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ব্যাখ্যা দাবি : ১১ মে আইন ও সালিশ কেন্দ্র দেশব্যাপী গুপ্তহত্যা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। এক বিবৃতিতে তারা বলে, সম্প্রতি পুলিশ ও র্যাব পরিচয়ে লোকজনকে বাসা ও রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ ধরনের গুপ্তহত্যা ফ্যাসিস্ট দেশগুলোতে হয়ে থাকে। গণতান্ত্রিক সমাজে এ ধরনের কর্মকান্ড কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা এ ধরনের হত্যা বন্ধে এবং তদন্ত করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিতে সরকারের কাছে আহবান জানায়।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকার এক বিবৃতিতে বলেছে, সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে আটকের পর অনেকের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না এবং পরে কারো কারো লাশ উদ্ধার হচ্ছে। ভিকটিমদের পরিবারগুলো দাবি করেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই তাঁদের আটক করে নিয়ে গেছেন এবং এরপর অনেকের লাশ উদ্ধার হয়েছে। অধিকার এ ধরনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে এবং দ্রুত নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধার ও গুপ্তহত্যার বিষয়ে সরকারের কাছে প্রকাশ্য ব্যাখ্যা দাবি করছে।
মামলা করার পর বাদীও নিখোঁজ : নিখোঁজ ভাইয়ের সন্ধান করতে গিয়ে রোষানলে পড়েছেন আরেক ভাই। এ ঘটনায় দুই ভাইয়ের সঙ্গে আরো একজনসহ মোট তিনজন নিখোঁজ হয়েছেন। এদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
অধিকার জানিয়েছে, ১৯ মার্চ বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে র্যাবের নাম করে ঠাকুরগাঁও সালেন্দার নওলাপাড়ার চান মিয়ার বাড়ির ভাড়াটিয়া কাঠ ব্যবসায়ী মো. আকবর আলী সরদার এবং একই গ্রামের বিপিনচন্দ্র সরকারকে সালেন্দার বিশ্ব ইসলামী মিশন মসজিদের সামনের রাস্তা থেকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়। ২০ মার্চ সকাল ১০টার দিকে বিপিন সরকারকে র্যাব ছেড়ে দিলেও আকবরের কোনো খোঁজ এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বিপিন সরকার বলেছেন, তাকে র্যাব সদস্যরাই ছেড়ে দিয়েছেন। আকবরের পরিবারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে ঠাকুরগাঁও থানায় জিডি বা মামলা করতে চাইলে থানা পুলিশ এর কোনোটাই গ্রহণ করেনি। পরে আকবরের পরিবার ঠাকুরগাঁও পুলিশ সুপারের মাধ্যমে র্যাবের কাছে আকবরের খোঁজ করলে তারা আকবরের আটকের বিষয়টি অস্বীকার করে। আকবরের ভাই আইয়ুব আলী ভাইয়ের এ অন্তর্ধানের বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। তিনি ২৯ মার্চ আদালতে একটি মামলা করেন। তিনি এ প্রতিবেদকসহ সাংবাদিকদের কাছে র্যাব তার ভাইকে অপহরণ করেছেন বলে অভিযোগ করেন। আইয়ুব আলী ওই সময় জানান, সাংবাদিকদের কাছে র্যাবের বিরুদ্ধে তার ভাইকে অপহরণের অভিযোগ করায় হিরু শেখ পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি তার মোবাইল ফোনে হুমকি দেয়। আকবরের বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে তারও একই পরিণতি হবে বলে জানায় সে। হুমকি পেয়ে আইয়ুব আলী রাজধানীর খিলগাঁও থানায় একটি জিডি করেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ১৭ মে রাত ১০টার দিকে আইয়ুব আলীও নিখোঁজ হন। খিলগাঁও বনশ্রী প্রজেক্ট এলাকায় আইয়ুব আলী খিলগাঁও থানা নির্মাণ শ্রমিক লীগের প্রচার সম্পাদক আবদুর রহমানের সঙ্গে কথা বলার সময় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা তাদের আটক করে নিয়ে যায়। এরপর থেকে আইয়ুব আলী ও আবদুর রহমানের হদিস মিলছে না বলে তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। ১৩৪ মেরাদিয়া মধ্যপাড়ার বাসিন্দা আইয়ুব আলীর স্ত্রী হালিমা এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘তারে মোবাইলে হুমকি দিছে। বলছে, মামলার বাদী হইছো। তোরেও তোর ভাইর মতন মাইরা ফালামু।’
নিখোঁজ দুই ভাই ফিরে আসেননি : রাজধানীর পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের ১ নম্বর ওয়াপদা ভবন থেকে ১৪ মার্চ রাত ৩টার দিকে দুই ভাই জালাল ও লালবাবুকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তাদের ভাই শাহাবুদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, ১৬ মার্চ রাত ৪টার দিকে হঠাৎ করে তাদের বাসায় হানা দেয় র্যাব-৪ এর একটি টিম। গ্রেপ্তার করে জালালকে। জালালকে র্যাবের গাড়িতে তুলে নেওয়ার সময় তার ভাই লালবাবু গ্রেপ্তারের কারণ জানতে চাইলে তাকেও গাড়িতে তুলে চোখ বেঁধে নিয়ে যায়। পরদিন তাদের খোঁজ নিতে র্যাব অফিসে গেলে র্যাব কর্মকর্তারা বিষয়টি বেমালুম অস্বীকার করেন। এখন পর্যন্ত তাদের খোঁজ পাননি পরিবারের সদস্যরা। দুই পুত্রের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার পর থেকে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন তাদের বৃদ্ধা মা।
ওরাও ফিরে আসেননি : নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কুতুবপুরের কাপড় ব্যবসায়ী আবু সালাম ও তার ভাগ্নে সজল ১৪ মে থেকে নিখোঁজ। ওইদিন রাতে ৭-৮ জন সালাম ও সজলকে আটক করে নিয়ে যায়। সজলের স্ত্রী জাহানারা বেগম ২৩ মে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন।
সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার ধুকুরিয়া বেড়াবাজার থেকে গত বছরের ২২ জুলাই রামপুরার ব্যবসায়ী মো. তুষার ইসলাম টিটুকে র্যাব আটক করার পর থেকে নিখোঁজ টিটু। তাকে কেউ গ্রেপ্তারের কথা স্বীকার করেনি। এদিকে টিটুর পরিবার কয়েকবার এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এখন আশা ছেড়ে দিয়েছে। তারা সব শেষ লাশের দাবি করেছিল। কিন্তু তার লাশও ফেরত দেওয়া হয়নি।
২৯ জুন বুধবার রাজধানীর হাতিরপুলে নির্মাণসামগ্রী ব্যবসায়ী জহির রায়হান হিরণের অন্তর্ধানের এক বছর পূর্ণ হবে। সোমবার সাপ্তাহিক বুধবার অফিসে এসে ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ কর্মী লিটন তার ভাইকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার বিষয়ে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান। হিরণকে গ্রেফতারে নেতৃত্ব দেওয়া কর্মকর্তাকে নৌবাহিনীতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তার আগেই হিরণকে অপহরণের প্রত্যক্ষ সাক্ষী পাখিকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়। লিটন জানান, আমাকেও ওই কর্মকর্তা র্যাব অফিসে ডেকে নিয়ে বলেছেন, বাড়াবাড়ি করবেন না। লিটন বলেন, বিভিন্ন মহল থেকে এতদিন আমাদের চুপ থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এতে ভেবেছিলাম ভাই ফিরে আসবে। এখন শুনি তাকে মেরে পেট কেটে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় আর চুপ থাকতে পারছি না। আমরা কয়েকদিনের মধ্যেই সংবাদ সম্মেলন ডেকে পুরো বিষয়টি গণমাধ্যমে তুলে ধরব।
কী ঘটেছে হাসান, রনি, তারিক, সেলিম ও সুমনের ভাগ্যে : ২০০৮ সালের ২৫ মে গাজীপুরের টঙ্গী উপজেলার উত্তর দত্তপাড়া বাসিন্দা মো. হাসান খানকে টঙ্গী কলেজ রোড বাসস্টপেজের সামনে থেকে র্যাবের একটি দল গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। কিন্তু র্যাব তাকে গ্রেফতারের বিষয়টি অস্বীকার করে। পরে আইন ও সালিশ কেন্দ্র ২৩ জুলাই র্যাবের মহাপরিচালক বরাবর হাসান খানের অবস্থান ও অবস্থার সংবাদ তার পরিবারকে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেয়। র্যাবের পক্ষ থেকে চিঠির কোনো উত্তর না দেওয়ায় ওই বছরেরই ২৩ অক্টোবর হাসান খানকে আদালতে উপস্থাপন করার জন্য হেবিয়াস করপাস রিট মামলা করা হয়। আদালত তিন সপ্তাহের মধ্যে হাসান খানকে আদালতের সামনে উপস্থিত করার জন্য র্যাবের প্রতি রুলনিশি জারি করেন। এটি বর্তমানে শুনানির অপেক্ষায় আছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের লিগ্যাল অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড পলিসি রিফর্ম ইউনিটের সমন্বয়ক আবু ওবায়দুর রহমান বুধবারকে জানান, এ রুলের কোনো জবাব দেয়নি র্যাব। আর হাসানকেও ফিরে পায়নি তার পরিবার।
২০০৯ সালের ২৭ অক্টোবর রাতে রাজধানীর কাফরুলের চেকপোস্টের সামনে খিলগাঁও থানা ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক মাহমুদুল হক রনি ও তার দুই বন্ধুকে র্যাব কর্মকর্তা পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো সন্ধান নেই। রনির সঙ্গে গ্রেফতার হয়েছিলেন মোশাররফ। তিনি সাংবাদিকদের জানান, আটকের পর কালো কাপড়ে চোখ বেঁধে তাদের গাড়িতে তোলা হয়। পরে তাকে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্রের সামনে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
২০০৯ সালের ২০ জুলাই পুরানা পল্টন থেকে তারিক হোসেন নামে এক যুবককে অপহরণ করা হয়। তার স্ত্রী শারমিনের অভিযোগ, র্যাব পরিচয়ে আটকের পর তাকে আর পাওয়া যায়নি।
১৯ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কাপাসিয়ার বাসিন্দা রাজধানীতে ফল ব্যবসায়ী মো. সেলিমকে র্যাব পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকেও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তার স্ত্রী নাজমা বেগম ২৭ মার্চ রাজধানীর ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন।
২৭ এপ্রিল মিজানুর রহমান সুমন নামের একজন ব্যবসায়ীকে সাদা পোশাকধারী র্যাব সদস্যরা গাইবান্ধার মহিমগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করে ঢাকায় নিয়ে আসেন। এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ। সুমনের স্ত্রী সুরভী আক্তার ৩০ এপ্রিল ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, র্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে র্যাব কার্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেও সুমনের কোনো হদিস পাননি তারা। কাফরুল এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকান্ডসহ বিভিন্ন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়েই তার এই পরিণতি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ব্যর্থ মানবাধিকার কমিশন : ২০০৭ সালের ১ ডিসেম্বর বরিশালের ছাত্রলীগ নেতা শফিকউল্লাহ মোনায়েমকে র্যাব পরিচয়ে তার কাউনিয়ার বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে তার পরিবারের অভিযোগ। এখন পর্যন্ত তার পরিবার জানতে পারেনি মোনায়েম বেঁচে আছেন নাকি তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। তিনি এনকাউন্টার বা ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন কি না তারও কোনো প্রমাণ নেই। ২০০৮ সালের ১ ডিসেম্বর মোনায়েমের ভাই মানবাধিকার কমিশনের কাছে অভিযোগ করেন। ওই সময় প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে পুলিশ তদন্ত করে ঘটনার নেপথ্যে একজন পৌর কমিশনারের ভূমিকাও খুuঁজ পেয়েছিল। এ ঘটনায় মানবাধিকার কমিশন ২০০৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মোনায়েমের অবস্থান জানাতে পুলিশ ও র্যাবকে সময়সীমা বেঁধে দেয়। জানা গেছে, র্যাব দায়সারাগোছের একটি রিপোর্ট ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাঠালেও পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি। ৩ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমকে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান আমিরুল কবীর চৌধুরী জানিয়েছিলেন, একজন নাগরিককে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার পর তার কোনো হদিসও পাব না এটা তো হয় না। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, ৩০ আগস্টের মধ্যে আমাদের কাছে একটি প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য আইজিপি ও র্যাবের ডিজিকে অনুরোধ করেছিলাম। সেই প্রতিবেদন তারা দেননি। কমিশনের এ তৎপরতা কোনো কাজে আসেনি। মোনায়েমকে আর ফিরে পায়নি তার পরিবার।
একজন চেয়ারম্যান ও দুজন সদস্যের সমন্বয়ে ২০০৮ সালের ১ ডিসেম্বর কমিশন গঠন করা হয়েছিল। ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই কমিশন আইন প্রণয়ন করা হয়। ওই আইনে কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বয়স সর্বোচ্চ ৭০ বেঁধে দেওয়ায় একজন সদস্য কমিশন ছেড়ে চলে যান। অপর এক সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান। এ অবস্থায় ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে বিচারপতি আমিরুল একাই দায়িত্ব পালন করছেন। ২২ জুন তিনি অবসরে যান। কিন্তু সরকার কমিশন পুনর্গঠনে আন্তরিকতা দেখাচ্ছে না। ২০০৮ সালের ২২ ডিসেম্বর প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের জন্য ৬২টি পদের একটি জনবল কাঠামো তৈরি করে সরকারের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। কিন্তু সরকার তা অনুমোদন করেনি।
২১ জুন বিচারপতি আমিরুল সাংবাদিকদের জানান, কমিশন প্রতিষ্ঠা থেকে ২০ জুন পর্যন্ত তারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ১৪৭টি অভিযোগ পেয়েছেন। এর মধ্যে ৮২টির নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ক্রসফায়ার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটকাবস্থায় মৃত্যুসংক্রান্ত অভিযোগগুলো র্যাবের মহাপরিচালক, পুলিশের মহাপরিদর্শককে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এ রকম পাঁচটি অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তের কাজ চলছে। কমিশনের চেয়ারম্যান জানান, তাঁরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেসব অভিযোগ পেয়েছেন, তার বেশির ভাগ অভিযোগই এসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি বিভিন্ন সংস্থার বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, ‘তারা গণতান্ত্রিক দেশের বাহিনী, জনগণের টাকায় চলে। তাদের মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা খুবই জরুরি।’ কিন্তু ক্রসফায়ার, গুমসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুতর অপরাধের অভিযোগের কোনো নিষ্পত্তি মানবাধিকার কমিশন করতে পারেনি। এমনকি তদন্ত পর্যন্ত তারা করতে পারেনি।
বিচারপতি আমিরুল কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন মানবাধিকার কমিশন ছিল কার্যত অকার্যকর। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের ১১ (১) (ক) ধারায় কমিশনের কার্যাবলি নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে – ‘কোনো ব্যক্তি, রাষ্ট্রীয় বা সরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘন বা লঙ্ঘনের প্ররোচনা সম্পর্কিত কোনো অভিযোগ স্বতঃই বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি কর্তৃক দাখিলকৃত আবেদনের ভিত্তিতে তদন্ত করা।’ কিন্তু এক বছরেও একটি ঘটনার তদন্ত শেষ করে দায়ীদের আইনের হাতে সোপর্দ করতে পারেনি কমিশন। কমিশনের তদন্ত কর্মকর্তা না থাকায় র্যাব-পুলিশের পক্ষ থেকেই সব ঘটনায় প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এর কোনো প্রতিবেদনেই সন্তুষ্ট হতে পারেনি কমিশন। পরে ফের তদন্তের জন্য ফেরত পাঠানোও হয়েছে। ফলে এ ক্ষেত্রে কোনো ঘটনাই উন্মোচন হয়নি।
শেষ কথা : বর্তমানে যেভাবে লোকজন নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছেন তা উদ্বেগজনক। পরিস্থিতি এমন দিকে যাচ্ছে যে, এখন ব্যক্তিগত শত্রুতাও এর মাধ্যমে নিবারণ করা হচ্ছে। এটা গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে বড় বাধা। এর আগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এভাবে নিখোঁজ হয়ে যেত লোকজন। ওইসব দেশের সরকার ফ্যাসিস্ট হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এ কারণেই সমাজ ও রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য এ ধরনের পন্থা ত্যাগ করা উচিত। গণতন্ত্র ও সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থেই অবিলম্বে মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন, আইন সংশোধনসহ এ ব্যাপারে আরো শক্ত ভূমিকা নেওয়া দরকার।
সূত্র: সাপ্তাহিক বুধবার

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


