ফাষ্ট ফরোয়ার্ড করে দিতে পরবর্তী দৃশ্যগুলোকে। ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে আওয়াজগুলো দৌড়ে যাক; চায়ের দোকান, ট্রেন, ইউক্যালিপ্টাস আর শাহীনের বাপ এরা ধরাছোঁয়ার বাইরে ছুটুক। তবে সেটা সম্ভব নয়, ওতে আর গল্পটা বলা হবে না।
শুরুটা হতে পারে উপজেলা চেয়ারম্যান আইজারউদ্দিনের বাপের মৃত্যু দিয়ে। বছর পনেরো-বিশেক আগে বৃদ্ধ নামাজ পড়তে পড়তে মারা গিয়েছিলেন হার্ট এটাকে, অন্য সব তাৎক্ষণিক মৃত্যুর মতোই। মিনিট দশেক জায়নামাযে কপাল ঠেকিয়ে স্থির হয়ে ছিলেন। কমবয়েসী পূত্রবধু অনড় শ্বশুরকে দেখে সন্ধ্যেবেলায় চেঁচিয়ে উঠেছিলো,
"বুড়া সেজদা দিয়া ঘুমাইসে নাকি?"
দেখা গেলো, বৃদ্ধের ঘুম আসলেই গভীর; উনার সৎকারের জন্য যথেষ্ট।
শোনা কথায়, চেয়ারম্যান বাপের চল্লিশাতে এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছিলো। বাপের প্রতি দরদ আর দু নম্বরী আয়ের প্রতিপত্তি ভালোমতোই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো দুইখান ষাঁড়ের কুরবানীর মাধ্যমে। খাসী কুরবানীও দেয়া হয়েছিলো মনে হয়; নাহ্, অত মনে নাই আমার! যেটাই হউক, আইজারউদ্দিনের সংসদ নির্বাচনে দাঁড়ানোর স্বপ্নটাকে একধাপ আগায়ে নিয়ে গিয়েছিলো বৃদ্ধ সুবিধেজনক সময়ে মরে গিয়ে; অন্তত এইটুকু আমি নিশ্চিত। তবে বেগমপুরের মানুষজন খুবই অকৃতজ্ঞ প্রাণী বলতে হবে; ষাঁড়ের মাংসের স্বাদ, চেয়ারম্যানের বউয়ের শাদা চামড়া সবকিছুই ওরা ভুলে গিয়েছিলো দুই সপ্তাহ পরে।
যখন...
রেললাইনের এক্সিডেন্টটাতে শাহীনের বাপ মারা গেলো।
এইরকম রোমাঞ্চকর মৃত্যু বেগমপুরের লোকে খুব কমই দেখেছে। বুড়ো মশিউর সেবার তুলনা করতে গিয়ে টেনে এনেছিলো একাত্তরে পালাতে থাকা এক বিহারীকে বেগমপুরের লোকজনের পিটিয়ে মেরে ফেলাটা। আমরা তাতে আপত্তি জানালেও আরো কয়জন মুরুব্বী কথাটায় সায় দিয়েছিলেন। সান্তাহার কলোনি থেকে পায়ে হেঁটে সেই বিহারী এসেছিলো হিলির এই প্রত্যন্ত গ্রামে যেনো এই ভয়ঙ্কর মৃত্যুর খোঁজেই।
আন্দাজ করি মৃত্যুও উপলক্ষ হতে পারে রোমাঞ্চ কিংবা চায়ের ষ্টলে ঝিম ধরা আড্ডার।
নাহ্, হিসেবে গোলমাল লেগে যাচ্ছে। গল্পটা শাহীনের মৃত বাপকে নিয়ে, সেখানেই ফেরা যাক।
যেটুকু মনে পড়ে...
বৃদ্ধ ছিলেন আর দশটা গ্রাম্য প্রৌঢ়ের মতোই, এককালে হালচাষ করে সংসার টেনেছেন। ছেলেপুলে বড় হয়ে আয়রোজগার করা শুরু করলে উনার দৈনন্দিন কাজকর্ম সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিলো গ্রামের মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া আর সন্ধ্যেবেলায় বাজারে চায়ের দোকানে বসে গল্পগুজব করাতেই। তবে যেদিন মারা গিয়েছিলেন যেদিন কি কারণে আসরের নামাজ পড়ে রেললাইনের দিকে হাঁটা দিলেন সেটা এক রহস্য এখনও পর্যন্ত। রফিক চাচা সেইদিন বলে বসলো...
"বনায়ন প্রকল্প লাইনের দু ধারোত তুঁতগাস লাগাইসিলো, মনে আসে? "
"তো বুড়া তুতঁগাছ দেখবার গেসিলো?"
"হবার পারে, বায়।"
হতে পারে বৃদ্ধ গিয়েছিলেন তুঁতগাছ দেখতেই, বেগমপুরের লোকজন দুই দশক ধরে রেললাইনের সারবাঁধা ইউক্যালিপ্টাস দেখে বেশ ত্যক্ত ছিলো মনে হয়। এটাও হতে পারে উনি গিয়েছিলেন জেনেশুনেই, মানে আত্মহত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে আরকি। কথাটা কানে যাওয়ামাত্রই সেলিম ভাই প্রায় লাফায়ে উঠলেন,
"কন কি বায়ে! বুড়া ট্রেন আইছে যে সিটা শোনা পারে নাই। ডান কানোত ঠসা আসিলো না!" হ্যাঁ, জোরালো যুক্তিই বটে। অতোবড় একটা ট্রেন আসতেছিলো সেটা টের পায় নাই একেবারেই! রেললাইনে পা দিয়েও বৃদ্ধ জমিনের কাঁপন টের পায় নাই? বাম কানের শ্রবণশক্তি কতটুকু কৃপণ হয়ে পড়েছিলো? ডানপাশে মৃত্যু আসতেছে, এটা বামকান শোনে নাই!
দূর্ঘটনাটা ডিটেইলগুলো মনে করি আর চমৎকৃত হই। ...কিছুটা আন্দাজ, কিছুটা শোনা কথা আর কিছুটা আমার কল্পনা। কথক হিসেবে এটুকু মাফ পাওয়া যাবে হয়তো।
বৃদ্ধ আপাদমস্তক চাদরে মুড়িয়ে ছিলো, রেললাইনটা পার হচ্ছিলো ধীরপায়ে। সম্ভবত এই কারণেই শুনতে পারে নাই ট্রেন আসার আওয়াজ। লাইনে বাম পা রেখেছে, অমনি আন্তঃনগর ট্রেনটা নিখাঁদ নিষ্ঠুরতায় একটা টোকা দিয়ে গেলো লোকটাকে। শরীরটা প্রায় বিশফুট দূরে উড়ে গিয়ে পড়লো একটা ইউক্যালিপ্টাসের গায়ে, তুঁতগাছগুলো অতো বড় হয় নাই তাকে ঠেকানোর জন্য। আশ্চর্যের বিষয়, উড়ে গিয়ে শরীরটা এমনভাবে স্থির হয়ে ছিলো দেখে মনে হচ্ছিলো বৃদ্ধ গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে। একপাটি রবারের স্যান্ডেল পড়ে ছিলো লাইনের পাশে; মালিকের সাথে উড়ে যাবার সময়টুকু পায় নাই মনে হয়। ঘটনাটা একরকম চাক্ষুষ দেখেছিলো সামছুল, দূর থেকে; ঘাড়ে স্মাগল করা শাড়ির বোঁচকা নিয়ে থানা শহরে যাচ্ছিলো সে। ব্যাটা এক গাব, পরে যখন চেপে ধরা হয়েছিলো কেনো সে আরো আগায়ে গিয়ে চেক করে দেখে নাই; তখন বলেছিলো,
"মনে করসিলাম ভুল দেখসি, আন্ধার হইসিলো খানিক...পরথমে ভাবসি মানুষ। পরে ভাবছি গরুটরু হবি নাহয়...
আরো কছু গুঁতোগুঁতি করা হলে,
"তাড়া সিলো, বটতলায় বাস ধরবার যাসিলাম মামা..."
এই হল ব্যাপার। তবে নাটকীয়তার কেবল শুরু ছিলো সেটা। শাহীন ভাই বিরামপুর থেকে বাসে ফিরতেছিলেন। বটতলায় নেমে রেললাইন পার হচ্ছিলেন, খেয়াল করলেন কেউ একজন গাছের গায়ে এই অসময়ে হেলান দিয়ে বসে আছে। এড়ায়েই যেতেন হয়তো, কি মনে করে আগায়ে গিয়ে খেয়াল করে দ্যাখেন নিজের বাবা। প্রথম দেখায় মনে হয়েছিলো বৃদ্ধ ঘুমাচ্ছেন। তাই পুত্র যখন বাপের ঘাড় ঝাঁকি দিয়ে বলে উঠেছিলো...
"আব্বা, আপনি এইখানে কি করতিসেন?"
শরীরটাও উত্তর দিয়েছিলো ছেলের গায়ে আস্তে করে ঢলে পড়ে। শুনেছিলাম ধাক্কাটা লেগেছিলো বৃদ্ধের বুকের সাথে ট্রেন ইঞ্জিনের একপাশে। পাঁজরে হাড্ডিগুলো একরকম তুলতুলে হয়ে গিয়েছিলো। একফোঁটা রক্তও ঝরে নাই নাকি তখনও পর্যন্ত! শাহীন ভাই চেঁচায়ে কাঁদতে কাঁদতে মৃত বাপরে বাড়িতে এনেছিলো। মৃতদেহটা শোয়ানো হয়েছিলো উঠানে চৌকির উপর, বৃদ্ধ কতটুকু মৃত তা জানবার জন্য ডাক্তার ডাকার প্রয়োজন আর হয় নাই, যখন হঠাৎ গলগল করে নাক মুখ আর কান দিয়ে রক্ত ঝরা শুরু হয়েছিলো শরীরটার। পুরো গ্রাম জড়ো হয়েছিলো শাহীন ভাইয়ের বাড়ির উঠানে। সবাই ছিলো আতঙ্কিত, শোকাভিভূত, বিস্মিত...
সৎকারটা ছিলো খুবই সাদাসিধে।
চল্লিশাতেও কোন গরু কুরবানী দেয়া হয় নাই।
তারপরও ঘটনাটা এখনও বেগমপুরের লোকজন ভালোভাবেই মনে রেখেছে।
_____________________________________________________________________________
সম্প্রতি ঈদের ছুটিতে দেশের বাড়ি গেলাম। খবর শুনলাম আইজারউদ্দিন কোল্ড ষ্টোরেজ ছেড়ে সোনামসজিদ দিয়ে পাথর আমদানীর ব্যবসা শুরু করেছে। পরের সাংসদ নির্বাচনে দাঁড়াবে, জোর গুজব শোনা যাচ্ছে। উনার বউয়ের বয়স বেড়েছে, তবে গায়ের চামড়া আগের মতই শাদা।
শাহীন ভাই একটা চাকরীর জন্য সাবেক চেয়ারম্যানের কাছে খুব তদবির করতেছেন নাকি। তবে কেনো জানি বিশেষ লাভ হচ্ছে না।
সামছুল মিয়া আর কয়জন মিলে ঈদের আগের রাতে একটা গাই কুরবানী দিলো। ওকে পাঁচশ টাকা দিয়ে এসেছিলাম মাংসের জন্য। রাত একটার সময় আমাকে ফোন করে বলে,
"কাকা একটা সমস্যা হইসে...জবো করি দ্যাখোসে যে গাভীর প্যাটোত বাছুর আসিলো।"
"কি কস!"
"তাও দু'তিন মাসে হবি নিশ্চিত। কেউ আর গোশত খাতি চাসে না। তা তোরা কি গোশত নিবেন?"
ছোটচাচা ঘটনা শুনে গালিগালাজের তুবড়ি ছোটালেন। হাজার হোক, জেনেশুনে গর্ভবতী গরুর মাংস খাওয়াটা একটু কঠিন।
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলাম। হাতে একটা পেপারব্যাক, ওরহান পামুকের "Snow"। পঁচিশ ওয়াটের বাল্বের আলোয় পড়তে পড়তে একজায়গাতে চোখ আটকে গেলো...
....he carried on writing, hardly even pausing, leaving spaces only here & there for the words he had not quite heard, until he had written thirty-four lines...
উপন্যাসে চরিত্রটা নাহয় কলমে কয়টা শব্দ বাগাতে সমস্যায় পড়েছে, আমি আস্ত একটা গল্প বাগাতে চাচ্ছি। দেখা যাক কতখানি ফাঁক রেখে দেয়া যায়!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

