০০.
ক'দিন আগে আমাদের এই ছোট্ট মফস্বলে পাকাপাকিভাবে নেমে এল রাত। জনশ্রুতি অনুযায়ী এই মফস্বলের সকল মৃতদের জেগে ওঠার কারণেই এমনটা ঘটেছিল। ঘটনার পরপরই এখানকার বহু অধিবাসী নিজ নিজ আবাস ছেড়ে পালিয়ে যাবার কারণে গুজবটা আরো শক্ত হয়ে ছড়ায়। শোনা যায় যে মৃতরা শুধু সমাধি থেকেই উঠে আসে নি; ওরা উঠে এসেছিল অসংখ্য স্থান থেকে কিংবা বলা যায় পছন্দের জায়গাগুলো থেকে...যদিও অধিকাংশেরই সমাধিস্থ শরীর গলে পঁচে মাটিতে মিশে গিয়েছিল, অণুপরমাণু হয়ে ঠিকানা খুঁজে নিয়েছিল বৃক্ষ, দালানকোঠার কংক্রীটে, জীবিতদের শরীরে, পিচের রাস্তায়, জমিনের সবুজ ঘাসে। ওরা ওদের সমস্ত কিছু ফেরত চেয়ে উঠে এসেছিল।
মঈনুদ্দীনের বউ সেদিন রান্নাঘরে মাছ কুটতে ব্যস্ত ছিল, হঠাৎ ডানে থাকিয়ে দেখে ময়লা শতচ্ছিন্ন কাফনে জড়ানো ভাঙ্গাচোরা এক শরীর দাঁত কেলিয়ে চেয়ে আছে তার দিকে।
"হা বউ, বটিত ধার ইট্টু কম মনে হসে!"
বউও আর্তচিৎকার দিয়ে চোখটোখ উল্টে জ্ঞান হারিয়েছিল। খুবই স্বাভাবিক, গত পাঁচ বছর ধরে মৃত শাশুড়ি এভাবে হুট করে রান্নাঘরে এসে হাজির হলে সেটা কারো পক্ষেই হজম করা সম্ভব নয়। অবশ্য সেদিন এই শহরের বহু বাড়িতে, রাস্তায়, দালানে, বাজারে আর্তচিৎকারের ধুম লেগেছিল। শ'য়ে শ'য়ে ওরা জেগে উঠছিল। তবে মৃতরা নতুনভাবে বেঁচে উঠছিল কিনা তা কারো জানা ছিল না বা নেই, কারণ জেগে উঠবার জন্য বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয়তা সম্ভবত খুব কম।
০১.
আমি নিজে ঘটনাটা টের পেয়েছিলাম অদ্ভুতভাবে। ছুটির দিন বিধায় ঘরে বসে একটা টেস্ট ম্যাচের হাইলাইটস দেখছিলাম, হঠাৎ কোনকিছুর নড়াচড়া আমার মনোযোগ কাড়ল। "ইঁদুর-টিদুর হবে হয়ত!"-এমন ভেবেই টিভির দিকে মুখ ফিরাচ্ছি, আবার সেই আওয়াজ; তবে একটু অন্যরকম। প্রবল আতঙ্কে আর বিস্ময়ে চেয়ে দেখি একটা বুড়ো আঙুল গজাচ্ছে......, না, অনেকটা গোঙাতে গোঙাতে বেরিয়ে আসছে ঘরের দেয়াল থেকে। চমকে উঠে তড়িঘড়ি করে ফোনটা খোঁজা শুরু করেছি, অমনি হাজারো আর্তনাদ-আতঙ্কিত চিৎকার-প্রলাপ-প্রার্থনা-ক্রন্দন দ্রবীভুত করা বিকেলের বাতাস জানালা দিয়ে এসে আমার ঘাড়ের লোম দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেলো। কার্পেটের উপরে আঙুলটার নড়াচড়া পুরোপুরি উপেক্ষা করা গিয়ে দাঁড়ালাম বারান্দায়। মূল রাস্তার ধারেই আমার বাসাটা হওয়ায় ঘটনাটা প্রত্যক্ষ করবার একটা সুযোগ ছিল আমার। চেয়ে দেখি রাস্তাজুড়ে সে এক এলাহী কারবার!
আতঙ্কিত শহরের বাসিন্দারা দিশেহারা হয়ে ছোটাছুটি করছিল, এক বৃদ্ধ ড্রেনের পাশে দাঁড়িয়ে থরথরিয়ে কাঁপছিল; ছুটে পালাবার শক্তিও নেই। ভাগ্যক্রমে একজন এসে সরিয়ে নিয়ে গেল তাকে। মোড়ে চায়ের দোকানের আলমকে দেখা গিয়েছিল খুবই দ্রুততার সাথে ঝাঁপ নামাতে। ও চেঁচাচ্ছিল,
"কেয়ামত আইসে! কেয়ামত!"
তবে আমি ইস্রাফিলের শিঙা শোনার জন্য কান পাতলেও কিছুই শুনতে পাই নি। বরং আরো স্পষ্ট হতে থাকা হৈ চৈ শুনে ভেবেছিলাম মারামারি কিংবা বোমাবাজি হচ্ছে আশেপাশে কোথাও। এভাবে পুরো ব্যাপারটাকে ভুল বুঝে ঘরের ভেতরে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম ওই বেয়াড়া বুড়ো আঙুলটার সাথে হিসেব মেটানোর জন্য; কিন্তু সহসাই রাস্তার পশ্চিমদিকে চোখ পড়লে একটা মিছিল এগিয়ে আসছে বলে মনে হল। সমাবেশটা আরো খানিক এগিয়ে এলে পরিস্কার দেখতে পেয়েছিলাম, সূর্যাস্তের বিপরীতে ছেঁড়াখোঁড়া অজস্র ছায়ার শরীর...
মৃতদের মিছিল!
মফস্বলের বাতাসে আরো একটা আতঙ্কিত চিৎকার যোগ হয়েছিল তারপর।
০২.
এক সপ্তাহ পরের কথা। পরিস্থিতি খানিক থিতিয়ে এসেছে, তবে উন্নতি হয়েছে কতটুকু তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। সেদিন সূর্যাস্তের পর থেকে আর সূর্যোদয় হয় নি। প্রথম প্রথম একেকটা লোডশেডিং ছিল দুঃস্বপ্নের মত। ঘটনার আকস্মিকতায় শহরের আতঙ্কিত বাসিন্দাদের অনেকে পালিয়েছিল সেদিন। যারা রয়ে গিয়েছিল তাদের মধ্যে সাহসী কিংবা অতিরিক্ত ভীতদের বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র হাতে সংগ্রামে নেমে পড়তে দেখা গিয়েছিল, কিন্তু এই নির্দিষ্ট অভিযানটা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
কারণ প্রথমত,
মৃতদের নতুন করে মেরে ফেলাটা সম্ভব নয়। কুপিয়ে ধড় থেকে হাত পা মাথা আলাদা করে ফেললেও ঠিকই জেগে ওঠে আবার।
দ্বিতীয়ত,
জেগে ওঠা মৃতরা মোটেও আগ্রহী ছিল না ত্রাস কায়েম করতে কিংবা আমাদের তাজা মাংস কামড়ে ছিঁড়ে খেতে। ওরা এসেছিল পরিচিতদের সাথে মোলাকাত করতে, নইলে জীবিতদের মাঝে কিছুদিন ঘুরে যেতে।
এটা শহরের লোকজনেরা বুঝতে পারায় খুব দ্রুত সবকিছু বদলে গেছে। চমকপ্রদ বিষয় ছিল যে মৃতরা প্রথম দিকে কপর্দকহীন হলেও নিঃস্ব ছিল না। ওদের সাথে রয়েছে অনেক পারলৌকিক মূল্যবান জিনিশ; যেমন সোনালী দুধ, পবিত্র মদ, কয়েক সহস্র কৌমার্য, স্বর্গীয় আপেল, উড়ন্ত ঘোড়ার খুর ইত্যাদি ইত্যাদি। এসবকিছু শহরের দোকানপাটগুলোতে বেচে ওরা জোগাড় করেছে প্রচলিত মুদ্রা, পারলৌকিক জিনিশপত্রের প্রতি জীবিত মানুষের প্রবল আগ্রহ অবশ্য বহু পুরনো জিনিশ । এরপর মৃতরা নেমে পড়েছে কেনাকাটায়। চব্বিশ ঘন্টাব্যাপী রাত দারুণ সুযোগ করে দিয়েছে শহরবাসীদের ব্যবসা করবার। এক হিসেবে শহরটা খানিক উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে বলাটা অত্যুক্তি হবে না।
০৩.
বুড়ো আঙুলটা এখনও আমার ঘরেই রয়েছে। ওটার আচরণ খানিক ইঁদুরের মতই মনে হচ্ছে আমার। তবে চোখকান কিছু না থাকায় প্রত্যঙ্গটার দিক চেনার ক্ষমতা একেবারেই নেই, বুদ্ধি বিবেচনাও নেই। খালি এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। আজ দুপুরে একটু হলেই চুলোর উপরে পড়তে যাচ্ছিল। অবস্থা বেগতিক দেখে ওটাকে আমি একটা কাঁচের বয়ামে ভরে রেখেছি।
ঘড়ির কাঁটার হিসেবে এখন বিকেল হবার কথা, তবে জানালার বাইরে আমি দেখছি যথারীতি রাত। দীর্ঘশ্বাস ফেললাম,
"সূর্যের আলো দেখতে ভীষণ ইচ্ছে করছে।", শহরের বাইরে পরিচিত যারা রয়েছে তাদের সাথে যোগাযোগ করে জেনেছি দীর্ঘ রাতটা নাকি একটা ওলটানো অন্ধকার গামলার মতো এই মফস্বলটার উপর চেয়ে বসেছে। বাইরের দুরবর্তী জনপদগুলো থেকেও নাকি স্পষ্ট দেখা যায় এই গম্বুজাকৃতি রাত। সেই রাতের দেয়াল পার করে যাওয়া সম্ভব নয়, একারণেই আমি অন্যান্য জীবিত শহরবাসীদের মত আটকা পড়ে গেছি এখানে।
আঙুলটার দিকে তাকালাম, খানিক নির্জীব হয়ে পড়েছে মনে হল। বয়াম বন্দী হয়ে থাকাটা পছন্দ হয় নি মনে হয়। কিছুই করার নাই, ওকে নিরাপদ রাখতে ওখানেই আটকে রাখাটা সমীচীন। তবে আমার এই আঙুলটার ব্যাপারে এতটা যত্নশীল হবার বিশেষ কারণ রয়েছে একটা। গত তিনদিন অনেক ভেবেচিন্তে আমি ঠিক করেছি ওকে ওর যথার্থ মালিকের কাছে পৌঁছে দেব, কিন্তু হাজার মৃতদের ভীড়ে নির্দিষ্ট কাউকে কিভাবে খোঁজা যায় সেটা আমার জানা নেই। সম্প্রতি পরপর দুটো প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় সন্দেহ হচ্ছে যে এই বুড়ো আঙুলের মালিক এখনও জীবিত, কিংবা তার সৎকার হয়েছে এ শহরের বাইরে কোথাও অথবা কোন কারণে সে জেগে ওঠে নি।
"আবার চেষ্টা করে দেখা যাক।", এটা ভেবে আমি প্যান্ট শার্ট চড়ালাম গায়ে। এমনিতেও বেকার বসে রয়েছি এই সময়টাতে। কাঁচের বয়ামটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়।
আজকে শহরটাকে একেবারে অন্যরকম দেখাচ্ছে। এখানকার পৌরসভা চেয়ারম্যান মৃতদের স্বাগতম জানিয়ে পুরো শহরে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করেছেন। ভীষণ উজ্জ্বল এখন চারপাশ! এতটা উজ্জ্বল এর আগে কবে দেখেছি মনে করতে পারলাম না। দোকানগুলোতে বেচাকেনা চলছে প্রচুর। মৃতদের মাঝে সবচেয়ে জনপ্রিয় পণ্যটা দেখলাম ব্যান্ডেজ। যারা আস্ত শরীর নিয়ে জেগে উঠতে পারেনি তাদের হাড়-মাংস-চামড়া সবকিছু একসাথে রাখতে ব্যান্ডেজ পেঁচিয়ে রাখা ছাড়া উপায় নেই। কোনমতে হাড়গোড় একসাথে থাকা একটা লাশকে দেখলাম ডজন'কয়েক ব্যান্ডেজ কিনতে কিনতে শাপাতে কোন অদৃশ্য শেয়ালকে।
সাত বছরের শিশুর মত কৌতুহলী চোখে যারপাশ দেখছি,
একটা জটলা আর গোলমাল আমার মনোযোগ আকর্ষণ করল। একটা ব্যান্ডেজ জড়ানো মৃতদেহ, দেখে মনে হয় কোন প্রবীণা হবেন; সক্রোধে চেঁচাচ্ছেন একজন ভীত তরুণীকে উদ্দেশ্য করে। কাছে এগিয়ে গেলে ঘটনা টের পেলাম। তরুণী বেশ আধুনিকা, বেশভূষায় সেটা ফুটে উঠেছে চমৎকারভাবেই। কিন্তু আপত্তি সেই মৃত মহিলার। তরুণীর ওড়না পরাটা উনার পছন্দ হয় নি।
প্রবল খিস্তিখেউড়ের মধ্যে কয়েকটা শব্দ টের পেলাম "বয়স্ক মেয়েছেলে...", "লজ্জা করে না?", এছাড়াও "কোন পরিবারে মেয়ে এমন জামাকাপড় পরে!" ইত্যাদি। সংকুচিত তরুণী দ্রুত পোশাকটাকে শালীন করে নিল। ওড়নার আড়ালে ঢেকে যাওয়া সেই উদ্ধতা দেখতে না পারার আফসোসের গন্ধ স্পষ্ট টের পেলাম ভীড়ে উপস্থিত পুরুষদের মাঝে। এই ব্যাপারটাতে মৃত বা জীবিত সকল পুরুষের একই আচরণ টের পেলাম।
হাজার হলেও, জিহবার চেয়ে আমাদের চোখদুটো অনেক বেশি অভূতিপ্রবণ আর শক্তিশালী!
০৪.
হাঁটতে হাঁটতে আমি এবার গার্লস স্কুলের সামনে এসে পড়েছি। হঠাৎ করে আমার হাতে ধরা বয়ামের ভেতর আঙুলটা ভীষণ উৎসুক হয়ে উঠল, পারলে ঢাকনা খুলে বেরিয়ে যায় এমন। আমি কি মনে করে ঢাকনা খুলে নামিয়ে দিলাম সেটাকে মাটিতে।
"যা, কই যাবি যা।" মাটি লেপ্টে লেপ্টে আঙুলটা রওনা দিল স্কুলের সামনে শহীদ মিনারের দিকে। অভিভূত আমি ছুটলাম ওর পেছন পেছন। মিনারের বেদীতে দেখলাম বিষণ্ণচোখের একজন বসে আছে, মৃত। বুড়ো আঙুলটা এবার লাফানো শুরু করল আনন্দিত কুকুরছানার মতো। লোকটা মুচকি হেসে হাতে তুলে নিল ওটাকে। আমার দিকে চেয়ে বলল,
"আমার আঙুলটাকে কি আপনিই খুঁজে পেয়েছেন?"
"জ্বি।"
"কি বলে যে ধন্যবাদ দেব আপনাকে...!"
"না না, ওসব কোন ব্যাপার না!" আমি ভদ্রতার খাতিরে বলি। বিদায় নিতাম, কি মনে করে বললাম,
"আচ্ছা, আপনার এই বুড়ো আঙুলটা কেন আমার ঘরের দেয়ালে আটকে ছিল?"
প্রশ্ন শুনে মাথা চুলকালো সেই লোক।
"ওহ, ব্যাপারটা কিভাবে বোঝাই? ......আমি একজন কন্সট্রাকশন কন্ট্রাকটর ছিলাম।"
"মানে?"
"একবার এক বিল্ডিং এর কাজ দেখবার সময় দুর্ঘটনায় এই আঙুলটা হারাই। পরে খুঁজে পাওয়া যায় নি। এখন মনে হচ্ছে ওটা ঢালাইয়ের মসলায় গিয়ে পড়েছিল।"
"ওহ্!"
"আমি নিজেই যেতাম আঙুলটার খোঁজে, সময় করে উঠতে পারি নাই।"
ব্যাপারটা অবশেষে পরিস্কার হল, ভেবে আমি স্বস্তিবোধ করি। কিন্তু আরেকটা জিনিশ আমাকে ভাবাচ্ছে...
"সমস্যা না থাকলে আরেকটা প্রশ্ন করি?"
"করুন,এমনিতেও বিশেষ কোন ব্যস্ততা নাই।"
"আপনি এখানে একা বসে আছে কেন? অন্যদের মত শহরটা ঘুরে দেখতে পারেন। ইচ্ছামত কেনাকাটা..."
"নাহ, ঘুরে দেখার ইচ্ছা নাই।" হাত নেড়ে থামিয়ে দিল ভদ্রলোক।
"টাকাপয়সার সমস্যা?", কথাটা বলামাত্রই পস্তালাম আমি। কিন্তু লোকটা আমাকে অবাক করে দিয়ে হেসে বলল,
"না না, সেরকম কিছু না। আছে আমার কাছে কিছু জিনিশ।" বলে পকেটে হাত দিল সে, বের করে আনলো পেঁজা শিমুল তুলোর মত কিছু জিনিশ, "এই যে, কিছু দ্বিতীয় আসমানের মেঘ! বিক্রি করা যাবে ভাল দামেই।"
"তাহলে?"
"এই চত্বরটা আমার খুব প্রিয় জায়গা, আমি আসলে এখান থেকেই জেগে উঠেছি।"
শুনে আমি উৎসাহী হয়ে উঠি, "আপনি কি ভাষাসৈনিক ছিলেন নাকি?"
প্রশ্ন শুনে লোকটা হেসে ফেলল। আমি লজ্জিত হলাম সাথে সাথেই; কারণ আমার বাসা এবং এই শহীদ মিনার চত্বর দুটোর বয়সই খুব কম। ভদ্রলোকের ভাষাসৈনিক হবার সম্ভাবনাটাও তাই খুব ক্ষীণ।
"যখন বেঁচে ছিলাম..." বলা শুরু করল লোকটা। "সারা জীবনের জমানো টাকা দিয়ে একটা জায়গা কিনেছিলাম; অবশ্য দলিল নিয়ে কিছু জটিলতা ছিল। কিন্তু জায়গাটা ছিল শহরের সেরা জায়গাগুলোর মধ্যে একটা।" আমি চুপচাপ শুনে যাচ্ছি।
"কিন্তু ঝামেলা হল এই আসনের সাংসদের সাথে। শালার ঐ জায়গাটাই দরকার ছিল। জায়গা নিয়ে মালিকানার দাবী তোলা অন্য একজনের সাথে মামলায় পড়ে গেলাম তারপর। সাংসদের ব্যাকআপ ছিল তার, মামলা জিতেও গেল, আর আমি আমার সারাজীবনের সঞ্চয় হারালাম।"
আমি কথাগুলো শুনে সত্যিকার দুঃখবোধ করতে থাকি। যদিও এই লোকের শহীদ মিনারে বসে থাকা আর জমি হারানোর গল্পের হিসেব মেলাতে পারছিলাম না; তাও জিজ্ঞেস করলাম,
"জায়গাটা কোথায় ছিল?"
"খুব কাছে, কিংবা বলতে পারেন এখানেই।" বলল লোকটা।
"এখানেই! তা ঐ এম.পির কি দরকার ছিল আপনার সেই জায়গার?"
লোকটা খানিক থেমে উত্তর দিল,
"শহীদ মিনারটা বানানোর প্ল্যান ছিল তার।"
০৫.
বাসায় ফিরছি তখন, সিড়ি ভেঙ্গে ওঠার সময় দ্রুতপায়ে পাশ দিয়ে নেমে গেল মৃত একজন। নীল তাঁতের শাড়ি পরা কেউ, ব্যান্ডেজ নয়! খানিক চেনা চেনা লাগলো। ঘাড় ঘুরিয়ে এক পলকের জন্যে দেখতে পেলাম বাঁ হাতে আলগোছে কিছু একটা ধরে রেখেছে। দেয়ালের ওপাশে হারিয়ে গেল পরপরই...
"নাহ্, সম্ভব না!" ঐ মৃত ব্যক্তির হাতে ধরা জিনিশটার কথা মনে করে বললাম আপনমনেই।
দরজায় চাবি ঘুরাচ্ছি, অস্ফুট শব্দ মনোযোগ কাড়ল। পাশের ফ্ল্যাটের মনির ভাই দাঁড়িয়ে আছে। প্রবল বিস্ময়ে দেখি ওনার বুকের বাঁ পাশে একটা গর্ত! তাজা রক্ত গড়াচ্ছে!
"মনির ভাই!......কি...কি হয়েছে আপনার......?" আতঙ্কিত গলায় কোনমতে বলি আমি।
"এইতো তোমার রিমি ভাবি এসেছিল দেখা করতে!" মনির ভাইয়ের হাসিমুখ আমাকে আরো খানিক ভীত করে তুলল। মিনিট দুয়েক আগের ঘটনাটা স্মরণ করা মাত্রই শিরদাঁড়া দিয়ে নেমে গেল একটা শীতল স্রোত।
"তাহলে, নীল শাড়ি পরা উনিই......" কথা আটকে গেল আমার।
"হ্যা, সেই।"
কয়েক মুহুর্ত নিশ্চল নিশ্চুপ থাকি আমরা।
"কখন এসেছিল ভাবি?" নীরবতা ভেঙ্গে প্রশ্ন করি।
"অল্প কিছুক্ষণ আগেই।" বলে বুকের গর্তটার দিকে সস্নেহে চেয়ে নিলেন একবার। আমার আতঙ্কিত দৃষ্টির দিকে একটা অভয়ের হাসি ছুঁড়ে দিয়ে বললেন,
"একটা ছোট্ট বোঝাপড়া বাকি ছিল আমাদের।"
ঠিক তখনই কবুতরের খোপটার প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে মনে হল,
এই দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের কোন নিভৃত প্রান্তে শীতল একটা মৃত্যু দেখাই সম্ভবত বাকি ছিল আমার।
(শেষ)
riz
-06 October 2010

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


