জানালার রেলিং এ বসে কাকটা প্রতিনিয়ত ডেকে যাচ্ছে। ভাদ্র মাসের শেষ ভাগ। প্রচণ্ড গরম। তবুও হিমু কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। সেটা কাক ডাকার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার একটা কৌশল। কিন্তু সেটা কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে না, বরং গরম তা আরও বারিয়ে দিচ্ছে। হিমু আর ঘুমিয়ে থাকতে পারল না। সে বিছানা থেকে উঠে বসেছে। তখনই কাকটা চিৎকার বন্ধ করে এক দৃষ্টিতে হিমুর দিকে তাকিয়ে আছে। ভাবটা এমন যে হিমুর ঘুম ভাঙানোর মতো মহান কাজটি করতে পেরে সে আনন্দিত।
এখন কয়টা বাজে তা বোঝা যাচ্ছে না। কারন হিমুর কাছে ঘড়ি নেই। তবে এখনও সাড়ে আঁটটা বাজে নি। কারন প্রতিদিন ঠিক সাড়ে আঁটটার সময় গনি মিয়া হিমুর জন্য নাস্তা নিয়ে আসে। হিমুর খাবার আসে বিসমিল্লাহ্ খাবার ঘর থেকে। হোটেল মালিক আক্কাস আলি ঘোষণা করেছে যতদিন ইচ্ছা হিমু ভাই তার হোটেলে বিনা পয়সায় খাবে। কারন হিমুর মন খারাপ। প্রায় দুই মাস হতে চলল হিমু তার ঘর থেকেই বের হচ্ছে না। আক্কাস আলির ভাষায় খুব ই আচানক ঘটনা। এবং এটা নিয়ে সে বিশেষ চিন্তিত।
হিমুর দরজায় করা নাড়ার শব্দ হচ্ছে। সাধারনত হিমুর রুমের দরজা খোলাই থাকে, কিন্তু গত দুই মাস হিমু ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখছে। দরজার শব্দে কাকটা উড়ে গেল। তবে বেশি দূরে না, পাশেই আরেকটা রেলিঙে বসে আগের মতই হিমুর দিকে তাকিয়ে রইল। হিমু দরজা খুলে দিল। গনি মিয়া এসেছে। সাথে পরাটা, ডিম পোঁচ, কলিজা ভুনা আর ভাজি আর কোকের বতলে করে চা।
টেবিলে খাবার গুলো রাখতে রাখতে বলল, বুঝলেন হিমু ভাই আজকের নাস্তাটা ইস্পিসাল হইসে। কইলজা ভুনা খাইলে বুঝবেন এক্কেবারে বেহেস্তের অমৃত। এমন খানা না খাইলে জীবনডাই বৃথা। আফনে হাত মুখ ধুইয়া আহেন আমি খানা রেডি করি। হিমু উঠে বাথরুমের দিকে গেল। যাবার আগে গনি মিয়াকে বলল আজ তুই ও আমার সাথে খাবি। বেহেস্তের খানা একা খাইতে মজা নাই। সকালের এই সময়টা বাথরুমে ভিড় থাকে, সিরিয়ালে থাকতে হয়। কিন্তু আজকে খালি পাওয়া গেল। বারান্দার এক পাসে মেস ম্যানেজার মফিজ সাহেব দাঁড়ানো ছিল। হিমু কে দেখেই দৌড়ে আসলো।
আরে হিমু ভাই যে, আজকাল তো আপনার দেখাই পাওয়া যাই না। সারাদিন রুমের ভিতর বইসা থাকেন, মন দিল খারাপ মনে হয়।
হিমুঃ না সে রকম কিছু না। বই টই পরি, বেহেস্তি খানা খাই সময় কেটে যায়।
ভাই যে কি বলেন। এখন আর আগের মতো কথা বলেন না, ঘরের বাইর হন না, আবার সেইদিন রুপা আপা ফোন করল তার সাথেও কথা বললেন না। ভাই কি কোন সমস্যাই আছেন? সমস্যায় থাকলে এই অধমরে নির্দ্বিধায় বলতে পারেন, আপনার জন্য কিছু করতে পারলে জীবনটা ধন্য হবে।
হিমুঃ না ভাই, ধন্যবাদ। সমস্যা থাকলে অবশ্যই বলবো।
হিমু রুমে এসে নাস্তা খেতে বসল, সাথে গনি মিয়া। কলিজা ভুনা টা সত্যিই অসাধারণ হয়েছে। অনেকদিন এমন খাবার সে খায় না। খেতে খেতে হিমু বলল গনি মিয়া, তোর দিনকাল কামন যায়?
গনি মিয়াঃ যায় আর কি। জানেন হিমু ভাই কাইলকা রাত্রে আকাশে বিরাট এক চান উঠছিল। তার কি চান্নি! একদম দিনের আলোর মতো ফকফকা। তয় বেশিক্ষণ দেখতে পারি নাই। ঘুমাইয়া গেছি। বিরাট আফসোস। এমন চান্নি আবার কবে আইব কে জানে।
হিমুর এতে বেশি ভাবান্তর হল না, সে আবৃতি করলো
“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্দ্যময়
পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি”
গনি মিয়াঃ অতি সত্য কথা বলছেন হিমু ভাই। দুনিয়া চলে পেটের দায়ে।
গনি মিয়া চলে যাবার সময় হিমু বলে দিল যে আজ আর খাবার হবে না। হিমু দরজা বন্ধ করে আবার শুয়ে পরল, এবং কিচ্ছুক্ষণ পরে সে আবার ঘুমিয়ে পরল। তার ঘুম ভাঙল ঠিক সন্ধার সময়। জানালা দিয়ে বিশাল একটা চাঁদ দেখা যাচ্ছে। হটাত করে হিমুর মনে হল কেউ তাকে ডাকছে, আজ তাকে বের হতেই হবে।
অনেকদিনপর রাস্তায় বের হয়ে সে চারপাশটা দেখে নিল। সব আগের মতই আছে। প্রথমে তার হাঁটতে একটু অসস্থি লাগছিল, তা এখন কেটে গাছে। প্রথমে সে গেল রুপাদের বাসায়। কলিং বেল দিতেই রুপা দরজা খুলে দিল।
হিমু!
কেমন আছ রুপা?
আমি ভালো আছি, কিন্তু তুমি?
আসলাম তোমাকে দেখতে। এক কাপ চা হবে?
তুমি বস, আমি নিয়ে আসছি।
চা খাওয়া শেষ করে হিমু রুপাদের বাসার থেকে বের হয়ে গেল।
রুপাঃ কোথায় যাচ্ছ?
হিমুঃ জানি না।
রুপাঃ ও আচ্ছা। যাও।
রাস্তায় বের হয়েই হিমু তার গন্তব্য ঠিক করে ফেলল। সে যাবে গাজীপুরের পিরুজালি গ্রামে। হিমু হেটে চলছে, তার মাথার উপর বড় একটা চাঁদ। চাদের আলোতে অন্যরকম একটা পরিবেশ।
হিমু দাড়িয়ে আছে নুহাসপল্লী নামক একটা জায়গায়। সেখানে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছে তার অতি আপনজন। কবরের সামনে দাঁড়ানো মাত্র হিমু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। হাঁটু গেড়ে বসে অঝোর ধারায় কেদে চলল। হটাত তার কাধের উপর হাতের স্পর্শ অনুভব করলো। ঠাণ্ডা গলায় কেউ ডাকদিল-
হিমালয়!
রুপা এসেছে। হিমুর পিছু পিছু সেও আজকে হেঁটেছে। হিমালয় বলে সে তাকে কোন দিন ডাক দেয়নি। তাই হিমু কিছুটা চমকিত হল।
রুপাঃ হিমু ওঠ। তুমি কাদছ কেন? হিমুদের কখনও ভেঙ্গে পরতে হয় না।
হিমুঃ রুপা আজ আমি বড় অসহায়।
রুপাঃ হিমু কখনও অসহায় হয় না। তোমাকে আবার স্বাভাবিক হতে হবে। তোমাকে পারতে হবে হিমু। তোমার মাঝেই বেচে থাকবে তোমার আপনজন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



