প্রতিবেদক মাত্র ছয় মাস সৌদি আরবে ছিলেন বলে রিপোর্টটিতে উল্লেখ করলেও এ কথাটি উল্লেখ করেননি যে, তিনি কেবলমাত্র হজ্জ্বের সময় সৌদিআরব এসেছিলেন এবং তার গন্ডী ছিল মক্কা,মদিনা,তায়েফ এবং জেদ্দা। সৌদিআরব সর্ম্পকে যারা জানেন তারা সকলেই জানেন যে রিয়াদ সৌদিআরবের রাজধানী এবং দাম্মাম,আলখোবার সৌদিআরবের অন্যতম প্রধান শহর যেখানে ল ল লোক বাস করে, এছাড়াও ছোট বড় আরো প্রায় ১০টির মতো শহর রয়েছে যেখানে বাংলাদেশীরা বাস করে। মক্কার কিছু এলাকা এবং জেদ্দার বালাদ (যেখান থেকে মক্কা বাস,টেক্সি পাওয়া যায়) এবং আর দুএকটি এলাকায় গিয়েই কি করে সৌদিআরবে বাস করা প্রবাসীদের সম্পর্কে বিশাল একটি প্রতিবেদন লিখলেন তা অবাক করার মতো ব্যপার। প্রবাসীদের দুঃখ কস্টে ব্যথিত হতে না শুধুমাত্র পৃষ্টা পূর্ণ করার তাগিদে তিনি প্রতিবেদনটি লিখলেন তা তিনি নিজেই বলতে পারবেন।
প্রতিবেদক তার প্রতিবেদনে লিখেছেন যে, দালালদের খপ্পরে বাংলাদেশীরা সৌদিআরব এসে দেখেন যে, থাকার জায়গা আছে, খাবার নেই, বেতন মাত্র ৩০০ সৌদি রিয়াল। তিনি লিখেছেন যে, এসব শ্রমিকরা দাল্লা নামক একটি কোম্পানীতে চাকরি করেন এবং আরেকটি জায়গায় লিখেছেন যে, সৌদিআরবে আট/দশ লক্ষ বাংলাদেশী আছেন তাদের বড় অংশ দাল্লায় বা বালাদিয়ায় কাজ করেন এবং এর বাইরে মক্কা মদীনায় কিছু ব্যবসায়ী আছেন। এই কথাগুলোর মাধ্যমে প্রতিবেদক এ তথ্যটি কি সারা বিশ্বসহ বাংলাদেশে প্রচার করলেন না যে, সৌদিআরবে যারা বাস করে তাদের মধ্যে বেশিরভাগ ৩০০ রিয়াল এর রাস্তা পরিস্কার করার শ্রমিক এবং বাকীরা কিছু ব্যবসায়ী, কোন ধরনের হাই প্রফেসনাল জবে কোন বাংলাদেশী নেই?
একটি জাতীয় দৈনিকে এরকম একটি তথ্য প্রকাশের পর জেদ্দা কিং আব্দুল ইউনিভার্সিটিতে অধ্যপনায় জড়িত বাংলাদেশী প্রবাসীদের অভিব্যক্তি কি হবে? কিং ফাহাদ হাসপাতালে যে কয়জন বাংলাদেশী ডাক্তার আছেন তাদের প্রতিক্রিয়া কি হবে? সৌদিআরবের অন্যতম বড় গ্রুপ নেসমাগ্রুপ, জেদ্দা হিলটন, ্ওয়েস্টিন, ম্যারিয়ট, কিং আব্দুল আজিজ এয়ারপোর্ট , সৌদি শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সাভোলা গ্রুপ, আল সায়া ইন্টারন্যাল কোম্পানী, বিন লাদেন, পাইওনিয়র এবং আরো অনেক বড় কোম্পানীর শীর্ষস্থানীয় পদে কর্মরত প্রবাসীরা বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসীদের কাছে দাল্লার ৩০০ রিয়াল বেতনের কর্মচারী হিসাবে পরিগনিত হবেননা তার নিশ্চয়তা কি প্রতিবেদক দিতে পারবেন? বাংলাদেশে সর্বোচ্চ রেমিটেন্স প্রেরণকারী সৌদিপ্রবাসীদের এভাবে হেয় করার মতো রিপোর্ট কি করে একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হলো তা সত্যিই অবাক ব্যপার।
প্রতিবেদক লিখেছেন যে, হাতে গোনা কয়েকটি উচ্চমানের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রবাসীরা কেবলমাত্র পরিবার নিয়ে থাকার অনুমতি পান যা সত্যের অপলাপ। সৌদিআরবের জেদ্দায় দুটি বাংলাদেশী ইন্টারন্যাশনাল স্কুল রয়েছে সেখানে দুই হাজার এর বেশী বাংলাদেশী ছেলে-মেয়ে পড়াশুনা করে। এদের অভিবাবক সবাই যে ইসলামী ব্যাংক, ওআইসি, আর্ন্তজাতিক সংস্থা এবং কনসুলেট এর কর্মকর্তা তা নয়।বাস্তবতা এই যে, সৌদি আরবে কেবল মাত্র লেবার ওয়ার্কপারমিটধারী প্রবাসীগন পরিবার আনার অনুমতি সাধারণত পাননা। কিন্তু স্পন্সরের সাথে আলোচনা করে ওয়ার্কপারমিট এ প্রফেসন পরিবর্তন করতে পারলে তারাও পরিবার নিয়ে বসবাস করতে পারেন। এমনকি ইলেকট্রিসিয়ান এবং সেলসম্যান হলেও প্রবাসীরা তাদের পরিবার আনার অনুমতি পেয়ে থাকেন।
সৌদিআরবে বিদেশীদের জন্য পড়াশুনার জন্য ভালো কোন ব্যবস্থা নেই বলে যে মন্তব্য প্রতিবেদক করেছেন তা সত্য নয়। সৌদিআরবে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কয়েকটি ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ রয়েছে যাতে যোগ্যতার মাপকাঠিতে সুযোগ প্ওায়া যে কেউ অধ্যয়ন করতে পারেন। এসব আর্ন্তজাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগই ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড এবং ক্যামব্রীজ এর অনুমোদনপ্রাপ্ত এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের তত্বাবধানে এসব স্কুলের পরীক্ষাসমূহ অনুষ্ঠিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানগুলিতে অধ্যয়ন করে বেশ কিছু বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রী স্কলারশীপসহ আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডে পড়াশুনা করছে। সৌদিআরবে কয়েকটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কার্যক্রম চালু করেছে এবং এরকম একটি মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশী ছাত্রীরা পড়াশুনা করছে। এসকল বিষয়গুলিকে পরোয়া না করে প্রতিবেদক সৌদিআরবের শিক্ষা ব্যবস্থা নিযে যে রকম মন্তব্য করলেন তা হতাশাজনক।
সৌদিআরবের ভাষার প্রতি দতা প্রকাশ করতে গিয়ে প্রতিবেদক এক জায়গায় লিখলেন যে, কফিল হচ্ছে সেসব সৌদি যারা সৌদিআরবে লোক আনা নেয়ার কাজ করেন। এবং কফিলরা প্রচুর টাকা পয়সার মালিক। বাস্তবতা হলো. সৌদিআরবে যে কোন বিদেশীর জন্যই একজন করে স্পন্সর থাকে এবং এই স্পন্সরকেই আরবীতে কফিল বলে। জেদ্দার বালাদে একটি রেল স্টেষনকে ঘিড়ে সৌদি আরবে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীরা সময় পেলেই আড্ডা দেন বলে যে মন্তব্য প্রতিবেদক করলেন তা হাস্যকর। জেদ্দা সৌদিআরবের একটি শহর, বিশাল এই শহরের একপ্রান্তে যারা বাস করেন অন্যপ্রান্তে গিয়ে আড্ডা দেয়ার প্রয়োজনীতা বোধ করেননা কারন এই শহরের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলাদেশীদের বিভিন্ন ব্যবসাকেন্দ্র এবং বাংলাদেশী মার্কেট রয়েছে যা কিনা প্রবাসীদের আড্ডার কেন্দ্রস্থল হিসাবে কাজ করে। জেদ্দার বালাদ সবচেয়ে জনপ্রিয় বানিজ্যিক এলাকা, ঢাকার গুলিস্তানের মতো হলেও এখানে আড্ডা দেয়ার জন্য যেখানে জেদ্দার লোকজনই তেমন আসেননা সেখানে পুরো সৌদিআরবের লোকজন আসে বলে প্রতিবেদক যে মন্তব্য করেছেন তা কি তথ্যের ভিত্তিতে করলেন তা তিনি বলতে পারবেন।
প্রতিবেদক লিখেছেন যে সৌদিআরবে ৮ থেকে ১০ ল বাংলাদেশী শ্রমিক আছেন যা একটি সম্পুর্ণ ভুল তথ্য। সৌদি আরবের জেদ্দা,মক্কা এবং তায়েফ অধ্যুষিত পশ্চিমাঞ্চলেই রয়েছে প্রায় দশ ল প্রবাসী এবং পূর্বাঞ্চলে (রিয়াদ,দাম্মাম) রয়েছে কয়েক ল বাংলাদেশী। এদের বড় অংশ যে দাল্লায় কাজ করে তিনি যে মন্তব্য করেছেন তা সত্যিই দুঃখজনক।
প্রতিবেদক তার প্রতিবেদনে সৌদিপ্রবাসীদের নিয়ে কেবল নেগেটিভ প্রচারনা চালিয়েছেন। বাংলাদেশের বাইরে বসবাসরত একটি বিশাল কমিউনিটির সম্পর্কে তেমন কোন কিছু না জেনেই যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন তা অবিশ্বাস্য। প্রতিবেদক সৌদিআরবে বসবাসরত বাংলাদেশীদের কোন পজিটিভ দিক নিয়ে বিন্দুমাত্র আলোকপাত করেননি। তিনি একথা তার প্রতিবেদনে একবারও বলেননি যে, মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয় সৌদিআরবে।তিনি একথা উল্লেখ করতে ভুলে গেছেন যে, আইনি বিধি নিষেধ থাকা সত্বেও সৌদিআরবের বিভিন্ন শহরে প্রতি সপ্তাহেই বাংলাদেশী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এবং প্রবাসী বাংলাদেশীগন টিকেট কিনে সেসব অনুষ্ঠানে শরীক হয় এই মরুর বুকে বাংলাদেশী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিকে বাচিঁয়ে রাখার তাগিদে। শুধুমাত্র জেদ্দাতেই রয়েছে ৭টি শিল্পগোষ্ঠি যাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে নিজস্ব গায়কি সরঞ্জাম এবং লোকবল। জেদ্দাতে রয়েছে কবিদের সংগঠন, রয়েছে রোদ্দুর,অভিক এবং রিয়াদে রাইটার্স এর মতো বেশ কয়েকটি মানসম্পন্ন সাহিত্য পত্রিকা। জেদ্দা থেকে প্রকাশিত ্ওয়েব ম্যাগাজিন প্রবাসীডটকম, অভিকডটনেট,মুন্শীগঞ্চডটকম, রিয়াদ থেকে প্রকাশিত মরুপলাশ বিশ্বের সেরা বাংলা ্ওয়েবসাইটগুলোর কাতারে স্থান করে নিয়েছে। এসব সৃষ্টিশীল কাজগুলো কোন রকম উল্লেখ নেই উক্ত প্রতিবেদনে।
এমনকি জেদ্দায়,রিয়াদে বাংলাদেশী ইঞ্জিনিয়ারস এসোসিয়েশন এবং ডক্টরস এসোসিয়েশন রয়েছে যা কিনা উপমহাদেশের অন্য কোন দেশের নেই। জেদ্দা এবং রিয়াদে প্রবাসীদের সংগঠিত করতে রয়েছে অসংখ্য আঞ্চলিক সমিতি। এসব আঞ্চলিক সমিতিগুলো বিভিন্ন সেবামূলক কর্মকান্ডের পাশাপাশি বাতসরিক অনুষ্ঠান, মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের বৃত্তি প্রদান এবং বাংলাদেশের যে কোন দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। জেদ্দায় দুটি বাংলাদেশী ইন্টারন্যাশনাল স্কুল তন্মধ্যে একটি বাংলা এবং অন্যটি ইংরেজী মাধ্যম। বাংলা সেকশন এর ছাত্র-ছাত্রীরা বাংলাদেশ শিক্ষা বোর্ডের তত্বাবধানে এস.এস.সি এবং এইস.এস.সি পরীক্ষায় অংশগ্রহন করে থাকে। এই স্কুল গত বছর এস.এস.সি পরীক্ষায় পাশের হার বিবেচনায় বাংলাদেশে টপ টেনে স্থান লাভ করেছিল। পান্তরে ইংলিশ সেকশনের কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী ব্রিটিশ কাউন্সিলের আয়োজিত ও লেভেল এবং এ লেভেল পরীক্ষায় পুরো সৌদিআরবের মধ্যে কয়েকটি বিষয়ে শীর্ষস্থান লাভ করেছে। এসকল মেধাবী নতুন প্রজন্ম, এদের অভিবাবক এবং এদের নিয়ে গড়া একটি কমিউনিটি যারা সৌদি আরবে আছে সম্মানের সাথে এবং দেশে প্রচুর রেমিটেন্স পাঠাচ্ছে তাদের বিষয়ে প্রতিবেদক কেন কোন কিছু লিখেননি তারা জবাব প্রতিবেদককেই দিতে হবে।
প্রতিবেদক কিছু প্রবাসীদের দুঃখ কস্ট নিয়ে লিখেছেন তার জন্য তিনি অবশ্যই ধন্যবাদ পাবেন। কিন্তু কিছু লোককে রেফারেন্স করে তিনি সৌদি আরবে বসবাসরত ল ল প্রবাসীদের এক কাতারে ফেলে তাদের তাদের বড় অংশ বালাদিয়া কোম্পানীর কর্মচারী অভিহিত করে তিনি সৌদি প্রবাসীদের যে অপমান করলেন কোন কারণে তা জানার অধিকার অবশ্যই আমাদের আছে। ভবিষ্যতে কোন বাংলাদেশী পত্রিকায় এ ধরনের সংবাদ পরিবেশনের পূর্বে কর্তৃপ সচেতনভাবে তথ্য সংগ্রহ করবে এটা সৌদিআরবে বসবাসরত প্রবাসীদের পক্ষ থেকে আমার বিনীত আবেদন।
মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলাম শাহীন
প্রকাশক এবং সম্পাদক
প্রবাসীডটকম
[email protected]
http://www.probasi.com
+966 508677292

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

