আধো ঘুমে ব্যালকনিতে দাড়াতেই পায়ে জলের স্পর্শ, আকাশের আলোটাও যেন খানিকটা আঁধারের দখলে, দেখেই বোঝা যায় রাতে প্রচন্ড বৃষ্টি হয়েছে।
আজ সারাটাদিন মেঘ আর বৃষ্টিদের আকাশ দখলে। ব্যস্ততাময় জীবনের ক্লান্তি ছাপিয়ে যখন নীড়ে ফেরার প্রস্তুতি তখনও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি ছিল। বাসস্ট্যান্ডে পৌছতে পৌছতে ততক্ষনে শুরু হয়ে গিয়েছে সজোরে। ছাতাটা মেলে দাড়িয়ে যেখানে বাসের জন্য অপেক্ষা ঠিক সেখানেই সামনে দাড়িয়ে ছিল একজন। বয়সের ছাপ আছে -মধ্যবয়স্ক, চোখ-মুখের পোড়া চামড়া কুচকে গিয়েছে, ক্লান্তির সঙ্গে অবসন্নতাও যেন দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুকে গ্রাস করতে চাইছে, অপলক চোখের তাকিয়ে থাকার ভাষায় যেন খুজে পাওয়া যায় কোন এক হারিয়ে যাওয়া অতীত - বিষন্নতা।
আগেও বেশ কয়েকবারই দেখেছি তাকে ঠিক এখানেই। বৃষ্টিটা যখন আরো সজোরে তখনও লাইনে দাড়িয়ে বাসের অপেক্ষারত যাত্রীরা কাক ভেজা ভিজছে। বৃষ্টির জলের সাথে যে আমার ছাতার চুইয়ে পড়া জলও মধ্যবয়স্ক মানুষটিকে ভিজিয়ে দিচ্ছে, খেয়াল হল অনেক পরে।
“আমি বোধহয় নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে আপনাকে ভিজিয়ে ফেলছি - যদি কিছু মনে না করেন তাহলে এ ছাতাটা দুজনে শেয়ার করা যেতে পারে”
- না বাবা - আমি তো এমনিতেই জলে ভিজে গিয়েছি,ওটা কিছু না !
এক অপরিতৃপ্তি বোধ থেকেই দীর্ঘশ্বাসে যেন কথাগুলো বেরিয়ে আসল। বাসে ঠিক মুখোমুখি দুজনে। নিজ থেকেই পরিচয় দিলাম, যেখানে কাজ করছি যেখানে থাকি ইত্যাদি। তিনি তেমন কিছু বলতে না চাইলেও নিজ থেকে জেনে নিলাম তার পরিচয়। রিটায়ার্ড সরকারী কর্মকর্তা, সৎ, নিষ্ঠাবান থাকায় তেমন কিছু করতে পারেননি, দু’ ছেলে আর এক মেয়ের সংসার। সব বাবাদের মতই সন্তানদের বড় করার প্রবল ইচ্ছে ছিল, যা কোন অমূলক ছিলনা। কিন্তু নিয়তি কি কোন শৃঙ্খল মানে ? মানে না বলেই হয়ত লোকটির বড় সন্তানকে বিদেশে পাঠানো হয় সমস্ত সঞ্চয়ী অর্থে, প্রথমে যোগাযোগ রাখলেও পরে কোন বিদেশীকে বিয়ে করে সেখানেই থেকে যায়। ছোট সন্তানটিকে দেশের বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো শেষে ভাল চাকুরী দেয়া হয়। নিজের সংসার নিয়েই সে থাকে। মেয়েটি তার পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করে আলাদা হয়ে গিয়েছে।
“বড় সন্তানের কথা বাদই দিলাম, সে কি আর দেশে ফিরবে আর দেশে ফিরলেই বা কি আমাদের ভার কি সে আর নিতে চাইবে ? , ছোটটার সংসারে ছিলাম বেশ কিছুদিন, আমরা থাকলে তার স্ত্রীর সমস্যা হয়, পারিবারিক কোন্দল প্রায় লেগেই থাকত, যখন বুঝতে পারলাম আমরাই তার কারণ, চলে এলাম। মেয়েটা বড় আদরের ছিল, কষ্ট হয়েছে তবুও কোনদিন ওকে অভাববোধটা বুঝতে দেইনি, উচ্চাভিলাষী ছিল তাই বড় ঘরে যাবার সপ্নে এক ছেলেকে বিয়ে করে, সুখ পেয়েছে কিনা যানিনা, শুনেছি ওর স্বামী খুব নির্যাতন করত, সেই আর পরে কোন যোগাযোগ রাখেনি”
কথাগুলো যখন শেষ হল, তার চোখের দিকে তাকাতে পারিনি; সামনের স্টপেজেই তিনি নেমে যাবেন, ভিজিটিং কার্ডটি দিয়ে যেকোন সময় যোগাযোগ করতে চাইলে করার অনুরোধ করলাম।
তারপর অনেকদিন পর .............................................................. সেই মধ্যবয়স্ক লোকটির ফোন ............
“আজ তুমি কোথায়, বাহিরে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে, আমার কিন্তু তোমার ছাতাটা শেয়ার করতে বড্ড ইচ্ছে করছে, আমার ইচ্ছেটা কি পূরণ করা যায় ?”
- “আমি আসছি”
--- বৃদ্ধাশ্রমটি খুব বেশী দূরে নয়, তিনি ও তার স্ত্রী সেখানেই থাকেন । পরিচয় হবার পর আজই সেখানে প্রথম যাওয়া হচ্ছে, এক অন্যরকম অনুভূতির অপেক্ষায়। ---

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


