somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জন্ম স্মৃতি

০২ রা আগস্ট, ২০০৮ রাত ১:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জন্ম স্মৃতি। জন্ম কথা, জন্ম সময়ের ঘটনাবহুল স্মৃতি কথা। প্রত্যেকটি মানুষের জীবনের তার জন্ম মুহুর্তের কিছু না কিছু ঘটনাসমৃদ্ধ স্মৃতি থাকে যা ওই সময় অনুভব করা না গেলেও মায়ের মুখে শোনা এ স্মৃতিকথাগুলো জমে থাকে মনের মনিকোঠায় যা বেঁচে থাকে জীবনের পুরোটা সময়।

একটি শিশুর আবির্ভাব, একজন বাবা-মায়ের অহংকার, একটি পরিবারের নতুন মুখ, সবকিছুতেই ঘিরে থাকে একটি জন্ম, আর সে জন্মের উপলক্ষ একসময় ছিলাম আমি, আপনি বা আমাদের মতনই কোন সন্তান। মনে পড়ে কি সেই প্রথম পৃথিবীর আলো দেখা, চাদড়ে মোড়ানো নরম শরীরখানি, আলতো আদরে মায়ের প্রথম চুমু, মায়ের শরীরের প্রথম উষ্ণতা, তাঁর বুকের দুধের স্বাদই প্রথম পান, আরো কত সব স্মৃতি কিন্তু তা সবই হয়ত বাবা নয়ত মায়ের কাছ থেকে স্মৃতি কথন হিসেবে শোনা।

আমার ঘটে যাওয়া জন্ম স্মৃতিগুলো পুরোটাই শোনা আমার মায়ের কাছ থেকে। যখন বুঝতে শিখেছি তার পরের সময়টাতে ম কুবার বলেছেন সেসব দিনের কথা, ততবারই মুগ্ধতা নিয়ে শুনেছি আর তাকিয়ে থেকেছি মায়ের পবিত্র মুখটার দিকে, অপলক চোখে, যেখানে একবারও চোখের পলক পড়েনি।

জন্ম ময়মনসিংহ শহরে। সন ১৯৮২। বাবার চাকুরির সূত্র ধরেই ওখানে তখন থাকা। ঠিক জন্মের সময়টাতে বাবা পাশে থাকতে পারেননি, কাজের সূত্রতায় বাহিরে অবস্থান করছিলেন। জন্মক্ষন এল, যখন পৃথিবীর আলো সমস্ত মুখটার উপর এসে পড়ল ঠিক বাহিরে তখন আলো আধারির খেলা, সময়টা ঠিক যখন মাগরিবের আযান পড়ছে। দিন দশেক পর, জানা গেল শরীরে বেঁধেছে নিউমোনিয়া। এতটুকুন ১০ দিনের বাচ্চার নিউমোনিয়া, মা যেন অল্পতেই হোঁচট খেলেন। তখনকার সময় ডাক্তাররাও বেশ শংকিত ছিলেন, সরকারী হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা এই আমার শরীরের মানুষটি যখন জীবন-মৃত্যুর ঠিক সন্ধিক্ষনে, হাজারো শংকা যখন একজন মা'কে বারবার আহত করছে সে মায়ের কথা আর কি বলব !

এভাবেই এক মাস, দেড় মাস যখন দু-মাস ছুয়েছে প্রায় তখনও হাসপাতালে, মেডিকেল কলেজ হওয়ায় প্রায়ই ছাত্র-ছাত্রীদের এক্সপেরিমেন্ট অবজেক্ট হতে হয়েছিল। মা দিতে চাইতেন না, তবুও। এ কটা মাসে মা গোসল করতেন সপ্তাহে একবার, তার কি ধারনা হয়েছিল তার কোল ছাড়লেই মারা যাব। একদিন মা প্রায় বিরক্তই হয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যাচ্ছিলেন প্রায়, কারণ জানতেন মারা গেলে মেডিকেল থেকে কখনো লাশ ফেরত দিবেনা ! এক ডাক্তার প্রায় টেনে হিচড়ে মাকে তুলে আনলেন। আবার নতুন করে দেখা হল আমাকে, যখন প্রেসক্রিপশন লিখছিলেন মা ডাক্তারের পা জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন ভাল ওষুধ লিখতে যেখান থেকে যেভাবে পারবেন সেভাবেই নাকি ওষুধ যোগাড় করবে। ডাক্তার সাহেব তাকিয়েছিলেন একবার মায়ের দিকে আর একবার আমার দিকে।

ওষুধ লেখা হল, এবার কোন সরকারী ওষুধ নয়। জার্মানীর। এক একটি ইনজেকশনের দাম প্রায় ৮০টাকা। বাবার বেতন তখন ৭০০ টাকা প্রতি মাস হিসেবে। প্রয়োজন হবে ৩৫টি ইনেজেকশন। এত টাকা কোথায় পাবে, মাসও প্রায় শেষের দিকে। তাহলে কি তাদের চোখের সামনে থেকে এই দুগ্ধপোষ্য শিশুটি অল্পকদিনের এ পৃথিবী ভ্রমণ শেষে আবার বিদায় নেবে ? অর্থাভাবে অসহায় পিতার অসামর্থতার বোঝা, মায়ের আকুল আকুতি, বিধাতার কাছে একটি চাওয়া - সবকিছু যেন কেমন দ্রুত পাল্টে যাচ্ছিল।

ওষুধও পাওয়া যাচ্ছিলনা শহর ঘুরে। রাত প্রায় ১০টা, একটা ফার্মেসি বন্ধ করতে চলেছে এ সময় বাবা জোড় করে ঢুকতে চাইলে ডাকাত সন্দেহ করে তারা দোকান বন্ধ করে ফেলে। অনেক অনুনয়ে খুললে সে দোকানেই পাওয়া যায় মাত্র দুটো ইনজেকশন। হাতের টর্চ লাইট, ঘড়ি, পরিচয় পত্র আর মানিব্যাগের গোনা কটা টাকা, এই সম্বলে প্রতিশ্রুতি পরিশোধে আনা হয় ওষুধগুলো।

শর্ত ছিল ইনজেকশন দেবার, হয় বাঁচবে নতুবা মরতে হবে। পাশের বেডের ছেলেটির বাবার অনুরোধ বাবা উপেক্ষা করতে পারেননি। এক অসহায় বোঝে আরেক অসহায়ের দু:খ। কিন্তু, হায় ইনজেকশন দেবার মিনিট ২০এর মধ্যে ছেলেটি মারা গেল। এবার আমার পালা। মা প্রায় পাগল তখন, মায়ের কথা ছেলে এমনিতে মরুক তবু ইনজেকশন দিয়ে মারবেন না। তারপর সে তো অনেক কথা, দেয়া হল ইনজেকশন। অপেক্ষার পালা, ঘড়ির সময় আর আমার স্পন্দন, দুটো যেন সমান্তরাল গতিতে এগিয়ে চলছিল। আল্লাহর অশেষ রহমতে শুরু হল নতুন জীবনের পথ চলা, যেন জীবনের পর নতুন আর এক জীবন ফিরে পাওয়া।

এভাবে দিতে হয়ে বাকী ৩৪টি ইনজেকশন। যখন হাসপাতাল থেকে রিলিজ নেবার দিন, ডাক্তার মায়ের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন এই ছেলে বাঁচবে, মায়ের স্নেহে আর আশির্বাদেই বেঁচে থাকবে।

আমার বাবার আদেশ ছিল একটি, জীবনে আর যাই করিনা কেন কোনদিন যেন অন্তত আমার মাকে ধমক কিংবা উচ্চস্বরে কিছু না বলি। কখনো যেন কোনদিনও এক মুহুর্তের জন্য কষ্ট না দেই।

আজ বড় হয়েছি, মা শুধু আমার জীবনে মা-ই নয়, একাধারে বন্ধু, শিক্ষক, সহকর্মী কত না সম্পর্কে আমার মাকে আমার প্রতিটি সময়ে বেঁধে রাখি, যেন সে সম্পর্ক জীবনের তরে কখনো ছিন্ন হবার নয়।

আমার মা, আমার জন্ম স্মৃতি আর আমি - এইতো পাশাপাশি রেখে পথ চলা।

.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
সামগ্রিক বিষয়টি আমার 'মা' কেন্দ্রিক, তাঁর স্মরণেই লেখা। উৎসর্গ করা প্রথম পোষ্টটি তাই উৎসর্গ করা হল আমার "মা"-কেই।
'মা' তোমাকে সালাম।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা আগস্ট, ২০০৮ রাত ১:৪৫
২১টি মন্তব্য ২২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×