somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আত্মকথন

১২ ই আগস্ট, ২০০৮ দুপুর ১:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার বন্ধু, মোজাম্মেল, সম্ভ্রান্ত ঘরের সন্তান হওয়াতে অভাববোধটা কোন সময়ই সে বুঝেনি, প্রতিপত্তিশালী, আচরণ আর চলনেও সাহেবী আয়েশটা ছিল। একদিন দুজনে ওদের দোতলা বাড়ীর ছাদে, মাঝের টেবিলটাতে একটা ফলের ঝুড়ি, তাতে সাজানো হরেক রকম ফল। কথাচ্ছলে হঠাৎই বেশ তাচ্ছিল্যতায় ঝুড়িটা আমার দিকে ঠেলে দিয়ে বলল “নে নে ফল খা, তোরা তো আর এই যশোর ছেড়ে ওই খুলনাতেও যেতে পারবিনা, জীবনে এই গ্রাম ছাড়া তোদের কোনদিনই শহর দেখা হবেনা” - জিদ্টা সেইদিনেরই, ঘুরে উঠে এলাম। মনে মনে জীবনে এই অপমানের প্রতিশোধের প্রতিজ্ঞাও নিয়েছিলাম।

তখনকার সময় বাবা সাধারণ কৃষক। অর্থ অভাবে পড়াশোনা, সে তো বিলাসিতা। তবুও ইচ্ছাশক্তিকে জয় করে মেট্রিক পাসটা হল। ততদিনে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হয়েছি, কিন্তু কৃষক বাবার ভরা ক্ষেতের মাঠ আর আমার পড়াশোনা, দুটো প্রসঙ্গই যেন প্রশ্নবিদ্ধ ? বাবা একদিন প্রচন্ড মারলেন, পড়াশোনার জন্য, কে খরচ দিবে ? তার চেয়ে যেন মাঠেই কাজ করি, অন্তত উপার্যন হবে। রাগে, ক্ষোভে, দু:খে বাবার মুখটাও দেখিনি-শুধু গায়ের গামছাটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়, যাবার আগে বলেছিলাম “আমি আর ঘরে ফিরবনা, কোনদিনও না” - আর ঘরে ফেরাও হয়নি, যখন ফেরা হল, তখন আর অবশিষ্ট কিছুই ছিলনা।

সময়টা সনের হিসেবে ৬৯। তখন তো আর অত পত্র-পত্রিকা পাওয়া যেতনা, সম্বল ছিল রেডিও, তাও দু-এক গ্রাম মিলে একটা। বাড়ী থেকে সেই যে বেরিয়েছি আর ফিরিনি, কোন যোগাযোগও পর্যন্ত রাখিনি। মানুষের ভীড়ে চায়ের স্টলে দাড়িয়ে রেডিও বাজছিল। হঠাৎ একটা খবর সমস্ত আকর্ষন কেড়ে নিল। “লোক নিচ্ছে, আর্মিতে লোক নিবে-লাইনে দাড়াতে হবে।” আগামীকালই, রওনা দিলাম সাথে সাথে, যে কয়টা পয়সা ছিল তাতে হেঁটে আর গাড়ীতে মিলে পৌছে গেলাম। মাগুড়া স্টেশন। শ’ - শ' লোক লাইনে। “কোনছে ট্রেড লেনা হ্যায় ?” পশ্চিম পাকিস্তানীর আকষ্মিক এ প্রশ্নে কিছুটা ভড়কে গেলাম, কারণ ট্রেড কি তা তো জানা ছিলনা, - অতীত স্মৃতি আর প্রতিশোধ নেবার সুযোগ, “স্যার আমাকে এমন একটা ট্রেড দেন, যাতে আমি দেশ বিদেশ ঘুরতে পারি।” জয়েন হল চিটাগং-এ, তিন মাসের মাথায় পোষ্টিং অর্ডার চলে এল। গন্তব্য পশ্চিম পাকিস্তান।

“মোজাম্মেল, দোস্ত - এ চিঠিটা যখন লিখছি, তখন আমি মাঝ সমুদ্রে, এখন গভীর রাত, পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের পথে।” - চিঠির শুরুটা করেছিলাম এভাবেই। কতটাই না প্রতিশোধপরায়ন ছিলাম।

ট্রেনিং শেষে চাকরি শুরু হল। ভালই চলছিল, মাস শেষে কড়া কড়া নোটের মাইনে, সামান্য খরচ ছাড়া সবটুকুই জমিয়ে রাখতাম। এতদিনে মনে পড়ে গেল বাবার কথা, গ্রাম - ভাই, বোন এদের সবার কথা। সময় গড়িয়ে তাও বছর দুয়েক পার হয়েছিল। বাবার জন্য বেশ কিছু জামা-কাপড় আর জমানো টাকাগুলো হাতে দিয়ে পুরোনো রাগটাকে বিসর্জন দেব, এই ভেবেছিলাম, ছুটিও নিলাম, প্লেনের টিকেটও কনফার্ম। যেদিন দেশে ফেরার কথা, তার আগের দিনের পাওয়া টেলিগ্রাম জীবনটাকে আরও একবার ওলট পালট করে দিল। সব হিসেব নিকেষকে শুন্যের কোঠায় নিয়ে দাড় করাল। সমস্ত উপার্যন এ জীবনের কাছে খুব, অতি তুচ্ছ মনে হল।

বাবা যখন নাকি মারা যায়, শুধুই তিনি আমার নাম-ই করেছিলেন, জীবনের শেষ দিন, শেষ মুহুর্তের একটাই চাওয়া ছিল, আমাকে একটিবার দেখবার। সেই যে বের হলাম, সেই তো শেষ দেখা ছিল। জীবনের এ ভূল, ভূলের কষ্ট কোনদিন শোধরাবার নয়। যার জন্য ঘর ছাড়া, দেশ ছাড়া সে মানুষটিই নেই, কার জন্য আমি, কার জন্য আমার এসব।

অবশেষে যখন দেশে ফেরা হল - ৭১’ সন। জানুয়ারী মাস। ৩ মাসের ছুটি ছিল। ছুটি শেষ হবার আগেই দেশে শুরু হল গন্ডগোল। ২৫শে মার্চ রাতের ঘটনা। ২৬শে মার্চ পশ্চিম পাকিস্তানে যোগদানের তারিখ। যখন শুনলাম ক্যান্টনমেন্টেও নাকি মানুষ মারা হচ্ছে, পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরত না গিয়ে সোজা ভারতে চলে গেলাম। ৮নং সেক্টরের সাথে থেকে শুরু হল আরেক যুদ্ধ, দেশকে বাঁচাবার যুদ্ধ। ৯মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম শেষে যখন বিজয় এল, দেশ ভাগ হল, এদেশের সেনাবাহিনীতেই যোগ দিলাম।
আমিই ছিলাম স্বাধীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নন-কমিশনড্ অফিসারের মধ্যে সর্বশেষ মুক্তিযোদ্ধা অফিসার-যখন অবসরে গ্রহণ করি।

গত হয়েছে অনেকটা সময়। আজ কোথায় তারা! কোথায় মোজাম্মেল, সেই গ্রাম, গ্রামের ধুলোমাখা পথ- যেখানে আজ কাঁচা পাকা রাস্তা, খসে পড়া স্কুলের দেয়ালে এখন চুনের রং, অবারিত ক্ষেতের মাঠ, রোববারের হাট, পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তান, যুদ্ধ, সংগ্রাম, দেশ ভাগ, কোথায় বাবা, বাবার সেই মুখখানি ...
.................................................................................
তার গলাটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে এসেছে , চোখটাও ঝাপসা, চশমাটা একবার খুলে মুছে নিতে দেখলাম।
বিষন্নতায় ডুবে থাকা মানুষটাকে কেমন জানি অগোছালো মনে হচ্ছিল, যতবারই কারণ জিজ্ঞেস করেছি এর আগে, এড়িয়ে গিয়েছে। কোথাও যেন খুব একটা বিষয় নিয়ে চিন্তিত নতুবা দুশিন্তা তাকে ভর করে আছে।

এভাবেই আজ যখন মানুষটি বলছিল তার -এ আত্মকথন, অতীত হয়ে যাওয়া জীবনের কিছুটা সময়ের কালক্ষেপণ। সে মানুষটির সামনেই আমি, বলা যায় মুখোমুখি দুজনে। অতীত খুঁজে ফেরা এ মানুষটির সামনে আমাদের বর্তমানকে বড্ড অসহায় মনে হল, তাইত স্বান্তনা দেবার মত সত্যি কোন সাহস আমারও ছিলনা।
.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
স্মৃতিকথামূলক এ লেখাটি আজ উৎসর্গ করা হল আমার বাবা'কে।
বাবা’র জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকা প্রত্যেকটি মানুষের অবদানকে কৃতজ্ঞচিত্তে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি, তার কর্মজীবনের সহযোগী, যুদ্ধের সহযোদ্ধা এবং সর্বপোরি পারিবারিক ও সম্পর্কযুক্ত সকল অস্তিত্বের প্রতি রইল সালাম। তাঁর সন্তান এবং পরিবারের পক্ষ হতে।
১৯টি মন্তব্য ১৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×