ভাইয়া আজ তোকে একটা লেখা লিখতেই হবে
- না রে, আজ পারছিনে, অন্য আরেকদিন
না ভাইয়া, প্লিজ লেখনা !
- বলছিনে আজকে ভাল লাগছেনা, আর লিখবটাই বা কি ?
তুই কি তাহলে টপিকস খুজে পাছছিসনে, না কি ?
- না, আসলে সেরকম কিছু না, তারপরেও ভাল লাগছেনা
আচ্ছা যদি টপিকস খুজে না পাস, একটা টপিকস দেই তোকে, লিখবি ?
- কি বল ?
আগে বল লিখবি কিনা !
- বলবি তো !
আজ আমাকে নিয়ে একটা লেখা লিখে ফেল !
- তোকে নিয়ে ?
হ্যা! কেন, লিখতে পারবিনা ? আমাকে নিয়ে তোর ভাবা, না ভাবা সব কথাগুলো
আচ্ছা ঠিক আছে, তুই লিখলে লিখিস, আমি গেলাম
- এই কোথায় যাচ্ছিস ?
কাজ আছে, পরে এসে তোর লেখা দেখব ! ..
...... ওর পাগলামীটাই এরকম। হঠাৎ কোন কিছু আবদারের সুর তুলে বলে ফেলবে, এখন রাখ না রাখ নিজের ব্যপার। অন্যায় আবদার তো আর করেনি, তবে মাঝে মাঝে করে, জোড়ে বকা দিতে না পারলেও কিছুটা যে বিরক্ত হই, তা বুঝতে পারে। কেমন জানি সব কিছুতেই একটা বাড়তি দুর্বলতা কাজ করে। অনেক সময় রাগ করেও পারিনে, আবার গোমড়া মুখে থেকেও হেসে দিতে হয়। কি জানি, বুঝিনে এসব কেন হয় !
বয়সে তো ছোট বটেই, উচ্ছাসবোধটাই ওর সঙ্গী, সবসময় মুখে হাসি, মনে হয় হেসে হেসে পৃথিবীটাকে সুখী করার জন্য বোধহয় ওর জন্ম। সেই হাসিমাখা মুখের ছবিটাই রেখে দিতাম মানিব্যাগের অ্যালবামে।
বায়নাটা প্রচন্ড, যেবার যেটা বলেছে সেবার তা করবেই। অনেক মারও খেয়েছে বাবা-মা’র হাতে। বিন্দু বিন্দু আহ্লাদে সিন্ধু হয়ে আমি বায়না বাবু বানিয়ে ফেলেছি ওকে। রাগী আর জেদী খুব । এতটা আবার সবসময় ভালও লাগতনা। তবুও মেনে নিতাম। আবার ওদিকে বাবা-মা’ কেও সামলাতে হত। পড়াশোনার সময়টা বেশ অল্প কিন্তু রেজাল্ট ভাল। ঘুমকাতুরে মানুষ, গানের প্রতি খুব ঝোক কিন্তু খাওয়া-দাওয়ার প্রতি কোন নজরই নেই তার, তাইত তালপাতার সেপাই সেই তখনও আজ এখনও।
এই তো এখনও উজ্জল মনে পড়ে, দুজনের দু-কাধেঁ দুটো ব্যাগ ঝুলিয়ে দিত আর হাতে হাত ধরিয়ে দিয়ে বলত “যাও স্কুলে যাও, স্কুল থেকে ফেরার সময়ও এভাবে আসবে” - মায়ের আদেশ ছিল এটা। ঠিক সেভাবেই যেতাম, রাস্তার মানুষগুলো দেখে ভাবত ‘জমজ’, জিজ্ঞেসও করত মাঝে মাঝে।
কখনও তেমন বকতাম না, তাই বোধ হয় আশ্রয়-প্রশ্রায় দুটোই পেয়েছিল। এই তো অফিসের জুতার ভেতর তেলাপোকা রাখা থেকে শুরু করে, মানিব্যাগ হাওয়া করে দেওয়া,
বড় হতে লাগলাম আনুপাতিক হারে। বয়সের ব্যবধানটা তো আছেই। শারীরিক গঠনে ও বেশ ছাড়িয়ে গেল আমাকে। মানুষে ভাবত ওই বুঝি বড়। যাহোক সে ঝক্কিও কম ছিলনা। খুনসুটি তো থাকতই। মারামারি তেমন হয়নি, হলেও পেরে উঠতাম না, পেরে উঠতে চাইলেও স্ব-ইচ্ছেতে হেরে যেতাম। জিতুক, ওই জিতুক।
কথা দিলাম. পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করলে একটা সারপ্রাইজ দেব। সেবার রেজাল্টও করল বেশ। পারিনি যে সারপ্রাইজটা দেবার কথা ছিল, সেটা দিতে পারিনি। একটা ছোট্ট কিছু উপহার দিয়েছিলাম। সাইকেল নিয়ে ঘুরতে ও খুব ভালবাসত। ও কখনো জানেনি আমি যে নিজেকে এভাবে মিথ্যে বলেছি। ওর যে দিনটা জন্মের, কখনো সে দিনটাকে ওভাবে জন্মদিন হিসেবে পালিত হয়নি। ইচ্ছে তো থাকেই, খুব ঘটা করে না হয় একবার ! তাও কোনদিন হয়ে উঠলনা।
এখন তো বড় থেকে আরো বড় হচ্ছি। যখন ও বুঝতে পারল একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবার অসুস্থতায় বড় ভাইয়ের একার পক্ষে সম্ভব না, পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি নিয়ে নিল। দিব্যি সংসার চালিয়ে যাচ্ছে।
সেবার এক অসুখে পড়লাম, প্রচন্ড, মাথায় কি একটা সমস্যা ধরা পড়ল। ও তখনও জানতনা, অফিসে ছিল, যখন ফিরে শুনল, আমি ওর সামনে দাড়াতে পারিনি। ওর চোখের জলের সামনে নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হল। মাকে জড়িয়ে কাদঁছে আর বলছে “ভাইয়াকে চিন্তা করতে না বল, আমিই ওর চিকিৎসার সব টাকা যোগাড় করব” সেদিন আরও একবার ওকে খুব ভাল করে পরখ করলাম।
গেল ফেব্র“য়ারীর ১৪ তারিখ। ইচ্ছে করেই দেরীতে ঘুম ভাঙল। ঠিক উঠতে যাব হাতের কছটায় একটা খাম, একটা গোলাপ আর একটা ছোট বক্স। খামটা খুলেই বুঝতে পারি বদমায়েশটার কাজ। দারুন একটা উইশ মেসেজ আর বক্সটার উপর লেখা “ সময় আর আমি দুটোই তোমার বন্ধু”, বক্সে একটা চমতকার হাত ঘড়ি ছিল। একবার অতীতে ফিরে যাই ঠিক আবার ঘড়িতে সময়টা ঠিক করে নিই।
আজ বিকেলটা মনে হচ্ছে সন্ধ্যের দখলে। ইষৎ মেষে ঢেকে যাওয়া পশ্চিমের সূর্ষটা খানিকটা কোণঠাসা। ভালও লাগছেনা। ফোনটা বেজে উঠল ..
ভাইয়া লিখেছিস লেখাটা ?
- কোনটা ?
কেন তোকে দুপুরে বললাম না, ওই লেখাটা
- না রে, এখনও লিখিনি, লিখব
থাক তোর আর লেখা লাগবেনা ..............
(ফোনটা কেটে দিল)
আবারও সেই পাগলামী।
ইচ্ছে করেই মিথ্যেটা বলা। ওকে এ লেখা দেখাতে চাইনা, ও জানতেও পারবেনা এ ব্লগে প্রকাশ পাওয়া ওর কথাগুলো। ওকে নিয়ে আমার ভাবনাগুলো। সত্যি খুব বেশী কাছে টানি বলেই ভালবাসাটা অনেক বেশী। যে ভালবাসাই ভালবাসতে চাই আজীবন। ও তো আমার ছোটটা।
.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
লেখাটা আর কিছুই নয়, শুধুই আমার ছোটটাকে নিয়ে লেখা। হয়ত ওর সব কথা বলা হয়নি তবুও যতটুকু পেরেছি, তাতেই ঢের। আবেগ, অনুভূতিগুলো লেখার চেয়েও অনেক বেশী, বেশী হতেই হবে কারণ সে যে আমার ছোট ভাই।
পোষ্টটি তাই উৎসর্গ করলাম আমার ছোট ভাই’কে উদ্দেশ্য করে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


