ঠিক এখানটায়, যদি ডেভিড কপারফিল্ডের চোখ বেঁধে দেয়া যেতো, তাৎক্ষণিক সে যাদু-মন্ত্রে বলে দিতো কোথায় সে তখন। যাদুকে আমার কাছে ইল্যুশনের বেশী কিছু মনে হয় না, তাই সচারচর যেমন ধেধেঁ যাই তার চেয়ে বেশী কিছু নয়। আজ বোধহয় ধাঁধা গোছের কিছুতে আকৃষ্ট হতে পারিনি, সত্যিই যাদু বলে কিছু আছে সেরকমই লাগলো, আর যদি তাই মনে হয়, তাহলে এটাই প্রথম, যখন যাদু বলে কিছু আছে তাকে বিশ্বাস করলাম, তবুও ধার্মিক মন অতটা দূর্বল নয়।
“আরো একবার চোখ ফিরিয়ে নেই, একটু আগেই একবার দেখা হয়েছে, তারপরেও আরো একবার। মনে মনে হাসি “ধ্যাৎ ! কি হচ্ছে এসব !”
কই ! আজও তো সকালে মায়ের সেই চেনা সুরেই ভোর হওয়া “খোকা ওঠ, অফিসে যাবিনা, দেরী হয়ে যাচ্ছে তো ! ... কত করে বলি রাত জাগিস না ..............” ব্যতিক্রম তো কিছুই হয়নি, কার মুখ দর্শনে ওঠা ? নামাযের মাদুরে কোরআন শরীফ রেখে ডাকতে আসা ঘোমটার আড়ালে ছোট্ট নিষ্পাপ আমার মায়ের মুখখানি।
আটটার ঠিক মিনিট পাচেঁক আগেই পৌছেছি, আজ একটু তড়িঘড়ি, এক হাতে টিফিন ক্যারিয়ার, অন্য হাতে এক্সিকিউটিভ ব্যাগ, টাইয়ের শেষ অংশটুকু ভেতরে ঠিক মতো ঠোকানো হয়নি, বাস স্ট্যান্ডে এসে বাকী পরিপাটিটুকু হলাম, চিরুনীটা পকেটে রাখতে রাখতে হাত ঘড়ির সময় যে আরো এগিয়েছে সেটাও খেয়াল হল। যদিও বাস পেতে একটু সময় নিলো, তারপরেও একই রুট, একই বাস, সময়ের এদিক-সেদিক।
“এবারও দেখে নিলাম, এ নিয়ে বেশ ক’বার হলো”
ডেভিড কপারফিল্ডকে আপাতত বাদ দিলাম, আমারও যদি সেরকম চোখ বেধেঁ দেয়া হয়, নির্ঘাত সত্যি বলছি - বাসের রাস্তায় কখন কোথায় হুবহু বলতে পারবো। অবশ্য এখানেও যে ইল্যুশন নেই ! সে সত্যিটাই বা ক’জনা জানে ! হেল্পার ছোকড়াটা যখন স্টপেজ প্রতি ডাক দিবে প্যাসেঞ্জারকে “এ্যাই, কলেজ গেট নামেন” “আসদগেট কেউ আছে ?” “নামেন, নামেন - পান্থপথ আইছে” ওইটাই ইল্যুশন ‘আসাদগেট’ ‘কলেজগেট’ ‘সোবহানবাগ’; চোখ বাঁধা থাকলেও, কানে তো কেউ তুলো দেয়নি !
“চোখে ধুলো পড়েছে, চোখ মুছতে গিয়ে আরো একবার, গোণা হচ্ছেনা এ নিয়ে কতবার হলো”
আমি নেমে পড়বো পান্থপথে। সোবহানবাগ হয়ে গাড়িটা ঘুড়ে পান্থপথ হয়ে সোজা সার্ক ফোয়ারা দিয়ে বেরিয়ে যাবে। অফিস ঠিক পান্থপথ মোড় হতে কিছুটা পথ হেটেঁই সামনে। ন’টায় অফিস ধরতেই হবে, নচেৎ ‘বিলম্ব’ সূচক ‘লাল কালি’ যতটা না এটেনডেন্স খাতার জন্য অসৌজন্য, একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হয়ে বিষয়টি অন্যদের কাছে অনুকরণীয় মনে হতে পারে।
“ধূর, রাখো তোমার প্রশাসন, নিয়ম ভাঙ্গছি তো ভাঙ্গছিই, তাকানো হলো আরো দু’বার”
আজকাল রোডগুলোকে ডিভাইড করে ফ্যালা হয়েছে। নরমাল, লো-রেটেড, ভিআইপি, পাবলিক রোড আরো কত ক্লাস। ভেবে হাসি পেতে পারে কখনো ‘শহীদ ........ রোড’ সেটা পাবলিক রোড বলে ঘন্টার পর ঘন্টা জ্যামে বসে ব্যস্ত যাত্রীরা স্মরণ করতে থাকে আমার সেই শহীদ ভাইয়ের স্মৃতি কথা আর ওদিকে ‘বিজয় স্মারণী’ খুব ভিআইপি গোছের রাস্তা সেটা, বিজয়ের কথা তো আমরা সকলেই জানি .. তাই আর ভিআইপিদের মনে করবার দরকারের বোধটুকু-ও হয়না। ট্রাফিক পুলিশ ভাইদের যথেষ্ট হিউমার আছে বলতে হবে।
“আমার ওসব হিউমারের বালাই নেই, তাকিয়ে যাচ্ছি তো যাচ্ছিই -- নিরলস চেয়ে থাকা”
তবুও এতকিছু ঝক্কিকেই ভালোবেসে পথ চলতে হয়, চলতেই ভালোবাসি - এ ভালোবাসাতেই যেন অভ্যস্ত হয়ে পড়া। জ্যাম, ঝুলতে থাকা নয়ত ভীড়ে গাদাগাদি শরীরের সাথে লেগে বাসের টপ স্ট্যান্ড ধরে দাড়িয়ে থাকা, কখনো অপরিচিত মানুষের সাথে গলাবাজি, ভদ্রতা-অভদ্রতার দর কষাকষি। বাসের গায়ে সাটানো আছে ‘ব্যবহারে বংশের পরিচয়’ হা: হা: হা: ব্যবহারের অব্যবহার যারা করেন তাদের কি তাহলে কোন বংশ নেই ?
“ভাবছি আর তাকাচ্ছি, যেন তাকাতেই কিছু খুঁজে ফেরা”
.......................................................................................................
‘মা, তুই এখানে বস - একটা জায়গা আছে’
- বাবা তুমি বসো, আমি দাড়াতে পারবো
‘না, তুই বস - পথ তো সামনে’
- না; বাবা, তুমি বসোনা !
‘বলছি তুই বস, তুই দাড়িয়ে থাকতে পারবিনা’
পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী সম্পর্কগুলোর একটি দেখছিলাম “বাবা-মেয়ে” অনির্দিষ্টকালের জন্য নিরবিচ্ছিন্ন এক পরিণত সম্পর্ক।
এতক্ষণ যার দিকে তাকিয়ে থাকা, অযুহাতে - বিনে অযুহাতে, এ সেই মেয়টা, কিছুক্ষণ আগেই পেছনের স্টপেজ থেকে উঠেছে। মেয়েটি খালি সিটটাতে বসলে, তার বাবা দাড়ানোর একটা জায়গা করে নেয়। আমি দাড়িয়ে থাকি মেয়েটা যেখানে ঠিক তার সাথেই।
“চট্টগ্রাম সমূদ্র বন্দর সহ দেশের সকল নদী-বন্দরকে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে” - রাত গড়ালেও টিভি নিউজটা এখনও কানে ভাসছে, আকাশও গাড় অন্ধকার, প্রচন্ড বাতাস বাইরে, দমকা হাওয়ায় ক্ষনিকেই এলোমেলো করে দিতে চেয়েই আবার শান্ত স্বরুপ, অদ্ভূত খেলায় মেতেছে প্রকৃতি, আমার সেদিকে বিন্দুমাত্র নজর ছিলনা, অশান্ত প্রকৃতির মাঝেই নিরিবিলি শান্ত রহস্যে তাকিয়ে থাকি অবিকল নির্লজ্জের মতো, আমি দেখি মেয়েটিকে।
শাড়ীতে জড়িয়ে থাকা মেয়েটির আচলের সবুজ রং, লাল-মেরুন রং-এর বাহারী চুরী, সোনালী কানের দুল, কালো আঁধারের চুল - যেন সাতআসমানীর বাহারী রং তুলি দিয়ে গায়ে ছেটানো। রং কে উপভোগ করি ভাবতে ভাবতে; যদি চিত্রশিল্পী হতে পারতাম একটা ক্যানভাস হয়ে যেতো, যা হতো শ্রেষ্ঠ ‘কালার কম্বিনেশন’।
বাসটা এখন অনেক স্পীডে ছেড়েছে, এ রাস্তায় সাধারণত জ্যাম তেমন থাকেনা। সামনের মোড়ে পেরুলেই হালকা একটা জ্যাম তারপর ফ্রী। সিগন্যালের জ্যাম তো, কিছুক্ষন আটকে থাকা, তারপড়েই ছেড়ে দেয়। আমি দাড়িয়ে থাকি, মেয়েটি বসা। আমি তাকিয়ে থাকি, ভাবতে থাকি। জ্যাম না পড়লেও গাড়ী দিব্বী দাড়িয়ে আছি অনেকক্ষণ। “কি ব্যপার ড্রাইভার সাহেব, হঠাত এতো জ্যাম কেনো ?” – ‘সামনে মিনিষ্টার যাইবে, সিগন্যাল দিছে’; ব্যাস হয়েছে!
“তুই কবিতা লিখতে পারিস?” –‘না, কেনো?’ “একটা কবিতার দু’লাইন লিখেছি, পড়বি?” –‘বল, শুনি’ “সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর, তেমনি দেখিছি তারে অন্ধকারে” স্মরন হতেই–‘আরে, তুই তো বনলতা থেকে কপি দিয়েছিস রে’; ও হাসতে হাসতে লুটোপুটি খায়, জীবনানন্দ বাবু বনলতা’কে দেখেছিলেন কিনা জানিনে, কিন্তু আজ যে চোখে তাকিয়ে আছি সে চোখেই কবিতার লাইন লেখা হয়, যাকে খুঁজে চলেছি। এবার কি তাহলে কবি হতে পারবো ? বাঁকা ঠোটের হাসিতে অপ্রস্তুত হয়ে তাকিয়ে দেখি- ‘না, যাক কেউ দেখে ফেলেনি’
হাতের কাঁকন দেখেই বিভাজিত ধর্ম নিশ্চিন্ত হই। যখন চুরী দেখি তখনও। এক জোড়া হাতে দেড় ডজন চুরী; লাল, সবুজ, হলুদ - কত রং। “এ লাল রং-এর চুরিটা আমার অতীত, রক্তাক্ত অধ্যায়, সবুজটা বর্তমান - সবুজের মতন সজীব, আর এ কালোটা আমার ভবিষ্যত - অন্ধকারময়” - ওকে থামিয়ে দেই -‘কালোটা খুলে ফেললে কি হয় !’ “তুই কি তোর জীবনকে বদলাতে পারিস? তোর ভাগ্যকে?” –‘ভাগ্যকে তুই বিশ্বাস করিস ?’ ও নিশ্চুপ থাকে, আমার স্কুল জীবনের বন্ধু, পরের অধ্যায়ে কর্পোরেট ক্লায়েন্ট - এখন কোথায় তাও জানিনা। মেয়েটার হাতে একটা কালো চুরী ছিলো, ইচ্ছে হলো খুব করে বলে ফেলি ‘কালো চুরীটা খুলে ফেলুন না, ওটা না রাখলে নয় ?’ অধিকার খুজে পাইনা। মেয়েটার বাবা একটা খালি জায়গা পেয়ে সেখানে বসে পড়েছে।
-‘দিদিমণি, তুই এক কানে দুল পরিস নাকি?’ “কেন বলতো ?” –‘আমি কি বলবো, তুই দেখ’ “হায় হায় আরেক কানের দুল কোথায় পড়লো” হু হয়েছে আমার দিদিমণির দুল খোজা শুরু, এরকম যে কতবার হয়েছে, ইয়াত্তা নেই। -‘দিদিমণি তুই দুল পড়া ছাড়তো, বারবার পড়িস আর হারাস’ দিদিমণি আবার এক জোড়া নতুন আনে। কতদিন হলো দিদিমণির যে কত জোড়া যে হারিয়েছে, জানা হয়না, ওর শ্বশুর বাড়ীতে কেউ কি খুজে দেয় ওর দুল? আমার কথা নিশ্চয় মনে পড়ে। মেয়েটির দুলগুলো যে অযত্নে পড়ে থাকে দেখেই বোঝা যায়, হালকা পোলিশের রং-ও কেমন মলিন হয়ে আছে। সাদাসিধে দুলগুলো বাসের ঝাকুনিতে দুলতে থাকে, আমার চোখের মণি সমান্তরালে দেখে যায়।
“আচ্ছা খোকা ! তোর কেমন মেয়ে পছন্দো বলতো ?” – মা আমার মজা করেন, আমিও করি; ‘মা, শোন যদি তুমি মেয়ে দেখেই থাকো তাহলে প্রথম দেখবা তার চুল, লম্বা চুলের মেয়ে আমার চাইই’; এবার মা ঠাট্টা করেন “চুল দিয়ে কি করবি শুনি!”, ‘যেদিন আমার অফিস ছুটি থাকবে, সেদিন ওর চুল গুছিয়ে দেবো, আর একটা গল্পো বলবো - ‘রাজকণ্যার চুল’, “তুই পারলে এরকম খুজে নিস, আমি পারবোনা !” মা হাসতে হাসতে হেসেল ঘড়ে ছুটে যান, আমি মায়ের হাসির শব্দ পাই, মেয়েটির চুলে সকালের ভেজা-শুকনো একট গন্ধ লেগে আছে, সে গন্ধ নাকে আসে। আজ বাড়ীতে গিয়ে মা’কে বলতে হবে ‘মা, তুমি খুজেঁ পেয়েছো’
বাইরের বাতাসটা আরো জোড়ে বইছে, জানালার কাঁচ দিয়ে ভেতরে আসতে চাইছে, কয়েকজন যাত্রীর চেঁচামেচিতে কেউ কেউ জানালা বন্ধ করলেও কয়েকটা জানালা খারাপ থাকায় তা আর সম্ভব হলোনা, মেয়েটা যেখানটায় সে জানালাটাও খোলা। বাতাস বুঝি তার সঙ্গ পেয়েছে, সব এলোমেলো করে দেয়া তার চুলে। পিঠের নীচ অব্দি চুলে চোখ বেঁধে যায়, কানের কাছের চুলগুলো গুছিয়ে নিলো, আবার পেছনৈর ছড়ানো চুলের অবাধ্যতায় কখনো হাসি খেলা ইষৎ ঠোটের কোণে, নিশব্দ হাসির সুর কানে আসে, যেন বৃষ্টি পতনের ছন্দ। আমি তাকিয়ে থাকি, চোখ ফেরানোই দায়।
আচ্ছা অপরিচিত আগুন্তুক এ মেয়েটার যথার্থ নাম কি হতে পারে? যাকে নিয়ে এতক্ষন কবিতা, গল্প, সুর, ছন্দ - কতকিছুই তো হল অলস যানযটকালীন সময়ে! চারুলতা, বনলতা, ললিতা ? সব নামের শেষেই অদ্ভূত ভাবে ‘তা’ বর্ণটা যুক্ত হয়ে গেছে, মজার একটা ব্যপার। ভেতরে ভেতরে একাই যে সব মজা পাচ্ছি কেউ কি বুঝতে পারছে ? মেয়েটি কি পারছে ?
“পান্থপথ, যারা নামবেন গেটে আসেন” আমার গন্তব্যে পৌছুতে আর মিনিটের কম সময় বাকী, খুব কাছাকাছি চলে এসেছি। যানযটটা আর একটু দীর্ঘ হতে পারতো, অন্যদিনও তো এর থেকে বেশী সময় লাগে, আজ না হয় প্রশাসনিক কর্মকর্তার এটেনডেন্সে লাল কালি পড়তো তাও দোষের হতোনা, একজন মিনিষ্টার যে কেন গেলেন, আরও দু-একজন সাথে গেলেও তো জ্যামটা ধরে থাকতো। “এই যে ভাই, পান্থপথ নামবেন না আপনি?” –‘হ্যা আসছি’
“বাবা, আমার হাত ব্যগটা কোথায় দেখেছো ?” ; ‘ওই তো মা, সিটের পাশেই রয়েছে’ নামবার মুহুর্তেই চোখ ফেরাই, পাশে থাকা হাত ব্যাগটিও মেয়েটা দেখেনি, আমার বোঝার অপূর্ণতা কেটে যায়। নামবার আগে মেয়েটিকে আরেকবার দেখি, তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি। মেয়েটি অপলক তাকিয়েই আছে, আমার দিকে এক বিন্দুও তাকায়নি। অন্ধ মেয়েটির জন্মে যায় ততক্ষনে আমার অন্ধ ভালোবাসা।
আমি নেমে পড়ি, বাসটা আবার যানযটে পড়ে, আমি হেটেঁ ততক্ষনে অফিসের পথে। সিকিউরিটি গার্ড স্যালুট দেয়, আমার চোখ এড়িয়ে যায়, অফিসের গেটে যখন, তখনও বাসটা যানযটে।
ভালোবাসা দীর্ঘ হয়, কখনো এত স্বল্প, ক্ষনস্থায়ী হয় - অনুমানও ছিলোনা। আজও আমি গল্পে কিংবা বাস্তবে যখন স্মৃতি রোমন্থন করি, সত্যিটা ফস করে বলে ফেলি ; আমার “যানযট ভালোবাসা”
কৃতজ্ঞতা : সামহোয়ারইন আওয়াজ -এর মাইক্রো ব্লগার বন্ধু adnaneus এবং ajnabee কে পোষ্টটি উৎসর্গ করছি। তাদের করা সাউট থেকেই লেখাটির জন্য চেষ্টা করেছি। ধন্যবাদ দু'জনকেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

