ঠাস ঠাস.... করে বন্ধ করার শব্দটা এমনভাবে কানে আসছিলো ... আমার ঘর থেকেই স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম, একটা একটা করে সব জানলা বন্ধ করছে। যা ভেবেছিলাম তাই, একটু আস্তে বন্ধ করলে কি হয়, এমন জোড়ে আওয়াজ করছে পাশের ফ্লাটের মানুষরাও জানলায় ভীড় করেছে, অথচ আমি যে এখানে দিব্যি দাড়িয়ে আছি সেদিকে একবারেও খেয়ালও নেই ! কিন্তু অন্য সময় হলে তো চোখ নামানোই দায় .. ‘যাও না, এবার ঘরে যাও, সবাই দেখে ফেলবে তো’ - অনেক আদুরে অনুনয়ে তারপর জানলার পর্দা সরিয়ে বন্ধ করতো।
আমি জানতাম, এমন ব্যবহারই সে করবে, আজ বাদে কাল ঈদ, অথচ রোজার এ’কটা দিন খুব চটে আছে। কিছু হলেই রাগ করবে “দেখবে, সত্যি একদিন তোমায় ছেড়ে চলে যাবো”, খুব খারাপ লাগতো, ভয়ও হতো – সত্যি যদি ও চলে যায়! রাগ কি শুধু সেই করবে? আমিওতো করতে পারি, নেহায়েৎ ..!, আজ এমন রাগ করেছে;পর্দাগুলোতো সেটে দিয়েছেই, এখন জানলাগুলোও বন্ধ করছে। .. এত কিছুর পরেও যখন মিষ্টি মুখে এসে বলবে নয়তো আমিই ফোনে একটা ‘সরি’ এসএমএস পাঠাবো .. সব কোথায় যে উধাও হয়ে যায় - একেই জানি কি সেইসব বলে ? মেয়েটাকে বললে বলে “আমার ভাই অতো খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, তোমাকে ভালবাসবো”
আমি যে এপার্টমেন্টে থাকি ঠিক তার মুখোমুখি ওদের ঘরটা, অন্য এপার্টমেন্ট। রাত জেগে পড়তাম, সেও জেগে থাকতো .. কি ব্যপার? পর্দা সরিয়ে পড়া আমার অভ্যেস। কিছুদিন বাদেই লক্ষ্য করেছিলাম মেয়েটির ঘরের পর্দাও সরানো। ঠিক সবসময় দেখা যেতোনা, এই হয়তো একটু চুল আচড়াচ্ছে... নয়তো ছোট বোনটাকে পড়া দেখাচ্ছে ... আবার যখন তার বাবা বকতো .. পর্দা সরিয়ে দিতো।
কলেজে যাবার মুখে সেবারই প্রথম পথ আগলেছিলাম, ‘কি ব্যপার, পর্দা খুলে রাখেন কেনো ? আমার পড়াশোনা তো সব যাচ্ছেই যাচ্ছে, মাথাটাও নষ্ট করছেন’ অচেনা ঠোটে আর চোখের ইশারায় হাসলো .. “আপনি না তাকালেই হলো” ‘তাই বলে আপনি পর্দা বন্ধ করবেন না?’ “না” উত্তরে কোথায় যে হারালো, যখন খুঁজে পেলাম, এ হৃদয়খানিতেই সে লুকিয়ে ছিলো।
কাল রাতের রাগটা এখনো পুষে রেখেছে, “তোমায় ছেড়ে যখন চলে যাবো; আর ফিরে আসবোনা, তখন বুঝবে” খুব কষ্ট পেলে এ কথাগুলোই বলতো, কাল রাতেও একবার বলেছিলো, সেই থেকে জানালায় অপেক্ষা, একবারেও এলোনা, শুধু দেখেছিলাম কি জানি ব্যাগ ভর্তি করছে। ভয়ে কেপেঁ উঠলাম, ও যদি আর ফিরে না আসে? ওদের বাড়ীর গেটে একটা ট্রাভেল ব্যাগের পাশে ও দাড়িয়ে। অন্যপাশে কেউ আছে কিনা দেখতে পাচ্ছিনে। এ জানালা দিয়ে ছুটে বারান্দাতে গিয়ে দেখি ট্রাভেল ব্যাগটা আছে ও নেই, সত্যি ও বোধহয় খুব রাগ করেছে ‘না না, ও এভাবে না বলে যেতে পারেনা’
……………………
“কি ব্যপার তুমি রিকশার পেছনে দৌড়াচ্ছো কেনো ? বাবা দেখে ফেলবে তো”
: আমি সরি, দেখো আর কোনদিনও ভুল করবোনা
“যাওনা বাবা, দেখে ফেললে কিন্তু আমায় খুন করে ফেলবে”
: বলছিতো সরি, তুমি আমায় ছেড়ে যেওনা প্লিজ
: আমি আর কোনদিন ও .......
“এ্যাই তোমার কি হইছে; পাগলামী করতেছো কেনো?”
“আরে আমি যাচ্ছিনে ..... তো
.... ঈদের ছুটিতে বাড়ী যাচ্ছি”
শেষ কথাগুলো বাতাসে তখনও ভেসে ছিলো, যতক্ষন ওর রিকশাটা দেখছিলাম, গলির বাকেঁ মোর নিলেই চোখের আড়াল হয়, কথাগুলোকে বুক পকেটে নিয়ে ঘরে ঢুকি, হাত দিতেই দেখি উধাও, কখন যে সেগুলোও হৃদয়ে গিয়েছে, খেয়ালই হয়নি।
শেষটা - “দাড়াও এবার ফিরে এসে তোমায় মজা দেখাবো”
..........................................................................
আজ যখন ঈদের দিনেও কর্পোরেট হাউজের বিশ তলা উচুঁ ভবনের একটা ফ্লোরে নীল সান প্রটেকটিভ গ্লাসের পাশে কফি হাতে দাড়িয়ে শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত রাস্তায় ছুটে চলা মানুষগুলোকে দেখি, খুজে ফিরি সেই রিকশা, তার পেছনে ছুটে চলা আমি আর ও। মিষ্টি মুখের দুষ্টুমী হাসি কোথায় সব হারিয়ে গ্যাছে .... অতীত স্মৃতি শুধু তাই মনে করিয়ে আমায় কষ্ট দিতে চায়।
কাজের অযুহাতে যখন শর্ত সাপেক্ষে ছুটি মেলে, ঈদ ও ঈদের পরদিন অফিসের দায়িত্ব, ঈদের ছুটিটাই না কত দূর্বোধ্য, অথচ জানলাতে বসা সেই মেয়েটির ঈদের ছুটিতে বাড়ী ফেরা ....থাক !
আহা! ঈদের ছুটি !

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

