somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নিখোঁজ সংবাদ

২৩ শে নভেম্বর, ২০০৯ রাত ১২:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রাস্তার পাশের পুরোনো দালানটার পলেস্তার খসে পড়া বাউন্ডারী, তা শহরের ভেতরেই - আমার অফিস ফেরার পথে এ জায়গাটা পেরুতেই হবে। রোজকার আসা-যাওয়াতে এখন আর অপরিচিতও নয়, তবুও চোখের আড়াল হাবার মতো কখনো এভাবে দালানটাকে খেয়াল করা হয়নি, আজও না চেনার মতই আচমকাই চোখ চলে গ্যালো বাউন্ডারীর গায়ে সেটে দেয়া আধাঁ ছেড়া আর বৃষ্টিতে ভিজে শুকিয়ে গুটিয়ে যাওয়া একটা চার রঙা ‘পোষ্টারে’র দিকে। বোল্ড অক্ষরের শিরোনাম-টা পড়তে চাইলেও ভালোভাবে তাকাতে হবে, পোষ্টারটিতে একটা ছবিও যে আছে, সেটা দেখা যাচ্ছে। আমি তখন বাসের জানলার ধারে বসা, জ্যামে আটকে আছে কিছুক্ষণ। মৃদু আলোতে যাই দেখা যাচ্ছিলো তাতেই শিরোনাম-টা দেখেই গায়ে শিউরে একটা ঝাকুনি দিলো, লোমগুলো চমকে ওঠার মতো দাড়িয়ে গ্যালো, ছবিটা অষ্পষ্ট - চেনবার কথা নয় - ছবিটা আরেকবার দেখতে চাইলেও সবুজ সিগন্যালে ট্রাফিক কন্ট্রোলারের হাতের সংকেতে, বাসে বসে থাকা অন্য মানুষগুলোর মত আমিও চলমান হতে শুরু করলাম - কিছু বুঝবার আগেই।

এরকম একটা ব্যপারের সাথে যে পরিচয় জীবনের এটাই প্রথম; তা কিন্তু নয়। প্রথম হলে আশ্চর্যবোধ-টা বেশী থাকে। কতবার যে এরকম ঘটনায় আশ্চর্যিত হয়েছি, এখন ঠিক তার উল্টো - ‘আতংক’। না ফিরে পাবার আবার হারাবার এক অজানা আতংক।

এইতো, সেদিনের কথা - খুব কাছাকাছি সময়ের ব্যবধান। আমার এক সহকর্মী, তার পরিবারের জন্যও এরকম কত আয়োজন করতে হোলো, না করে উপায়ও ছিলোনা, ব্যপারটা এড়িয়ে যাবার মতও নয়। ঠিক সেদিনের সেই ঘটনার আগের সেই মানুষটিকে আর কখনো সেভাবে পাইনি, এখনও প্রতিদিনকার মত সকালে অফিসে তার ওয়ার্কষ্টেশনে চা কিংবা কফির মগ-টা বাড়িয়ে দিয়ে “বস, ক্যামোন আছেন !” স্বশব্দে উত্তরের প্রত্যাশা করিনা, মেকী হাসিতে বুঝিয়ে দেন জীবনের বাকীটা সময় এ ‘কেমন থাকার’ উত্তর-টা বোধহয় তার খুব অজানা। ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকেন; ডেবিট-ক্রেডিটের হিসেবে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান।

আমার দোতলা’র ঘরটাতে এম্নিতেই বিকেলের সূর্যটা পেছনে পড়ে যায়। জানালার পর্দাগুলো সব সরানো ছিলো। ছুটির দিন সেদিন; ড্রয়ই বুকে হাবিজাবি পেন্সিল স্কেচ; বাহিরে মাইকের এনাউন্সমেন্ট হচ্ছিলো। খুব সম্ভবত সেবার ইলেকশনের সময়, থেমে থেমে এনাউন্সমেন্ট-টা করছে, ঘর থেকে স্পষ্ট নয়, বিষয়টা ভালোভাবে শোনার জন্যই বারান্দায় যাওয়া। যা ভাবিনাই-ঠিক তাই। আজকাল হরহামেশাই এ ধরনের এনাউন্সমেন্ট হচ্ছে মোড়ের গলিগুলোতে, মুখস্থ পড়ার মতো একই ডায়লগ আউড়ে যাচ্ছে মাইকওয়ালা। হ্যামিলনের বাশিঁওয়ালার মতো কেউ আছে হয়তো এই শহরে।

‘পোষ্টারে’র হেডিংটা ছিলো এরকম “নিখোঁজ”। তার ঠিক ডান দিক নীচে পাসপোর্ট সাইজের একটা ছবি বড় করে পেষ্ট করা আর বাম দিকের কিছু সাদৃশ্য বর্ণনা, যেখানে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের আতংক, আকাঙ্খা, হারিয়ে ফেলার তীব্র বেদনা আর খুজেঁ পাবার তীব্রতর বাসনা। শতভাগই হারানোর; যে হারিয়েছে আর যে হারিয়ে ফেলেছে।
বয়স, গায়ের রং, পরনে শার্ট-প্যান্ট ... শেষবারের মত হারানো জনের বর্ণনাই এভাবেই তুলে দিয়েছে। একটা যোগাযোগের ঠিকানাও আছে আর মোবাইল নম্বর। শেষ আশাটুকুন; যদি খোঁজ পেয়ে কেউ তাদেরকে জানান। আমি অনুমান করতে পারি, এ পোষ্টারের সাথে মিশে থাকা পরিবারটি যদি তাদের প্রিয়জনকে আজও খুজেঁ না পেয়ে থাকেন; প্রতিদিনকার মতো আজ সকালেও হয়তো তাদের মেইল বক্সে মিথ্যে আশায় খোঁজ নিয়েছেন; নয়তো ফোনের স্ক্রীনে অপলক প্রতীক্ষা কখন একটা কলে ফিরে পাবার সংবাদ।

আপনার অভিজ্ঞতায় কি কখনো এমনটা হয়েছে ? এভাবে কোন হারানো পরিবারের মানুষগুলোকে কাছ থেকে দেখবার ? হোক বা না হোক একবার কল্পনায় ভাববার চেষ্টা করবেন কি ? এভাবে কেউ হারিয়ে গ্যালো, তাকে খোঁজবার জন্য পোষ্টার, মাইকিং, থানা, হাসপাতাল সব জাগাতেই ছুটোছুটি করছেন কিন্তু কোথাও পাচ্ছেন না, সময় কিন্তু থেমে নেই তাতে, যে মানুষটিকে ছাড়া একদিনও ভাবাই করা যেতনা সেই মানুষটিই ঘর হতে নিরুদ্দেশ এক দিন, দুদিন করতে করতে বছর ঘুরে আসে। জন্মদিনের মতো হারানো দিনটিতে কষ্টগুলো বুকের গভীরে জাপ্টে ধরে। তবু খুজেঁ পাওয়া যায়না। যে হারিয়েছে সে তো গ্যাছেই; আর যারা তারা অপেক্ষায়, তারা ?

আমার ব্যক্তিগত জীবনের একটা ঘটনা, কখনো ভোলা এটা সম্ভব না। আমার ছোটটা, প্রচন্ড দুরন্তপানার কাছে বাবা-মা-ও মাঝে মাঝে হিমশিম খেতো, তখন ও কত ক্লাশে পড়ে ? ক্লাশ নাইন কি টেন। বাবা কি কারণে রাগারাগি করেছেন, ও সকালে স্কুলে গ্যালো, দুপুর - বিকেল - সন্ধ্যা ও আর ফিরে এলোনা। রাত যখন একটু বাড়লো বাবা অফিস থেকে তখনও আসেননি, আমি তখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেবো। পুরো তন্ন তন্ন করে খোঁজা; কোথাও নেই, উদ্বগ্নিতা, আতংক, ভয় সবকিছু তখন একসাথে। রাত বারোটার উপর, বাবার কলিগরাও খুঁজতে বেরিয়ে গেলেন। মা’ এর কান্না আর তার আশংকা ‘ওকে ছেলে ধরারা নিয়ে গ্যাছে’; আমার মাথায়ও ভর করলো, যদি সত্যি তাই হয় তাহলে তো ওকে আর কখনোই দেখতে পাবোনা, ও কি আর ফিরে আসবে, যদি না আসে, কোথায় থাকবে - এরকম হাজারো কতশত ভয় মিশ্রিত প্রশ্ন। অবশ্য পরে ওকে খুজেঁ পেয়েছিলাম।

আজও যখন রাস্তায় এভাবে “নিখোঁজ” শিরোনামের পোষ্টরটি চোখে এলো, সেদিনকার সেই ক্ষনিকের হারিয়ে ফেলা আমার ছোটটার স্মৃতিগুলো ভেসে এলো, ওতো এখন চাকরী করছে - বড় হয়েছে, কিন্তু পোষ্টারের সাথে লেগে থাকা হারানো পরিবারটির উদ্বিগ্নতা, ভয়, স্নেহ, মায়া আর ভালবাসা - এটার কতটুকুই আমি অনুভব করতে পারি বা আমরা পারি ?

মাঝে মাঝে ভাবি; আমি নিজেই হারিয়ে যায়, নিরুদ্দেশ হোই - স্বইচ্ছায়; কেউ আমাকে যেনো চুরি করতে না পারে।
আমাকে নিয়ে কেউ কি কখনো “নিখোঁজ সংবাদ” পোষ্টার ছাঁপবে ?
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×