ঘড়ির কাটায় তখন রাত ১১টা; বছরের শেষ দিন, ইতোমধ্যে সবজাগাতেই কাউন্টডাওন শুরু হয়েছে, ৫৯ – ৫৮- ৫৭ ... এভাবে মিনিটের হিসেব ..কতটা সময় পর বেজে উঠবে ২০১০ এর প্রথম ঘন্টাটা, চারদিক উল্লসিত হবে, হৈ-হুল্লোর ... তার আগেই ২০০৯এর পুরো ১২’টা মাসের এক বিশাল চ্যাপ্টার ক্লোজ হয়ে যাবে।
আমিও তখন টেলিভিশনের সামনে, ২০০৯ এর বিশেষ ঘটনাগুলো একে একে স্লাইড শো’র মত করে চোখের সামনে টেনে আনছে টিভি কর্তৃপক্ষ। ঝাপসা চোখে তার কিছুটা দেখছি বাকীটা নি:শব্দে এড়িয়ে যাচ্ছে। আমি যেখানটায় বসা ঠিক তার পাশেই বাবা শুয়ে আছেন। শীতের চাঁদরে পুরোটা শরীর ঢেকে রেখেছেন শুধু মুখ আর চোখ বাদে। আমার চোখদুটো বারবার চলে যাচ্ছিলো তার চোখের উপর। ডান হাতটা তার মাথার অল্প কটা চুলের উপর রাখতেই, বাবা ফিরে তাকায়। “খোকা খেয়েছিস ? সেই সকালের পর থেকে তো আর কিছুই খাসনি” –‘জ্বী বাবা, খেয়ে নেবো’ । ঠিক এ সময় বাড়ীর সামনের রাস্তা সোজা একটা ৩১ রাতের শেষ উৎসবের ছেলেমেয়েরা সশব্দে গাড়ীগুলোতে হর্ণ বাজিয়ে চলেছে। বাবা আমার কথা ঠিকমত শুনতেই পারেননি, অন্যমনস্কতায় শীতের চাঁদরে আবার ঢেকে গেলেন।
অফিস থেকে বাসায় ফিরেছি, তারপর ফ্রেশ হতে হতেই রাত ১০টার বেশী। বাবার কাছে সেই তখন থেকেই বসা। শুধু একটা ফতুয়াতে এখন কিছুটা ঠান্ডা লাগছে, যদিও বাবার জন্য সব দরজা-জানালা কোথাও কোনোটা খুলে রাখার জো নেই, তারপরেও আজ বাইরে বেশ ঠান্ডা ছিলো, ঘরের ভেতরও তাই। অফিসেই গিয়েছিলাম বিকেল ৫টার পর। এতোপরেও যেতে হয়েছিলো, কেউ এতটুকুন সৌজন্যবোধে বলেনি “থাক, আজ আর এসে কি হবে, সময় তো এম্নিতেই শেষ” কর্পোরেট ভদ্রতায় বোধহয় ওই সৌজন্যবোধের যথেষ্ট অভাব আছে।
আমার বাবা। আজ ছ থেকে সাত বছর হতে চললো পঙ্গুত্বের এক অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছেন। ২০০৩ সালের কথা, তখন বাবা একটা জরুরী কাজে ঢাকা থেকে বাড়ীতে গিয়েছিলেন যশোরে। সদ্য অবসরে এসেও পরিবারের কথা ভেবে আবার একটা চাকরীতেও জয়েন করেছেন ততদিনে। সেই চাকরীর বয়সও খুব বেশী দিন হয়নি, তার আগেই কোনকিছু ভাববার সুযোগটুকু না দিয়ে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গ্যালো। যশোরেই ‘ব্রেণ স্ট্রোক’ করলেন ডাক্তারদের ভাষায় ‘ব্রেণ হেমারেজ’, ৭২ঘন্টা ক্লিনিক্যাল অবজারভেশনে রাখা হলো, তখন তার জীবন বলতে শুধু প্রাণটুকুই ছিলো। আমরা, মানে ভাই – মা আর আমি খবর পাওয়া মাত্রই চলে গেলাম যশোরে। যা দেখেছিলাম, বাবা’র হাত – পা হাসপাতালের বেডের সাথে বাঁধা, মুখের বা পাশ’টা একদিকে বাঁকা, কথাও ঠিকমত বলতে পারছিলেন না, মা’কে চিনতে পারেননি, আমাদেরকেও না ... থাক সে কথা, এগুলো বহুদূরে যেতে হবে। ২৪ঘন্টা পার হলে ডাক্তারদের বিশেষ পরামর্শে প্লেনে আনা হলো ঢাকা’তে, এখানে শুরু হলো নতুন করে চিকিৎসা, এরপর প্রতিটি সেকেন্ড আমাদের পুরো পরিবারের জন্য কত’টা উদ্বিগ্নতা ছিলো হয়ত কথা বা লেখার ভাষায় তার প্রকাশ সেভাবে করা যাবেনা। আইসিউ১, আইসিউ২ এবং আইসিউ৩ এভাবে মাসখানেক তারপর কেবিন, কেবিনে ছিলো প্রায় মাস ছ’য়েকের মতো। বাবা আস্তে আস্তে শারীরিক সুস্থতা ফিরে পেতে থাকলেও তার শরীরের বা’পাশ হাত ও পা দুটোই অচল হয়ে যায়। আমরা বাবাকে ফিরে পাই এটাই আমাদের স্বান্তনা, আল্লাহ’র অশেষ কৃপা।
২০০৩সাল, কলেজ পাশ করে ইউনিভার্সিটি’র অপেক্ষায়। ছোটটা’র এইচএসসি পরীক্ষা। জীবনের কঠিন মুহুর্ত, বাড়ীতে মা একা, আমি হাসপাতালে দিন-দুপুর-রাত। এভাবে চলে গেলো হাসপাতালের ছ’টি মাস বা তারও বেশী। আর্থিকভাবেও তুলনামূলক সঞ্চয় ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকলো, উপার্যনক্ষম বলে আর কেউ রইলো না। পড়াশোনা অথবা চাকরী ? দুটো প্রশ্নে এক সিদ্ধান্ত ! বেছে নিলাম চাকরী। শুরু হয়েছিল জীবনের অন্য একটি অধ্যায়।
সেদিনের বাবার অসুস্থতা তার হাসপাতালের সময়কালীন আমাদের খুব কাছে থাকা, অনেকটা একই প্রাণ হয়ে গিয়েছিলাম, তাই অসুস্থতা সেরে বাড়ীতে নিয়ে এলেও সবসময় চোখে চোখে রাখা হোতো। অফিসে এসে ফোন, দুপুরে, ফিরবার সময়-একটা রুটিন দাড়িয়ে গ্যালো। বাবা’র প্রতি যে ভালবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ সেখান থেকে নতুন যে সম্পর্কের সূচনা হলো, তাতে অনন্ত এতটুকুন উপলব্ধি হয়েছিল, পৃথিবীতে বাবা এবং মা’ই সব, এক মুহুর্তও এই দুজন’কে ছাড়া নয়।
অন্যদিনের মত কাল সকালেও অফিস টাইমের হিসেবে মায়ের নাস্তার আয়োজন, বাবা’র ওই সময়ে ঘুমিয়ে থাকা, ছোটটা ততক্ষণে অফিসে রওনা দিয়েছে। আমি বের হবো হবো প্রস্তুতি, ঠিক এ সময় বাবার অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লো মায়ের চোখে। মা’ বাবাকে নাস্তা করিয়ে দিলেন। কিন্তু বিপত্তিটা ধরা পড়লো তখনই নাস্তা সেরে উঠতেই আবার জিজ্ঞেস করছেন ‘নাস্তা করেছেন কিনা’, ‘সকালে বাথরুমে গিয়েছিলেন কিনা’, ‘গত রাতে ওষুধ খেয়েছিলেন কিনা’ ইত্যাদি। তাড়াতাড়ি ব্লাড প্রেসার মেপে দেখি প্রেসার অনেক বেশী। সকালের ওষুধ যে কি খেতেন সেটাও মনে করতে পারছেননা। ওষুধ খাইয়ে শুইয়ে দিলাম, কিছুক্ষণ পর পরই প্রেসার মাপতে বলছেন, যতই বলছি এইতো মিনিট দুই আগে মাপলাম, তিনি বলছেন ‘কোই?’ মানে কিছুতেই স্মরণে আনতে পারছেন না। আমি কিভাবে বলবো, ঠিক ও সময় বাবার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিলো না। বাবাকে হাসপাতালে নিয়েছিলাম, ডাক্তার সাহেব ওষুধ দিলেন, বাবাকে আবার বাড়ীও নিয়ে এলাম।
আর অল্পক্ষণ বাকী ছিলো রাত ১২টা বাজতে, কতজনে হয়তো আগেই উইশ ম্যাসেজ পাঠাচ্ছে, মোবাইলে এসএমএস টোন বাজছে তাই। বাবার পাশেই বাসে থাকি অনেকক্ষণ। আস্তে আস্তে বাবা’র চোখদুটোতে ঘুম জড়িয়ে এলে উঠে আসতেই, আস্তে করে বাবা বলে বসেন “খোকা, এটা সেই তোকে দেয়া আমার ফতুয়া’টা না !, অনেকদিন পরিসনি, তাই না? বাবা’কে আমার দূর্বলতা বুঝতে দেবার আগেই রুম থেকে বেরিয়ে আসি।
বাইরে ততক্ষণে ডিসকো গানের আওয়াজ বাজছে, বন্ধ জানালা দিয়েও তা ভেতরে আসছিলো। মনিটরের সামনে বসে থেকেও কাউকে শুভেচ্ছা বাণী পাঠানো হয়নি, ইনবক্সের আনরিড ম্যাসেজগুলো থেকে প্রথম দিকের দু-একটা ম্যাসেজ পড়ে রিপ্লাই বাটন প্রেস করেছি, কিন্তু রিপ্লাই দেয়া হয়নি। সরি বন্ধুরা।
সকালের নিয়মমাফিক রুটিন অফিস। রাস্তায় বেরিয়ে তেমন কোন জ্যাম দেখিনাই আজ। তুলনামূলক খালি বাসের একটা জানলার পাশের সিটে বসে, অল্পদূর যেতেই বাবাকে ফোন দেই ‘বাবা, আজ সকালে নাস্তা করেছো ? কি দিয়ে করেছো’ .. বাবা মুখস্থ বলার মতো গড় গড় করে বলে দিলেন বিস্তারিত বিবরণ … আমি শুধু বলেছি ‘বাবা, ঠিক আছে, আর বলতে হবেনা’ বাবা’র চাপা কন্ঠস্বর গাঢ় হবার আগেই ফোনের লাইনটা কেটে যায়।
৩১ডিসে: রাত, এবং-অত:পর ১জানু: সকাল, অন্যকোন দিন বা রাত থেকে আলাদা করে দেখবার সময় বোধহয় আমার এখনো আসেনি, বাড়তি কোন উচ্ছাস বা পুরোনোকে পেছনে রেখে আসবার বিষাদও তেমন সক্রিয় নয়।
প্রতিদিনকার জীবন চলে, তাই চলি বা চলতে হয় – এটাই সুখকামনা যেন অন্তত আজকের প্রতিটি দিনই সর্বোচ্চ ভাল থাকুক বা ভাল কাটুক – আমার বা আমাদের সীমাবদ্ধতায়।
সকলের প্রতি রইল শুভকামনা ও নতুন বছরের শুভেচ্ছা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

