আজ থেকে তাও প্রায় বছর সাতেক আগে যখন বাড়ীতে প্রথম কম্পিউটার আনা হয় সে সময় বিক্রেতার দেয়া কিছু ভিডিও আর অডিও গানের মাঝে এল্টন জনে’র স্যাক্রিফাইস গানটাও ছিলো। অতটা না বুঝলেও দু-একবার চালিয়ে এতটুকুন বুঝেছিলাম গানটা’র বেশ কয়েক জাগাতে ‘স্যক্রিফাইস’ শব্দটা রয়েছে আর সেখানেই গায়ক এমন দরদী সুর তুলেছেন কি জানি এক বেদনা আর কষ্ট তাতে মিশে আছে। আগেই বলেছি এটা প্রায় বছর সাতেক আগের অনুভূতি, তখনও ব্যক্তিজীবনে স্যক্রিফাইস শব্দটার সাথে পরিচিত হবার কোন তাগিদ-ই অনুভব করিনি। প্রয়োজন হয়নি।
এদিকে আমার কম্পিউটারের বয়স বাড়তে থাকে, অনেক সমমানের আধুনিক-পুরোনো গানের সম্ভারে কবে যে ‘স্যক্রিফাইস’ গানটাকে হারিয়ে ফেলেছিলাম সে বোধটাও এসেছিলো অনেক পরে। যখন খুঁজতে গিয়ে আর পাইনি তখনই মনে হয়েছিল আমার এসব সব গানগুলোকে বিসর্জন দিতে পারি শুধু ওই গানটাকে পাওয়ার বদলে। অজান্তেই ‘স্যক্রিফাইস’-এর সাথে সখ্যতা তখন থেকেই।
জীবনের গতি থেমে থাকেনি, তাই না পাওয়ার বেদনাকে সঞ্চয় করে নতুন স্বপ্ন দেখাদের দলে যোগ দিয়েছিলাম। এরপর থেকে শুরু হয় জীবনের আরেক অধ্যায়, সম্পূর্ণ অচেনা-নতুন এ পথ। যেখানে কিছু পাওয়ার আগেই চিন্তা করতে হয়েছে আমি কতটুকু ছাড় দিতে পারি, ত্যাগ স্বীকারের হিসেবে আমি কতটা এগিয়ে কিংবা বিসর্জনকারী হিসেবে আমার সুখ্যাতি কতটুকু ! প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন কিছুদিনের জন্য স্থগিত তখন, অবসর-আনন্দ-হাসি সবকটা’কে ছুটি দিয়ে ‘বিসর্জনের’ পেছনে একক সময় দেবার পালা। আফসোস-অনুতাপ পাশাপাশি সহবস্থানে। আর তার বড় সাক্ষী সময়। এগুলো বেশ আগেকার কথা। আমার এ অতীতকে সবার সাথে পারিচয় করিয়েছি “স্ট্রাগল” নামের একটা কঠিন ক্রিয়াবাচক শব্দযোগে।
< মাঝের অনেকটা সময় স্কীপ করে গেলাম ! >
ছেলেটার সাথে মেয়েটার পরিচয় বছর খানেক হবে কিংবা তারও বেশী । অথচ তখনও পর্যন্ত ওরা কেউ কাউকে দেখেনি। ফোনে কথা হত। কথা ছিলো মেয়েটা ঢাকায় ফিরলে ওদের প্রথম দেখা হবে। দুজনেরই অপেক্ষা। ক্যালেন্ডারে কাটাকাটি করার অভ্যেস’টা ছেলেটার কাছে পুরোনো, সেই ছোটবেলায় পরীক্ষার সময়ের হিসেব থেকে শুরু করে অনেক সময়ই সে এমনটা করেছে।
অফিসের ডেষ্কে ‘স্যাক্রিফাইস’ গানটা বাজছে, অবসন্নতায় চেয়ারে শরীরটা হেলে দিয়ে সেল ফোনের পুরোনো কিছু এসএমএস পড়তে পড়তেই ছেলেটা ফোন দেয় তাকে -
তুমি কি ব্যস্ত ?
- হুমম, কেন ?
কোথায় এখন তুমি ?
- এইতো ট্রেনিং পোগ্রামে, কিছু বলবে ?
না ঠিক আছে, তাহলে পরে ফোন দেই !
(মেয়টা ওপাশ থেকে লাইন’টা ডিসকানেক্ট করে)
মেয়েটার রেজাল্ট হয়ে গেলে ঢাকায় ফেরার কথা, অবশ্য তখন আরো ব্যস্ত থাকতে হবে তাকে। স্কলারশীপের জন্য এপ্লাই, এডমিশান - অনেক ঝক্কি, পারবে কি মেয়েটা একদিন সময় করতে ? দ্বিধা-দ্বন্দের দোদুল্যতায় কোন কারণ ছাড়াই মেয়েটা’কে টেক্সট করে “মিস ইউ”
< আরো কিছুটা সময় স্কীপ করে গেলাম ! >
মেয়েটা তখন ঢাকাতেই। দেশের বাইরে যাবার ব্যপারটাতে সে তখন দ্বিগুণ ব্যস্ত। যেবার ছেলেটা উইকেন্ডে শহরের বাইরে গেল সেদিনই সে তাকে দেখা করতে বলে। দেখা হয়না, ছেলেটার ফিরে আসতে সময় লাগে। তার কিছু পরে বদলী হয়ে তাকে শহরের বাইরে চলে যেতে হয়। মেয়েটার গোছানো প্রায় তখন শেষের দিকে।
মফস্বলের যে জাগাটাতে ছেলেটা থাকতো, কিছুটা সরু রাস্তা পেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠতে হত, আবার সেখান থেকে রিকশা তারপর পাবলিক বাসে অফিস। আচমকাই ফোনটা বেজে উঠতে তাকিয়ে দেখে মেয়েটার ফোন ...
কেমন আছো ?
- এইতো কেটে যাচ্ছে
কেটে যাচ্ছে মানে ? তুমি সবসময় এমন উদাস টাইপ কথা বলো কেন ? আমার ভাল লাগেনা
- তোমার তো কোন সময়ই ভালো লাগতোনা
- ফোন করেছো কেন ?
একটা সারপ্রাইজ দেব তোমাকে
- আমাকে ?
হুমম !
- কি
অনুমান করতো
- না পারছিনা, তুমিই বল
কোথায় তুমি এখন
- এইতো রিকশা থেকে নেমে, বাসের অপেক্ষায়
জানো, আমার না ভিসা হয়ে গ্যাছে, সব রেডী, কাল ফ্লাইট
বাসার সবাই খুব ব্যস্ত, জামাকাপড়-বই,খাতা কত্ত সব হাবিজাবি
এত্ত ওজনের ব্যগটা নিব কিভাবে বলোতো ...
(মেয়েটা এক লাইনে অনেক কথা বলতে থাকে, ছেলেটা শুনতে পাচ্ছে-অস্পষ্টতায় শুধু একটা কথায় বারবার ফিরে আসে “কাল ফ্লাইট”)
হ্যালো, হ্যালো এই তুমি শুনছো
- হুমম, বলো . তোমার ফ্লাইট কখন
এইতো খুব ভোরে
- তোমার অনেকদিনের স্বপ্ন তাইনা ?
হ্যা, তুমি খুশী হওনি
- হু, অবশ্যই হয়েছি
তোমার কি মন খারাপ ?
- না, মন খারাপ হতে যাবে কেন ?
- আমাদের আর দেখা হলনা, তাইনা ?
হুমম, তুমি কি কষ্ট পাচ্ছো ?
- আমি তোমার সাথে একবার দেখা করতে চায়, শুধু একবার; তোমাকে সামনে থেকে দেখতে চায়, প্লিজ !
তুমি না আমাকে প্রায়ই বলতে, জীবনে অনেক স্যাক্রিফাইস করেছো তুমি, তোমার অনেক সাহস-তোমার সব প্রিয় মানুষদের জন্য তুমি স্যাক্রিফাইস করতে জানো !
- হ্যা, বলেছিলাম
তাহলে, আমার জন্য না হয় এতটুকুন স্যাক্রিফাইস করলে, দেখা হলোনা তাতে কি !
(কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকা অত:পর একটা দীর্ঘশ্বাস)
- ওকে !
- শোনো একটা শেষ কথা, আমাকে কি সারপ্রাইজ না স্যাক্রিফাইস - কিসের জন্য ফোন করেছিলে ?
(মেয়েটি কোন কথা বলে না)
(ছেলেটি লাইনটি ডিসকানেক্ট করে)
শহরের চৌরাস্তার এই মোড় থেকে পশ্চিমের বাস ধরে অফিসের পথ। সকাল থেকেই মেঘলা আকাশ আর গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। সময়ের টানাটানিতে ছাতাটাও আনেনি ছেলেটা। পূবের পথ ধরে সামনে এগুলেই একটা শুকিয়ে যাওয়া নদী সেখানে। মোবাইলটা তালুবন্দী করেই ছেলেটা পূবের পথে হেটে চলে, ঘড়ির সময় তখন ৯টা বেজে ৪৩ মিনিট !
Elton John - Sacrifice
উৎসর্গ : একজনকে
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা আগস্ট, ২০১০ রাত ১:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



