somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... - আজও আমার কোন বোন নেই”
ওর সেই কাঁদবার শব্দ কখনো পাইনি, কিন্তু কখন কিভাবে যে সেই আপুটার জন্য আনমনে বহু শতবার একা একা চোখের জল ফেলেছি, ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেদেঁছি আবার চোখের জল গালের স্পর্শে আসতেই তা মুছেও ফেলতাম । হা হা হা, বড্ড হাসি পায় এখন, কত পাগলামী-ই না করেছি। প্রতিবেশীর কোন পিচ্চি বোন থাকলে তাকে ধরে নিয়ে আসতাম, লুকিয়ে লুকিয়ে। নিজের কাছে রেখে দিতাম ফেরত চাইতে গেলেই বিপত্তি ঘটতো, জগৎজাড়া কান্না জুড়ে দিতাম, আমার সেই কান্নার শব্দে সেই বোনটাও কেঁদে উঠতো। সবাই হাসতো তখন কিন্তু আমি কিছুই বুঝতাম না।

বড় হতে লাগলাম, একটা শূন্যতা ছিলো সবসময়, নিজের কাছে অনেককিছু থাকবার পরেও কিছু একটা না থাকার তীব্র অভাববোধে অনেক কষ্ট পেতাম। নিজেকেই সামলাতাম। কেউ বুঝুক আর নাই বুঝুক।

...................................................................................................
যেখানটায় কাজ করি, ছোট্ট একটা অংশ আছে “কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি”, খুব বেশী পরিসরে না হলেও সামান্যই যা, তাতে যারা অর্থের অভাবে চিকিৎসার অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন না, তাদের সাহাযার্থে কিছু করার প্রচেষ্টা।

বেশ কয়েকমাস আগের একদিন, আমি ডেস্কে কাজ করছি; একটা ছোট মেয়ের কন্ঠ শুনতে পেলাম আমার সামনের ওয়ার্কস্টেশনে বসা ম্যানেজারের সাথে এক আলাপচারিতায়। মনিটর থেকে চোখ ফিরিয়ে একবার দেখে নিলাম। অনেক অনুরোধ ছিল, আবদার ছিলো যেন শত প্রচেষ্টাতেও এই কাজে তাকে সাফল্য পেতেই হবে। মেয়েটার বয়স কত হবে ? হিসেবে ইন্টারমিডিয়েট পড়ে এইরকম।

প্রায় ৫মাস পর। মেয়েটার চেহারা মনে ছিলোনা। আজ আবার এলো। ও একটা এপ্লিকেশন দিয়েছিল সেবার, ডোনেশন বক্স বসানোর জন্য। কিন্তু সেটা বসবে তাও প্রায় বছর খানেক পর। কিন্তু হঠাৎ আজ এলো কেন ? প্রশ্ন’টা করতেই মেয়েটা গলা ধরে এলো, দু-একবার চোখের পাতা বন্ধও করলো। স্পষ্ট দেখতে পেলাম মেয়েটা খুব সযতনে চোখের জল মোছার চেষ্টা করছে। ভারী আর কাঁপা গলায় বলতে না চাইলেও, জানালো এপ্লিকেশন’টা উইথড্র করতে এসেছে। আর বেশী কিছু জিজ্ঞেস করিনি, বুঝতে পেরেছিলাম।

কি অদ্ভূত একটা মায়া তার চোখে। তার ভাইটি মারা গিয়েছে এই ডিসেম্বরে। ক্যান্সার বাসা বেধেঁছিলো। অনেক চেষ্টাও করেও কিছুই হয়নি। যেভাবে বলছিলো কথাগুলো মনে হলো, তার ভাই তার সাথেই রয়েছে। আর তার ভাই যে নেই একথা সে এখনও বিশ্বাস করেনা, সবাই নাকি মিথ্যে বলে।

পেন্ডিং ফাইলটা থেকে ওর দেয়া এপ্লিকেশনটা বের করলাম, বললাম “ঠিক আছে, আমরা ব্যবস্থা নিবো” মেয়েটা উঠলো, কি ভেবে আবার পেছনে দাড়ালো। শুধু বললাম “আপু, তুমি এটা নিয়ে মন খারাপ করোনা, পৃথিবীটা এমনই – আমাদের সবাইকেই একদিন যেতে হবে।” আমাকে কিছু বলতে গিয়েও বললোনা। চলে গেল। ভাইয়ের ছবি দেয়া এপ্লিকেশন পেপারটা তখনও আমার হাতে, “এক্সপায়ার্ড” শব্দটা বড় বড় অক্ষরে লিখে অফিস এটেন্ডেন্টকে ডাক দিলাম।

মেয়েটা চলে গেলে, অসম্ভব এক শূণ্যতা নিজের পাজরে গেঁথে গেল, কাউকে বোঝাবার মত নয় সেই লুকানো ব্যথাটা, কর্পোরেট কালচারে খুব বেশী আবেগী হওয়াটাও ভাল না। সে দীক্ষাই নিজেকে সামলে নিতে নিতে শুধু একটা কথাই ভাবলাম “আজও আমার কোন বোন নেই”
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29288183 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29288183 2010-12-12 13:29:04
ভালবাসার গল্প
আজ ৩০ অক্টোবর ২০১০. সব সাধারণ সাদামাটা দিনগুলো থেকে আজকের দিনটা একদমই আলাদা। অন্তত আমার চোখে আর মনে। আজকের আগের সময়টা হিসেবের কড়া দর কষাকষিতে, কি হবে কি হবেনা, সেই সাত পাঁচ ভাবতেই যে ঝক্কি পেরুতে হয়েছে, এখন অনেকটাই তার থেকে নির্ভার। তবুও এক আশংকা থেকেই ছিলো, শেষ মুহুর্তে যেভাবে ভেবে রেখেছি সব কিছু অবিকল ঠিক থাকে যেন, দু্-একটা ব্যতিক্রম হতেই পারে, কিন্তু যেন এলোমেলো না হয়, সে ভয় ও ছিল অল্পবিস্তর ।

সকালেই অফিসে বেড়িয়েছি, কিছু কাজে বাইরে যেতে হল। যত তাড়াতাড়ি পারা যায় কাজ শেষ করে আবার ফিরে আসার একটা তাড়াও ছিল। কিছুটা টেনশন কাজ করছিল। মুঠোফোনে প্রায় সময়ই ব্যস্ত ছিলাম। কোথায়-কিভাবে-কখন, যদিও এগুলো আগেই নিশ্চিত করা হয়েছিল, তবুও আবার জেনে নিচ্ছিলাম। আমাকে অফিসে ফিরে আবার বের হতে হল। খুবই খারাপ লাগছিল, হাতে বেশী সময়ও ছিলনা। তবুও এরই মাঝে সিনেপ্লেক্সের দুটো টিকেট কেটে রাখলাম। শো টাইম – দুপুর ১.০০

উত্তেজনা, ভয় আর কি সব উদ্বিগ্নতায় একটা বাড়তি চাপ ভর করে আছে অনেকক্ষণ ধরে। কাউকে প্রকাশ করার মত নয়, কিন্তু আনন্দটা ধরে রাখার মতও না। যেন তীর্থের কাকের মত অপেক্ষা।

আমি আগেই পৌছে গেলাম, ও তখনও রাস্তায়। এরকমটা শর্ত ছিল, ও আগে আসবে এবং আমাকে খুঁজে বের করতে হবে। আমিও রাজী। বেশ রোমাঞ্চকর ব্যপার, যেন সাগরের ভেতর থেকে মণি খুঁজে বের করা। তবুও যে মণির সন্ধান আমি আগেই পেয়েছি তাকে চিনে নিতে যে খুব একটা কষ্ট হবেনা, সে বিশ্বাস ছিলো। তাই ও এসে যখন আমাকে ডাক দিল, পড়লাম বিপদে – একবার ডান-বাম, এদিক সেদিক, নাহ; কোথাও ওর টিকিটুকুও খুজেঁ পাচ্ছিলাম না, ও ঠিকই আমাকে অনুসরণ করছিলো।

একদম উপরের তলায় চলে এলাম, এখানেই সে আছে, আমি খুঁজছি হন্যে হয়ে, কত প্রতীক্ষা আর অপেক্ষা যেন শত সহস্র মাইল পথ পেরুলেও যে অপেক্ষার শেষ নেই, সেই অপেক্ষার পালা আজ শেষ হতে গিয়েও শেষ না হওয়ার একটা তীব্র – সূক্ষ্ম যন্ত্রণা নিজের মাঝে পেয়ে বসলো, এরপরেও যখন ওকে ফোনেও পাচ্ছিলাম না, দুরুদুরু বুকে পায়চারী করেই চলেছি।
তখন কয়টা বাজে, সেটা দেখতে বেমালুম ভুলে গেলাম, ও আমার সামনে আর আমি ওর সামনে। মানে দুজনেই মুখোমুখি। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতায় থেকে ওকে একটা অনেক করে বকা দিলাম, আমাকে এভাবে আড়াল করার জন্য। খুব সম্ভবত তখন দুপুর ১.৩০এর কিছু বেশী।

মিলি। পরিচয় এ নামেই। অনেকদিনের চেনা। কিন্তু আজই প্রথম দেখা ওর সাথে। পরিচয়ের হিসেবটাও প্রায় বছরের বেশী সময়। শুধু কথাই হয়েছে, তবু কোনদিন দেখা হয়নি । তাই আজ যখন দীর্ঘ সময়ের পর ওকে খুব কাছ থেকে দেখবার সুযোগ এল, যতক্ষণ পর্যন্ত না দেখা হচ্ছিল ততক্ষণই দীর্ঘ উৎকন্ঠায় অপেক্ষায় ছিলাম ।

খুব কাছ থেকে দেখলাম ওকে, এক অপরুপ বিষ্ময়ে, যেন এ বিস্ময় অনন্তকালের, দীর্ঘ প্রতীক্ষার। ওকে বলবার কিছুই খুজেঁ পাচ্ছিলাম না, অথচ কত কি ভেবে রেখেছিলাম বলবো।

সিনেপ্লেক্সের ভেতরে যাবার আগে পপ কর্ণ আর কোল্ড ড্রিংকস্ হাতে ওকে খুব কাছে থেকে আর একবার দেখলাম। আমার কল্পনা, আমার স্বপ্ন সবগুলো যেন খুব দ্রুত মিলে যাচ্ছে, যেন যাকে চেয়েছি এতদিন সেই এখন আমার খুব কাছে, আমারই পাশে।

সিনেপ্লেক্সে বেশীক্ষণ থাকা হয়নি, ওকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। তখন দুপুর। বসলাম ফুডকোর্টে, কিছুই খাবেনা সে। দুজনেই মুখোমুখি। অনেকক্ষণ চুপ করে থাকা।

ওর জন্য একটা গিফট রেখেছিলাম, চকোলেট বক্স। একটা লাল গোলাপ আর দু-লাইনে কিছু কথা। মিলি’ও আমাকে একটা প্যাকেট দিল। ওর আইডিয়াগুলো ছিল অসাধারণ। ওর অনেক পুরনো কিছু স্মৃতি’র বেশ কয়েকটা আমাকে দিল, যেমন : ফ্রেন্ডশীপ ম্যাসেজ বুক, তিনটা স্টোন আর কিছু একটা।

স্টোন তিনটার দুটোতে আমি ওর নাম লিখে ওকে দিলে ও আমার নাম লিখল তাতে আর আকাঁল একটা লাভ সাইন। আমিও আকঁলাম। তারপর একটা পাথর আমি রেখে আরেকটা ওকে দিলাম, ওর কাছে রেখে দেবার জন্য। আর বাকী থাকলো একটা স্টোন যেটা সম্পূর্ণ খালি। ফ্রেন্ডশীড ম্যাসেজ বুকে ওকে কিছু লিখতে দিলাম ও এত বিশাল কিছু লিখে ফেলেছে, আমি হয়তো তার কিছুই নই। পেছনের পাতায় আমিও লিখে দিলাম, যত নামে ওকে ডাকি সেইসব নামগুলো।

সময়গুলোকে যতই ধরে রাখতে চাইছি, যেন সময় ততই দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে। ঘড়ির কাটায় এগিয়ে যাচ্ছে সেকেন্ড, মিনিট আর ঘন্টার কাটা। আইসক্রিম ওর খুব পছন্দ ছিল। কিন্তু খুব বেশী খেলনা। ওর হাতের তালুতে দুটো ছবি একেঁ দিলাম, একটা ছেলে আর একটা মেয়ে। ও কিছু বুঝলো কিনা জানিনা, আমাকে কিচ্ছু বলেনি।

দুজনেই ফুড শপ থেকে বের হলাম। হাঁটতে হাঁটতে বেশ সামনে গিয়ে মিউজিক ক্যাফেতে বসলাম। জায়গাটা বেশ নিরিবিলি, বাইরের পরিবেশ থেকেও আলাদা। দুপুর গড়িয়ে তখন বিকেল। বাইরের সূর্যের আলো যখন গায়ে এসে পড়ছিলো ঝিকিমিকি রোদে ওকে দেখতেই লাগছিল অন্যরকম। কিছু কথা হয়, নীরবতা থাকে তার থেকেও বেশি।

নুপূর, আমার খুব পছন্দ। ওর তেমন পছন্দ ছিলনা। একবার বলেছিলাম, সেও অনেক আগের কথা, নুপুর পড়তে। রাজী হয়েছিলো। আজ যখন এলো ওর দুপায়ে দুটো আলাদা নুপুর ছিলো। আমি প্রায় রাতে যখন ওকে স্বপ্নে দেখতাম, দেখতাম ও আস্তে আস্তে ধীর পায়ে আমার খুব কাছে আসছে নুপুরের একটা রিমঝিম শব্দ পেতাম, বিভোর হবার মত এক অপূর্ব মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়তাম। কল্পনায় যে নুপুরকে বারবার দেখার চেষ্টা করেছি সেই নুপুর পায়ে আমার প্রিয় আমারই সামনে। যেন স্বপ্নকে ছোঁয়া যায়, দেখা যায় এবং অনুভব করা যায় হৃদয়ের স্পন্দন থেকে।

ওকে পৌছে দিতে হবে। সেই পথটুকু ওর সঙ্গী হয়েছি। যখন বের হলাম তখন পড়ন্ত বিকেল। মিষ্টি রোদের লুকোচুরি খেলায় যখন ডুবন্ত সূর্যের হলুদ আভা ওর শরীরে পড়ছিল, যেন এক অপরুপ প্রকৃতির বিচিত্রতা খেলা করছিল সেখানে। চোখ ফেরানোই দায়।

বিদায় বেলাটা বেদনার। কতটা সময়ের জন্য খুব কাছে আসা আবার যার যার গন্তব্যে ফেরা, যেন কিছুতেই ছেড়ে যাবার জন্য নয়। এতদিন পর যখন ওকে এতটা কাছে পেয়ে আবার ফিরে আসতে হচ্ছে, কিছুতেই মন সায় দিচ্ছিলনা। রিকশায় উঠিয়ে দিয়ে ফিরে এলাম।

রাতে যখন বাড়ী ফিরে এসেছি, তখনও ওর হতের স্পর্শ, ওর কথা, ওর হাসি সবকিছু অবিকল আমার চোখের সামনে ঘটে যাচ্ছিলো। যেন এক সূক্ষ্ম অনুভূতিতে ওকে নিয়ে স্বপ্ন দুয়ারে পৌঁছে গিয়েছি, সেখান থেকে কিছুদূর এগুলেই আমাদের দুজনার স্বপ্ন রাজ্য, যেখানে ও স্বপ্নের রানী, আমারই মনের রাণী।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29267140 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29267140 2010-11-05 13:13:29
আমার প্রথম এবং শেষ ভালবাসা
বিধাতা আমাকে একজনের মুখছবি আঁকাবার জন্য বললেন, আমি যেন হুবহু তাকে আঁকতে পারি। শর্ত জুড়ে দিলেন, যাকে খুব আপন ভাবা যায়, যাকে ভালবাসি, যাকে নিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি, যার সুখ-দুঃখে সব সময় পাশে থাকার প্রতিজ্ঞা করেছি তার মুখছবি। নির্দ্বিধায়, বিনা সংকোচে বাধাহীনভাবে এঁকে ফেললাম আমার ভালবাসার মুখছবি। বিধাতা খুশি হলেন আমার সত্য অংকনে। পুরস্কার স্বরূপ তাকে আমার করে দিলেন। পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল মেয়েটিকে বেছে নিতে বলা হলে আমি তোমাকেই আপন করে নিতাম। আমি আমার এক জীবনের সন্ধান পেয়েছি একজনের মাঝে, যাকে বিশ্বাস করা যায়, ভালবাসা যায়, নিজেকে বিলিয়ে দেয়া যায়। আর সেই মেয়েটি তুমি। আমার প্রথম এবং শেষ ভালবাসা।







]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29264759 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29264759 2010-10-31 23:35:31
ই উ নি ভা র্সি টি আক্ষেপ বলেছি তার একটা যুতসই কারণ ছিল। এখনও আছে। তবে সমেয়র সাথে সে আক্ষেপ উত্তোরণের চেষ্টা চলছে তাই আপাতত আক্ষেপ নিয়ে কোন বাড়তি অনুতাপ করার ইচ্ছে তো নেই বরং অন্য কিছু উপভোগ করা যাক।

এই লেখার শিরোনাম ‘ইউনিভার্সিটি’। স্কুল – কলেজের গন্ডি পেরুলেই একজন শিক্ষার্থীর বড় স্বপ্ন থাকে একটা ‘ইউনিভার্সিটি’ । লেখাটার এ পর্যায় যদি একটা প্রশ্ন তোলা হয়, আপনার শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে আনন্দময় আর বিশেষ মুহুর্তের সময় ছিল কোনটা ? নি:সন্দেহে ব্যক্তি পার্থক্যে উত্তরের তারতম্য খেয়াল করা যাবে, এখানে সন্দেহের অবকাশ নেই। আমার উত্তরটাই বলি, ইউনিভার্সিটি লাইফ বলে কিছুই ছিলনা, ইন্টারমিডিয়েট লাইফ’টা কেটেছে ছন্নছাড়ায় আর স্কুল জীবন’টা পার করেছি বোঝা-না বোঝার আনন্দময়তায়।


স্কুল জীবনের একটা ঘটনা প্রায়শই মনে পড়ে, :

বৃষ্টিতে ভিজেঁ ফুটবল খেলার আনন্দটাই অন্যরকম আর বয়স’টা যদি হয় ১২ কিংবা ১৩ তাহলে কি আর কিছু বলার অবকাশ আছে ? যে বয়সে দূরন্তপনার সীমাহীন কোন উচ্ছাসে সব বাধাকেঁই উপেক্ষা করা যায়, এমন সময়ে স্কুলের মাঠে ঝুম বৃষ্টিতে এক ফুটবল পায়ে নিয়মের তোয়াক্কা ছাড়াই ১৫-১৫ = ৩০জনে মিলে খেলার আনন্দ স্মৃতি কি কখনো ভোলা যায় ? না যায় না ? আরো ভোলা যায়না যদি সবকিছুকে ছাপিয়ে স্কুলের হেডমাষ্টার স্যারের হাতে বৃষ্টিতে খেলার অপরাধে কড়া শাষনের মুখোমুখি হতে হয়।

খেলেছিলাম যখন, তখন এক বিন্দুই মনে হয়নি কিছু বাদেই আমাদের ভাগ্যে কি ঘটতে যাবে। পক্ষ – বিপক্ষ কোন দলের গোল করার উল্লাস চিৎকার যখন মাঠ পেরিয়ে হেডমাষ্টার স্যারের কানে গেলো, তার কিছু পরেই সাড়ি বেধে স্কুলের বারান্দায় ভেঁজা শরীরে আমরা ২০ কি ২২ জন দাড়িয়ে। অপেক্ষা শাস্তির। বাকীরা পালিয়েছিলো। সবার উৎসুক চোখের কেন্দ্রবিন্দুতে আমরা। স্যারের সেনাবাহিনী নির্দেশ “কানে ধর”, পিটি – প্যারেডে অভ্যস্ত আমরা কালবিলম্ব করিনি সেদিন। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি। এবার “উঠবস” সেটাও শুরু হল। থামার কোন লক্ষণ ছিলোনা। একজন ভেজা বারান্দায় পা পিছলে গেলে উঠবস থামিয়ে আবার সোজা হয়ে দাড়িঁয়ে থাকা। স্যারের পুন: নির্দেশ “রুকু দে” এবার সত্যিই আমার হতভম্ব, এরকম শাস্তি কখনো পেয়েছি বলে মনে পড়ছিলোনা তাই অনভ্যস্ত এ শাস্তির প্রারম্ভিক প্রস্তুতি নিতে দেরী হতেই ঝপাৎ ঝপাৎ করে যখন বেতের বাড়ি পড়ল, স্যার তখন চেঁচিয়ে বললেন “এই তোরা নামাজ পরিসনা, যেভাবে রুকু দেয় সেইভাবে হ” আল্লাহ’র নাম ছাড়া তখন আর কাউকে মনে পড়েনি, ক্ষণিকের জন্য আব্বার নামও বোধহয় ভূলে গিয়েছিলাম। রুকু অবস্থায় সাড়িতে দাড়িয়ে দ্বিতীয় দফা শাস্তির অপেক্ষা। কিছু বাদেই যখন ‘ঝপাৎ-তপাৎ’ আর সাথে সাথে ‘উহ-আহ’ , ‘স্যার লাগছে’, ‘ওরে আল্লাহ মরে গেলাম’ এমন আকুতি বাক্য সুর কর্ণগহ্বরে প্রবেশ করলো বুঝতে বাকী থাকেনি সাক্ষাৎ কেয়ামত দেখা সময়ের ব্যপার মাত্র। ঠিক তখনই “স্যার .. উহ আহ , স্যার লাগছে স্যার” পশ্চাতদেশের ব্যাথায় তখনও কাতরাচ্ছি, তবুও নিস্তার ছিলোনা। স্যার তখন হুংকার দিয়ে “আজ তোদের যে শাস্তি দিলাম তা শুধু তোরাই দেখতে পারবি, কাউকে দেখাতে পারবিনা, যা এবার” এক দৌড়ে সোজা টয়লেটে, ২০-২২ কি জায়গা হয়? তবুও ঠেলাঠেলি করে একে অপরের দু:খগুলোর ভাগাভাগির পর্ব তখন।


কলেজ জীবনের আরেকটি ঘটনা বলি :

স্বাধীনতা দিবস সেবার। আমি ইন্টারমিডিয়েট পড়ি তখন। কলেজে অনেক আয়োজনের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। উৎসবমুখর এক পরিবেশ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা – বক্তৃতা আরো কি সব জানি। আমরা বেশ কজ’ন অনুষ্ঠানের বাইরে তখন। ভেতরে যাচ্ছি আবার বেরুচ্ছি এই আর কি। মেয়েদের অনন্যা লাগছিলো। ভিন্ন রঙের শাড়ীতে, আসলে সত্যি বলতে কি কলেজ ড্রেসে ওদেরকে যেভাবে সচারচর দেখে অভ্যস্ত ছিলাম সত্যি শাড়ীতে ওদের একদম আলাদা লাগছিলো। আসলে স্বাধীনতা দিবসে যেন নিজেদের মাঝেই এক অফুরন্ত স্বীধনতার স্বাদ পেতে চাইলাম, তাই কেউ কেউ তাদের প্রিয়জনকে নিয়ে খুব সহজেই সটকে পড়লো, পরে শেষ বিকেল অব্দি কলেজ চত্বরে আর কাউকেই তেমন পাওয়া যায়নি।

নিজের কথা বলি, আমি আরো বেশ ক’জন কলেজের মাঠে তখন। চারিপাশের আনন্দ নিজেদের করে নেবার ব্যস্ততায় মশগুল আমরা। দেখছিলাম ঠিক অদূরে দাড়িয়ে থাকা বেশ কজ’ন মেয়ে জটলা করে এদিকেই, মানে আমাদের দিকেই আসছিলো। কিছুটা চাঞ্চল্যতায় আমরাও উৎসুকী হলাম। সামনাসামনি দুটি ছেলে মেয়েদের দল, একটা মেয়েকে রেখেই বাকী মেয়েরা সবাই চলে গেল। আমার সামনে এসে মেয়েটি বাকী ছেলেদেরকেও চলে যেতে বললো। মুখোমুখি আমি আর ও। পেছনে রাখা ওর হাত থেকে একটা লাল গোলাপ সামনে নিয়ে আমাকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বললো “তোকে আমি খুব ভালবাসি, কখনো বলিনি, তুইও বুঝতে পারিসনি, আজ বললাম, নে ফুলটা ধর” গলায় কাঁটা বিধলেঁ যেভাবে ঢোক গেলা যায়না, দম বন্ধ হয়ে আসে আমারও অবস্থা তাই, প্রচন্ড ঘামছি, হাতটা বাড়িয়ে যে ফুলটা নেব মনে হচ্ছিলো হাতে সে পরিমান শক্তিও নেই, চোখের সামানে সবকিছুকেই ঝাপসা লাগছিলো, ওর হাতের স্পর্শে সম্বিৎ ফিরে এলো “কিরে, ফুলটা নিতে বললাম, নিবিনা ?” ‘হ্যা, দে দে, কিন্তু দেখ আমি যে এগুলো নিয়ে এখন ভাবছিনা, কিছু মনে করিস না তুই, তোকে বন্ধু ভাবতে পারি এর বেশী কিছু না ?” অনেকক্ষণ দাড়িয়ে ছিলো ও, চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছিলো। নিষ্ঠুরের মত আমি ওর চোখের জল মুছে দেইনি, ভেবেছিলাম একবার আবেগ তাড়িত হলে সেখান থেকে নিজেকে ফেরাতে পারবো কিনা। কাঁদতে কাঁদতে ও চলে গেলো। ওর দেয়া ফুলটা তখনও আমার হাতে ছিলো।

এরপর অনেকটা সময় কলেজে একসাথে পড়েছি। কথা হত, কিন্তু বেশীক্ষণ না। অনেকদিন পর যখন শেষবারের মত কলেজে গিয়েছিলাম, শুনেছিলাম ওর নাকি বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ওই এলাকায় থাকতো। ভেবেছিলাম দেখা করবো। ইচ্ছে – অনিচ্ছের মাঝে আর কখনো দেখা হয়ে উঠেনি ওর সাথে। সত্যি বলতে আজ ওর নামটাও মনে করতে পারছিনা।


ই উ নি ভা র্সি টি

এবার আসি ইউনিভার্সিটি’র কথায়, ওহো , কিন্তু আগেই বলেছি ইউনিভার্সিটি পড়বার সুযোগ থেকেও হয়নি, ইউনিভার্সিটি জীবনের কোন অভিজ্ঞতাই নেই, নেই কোন জমানো স্মৃতিও । সেহেতু সে স্বাদ থেকে আমি বঞ্চিত সুতরাং ইউনিভার্সিটি পর্ব এখানেই স্টপ। ।

কিন্তু হ্যা এবার একটা সুযোগ হয়েছে । আর আজ ছিলো ইউনিভার্সিটির ওরিয়েন্টেশন
একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে এমবিএ’তে এডমিশান নিয়েছি । আগামী ২ অক্টোবর থেকে ক্লাস শুরু।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29247654 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29247654 2010-09-30 18:30:10
স্মৃতি; ২১ আগষ্ট
আমি তখন কলেজে যাচ্ছি, অফিস শেষে সেদিন আগেই বের হয়েছিলাম। মতিঝিলে তখনও পৌছায়নি, বাসের ঠিক পেছনটায় বসা ছিলাম। অন্য সব দিনের মত রাস্তায় মানুষের ব্যস্ততা চোখে পড়ছিলো। সবকিছু স্বাভাবিক।

শাপলা চত্বরে পৌছাবার বেশ কিছু আগেই যাত্রী ওঠা নামায় বাস’টা থেমে ছিল অনেকক্ষণ। হঠাৎ চিৎকার – চেঁচামেচিতে মতিঝিলের শাখা রাস্তাগুলো থেকে বের হয়ে আসা আতংকিত মানুষের এলোপাথাড়ী দৌড়ানো। কিছু বুঝে উঠবার আগেই বাসের পেছনের কাঁচ দিয়ে কিছু দেখার চেষ্টা করতেই বাসটি সজোড়ে চালিয়ে ডান দিকে মোড় নিয়ে নটরডেমের দিকে চলে যায়। কিছু মানুষ অপ্রস্তুতভাবে বাস থেকে নেমেও পড়ে। বাসের ভেতর সকলেরই বাড়তি উৎকন্ঠা পরিবেশ’টাকে আরো গাঢ়ো করে তুলছিলো। আমি আমার গন্তব্যে নেমেছিলাম।

সন্ধ্যা প্রায়। কলেজের বারান্দায় বসা। আমার সাথে আরো গোটা তিন চারজন। একটা জুনিয়র ছেলে বাকী সবাই ক্লাস মেট। কেউ কিছু অনুমান করতে পারছিলাম না। কিন্তু ভেসে আসা উড়ো খবরে বিশ্বাসও করতে কষ্ট হচ্ছিলো। আনমনে পায়চারী করছি আর বাড়তি অনেক চিন্তা মাথায় ভর করছিল, সবারই একই দুশ্চিন্তা। কেউ কাউকে আলাদা করে শেয়ার করার মত কিছু ছিলনা।

ইলেকট্রিসিটি অনেক আগেই চলে গিয়েছিল। মোবাইল নেটওয়ার্ক-ও কাজ করছিলো না ঠিকমত। আমি তখনও মোবইল ব্যবহার করতাম না। বন্ধুর একটা ফোন থেকে বাড়ীতে কয়েকবার কল করলাম কিন্তু গেলনা, আরো দুশ্চিন্তা মাথার আশেপাশে। ঠিক ওসময় এমন পরিস্থিতে বের হওয়া ঠিক হবে কিনা সেটা ভাবছি আর বাইরের পরিবেশের কথা অনুমান করছি শুধু। কারণ কলেজের বারান্দা থেকে যে রাস্তাটুকু দেখা যায় তাতে বুঝতে পারছিলাম কোন সাধারণ ঘটনা ছিলনা ওটা।

আমি আর দুজন তখনও কলেজে। ক্লাস হবেনা জানিয়ে দিয়েছিল বেশ অনেক আগেই। অন্যরা সবাই যে যার মত বেরিয়ে পড়েছিলো। যখন রাস্তায় নামলাম প্রায় অন্ধকার চারদিক। রাত তখন। দোকান পাট প্রায় সব বন্ধ। কোন রিকশাও পর্যন্ত চলছিলো না। শুধু রাস্তার লেন, রাস্তা ধরে সারি সারি মানুষের হেটেঁ চলার ঢল। তখন আর কাউকে ছোটাছুটি করতে দেখিনি।

শাপলা চত্বরে পৌছে পাশে থাকা বন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমার পথে এগুলাম। কেমন একটা চাপা গুমোট –ভয়াবহ লাগছিলো চারদিক। রাস্তার পাশে দাড়িয়ে থাকা প্রত্যেকটা মানুষের চোখে মুখে আতংক আর ভয় দেখেছিলাম। রাস্তায় বাস তেমন ছিলনা। দু-একটা কোথা থেকে যেই মূল রাস্তায় উঠে আসছিল অপেক্ষমান মানুষের হামলায় তাতে ওঠাই দায় ছিলো।

আমি তখন অন্য চিন্তায় নিজেকে আরো বেশী অস্থির লাগছিলো। বাড়ীতে বাবা – মা জানতেন আমি এদিকেই আসছি, তারা হয়তো পুরোপুরি খবর জেনে গেছেন ইতোমধ্যে। তাদের উদ্বিগ্নটা আঁচ করতে পেরেই বাড়ী ফেরার বদলে খোঁজ করছিলাম কোথা থেকে খবর পাঠানো সম্ভব হয় কিনা। শাপলা চত্বর থেকে ডান দিকে এগুতেই, বন্ধ থাকা সব দোকানের মাঝ থেকে গলির মুখের একটা ফোন-ফ্যাক্সের দোকান খোলা দেখে ছুটে গেলাম। ডায়াল করলাম। কিন্তু দোকানের ছেলেটা জানালো মোবাই নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বন্ধ।

তখনও পুরোপুরি খবর জানতে পারেনি আসলে কি ঘটেছিলো, মনে হয়েছিলো দোকানের ছেলেটা হয়তা জানতে পারবে, সে অনুমান থেকেই জিজ্ঞেস করা। এরপর নানা গুজবের মাঝ থেকে সত্যটা জানলাম, সেদিনকার মিটিং-এ বোমা হামলা হয়েছে। অনেক মানুষ হতাহত হয়েছে। নিহত-আহতের সংখ্য সঠিক কিছু না বলতে পারলেও ছেলেটার ভাষায় “ম্যালা মানুষ মরছে”

বাড়ী ফেরার চিন্তা মাথায় তখন। এতদূর পথ হেঁটেও ফেরা অসম্ভব না হলেও সময়ের হিসেবে অনেক পথ। অগত্যা কোন উপায়ন্তর না দেখে অনেক মানুষের ভীরে আমিও হাঁটতে শুরু করেছিলাম। বিশেষ করে যেসব মেয়েরা বাড়ী ফিরছিলো ওদের কষ্টটা ছিলো অবণর্নীয়। তবুও সবাই একটা চাপা ভয়কে সঙ্গী করে যে যার গন্তব্যে এগিয়ে চলছে । অনেকেই জানা – অজানা দু-একট ঘটনার বাক্য বলে যাচ্ছে, পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া আমি আবার থেমে থেমে শুনে যাচ্ছি আর ভাবছিলাম সত্যি যদি তাই হয় তাহলে দেশের নিরাপত্তা কোথায়। আর আমরা সাধারণ যারা এদের কথা তো তাদেরই ভেতরে।

শাহবাগে পৌছানোর বেশ আগেই পেছন থেকে ছুটে আসা একটা বাসের দরজার হ্যান্ডলে হাতাখানা বাড়িয়ে ধরে ফেললাম। পা টা গিয়ে পড়েছিলো আরেকজনের পায়ে। তিনি নমনীয়তায় আমাকে যতটুকু পারা যায় আগলে রাখলেন। এভাবেই ঝুলতে ঝুলতে বাকী’টা পথ পেরুনো।
বাসায় তখনও পৌছায়নি। এলাকার রাস্তাগুলোতেও অন্য সব দিন থেকে আলাদা মনে হলো, মতিঝিলের এ ঘটনার ভয়াবহতার ছাপ ওখানেও লেগে আছে। মানুষজনের চলাফেরা কম, রিকশাও যা চলছে দু-একটা। হেঁটেই বাড়ী পর্যন্ত চলে গেলাম।

ঘরের কলিং বেল দিতেই, মা ছুটে এসেছিলেন। কিছু বলার আগেই মা জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছেন, বাবাও তখন উঠে এসেছেন, ছোটটা আমার পাশে। বুঝতে পেরেছিলাম, ওই সময়ের ঘটনায় আমার দুশ্চিন্তার চেয়ে বাবা-মা কতটা দু:সহ আর অসহায় সময় পার করেছেন। রাতে টেলিভিশনে বিস্তারিত জানলাম।

অনেকদিন পর আজ যখন আবার বছর কয়েক ঘুরে সেই ২১ আগষ্ট, এর মাঝে আমি প্রায় ভুলতে বসেছিলাম জীবনের অনেক আনন্দ – কষ্টের বেশকিছু স্মৃতি। আসলেই হয়তো ভুলেও গেছি অনেক কিছু। কিন্তু সেদিনকার সেই দু:সহ স্মৃতি ভুলতে পারিনি, আরো অসহায় বোধ করেছি যখন টেলিভিশনে দেখেছি ছিন্ন-ভিন্ন লাশের টুকরো, মানুষের আহাজারি, স্বজন হারানোর ব্যথা – তীব্র চিৎকারের কান্না। আমি কোন দলের নয়, নির্বিশেষে এ দেশের একজন খুব সাধারণ মানুষ। সে বিবেচনায় সেদিনের ঘটনা যারা ঘটিয়েছিলো আজও তাদের তীব্র ঘৃনা করি এবং ধিক্কার জানাই।

কিন্তু আফসোস হয়, কেউ প্রকৃত ঘটনা না পেরেছে উদঘাটন করতে, না বিচার, শুধু দলীয় কোন্দলে একে অপরকে দোষারপ ছাড়া।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29226918 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29226918 2010-08-21 11:58:39
স্যাক্রিফাইস
এদিকে আমার কম্পিউটারের বয়স বাড়তে থাকে, অনেক সমমানের আধুনিক-পুরোনো গানের সম্ভারে কবে যে ‘স্যক্রিফাইস’ গানটাকে হারিয়ে ফেলেছিলাম সে বোধটাও এসেছিলো অনেক পরে। যখন খুঁজতে গিয়ে আর পাইনি তখনই মনে হয়েছিল আমার এসব সব গানগুলোকে বিসর্জন দিতে পারি শুধু ওই গানটাকে পাওয়ার বদলে। অজান্তেই ‘স্যক্রিফাইস’-এর সাথে সখ্যতা তখন থেকেই।

জীবনের গতি থেমে থাকেনি, তাই না পাওয়ার বেদনাকে সঞ্চয় করে নতুন স্বপ্ন দেখাদের দলে যোগ দিয়েছিলাম। এরপর থেকে শুরু হয় জীবনের আরেক অধ্যায়, সম্পূর্ণ অচেনা-নতুন এ পথ। যেখানে কিছু পাওয়ার আগেই চিন্তা করতে হয়েছে আমি কতটুকু ছাড় দিতে পারি, ত্যাগ স্বীকারের হিসেবে আমি কতটা এগিয়ে কিংবা বিসর্জনকারী হিসেবে আমার সুখ্যাতি কতটুকু ! প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন কিছুদিনের জন্য স্থগিত তখন, অবসর-আনন্দ-হাসি সবকটা’কে ছুটি দিয়ে ‘বিসর্জনের’ পেছনে একক সময় দেবার পালা। আফসোস-অনুতাপ পাশাপাশি সহবস্থানে। আর তার বড় সাক্ষী সময়। এগুলো বেশ আগেকার কথা। আমার এ অতীতকে সবার সাথে পারিচয় করিয়েছি “স্ট্রাগল” নামের একটা কঠিন ক্রিয়াবাচক শব্দযোগে।

< মাঝের অনেকটা সময় স্কীপ করে গেলাম ! >

ছেলেটার সাথে মেয়েটার পরিচয় বছর খানেক হবে কিংবা তারও বেশী । অথচ তখনও পর্যন্ত ওরা কেউ কাউকে দেখেনি। ফোনে কথা হত। কথা ছিলো মেয়েটা ঢাকায় ফিরলে ওদের প্রথম দেখা হবে। দুজনেরই অপেক্ষা। ক্যালেন্ডারে কাটাকাটি করার অভ্যেস’টা ছেলেটার কাছে পুরোনো, সেই ছোটবেলায় পরীক্ষার সময়ের হিসেব থেকে শুরু করে অনেক সময়ই সে এমনটা করেছে।

অফিসের ডেষ্কে ‘স্যাক্রিফাইস’ গানটা বাজছে, অবসন্নতায় চেয়ারে শরীরটা হেলে দিয়ে সেল ফোনের পুরোনো কিছু এসএমএস পড়তে পড়তেই ছেলেটা ফোন দেয় তাকে -

তুমি কি ব্যস্ত ?
- হুমম, কেন ?
কোথায় এখন তুমি ?
- এইতো ট্রেনিং পোগ্রামে, কিছু বলবে ?
না ঠিক আছে, তাহলে পরে ফোন দেই !
(মেয়টা ওপাশ থেকে লাইন’টা ডিসকানেক্ট করে)

মেয়েটার রেজাল্ট হয়ে গেলে ঢাকায় ফেরার কথা, অবশ্য তখন আরো ব্যস্ত থাকতে হবে তাকে। স্কলারশীপের জন্য এপ্লাই, এডমিশান - অনেক ঝক্কি, পারবে কি মেয়েটা একদিন সময় করতে ? দ্বিধা-দ্বন্দের দোদুল্যতায় কোন কারণ ছাড়াই মেয়েটা’কে টেক্সট করে “মিস ইউ”

< আরো কিছুটা সময় স্কীপ করে গেলাম ! >

মেয়েটা তখন ঢাকাতেই। দেশের বাইরে যাবার ব্যপারটাতে সে তখন দ্বিগুণ ব্যস্ত। যেবার ছেলেটা উইকেন্ডে শহরের বাইরে গেল সেদিনই সে তাকে দেখা করতে বলে। দেখা হয়না, ছেলেটার ফিরে আসতে সময় লাগে। তার কিছু পরে বদলী হয়ে তাকে শহরের বাইরে চলে যেতে হয়। মেয়েটার গোছানো প্রায় তখন শেষের দিকে।

মফস্বলের যে জাগাটাতে ছেলেটা থাকতো, কিছুটা সরু রাস্তা পেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠতে হত, আবার সেখান থেকে রিকশা তারপর পাবলিক বাসে অফিস। আচমকাই ফোনটা বেজে উঠতে তাকিয়ে দেখে মেয়েটার ফোন ...

কেমন আছো ?
- এইতো কেটে যাচ্ছে
কেটে যাচ্ছে মানে ? তুমি সবসময় এমন উদাস টাইপ কথা বলো কেন ? আমার ভাল লাগেনা
- তোমার তো কোন সময়ই ভালো লাগতোনা
- ফোন করেছো কেন ?
একটা সারপ্রাইজ দেব তোমাকে
- আমাকে ?
হুমম !
- কি
অনুমান করতো
- না পারছিনা, তুমিই বল
কোথায় তুমি এখন
- এইতো রিকশা থেকে নেমে, বাসের অপেক্ষায়
জানো, আমার না ভিসা হয়ে গ্যাছে, সব রেডী, কাল ফ্লাইট
বাসার সবাই খুব ব্যস্ত, জামাকাপড়-বই,খাতা কত্ত সব হাবিজাবি
এত্ত ওজনের ব্যগটা নিব কিভাবে বলোতো ...
(মেয়েটা এক লাইনে অনেক কথা বলতে থাকে, ছেলেটা শুনতে পাচ্ছে-অস্পষ্টতায় শুধু একটা কথায় বারবার ফিরে আসে “কাল ফ্লাইট”)
হ্যালো, হ্যালো এই তুমি শুনছো
- হুমম, বলো . তোমার ফ্লাইট কখন
এইতো খুব ভোরে
- তোমার অনেকদিনের স্বপ্ন তাইনা ?
হ্যা, তুমি খুশী হওনি
- হু, অবশ্যই হয়েছি
তোমার কি মন খারাপ ?
- না, মন খারাপ হতে যাবে কেন ?
- আমাদের আর দেখা হলনা, তাইনা ?
হুমম, তুমি কি কষ্ট পাচ্ছো ?
- আমি তোমার সাথে একবার দেখা করতে চায়, শুধু একবার; তোমাকে সামনে থেকে দেখতে চায়, প্লিজ !
তুমি না আমাকে প্রায়ই বলতে, জীবনে অনেক স্যাক্রিফাইস করেছো তুমি, তোমার অনেক সাহস-তোমার সব প্রিয় মানুষদের জন্য তুমি স্যাক্রিফাইস করতে জানো !
- হ্যা, বলেছিলাম
তাহলে, আমার জন্য না হয় এতটুকুন স্যাক্রিফাইস করলে, দেখা হলোনা তাতে কি !
(কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকা অত:পর একটা দীর্ঘশ্বাস)
- ওকে !
- শোনো একটা শেষ কথা, আমাকে কি সারপ্রাইজ না স্যাক্রিফাইস - কিসের জন্য ফোন করেছিলে ?
(মেয়েটি কোন কথা বলে না)
(ছেলেটি লাইনটি ডিসকানেক্ট করে)

শহরের চৌরাস্তার এই মোড় থেকে পশ্চিমের বাস ধরে অফিসের পথ। সকাল থেকেই মেঘলা আকাশ আর গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। সময়ের টানাটানিতে ছাতাটাও আনেনি ছেলেটা। পূবের পথ ধরে সামনে এগুলেই একটা শুকিয়ে যাওয়া নদী সেখানে। মোবাইলটা তালুবন্দী করেই ছেলেটা পূবের পথে হেটে চলে, ঘড়ির সময় তখন ৯টা বেজে ৪৩ মিনিট !



Elton John - Sacrifice
উৎসর্গ : একজনকে ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29211542 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29211542 2010-07-31 01:51:25
প্রাপ্তি
এইতো ঠিক তার দু’দিন আগেই, আমরা যে এলাকায় বাস করি। সেদিন সন্ধ্যা থেকেই একটা ভ্যানে বারবার মাইকিং করে যাচ্ছিলো। একই রাস্তা ওরা কয়েকবার ঘুরে গেল, কিন্তু কথার অস্পষ্টতায় ঘরের ভেতর থেকে তা বুঝতে পারছিলাম না। ব্যালকনিতে এসে দাড়াতেই ওদের কথায় যা বুঝলাম ওটিও একটি “হারানো সংবাদ”। মুখস্থ কতকটা লাইনে হারিয়ে যাওয়া সেই মানুষকে খুজেঁ দেবার অনবরত অনুরোধ বাণী পড়ে যাচ্ছে।

এসব হারিয়ে যাবার ব্যপারগুলিতে যে কষ্ট পেতাম না, তা নয় ! যখন নিজের করে ভাবতাম, নিজের পরিবারেরই কারও কথা, কেউ যদি এভাবে হারিয়ে যেত, আকষ্মিক বুকের মাঝ’টা অসম্ভব খালি হয়ে যেতো তখন । ইদানিং এসব দু:খ সংবাদে কয়েকটা শোকসূচক শব্দ আর বিষ্ময়বোধ প্রকাশেই আটকে থাকি। পেছন থেকে কেউ আবেগী বলে ফেলে, সেই ভয়ে তাই কষ্ট পাওয়া হতেও দূরে থাকার চেষ্টা করি।

আমার বাসাটা তে’তলায়, আজ রাতে যখন বাড়ীতে ফিরেছি তখন নয়টারও কিছু বেশী হবে। বাসায় পৌছতে না পৌছতেই ইলেকট্রিসিটি চলে গেলো। বাতি না আসা পর্যন্ত অন্ধকার এ সময়টুকুই আমার অবসর। ব্যলকনির চেয়ারে শরীরটা হেলে দিয়ে হাজারো কথা ভেবে চলেছি। কিন্তু এই অন্ধকারেও যে রাস্তায় থেমে থেমে পরিচিত সুরের একটা ভ্যান থেকে বিরামহীন মাইকিং করে যাচ্ছিল; খেয়াল হল তখন যখন ঘর থেকে মা’ জানতে চাইলেন “খোকা দেখতো মাইকে কি বলছে” – “প্রাপ্তি সংবাদ” “প্রাপ্তি সংবাদ” – একটি ছেলেকে পাওয়া গেছে, ছেলেটির বয়স .........................যোগাযোগের ঠিকানা ....”
খুব অনেকদিন পর এরকম একটা অনুভূতির সাথে পরিচিত হতে পেরে সুখানুভব করলাম। বিষন্নবোধের এ সময়টুকুতেও যে এ প্রাপ্তি সংবাদ আমার আনন্দের উপলক্ষ হয়ে আসবে, ভেবেই ভাল লাগছিল।

এদিকে নিজের জীবন নিয়ে ভাববার যে অবসরটুকু হয়, তাতেও ভাগ বসিয়ে দেবার মত জোড়দখল করে নেয় পারিবারিক, সামাজিক অনুষঙ্গগুলো। কিন্তু এরই মাঝে যে কতকিছু হারিয়ে যাচ্ছে সে খোঁজও সবসময় রাখা হয়না। কিছু হারানোর কথা সবটাই আত্মগোপন করি।
মাঝে মাঝে কিছু হারানোর ব্যথা, হারিয়ে ফেলা মানুষের খুব কাছে থেকেও তাকে প্রকাশ বা বোঝানো সম্ভব হয়না। আর আমি! সে তো অনেক দূরে। কখনো বোঝাতে পারিনি বা বুঝতে পারিনি কিংবা কত কিছু ভেবেই যোগাযোগ হয়নি। এটাও অনেক দিনের কথা।

আজ অফিস থেকে বের হবার আগে ওকে একবার ফোন দিয়েছিলাম, গতকালও দিয়েছিলাম, কোনবারই ধরলোনা। অফিস থেকে তখন বের হয়েছি মাত্র, রাস্তায় দাড়িয়ে গন্তব্যের সিটি বাসের অপেক্ষা। ঠিক সে সময় ওর সেল থেকে ইনকামিং কল। বাসে উঠে পড়লে ফোনে কথা বলাটা কেমন হবে, এই ভেবে ফোন’টা রিসিভ করেই ওই পথে হেঁটে চললাম।

তখনও ব্যালকনিতে বসা, অনেক দূরের কয়েকটা বাড়িতে নিভু নিভু আলো জ্বলছে, অন্ধকারে আমি সেদিকেই তাকিয়ে। “প্রপ্তি সংবাদ”-এর মাইকিং ভ্যানটার আওয়াজও দূরে মিলিয়ে যেতে থাকে।

সবকিছুর পরেও যখন, আজ তাকে আবার ফিরে পেলাম; তখন আর বুঝতে দেরী হয়নি, হৃদয়ের দরজায় কবেকার লাগানো সেই “হারানো সংবাদ”-এর ফ্যাকাসে পোষ্টারটি খসে সেখানে নতুন রঙিন এক “প্রাপ্তি সংবাদ” এর ফলক উঠে গেছে, তাতে শুধু সেই বার্তাই আছে “এ প্রাপ্তি আনন্দের”।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29168365 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29168365 2010-06-02 13:19:48
অনেকদিন কষ্ট পাইনা স্মৃতি খুজেঁ কিছু রোমান্থন করবার আগ্রহ’টা কবেই যে হাওয়ায় মিশেছে, যান্ত্রিক জীবনের এ কোলাহলে তা বোঝবার জো নেই। আমার এ অভ্যেস’টা নৈমত্তিক নয়, অনেকটা পুরোনো বাতিকের মতন। কতজনে বলেছে ‘স্মৃতিই তো সব’, আমি শুধু তাচ্ছিল্যতায় হেসে, ওটাতে কোথাও সুখ পাইনি বলে দোষ চাপিয়ে বলে এসেছি “স্মৃতি কষ্টের”। আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করতো, আমি গন্তব্যে পা বাড়াতাম।

এভাবেই এতটা সময় চলে গেছে, শুধু যে কষ্ট ছিলো তা কিন্তু নয়; হয়তো কষ্টের দিকটা ভারী, তাই বলে স্মৃতি’ খুজেঁ দু-একটা সুখ উপলব্ধি পাবোনা তাও নয়। সে স্মৃতি গুলো বেশ রোমাঞ্চিত। কিন্তু সে সুখময় ব্যপারগুলিই যখন একসময় নিজের জীবনের কাছে ব্যথার কারণ হয়ে দাড়ায় তখন “না বলা কথায়” সে অব্যক্ত ভাষা লুকিয়ে লুকিয়ে বয়ে বেড়ানো যে কত কষ্টের তা হয়ত এ লেখায় প্রকাশ করা সহজ নয়; শুধু একজন বা আরেকজনকে মনের কথায় বুঝিয়ে বলা সম্ভব। আবার সেই সম্ভাবনা’টাও খুব বা অল্প বিস্তর ক্ষীণ-ও হতে পারে।

অনেকদিন স্বপ্ন-ও দেখিনা। স্বপ্নেও অনেক কষ্টের ব্যপারগুলি ঘটে যায়। সেগুলোর কোনটা অবাস্তব আবার কোনটা জীবনের সাথে মিশে থাকা সত্য অনুভূতি। কষ্টটা মৌলিক বলে সব জাগাতেই তার অস্তিত্ব থাকবে সেটাও মানতে পারিনা, তাই ভালো স্বপ্ন দেখবো সে আশ্বাসেও রাজী না হয়ে সেদিনের পুরোটা রাত জেগে থাকি।

আমার ভেতরের এ ক্রিয়াগুলি আমি ছাড়া কাউকেই প্রকাশ করিনি। সেখানেও তীব্র বঞ্চনায় ভয়, আজকাল কেউ দু:খবোধের বাক্য শুনতে রাজী হয়না যেখানে সকলেই সুখ প্রত্যাশী, সে জাগাতেও আমি যে খুব শঙ্কাবস্থায় তা ভেবেই ভীত হয় মাঝে মাঝে। এত সবের মাঝেও কিছু কিছু সুখ হঠাত করেই আসে আবার হঠাতেই মত চলে যায়। “The Pursuit of Happiness” ছবিটি’র শেষ দিককার একটা দৃশ্য সংলাপ এরকম “It’s a little part, it’s called happiness” খুব অল্প কিন্তু আনন্দের; সেটাই অনেক বড়।

একটা লেখা লিখেছিলাম ওর জন্য, এটা ক’দিন আগের কথা। যেদিন লেখাটা ছাঁপানো হল সেদিন ছিলো ওর জন্মদিন। লেখা কখনো কারো জন্মদিনের উপহার হতে পারেনা, তবুও কি ভেবে যেন লেখাটা লিখে ফেললাম। সেখানে অকপটে বলে গিয়েছে নিজের অনেক কথা। ওর কথাই ছিল সর্বস্ব। লেখাটি যে ও দেখবে সেরকম প্রত্যাশাও করিনি কারণ ততদিনে দুজনের সংযোগহীন অবস্থায় কেটেছে প্রায় অর্ধেক’টা বছর। এত ব্যবধানে ওকে মনে করিয়ে দেয়া, ভেবেছিলাম ভুলে যাবে।

দরজার ওপাশ থেকে সন্ধ্যাচ্ছন্ন অন্ধকারে প্রথমে ওকে চিনতে পারিনি। ও অপেক্ষা করছিল। সেদিনের দুজ’নের আর কোন কথা হয়নি, শুধু যখন ওর কাছে গিয়েছি টেবিলের উপর মুখটা ঢেকে শব্দহীন কেঁদে যাচ্ছিলো, জল ভেজা চোখে তাকিয়ে বলল “কেন তুমি ওসব লিখতে গিয়েছ” ফিরে এসেছিলাম। লেখাটি মুছেও দিয়েছি।

ইচ্ছে হয়েছিলো ফোনে যোগাযোগ করি, করতেও পারতাম ! ওকে আর জিজ্ঞেস করা হয়নি “আমি তো মিথ্যে কিছু লিখিনি, তাহলে সত্য’কে কেন মুছে দিতে বলছো” কি হবে জিজ্ঞেস করে ! এতদিন পর তাই স্বপ্নেও সে কথা তাকে বল হলোনা। ওটা ছিল দু:সহ স্মৃতির দু:স্বপ্ন।

আমরা হয়তো এভাবেই বেঁচে থাকি স্মৃতি মায়ায় জড়িয়ে, কখনো কষ্টগুলোকে আড়ালে রেখে কখনোবা চিৎকার করে প্রকাশে। তাই অনেকদিন না পাওয়া কষ্টের ভেতর যখন আজ তাকে স্বপ্নে পেয়েও কিছুই বলতে পারলাম না, তখন সেই স্মৃতিকেই খুজেঁ পেলাম কিন্তু “স্মৃতি বরাবরই কষ্টের” এবং “স্বপ্ন’টা দু:স্বপ্নের”।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29164319 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29164319 2010-05-28 15:51:12
"আলোড়িত" জন্মদিন ]]> http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29162336 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29162336 2010-05-25 09:18:52 বৈশাখী প্রস্তুতি
‘প্রস্তুতি’ নিয়ে বলার রহস্য, আজকাল হর-হামেশাই এই শব্দটার যথেষ্ট যাচ্ছেতাই ব্যবহারের নমুনা পাই। যদিও শব্দটার কোন বাধ্যবাধকতা নেই, তবুও ‘প্রস্তুতি’ এখন আমাদের দিন-দিবসের মত সার্বক্ষণিক-সর্বময়।

‘পরীক্ষার প্রস্তুতি’ একসময় খুব এবং আজও কিঞ্চিত জনপ্রিয় ও বহুল প্রচলিত শব্দ-জোড়া। ঠিক এখন থেকে আগে যখন মানুষ তার ভাবনার সীমাবদ্ধতায় প্রশস্ত কল্পনাশক্তিতে আনতেই পারেনাই; উৎসব, পর্বন কিংবা অনুষ্ঠান ইত্যাদি সমজাতীয় শব্দসমূহ ‘প্রস্তুতি’কে দখল করে নিবে; এক বিলাসিতায়।

একটা উদাহরণ টেনে ধরি, কাল রাতে যখন বাতি নিভে গেলো. দখিনা বারান্দাতে অন্ধকারে বসে রেডিও টিউন করছিলাম। আরজে রিসিভ করা এসএমএস গুলো বলে যাচ্ছিলো একের পর এক, এসএমএস পাঠেনেওয়ালাদের বেশীরভাগই আগ্রহ ছিলো সেলিব্রিটি আরজে’র ‘বৈশাখী প্রস্তুতি’ কেমন ? নি:সন্দেহে সুচতুর আরজে তাদের প্রত্যেকের মন বাচিয়েঁ উত্তর দিতে থাকেন, পাল্টা প্রশ্ন এবং টপিকও দিলেন তাই; ‘আপনাদের পহেলা বৈশাখের প্রস্তুতি কেমন তা জানিয়ে এসএমএস করুন .......... নম্বরে’।

ধরুন, ‘পরীক্ষার প্রস্তুতি’ কেমন জানতে চাওয়া হলে, উত্তর মিলবে গন্ডীর মধ্যে সাদামাটা ‘এইতো মোটামুটি’ কিংবা বেশী হলে ‘ভালো’। কিন্তু বৈশাখীর প্রস্তুতি ? ধূসর তো নয়, নতুনের মত জ্বলজ্বলে সাত রঙা। ‘নিজের একটা ফতুয়া, বাচ্চার জন্যও কেনা হয়েছে, আর ও .....’ ‘ইলিশ এনেছি তিনটে, দুটো বড় আর .....’ ‘রমনার বটমূলে তো যেতেই হবে .. মেকআপ কি নিবো এখোনো .....’ ইত্যাদি

আমার এ লেখাটা সংকলিত হতনা, যদি না সেদিন এরকম একটি ঘটনার মুখোমুখি হতাম। সংক্ষেপে বলি, আমার অফিসের এক কলিগ (ম্যডাম) তিনি স্ব-আগ্রহে জানতে এবং জানাতে এসেছেন ‘বৈশাখী প্রস্তুতি’ কেমন ! কিছুটা বিষ্মিত এবং অনুসন্ধানী সুরে জানতে চাইলাম ‘কেমন প্রস্তুতি’, তিনি তার বণর্নাটাই দিলেন- নিজের, বাচ্চাদের এবং হাজবেন্ডের প্রত্যেকের জন্য আলাদা করে বৈশাখী পোষাক করেছেন, পান্তা – ইলিশেরও ব্যবস্থা হয়েছে, সকাল থেকে বিকেল অব্দি এবং রাত (পহেলা বৈশাখের দিন) কোথায় কোথায় কাটানো হবে তাও ঠিক করে রেখেছেন এবং আরো ইত্যাদি। আমি কিছুটা ভেবে তাকে বসার আমন্ত্রণ জানই এবং চা অফার করি। আমাদের অফিস রুমে আমি ছাড়াও আরো তিনজন বসেন, ম্যাডম অন্য অফিসের। চা খেতে খেতে তাকে একটি প্রশ্ন করবার অনুমতি প্রার্থনা করি। তিনি সায় দিলে জানতে চাই “আজকে বাংলা তারিখের হিসেবে কোন সাল এবং কত তারিখ” – ম্যাডাম কিছুটা বিব্রতবোধে নিশ্চুপ হয়ে পড়েন, আমি অভয় দিয়ে, কোন দিন-পঞ্জিকার সাহায্য না নেয়ারও অনুরোধ করি। সত্যি তিনি এবার অসহায়ের মত আমার অন্য কলিগদের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলে আমার বোঝার আর অবকাশ থাকেনা ‘বৈশাখী প্রস্তুতি’ তিনি যথেষ্ট পটু হলেও স্বকিয়তার ক্ষেত্রবিশেষে তিনি অন্তসারশূণ্য।

ঠিক, একই প্রশ্নটি সম্ভাব্য বৈশাখ উৎসব পালন করবেন এমন বন্ধু-বৎসল, সহকর্মী এবং অনেকের কাছেই রেখেছিলাম, সবাই দু:খিত বললে, আমার বিষ্ময়ের সীমা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে। এক অজানা আশংকা, ভয় ঘিরে ধরে, যখন আমরা নিজেরাই একটি প্রজন্মের ধারক ও বাহক হয়ে বাঙ্গালী ঐতিহ্যের মূল (বেসিক) প্রশ্নে নিজেরদেরকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছি, সেখানে ভবিষ্যত বংশধরদের দিকটা চিন্তা করার সাহসই হয়নি।

এ কথা অনস্বীকার্য, শহুরে ইট-ইস্পাতের ব্যস্ত জীবনে বছরের দু-একটা পর্বন-উৎসব আমাদের বিনোদেনের অনন্য মাধ্যম। এরই মাঝে বারেবারে খুজেঁ ফিরতে চাই ক্লান্তি অবসানের অবসর। কিন্তু সেটা যে শুধুই ‘দিন’ বা ‘দিবস’ নির্ভর আনন্দ-উৎসবের মিলমেলা ছাড়া আমাদের ব্যবহারিক দৈনন্দিন জীবনে তার বিন্দুমাত্র প্রভাবটুকু থাকছেনা, সেটাই ভয়ের- ভুত এবং ভবিষ্যতের।

একটি দিবসের মহত্ম শুধু ওই চব্বিশ ঘন্টার সময়ের হিসেবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নই। আমরা অনুপ্রেরণা পাই, উৎসাহিত হই, নিজেদেরকে সংগঠিত করি, দৃঢ় অঙ্গীকার প্রত্যয়ে। সমাজ-সংস্কৃতি এমনকি রাষ্ট্রে যুক্ত হয় নতুন-পুরনোদের প্রতিশ্রুতিশীল আগামী দিন গড়বার সংকল্পে।

আমরা ঐতিহ্যকে লালন করছি শত-যুগ ধরে, ভিন্ন আবহে এবং আঙ্গিকে, ভালবেসেছি আমাদের সংষ্কৃতিকে, তার ভাষা, আচরণ এবং মূল্যবোধকে। আমাদের ইতিহাস পুন:জাগরণের, শক্তি সঞ্চারের, সমুন্নত জাতিবোধের চেতনায় উদ্ভুদ্ধ।

কিন্তু যেখানে আনন্দই উপভোগ – উপভোগে উদযাপিত; এই সমীকরনে এগুতো থাকি তখন পহেলা বৈশাখের সাত দিন আগেও যখন আমরা বলতে পারিনা বাংলা সাল ও তারিখ, সেটাতে খুব আশ্চর্যিত হবার কিছুই থাকেনা। একটি বছর শেষে নতুন বছরের প্রথম দিনে পুরোনো গ্লানি, অবষাদকে ফেলে, নতুন উদ্যোমে বর্ষবরণের পূর্ণতা খুজিঁ, কিন্তু পূর্ণতা কি সেটাই ? বিনে চর্চায় পুরোটা বছরের ঐতিহ্য কে ভুলে একটি দিনের অপেক্ষা মাত্র ?

আমাদের প্রস্তুতি আছে, সাথে রয়েছে প্রাপ্তি এবং সবিশেষ পূর্ণতা। পূর্ণতার সুখাবহ আমাদেরকে আবিষ্ট করবে ঠিকই কিন্তু মোহাবিষ্ট নয়, এটাই প্রত্যাশা এবং কামনা নতুন বছরের এমন আগমনের সূচনায়।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29133451 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29133451 2010-04-12 14:41:08
মা’কে নিয়ে টুকিটাকি; কিছুনা’ তার মায়ের জন্মদিনের শুভেচ্ছা ! আওয়াজ খুলতেই প্রথম যে সাউট-টা চোখে পড়ল তা কিছুনা ’র একটা ছোট্ট সাউট। “আজকে আমার আম্মার শুভ জন্মদিন <img src=" style="border:0;" />”, আজ কিছুনা’র মায়ের জন্মদিন।

অনেক অনেক শুভেচ্ছা কিছুনা’র আম্মুর প্রতি।

‘মা’ শব্দটাই আমার কাছে হৃদয়ঘটিত ব্যপার। অন্য কোন অনুভূতি এতটা মায়া কখনো আনতে পারেনা যা একমাত্র ‘মা’ শব্দটাই পারে। কিছুনা’র মায়ের কথা ভাবতে ভাবতে আমার মা’য়ের কথা মনে পড়ে গ্যালো। একবার এরকম হয়েছে মা’কে জিজ্ঞেস করছি ‘মা তোমার জন্মদিন কবে’ মা তো হেসেই খুন, ‘কি করবি খোকা’ আমিও নাছোরবান্দা ‘আহা বলোনা, কবে তোমার জন্মদিন’ মা অনেকক্ষন কি জানি খোঁজাখুজি করলেন তারপর ‘খোকা, তোকে পরে বলবোনে’ – অবশ্য পরে আর জানাও হয়নি মায়ের জন্মদিনের তারিখ’টা।

‘মা’ নিয়ে যখন দু-কথা বলতে বসলাম, তখন এইতো কিছুদিন আগেকার দুটো স্মৃতি শেয়ার করা যাক ....

প্রতিদিনকার মত সকালে চা বানিয়ে সবাইকে খাওয়ানো আমার রুটিন মাফিক অভ্যাস। এটার কোন বাধ্যবাধকতা নেই কিন্তু নিয়মে দাড়িয়ে গিয়েছে। সেদিনও চা করে মায়ে’র রুমে চা দিতে গিয়ে দেখি মা’ নামাজ পড়ে চেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়েছেন, আমি আর তাকে ডাকিনি, অবিকল চায়ের কাপ হাতে ঠাই দাড়িয়ে থাকলাম, কতক্ষণ হবে, বড়জোড় ৫০ সেকেন্ড থেকে ৬০ সেকেন্ড, মা জেগে উঠলেন ‘কি রে, চা হাতে দাড়ায় আছিস’ আমি সুযোগ্য সুযোগে ‘মা, দেখো দেখো তোমার প্রতি আমার ...’ মা কথা কেড়ে নিলেন ‘কতক্ষণ দাড়ায় আছিস’ এবার আমিও ‘যতক্ষণই থাকি না কেনো, বায়েজীদ বোস্তামী পানি হাতে সারা রাত দাড়িয়ে পরে বড় পীড় হয়েছিলেন মায়ের দোআয়, আর আমাকে দেখো সকাল সকাল চা হাতে তোমার পাশে দাড়িয়ে, মা এবার তাড়াতাড়ি বায়েজীদ বোস্তামীর মায়ের মত একটা দোআ দাওতো’ – মাথাখানি নীচে নামিয়ে দিলাম ‘খোকা, আমি তোর মা-ই দোআ দিচ্ছি, অনেক বড় হবিরে খোকা’ – মা’কে জড়িয়ে ধরে বললাম ‘মা, তুমি তো সব সময় দোআ করো, আর লাগবেনা’
ওইদিনটা আমার সবচে ভালো গ্যালো।

দ্বিতীয় ঘটনাটা, অফিস ছুটির দিন বাসায় আছি। তখন সন্ধ্যার দিকে একটা ফোন এসেছে সেলফোনে। ধরতে ইচ্ছে করছিলোনা, মা তখন ওযু করছেন, মাকে গিয়ে অনুরোধ করলাম ‘মা, ফোনটা ধরে বলো, শুয়ে আছি’, ওযু করতে করতেই মা বলছেন ‘আমি ওযু করছি আর তুই আমাকে মিথ্যে বলতে বলছিস’ আমিও চিন্তায় পড়ে গেলাম, ফোনটা বেজেই চলেছে, সাথে সাথে তাই ‘মা, আমি বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ছি, তুমি এবার বলো – আমি শুয়ে আছি’ মা আমার দিকে গড়গড় চোখে তাকিয়ে আছেন, ফোনটার লাইন ততক্ষনে কেটে গ্যালো। পরক্ষনেই সেই ফোনটা আবার এলো এবার মাকে ফোনটা দিয়েই শুয়ে পড়লাম – মাও যথারীতি ফোনের লাইন-টা কেটে দিলেন। “খোকা এভাবে আমাকে দিয়ে আর কখনো মিথ্যা বলবার জন্য বলাবিনা” – রাতে মা’কে সরি বলেছিলাম, মা আর কিছুই বলেন নি।

মা’কে নিয়ে এরকম আমাদের সকলের জীবনে অনেক টুকিটাকি ঘটনা রয়েই গ্যাছে, খুব আনন্দিত হোই, আবেগে আপ্লুত হোই, ভালবাসাই সিক্ত হোই – সবটাই মা’য়ের উপলক্ষ।

আজ তাই এদিনে, কিছুনা’র আম্মুর জন্য আমাদের সকলের পক্ষ থেকে রইলো অনেক অনেক শুভকামনা। তিনি দীর্ঘজীবি হউন এ প্রার্থনাই করি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29114124 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29114124 2010-03-11 09:43:51
নারী দিবসে টিভি-এ্যাড; আমাদের বিতর্কিত ভাবনা !
একটি টেলিভিশন এ্যাডের প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষন করছি। অনেকেই হয়তো এ্যাডটি দেখেছেন; দারুন কৌশলী বিজ্ঞাপণ চিত্রে নির্মিত ওই এ্যাডটি নি:সন্দেহে আমাদের সামাজের একটি বিশেষ অংশের মানুষকে তাদের ভাষা সেবার ক্রেতা হিসেবে পাওয়ার মূলমন্ত্র ছেড়ে দিয়েছে। জাতি হিসেবে সেই ভাষার ব্যবহারে আমরা কতটা দূর্বল সে প্রকাশ প্রকাশ্যে না থাকলেও তাকে যে রাখঢাক রেখে প্রচার করা হয়েছে তাও কিন্তু নয় !

বলছিলাম এ্যাডের কথা। বিটিভি সহ দেশের সকল স্যাটেলাইট চ্যানেলে ইতোমধ্যে প্রায় একাধিকবার প্রচারিত হয়েছে এ্যাডটি। এই এ্যাডটি প্রচার হবার পূর্বে এ্যাড প্রচারক কোম্পানীর আরো দুটি কি তিনটি সমবিষয়ক এ্যাড প্রচার হয়েছিলো। কিন্তু সেগুলো অতটা স্থায়ী হয়নি টেলিভিশনের পর্দায় যতটা এই এ্যাডটি হয়েছে। আগের দুটো এ্যাডের প্রচার স্বল্পতার কারণ হিসেবে তাদের অবাস্তব তুলনা হয়তো ‘পাবলিক’ গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছিলনা বা সুযোগ্য স্ক্রীপ্টের অভাবে ‘উপায় নেই’ গোছের হাব-ভাবে চালিয়ে দেয়া।

আগের দুটি এ্যাডের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এরুপ :
ক) গ্রামের কিশোরী, নি:সন্দেহে চঞ্চলা-চপলা, দুরন্তপনার অতিশয্যে সে তার বাড়ীর আঙ্গিনার প্রিয় ‘মুরগী’কে ধরতে এমন কৌশল রপ্ত করেছে তাতে নিশ্চয় তার শরীর চর্চার অতি আধুনিক এ বিদ্যার প্রশংসা না করে থাকা যায়না। যারা মুরগী খামারী তারাও হাজার হাজার মুরগী মানুষ করতে গিয়ে এমন কৌশলের কথা জানেন কিনা, তা আমার অভিজ্ঞতার ঘাটতি। মূল বিষয় সেটা না, এ্যাডের ভাষায় মুরগী ধরার মত ‘এত কঠিন’ কাজটি মেয়েটি জানলেও মেয়েটি জানেনা কিভাবে ইংরেজীতে কথা বলতে হয়, আর তার এই ইংরেজী ঘাটতি পুষিয়ে দিতেই ইংরেজী প্রচারকেরা বাজারে এনেছেন ইংরেজী শেখানোর জন্য বিশেষ ‘জানালা’ যা দিয়ে সহজেই প্রবেশ করবে ইংরেজী জানার সকল তরিকা। (পয়সা প্রযোজ্য)

খ) প্রায় প্রথম এ্যাডটির আদতেই করা এটিও, শুধু চরিত্রের লিঙ্গ পরিবর্তন। স্ত্রী’র পরিবর্তে এবার পুং লিঙ্গের চিত্রায়ন। তারও একই দশা, বেশ সুদর্শন, টাইট ইন করা শার্ট – প্যান্টের সাথে গলায় ঝোলানো দড়ি (টাই) স্পষ্টতই প্রমাণ করে ছেলেটি ‘স্মার্ট’ শুধু স্মার্ট বললে ভুল হবে ‘ওভার স্মার্ট’। শহুরে জীবনে চলার পথে এমন কৌশল সে জানে যেকোন প্রতিকুলতার হাত থেকেই নিজেকে বাচিয়েঁ তোলা সম্ভব। কিন্তু দৃশ্যায়নে তখনই অস্পষ্ট চিত্রের ভাষায় ‘আনস্মার্ট’ বা ‘ক্ষ্যাত’ হিসেবে দেখানো হয় যখন জানা যায় এতসব কিছু জানলেও ইংরেজী জানার প্রতি রয়েছে তার দূর্বলতা। আর তখনই আবির্ভাব হয় সেই ‘জানালা’ যা দিয়ে সহজেই প্রবেশ করে ইংরেজী শেখার সকল তরিকা। (অবশ্যই পয়সা প্রযোজ্য)

লেখক হিসেব আমি যতটা আনস্মার্ট হইনা কেন, পাঠক হিসেবে আপনারা নিশ্চয় ততটা নন, অবশ্যই স্মার্ট বা ওভারস্মার্ট। এখানে পাঠক অবশ্য একজন দর্শকও বটে। আপাতত দর্শকের ভূমিকায় থেকে চিন্তার সম্প্রসারণ করি। উপরের এ্যাড দুটিকে খুব বেশী সময় টিভিতে দেখিনি, হয়তো বাস্তবভিত্তিক চিন্তায় ‘অবাস্তব তুলনা নির্ভর’ দৃশ্যকল্প দর্শককুলকে সাময়িক আনন্দ দিতে সক্ষম হলেও ‘সংখ্যা তত্ত্ব’ হিসেবে যে ‘লার্নার’ (কাষ্টমার) পাওয়ার কথা ছিলো তা হয়তো না পেয়েই পরবর্তীতে ‘বাস্তবসম্মত’ এ্যাড নির্মাণের দিকে ঝুকেঁ যান ইংলিশ শেখানোর প্রচারকেরা।

এবার আসি সেই প্রসঙ্গ কেন্দ্রিক এ্যাডটির বণর্ণায় :
বাড়ীর গৃহিনী সকালে নাস্তা তৈরীতে ব্যাস্ত। নিশ্চয় অফিসের উদ্দেশ্যে কর্তা কিছুক্ষণ বাদেই বেরিয়ে পড়বেন। এদিকে কর্তা তখন গোসলখানায়। পানির ঝিরঝির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ঠিক সে সময়ই কর্তার মোবাইলে কল আসে। অনুগত গৃহিনী দৌড়ে এসে মোবাইলটি ধরে গোসলখানার দরজায় মুখ রেখে কর্তাকে জানান দেন, মোবাইলে ডাক এসেছে। মোবাইলের রিংটোন ততক্ষনে বেজেই চলেছে। কর্তা ওপাশ থেকে গৃহিনী’কে মোবাইলের ডাকটি রিসিভ করার আদেশ দেন। গৃহিনী কিছুটা বিচলিত – কি করবেন? ওপাশে চুলোয় রান্না চাপানো, এদিকে - সাতপাঁচ ভাববার আগেই মোবাইল রিসিভ করেন। ব্যাস, ঘটনা ফিট – মোবাইলের ওপার থেকে ভেসে আসে বৈদেষিক ভাষার মানুষের কন্ঠ। গৃহিনী এবার তো পুরো “ধরা খাওয়া’র ভঙ্গিতে একেবারে ভ্যাবাচাকা অবস্থা। পারলে গোসলখানায়ই মোবাইলটা চালান করে দেন, কর্তার ফোন কর্তাই কথা বলুক। কর্তা আবারো তাকে আদেশ দেন ‘কিছু না কিছু’ বলার জন্য। এই ‘কিছু না কিছু’ কি বলবেন তা তখন গৃহিনীর ভাবনায়, আর টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা আমরা দর্শকদের অবস্থা অনেকটাই নাজুক, কিন্তু না সবাইকে তাক লাগিয়ে অবাক বিষ্ময়ে খুব সুন্দর এবং স্পষ্ট ভাষায় বিদেশীকে অনুরোধ করছেন ‘কিছুক্ষন পরে ফোন দিতে’ – এবং তা অবশ্যই ইংরেজী ভাষায়। বিষ্ময়ের তখনো বাকী, এবার কর্তা নিজেই ‘কট বিহাইন্ড’ গৃহিনীর এমন পারদর্শিতায়। তাই যখন গোপন রহস্যের কথা জানতে চান, গৃহিনী পায়ের উপর ভর করে নিজেকে উঁচু করে বলেন ‘বিবিসি জানালা’

এ্যাডটির সমাপ্তি ওখানেই; কিন্তু না তারপরেও কিছু সময়ে টেক্সট এ্যানিমেশনে দেখানো হয়েছে কিভাবে কত নম্বরে কল করে পয়সা’র বিনিময়ে আপনাকে সেই ‘জানালা’ সরবরাহ করা হবে তার বিবরণ।

প্রথম দুটি এ্যাড থেকে তৃতিয়টি যে বাস্তব বিবর্জিত নয়, সেদিকে পরিচালক এবং প্রচারক উভয়কুলই প্রশংসার দাবী রাখেন। এ্যাডটি দেখার পর হয়তো আমরা কেউ কেউ বাহাবা দিয়েছে এই ভেবে, আমাদের নারী সমাজ বিশেষত: বাড়ীর গৃহিনীরাও এখন ইংরেজী বলতে পারছে সেই ‘জানালা’র সুবাদে। এমনটা ঘটে থাকলে আমি নিজেও সাবাশ দেবার জন্য প্রস্তুত রয়েছি। বীরত্বকে তো অন্য কোন কপটতা দিয়ে ঢেকে রাখা সম্ভব না।

সবার দৃষ্টিভঙ্গী নিশ্চয় এক হবার কথা নয়, ভাববার বৈচিত্র তো আছেই। আমার দৃষ্টিকোণে এ্যাডটিতে নারীকে হেয় বা ছোট করার যে মানসিক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিলো পরিচালক সুচারুরুপে প্রচারকের গুণকীর্তি গাইতে গিয়ে শেষে তাকেই মহান করে তোলেন। একটি পারিবারিক সম্পর্কের দুটি চরিত্রের উপর নির্ভর করে তুলনামূলক বাড়ীর কর্তাকে ‘বড়’ এবং গৃহিনীকে ‘ছোট’ করে দেখানো হয়েছে। এক্ষেত্রে, তিনি কতটাই বা সফল হয়েছেন ? অসফলতার কথা নয়; উপস্থাপনার তাগিদে যেনো অপ্রাসঙ্গিক কোন প্রেক্ষাপট ‘মূল বিষয়বস্তু’ না হতে পারে সেটাই চিহ্নিত করাই এ লেখার সূক্ষ প্রয়াস।

একদা নেপোলিয়ান বলেছিলেন “আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও আমি তোমাদেরকে একটি শিক্ষিত জাতি দিবো” – অপরপক্ষে বেগম রোকেয়া তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার চিত্র এভাবেই লিপিবদ্ধ করেছিলেন “অনেকে বলেন, স্ত্রীলোকদের উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন নাই। মেয়েরা চর্ব্ব্য, চোষ্য রাধিতেঁ পারে, বিবিধ প্রকার সেলাই করিতে পারে, দুই-চারিখানা উপন্যাস পাঠ করিতে পারে, ইহাই যথেষ্ট” – দুজন মহানের কথায়ই স্পষ্টত – অস্পষ্টত প্রমাণ মেলে আমাদের জাতিকে জ্ঞাণত সমৃদ্ধরুপে দেখতে চাইলে তা একজন শিক্ষিত নারীর উপর অনেকাংশই নির্ভরশীল। এজন্য তাকে কর্মে-গুণে-মহিমায় অনন্যা হতে হবে, যার বাহক শিক্ষা।

ওই এ্যাডটির পরিচালক ও প্রচারক এই ‘শিক্ষা’ শব্দটির উপর ভর করেই আমাদের দৃষ্টিকোণকে সরাতে চেয়েছিলেন, আর সেখানেই আমাদের বাড়ীর গৃহিনীদেরকে এমন একটি ‘ক্যাটাগরী’তে নিয়ে অবস্থান দেন যেখানে বাংলাদেশের প্রকৃত নারী শিক্ষার হারকেই তীরবিদ্ধ করেছে। স্পষ্টতই প্রমাণ করেছে তাদের অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষা যোগত্যা, ইংরেজী না পারা এবং ভীত বোধ তাদেরকে সমাজের চোখে ছোট থেকে ছোটতর করেছে। এবং অপেক্ষাকৃত সকল যোগত্যা পুরুষকেন্দ্রিক। তারাই সবটার ধারক ও বাহক, তাই স্ত্রীর বলা ইংরেজী কথাতে বিন্দুমাত্র বিষ্ময়বোধ প্রকাশ করতে দ্বিধা করেননি এ্যাডটির কর্তা। এখানেও আরেক দফায় গৃহিনী’কে অপদস্থ হবার প্রয়াস ছিলো, তাচ্ছিল্যের প্রকাশ বলাই বাহুল্য। অবশ্য পরিচালক ‘না বলা ভাষায়’ তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ‘দৃশ্য অভিনয়ে’ !

একটি পারিবারিক টেলিভিশনে যখন এ্যাডটি প্রচারিত হতে থাকে, পরিবারের সকল সদস্যের মাঝে আমাদের গৃহিনী’রাও থাকেন। তার সন্তানেরা বা তার সন্তানের সন্তানরাও থাকেন। যখন এ্যাডটি দেখে কারও বুঝতে বাকী থাকেনা ‘গৃহিনী’র ইংরেজী ভীতি বা স্বল্প শিক্ষিতা বা অশিক্ষিতা তখন ইংরেজী স্কুল পড়ুয়া কোন বাচ্চা সন্তান ইংরেজীতে প্রশ্ন করে থাকে “আর ইউ অলছো লাইক দ্যাট ?” – তখন আমাদের গৃহিনীর কাচুমাচু মুখে শত-সহস্র চেষ্টায় উত্তর খুজতে ব্যার্থ অসফল-লজ্জিত মুখখানিতে পারিবারিক যে অসম্মানের ভীত গড়ে উঠে তা কি ওই এ্যাড বিন্দুমাত্র মোচন করতে পারবে ?

এ্যাডটিতে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে, আমাদের বাসা-বাড়ীতে যে গৃহিনীরা কাজ করেন তার অধিকাংশই এমন শিক্ষিতা যারা ইংরেজী বুঝতে ও বলতে চরম মাত্রায় অদক্ষ। আমিও অস্বীকার করছিনা, আমাদের সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় বর্তমান যে ধারা তাতে শুধু গৃহিনী কেন কর্পোরেট অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মদক্ষ কিন্তু ইংরেজীতে বলা বা লেখায়ও অনেক অদক্ষ পুরুষ ও মহিলা উভয়কেই পাওয়া যাবে। কিন্তু একটি সামাজিক এ্যাডে কেনো নারী’কে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করে হলো, অবশ্য সে রাস্তা থেকে উত্তোরণের পথও বাতলে দেয়া হোলো – তার একমাত্র সমাধান “বিবিসি জানালা”।

আমাদের নীতি নির্ধারকদের গলাধকরণ: করানো হয়েছে – ইংরেজীতে পিছিয়ে থাকা আমাদের নারীদেরকে সেই ভাষা শেখানোর মহান কাজটি করছে ‘বিবিসি’, আমার আপত্তি সেখানে না – বিষয়টি সবার জন্যই প্রযোজ্য হওয়া উচিত। কিন্তু শুধু কেন নারী ভূমিকায় থাকবে ? সেখানে তো কোন পুরুষকেও দেখানো যেত ? নারীকে কোন বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে ‘দূর্বল’ দেখানোর অর্থ তো সুষ্পষ্ট – তাকে হেয় বা অপমানিত করা।

একজন নারীকে এখনো আমরা ঘরের চারকোণায় বন্দী করে রাখতে যায়, সে নারীর কপালে এ বন্দীদশা শুরু হয় তার নিজ গৃহ হতেই, তারপর স্বামীর গৃহ – অত:পর জীবনের শেষ দিনগুলোতে কোথাও না কোথাও বন্দীদশাতেই কেটে যায় বাকী সময়গুলো। নারী বেরিয়ে আসতে চাইছেনা ? না আমরা বেরিয়ে আসতে দিচ্ছিনা ? তাহলে প্রতিবন্ধকতা কোথায় ? এটাই কি স্পষ্ট আমরা প্রতিবন্ধকতাকে লালন করছি, পুষ্টি দিয়ে তাকে বড় করছি – যেখানে নারীর স্বাধীনতাকে হরণ করার প্রত্যেকটা সূত্রই রয়েছে ?

শেষ করছি একটি সম্ভাব্য আংশকা নিয়ে,
খুব শীঘ্রই প্রচার পাবে অনুষ্ঠানটি যেকোন টেলিভিশনে, নারী সংঘ আয়োজিত ‘আর্ন্তজাতিক নারী দিবস’-এর শর্তবর্ষে পদার্পন উপলক্ষে নারীর অধিকার, দাবী ইত্যাদি যৌক্তিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবেন দেশের প্রথম সারির নারী আন্দোলনে সক্রিয় কয়েকজন নারী।
আশংকার কথা এই, সেই অনুষ্ঠানটি প্রচার সহযোগিতা করছে ‘বিবিসি জানালা’ খ্যাত সেই বিখ্যাত এ্যাডটি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29112430 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29112430 2010-03-08 13:54:52
বইমেলায় যাঁরা বাণিজ্য খোজেঁন এবং বাণিজ্যমেলায় যারা বই খোজেঁন
শুরুতেই সতর্কবাণী; শিরোনামের মতন ! তবে ভয়ের কিছু নেই, আপাতত:
যারা ভয় পাবার তারা পাবেই, যাদের আছে সংকীর্ণতা, রয়েছে ক্ষুদ্রতা - ভয়তো তাদের পিছেই, আমার বা আপনার, বিশেষত পাঠকের তো নয়ই।

প্রসঙ্গ কেন্দ্রিকতা ‘বই’ এবং তার সংশ্লিষ্টতা, বাড়তি হিসেবে সংযোজিত ‘বাণিজ্য’ ও তুলনামূলক সমর্থিত শব্দ ‘মেলা’; যদিও আধুনিকতায় - বই, বাণিজ্য ও মেলা-সমূহ’কে আলাদা করে দেখবার আদর্শ বা নীতিগত তেমন সুযোগ থেকেও নেই অথবা সুযোগ ব্যবহারের চেষ্টা করেও করিনা বা পারিনা। না করাটা’ অক্ষমতা এবং না পারাটা’ ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা।

ফিরে যাই শিরোনাম প্রসঙ্গে; চলছে বইমেলা-একাডেমী প্রাঙ্গণে এবং চলবে ফেব্রুয়ারী মাস পুরোটা অব্দি। মেলায় মিলন ঘটবে-এটাই স্বাভাবিকতা। প্রকাশক-লেখক-পাঠককুলের এক অপূর্ব-নিরবিচ্ছিন্ন মিলন । যদিও মিলনের সমীকরণ’টা এরকম: প্রকাশক-লেখক এবং পাঠক-লেখক, তবে প্রকাশকের সাথে পাঠকের সংযোগ’টা সেখানেই যেখানে ‘বাণিজ্য’ অস্তিত্ব সু-সমৃদ্ধ।

লেখক ইমদাদুল হক মিলন সাহেবের কোন একটি লেখার উদ্ধৃতি দিচ্ছি “তারাঁ আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘কলকাতার বইমেলার সঙ্গে বাংলা একাডেমীর একুশে বইমেলার ব্যবধান কী?’ উত্তরে আমি বললাম, পশ্চিমবঙ্গ বইমেলা বা কলকাতার বইমেলা একটি বাণিজ্যিক মেলা আর আমাদের বইমেলা হচ্ছে একুশের চেতনার সঙ্গে যুক্ত প্রাণের মেলা।” – প্রখ্যাত লেখকের এমন মন্তব্যে উচ্ছসিত হওয়াটাই স্বাভাবিক, আশায় সঞ্চারিত হোই আমরা পাঠকেরা। বইমেলাকে নিয়ে ব্যক্তিগত ভাববার যে দৃষ্টিসীমা সেখানে সমুন্নত উদ্দীপনা যুক্ত করেন উদ্ধৃতির লেখক। সাধুবাদ তাকে।

খানিকটা বাস্তবতায় বিচরণ করি, বলছি আমাদের বইমেলার কথা। একটি তুলনামূলক পরিসংখ্যানের হিসেবটা কারও অজানা নয়-“বই প্রকাশের সংখ্যা”র হিসেব। লক্ষ্যনীয়, বইমেলা উপলক্ষ্যে মেলা চলাকালীন সময়ে যে হাজার বা ততোধিক সংখ্যার বই প্রকাশিত হয়, সারা বছরের প্রকাশের সংখ্যা সেখানে দু বা তিন ডিজিটে কষ্টে কষ্টে ছুয়ে থাকা। এটা কিসের ইঙ্গিত হতে পারে ? আমি বিশ্লেষক নই, তাই আপাতত শুধু মন্তব্যই করছি। প্রকাশ সীমাবদ্ধতায় থেকেছে তা নয়, এর সাথে যে ‘বাণিজ্য’ তার হিসেবের পরিমাণটাও এ বইমেলাতে কোটি টাকা ছাড়িয়ে বা ততোধিক। একটা মন্তব্য করতে দু:সাহস দেখাই - ভাষার মাস, শোক, একুশ তারিখ; বাঙালী আবেগের সাথে জড়িয়ে থাকা এ’কটা শব্দের মমার্থ কি আমরা কোন “বাণিজ্য” শব্দকরণের মধ্যে খুঁজতে চাইবো ? নিশ্বচয় সমস্বরে “না”। কারণ একুশ মানেই আবেগ, আর সে আবেগের বড় জায়গাটা আমাদের এই গ্রন্থমেলা।

কথাচ্ছলে অভিযোগের সুর তোলা হচ্ছে এখন, “সারাবছর প্রকাশকরা শুধু একমাস বই বের করার জন্য বসে থাকেন।” প্রকাশকেরা কি বই লেখেন ? তারা তো শুধুই ছাপান। তাহলে লেখকেরা কি সারা বছর অপেক্ষা করেন এ মাসে বই ছাপানোর জন্য ? প্রশ্নটা আমারই। ভালো – মন্দের হিসেব’টা তো আলাদা। এটা অস্বীকার করার জো নেই, প্রকাশক তার অর্থ লগ্নি করছেন বই প্রকাশে, ইনভেষ্ট মানেই রিটার্নের প্রত্যাশা থাকবেই, কারণ এগুলো ব্যবসার অন্তর্ভুক্ত। দ্বন্দ’টা সেখানেই, “মুনাফার লক্ষ্য হয় যদি উপলক্ষ বইমেলা” এটাও নিশ্চয় সবাই করছেন না, কিন্তু তা হচ্ছে। হচ্ছে বলেই একুশের মেলাকে টাগের্ট করা হয়, তা না হলে আর্ন্তজাতিক বা ঢাকা মেইমেলা নামে চলা অন্য মেলাটি কিছুতেই পাঠক প্রাধান্য পায়না বা সেরকম উদ্যোগই থাকেনা। বই বিক্রি করে টাকা পাওয়া যায় একথা ঠিক আবার বই কিনে জ্ঞাণের খোরাকও হয়। অবশ্য সব বইয়ে জ্ঞান দেয়া থাকেনা, সেটা প্রত্যাশিতও নয়।
নির্ভেজাল সত্য কথা, আমাদের যে প্রকাশক সমিতি রয়েছে সেখানে নিবন্ধিত সদস্য ৬০ এর কিছু অধিক, অথচ লক্ষ্যনীয় সর্বাধিক স্টল বরাদ্দ পাওয়া এবারের বইমেলায় তার সংখ্যা প্রায় ৩০০ এরও বেশী, সহজেই কি প্রতীয়মান হয়না, এ প্রকাশনা সংস্থাগুলোর আবিভার্ব শুধুই ‘সিজেনাল প্রকাশক’ হিসেবে নয় ? অনেক লেখককে আক্ষেপ করতে দেখেছি “সম্পাদনার” মতো বড় বিষয়টি প্রকাশনা সংস্থাগুলো এড়িয়ে যান, কিন্তু কিভাবে একটি নির্ভূল ও মানসম্মত বই পাঠকের হাতে পৌছবে ? কথায় আছে না! ‘শেষ ভালো যার তার সব ভালো’ তো ‘বই বিকিকিনি ভাল তো সব ভাল’-এমনটা যেনো না হয়, এটা শংকা’র কথা।

“পাইরেসী” বিষয়টিকে পাশ কাটানো যাবে, সেটারও উপায় নেই। ‘মরার উপর আরেক ঘা’। নগ্ন বাণিজ্য পলিসিতে পিছিয়ে নেই একদল প্রকাশ্য অপরাধী। কার বই কিভাবে কে ছাপিয়ে দিচ্ছে, তারপর হরদম চলছে ক্রেতা-বিক্রেতার হাতবদল। কাগুজে ছাপানো বিধিমালা সমেত আইন সেখানে নির্বাক কটা বাক্য মাত্র। দেখার কেউ নেই যেনো, শুধু গলা ফাটিয়ে চিৎকার, নয়তো দৈনিকের পাতায় দু-চার কলামের ‘আফসোস বাণী’। আরো দেখতে হবে না জানি কতো বই নিয়ে ব্যবসার হরেক রকম কায়দা ! ফন্দি ! এবং ফিকির !

ফিরে আসি ইমদাদুল হক মিলন সাহেবের কথায়, তিনি লেখালেখির শুরুতেই লেখাকে পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন এবং এ পেশায় টিকে থাকবার জন্যে ‘জনপ্রিয় বই’ লেখার লেখক হিসেবেও ঝুকেঁ গেলেন। তিনি জানতেন এবং বুঝতেন, তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আজকে এক্ষেত্রে তিনি একজন ‘জনপ্রিয়’ লেখক। লাইনে দাড়িয়ে বই সংগ্রহে বাড়তি উৎসাহ হিসেবে যোগ হয় যদি পাওয়া যায় স্বহস্তে তার আকাঁনো অটোগ্রাফ। নি:সন্দেহে সেদিনকার সে ‘জনপ্রিয়’ হবার সিদ্ধান্ত তাঁর ভূল ছিলোনা। প্রত্যেক লেখক ভেদে পাঠকের ভিন্ন রকমের প্রত্যাশা থাকে, প্রত্যাশা পূরন হলেই ব্যাস, পাঠকের চাহিদা তো অন্তত মিটে যাবে !

আক্ষেপ, অভিযোগ, অনুতাপ, হতাশা ও খানিকটা অসহায়বোধ থেকে পত্রিকার কলাম ছেপে প্রকাশ পাচ্ছে বইমেলা সংক্রান্ত খবর পাতায় পাতায়, উদাহরণের ধরণটা এমন ‘মোড়ক উন্মোচনের জোয়ার’, ‘যেন মানসম্মত বই বের হয়’, ‘স্থান সংকুলান নিয়ে জট’, ‘ভালো বইয়ের আকাল’, ‘পাইরেসির বিরুদ্ধে অভিযান’, ‘আর্ন্তজাতিকতার ছাপ দেখতে চাই’, ‘বইয়ের মান বিচার করা উচিত’, ‘লেখকের স্বার্থ বিপন্ন’ ইত্যাদি এবং অনেক কিছু।

অন্যায়ের আবদার নয়, এতটুকুন ভবিষ্যত প্রত্যাশা – ফেব্রুয়ারীর এ বইমেলা যেনো শুধু বই বিক্রীর ‘মাসব্যাপী বিশেষ বাজারে’ পরিণত না হয়, তার আগেই সেটাকে আক্ষরিক ও ব্যবহারিক অর্থে মেলাপোযোগী করে তোলার প্রয়াস থাকতে হবে, তা স্থান সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে, নীতিমালা বাস্তবায়ন ও তার প্রত্যক্ষ প্রয়োগ। অসাধু-কপটাতা থেকে মেলাকে দূরে রাখার পাশাপাশি এক মাসের সংকীর্ণ চেতনাকে বিসর্জন দিতে হবে, লেখক এবং প্রকাশক উভয়কেই। জলাঞ্জলী দিতে হবে অপেশাদারী মনোভাবকে। শুধু সরকারের দোহাই নয়, লেখক সংঘ, পাঠক ফোরাম এবং প্রকাশক সমিতি, যথেষ্ট কি নয় কোন নতুন পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে এ তিনটি দলের অভিন্ন মতামতের ? প্লিজ! এ কথাটুকু অন্তত মাথায় রাখি সবাই, আমাদের লজ্জার সীমা থাকবেনা যখন অন্য দেশের কেউ আঙুল উচিঁয়ে উদাহরণ দাড় করাতে চাইবে, “ওই তো ওপারেও বই বিক্রীর একটা হাট বসে ফেব্রুয়ারীতে, দেদারছে চলে ব্যবসা, ভালই – মন্দ না।” আমাদের আক্ষেপ’টা বেড়ে ততদিনে শতগুণে পৌছাবে কারণ অবহেলায় পার করা এ সময় আমাদেরকে সহজেই ছেড়ে দেবেনা।

অনস্বীকার্য সত্য এ কথা, যারা প্রকৃত পাঠক তারা মুখিয়ে থাকেন নতুনত্বে, পাঠ তৃষ্ঞা ক্রমাগত তাদেরকে তৃষ্ঞার্ত করে তোলে অপেক্ষার প্রহরে। ফেব্রুয়ারী মাস ঘুরে যেতেই সেই পুরোনো কষ্ট বুকে চেঁপে অতীত অপেক্ষার পুনারাবৃত্তি।
লেখক – পাঠকও বটে! কিন্তু সব পাঠক – লেখক নয়। তাই লেখকের দুটি স্বত্ত্বা। তাঁরা বাক্যের কারিগর, শব্দের রুপকার – সৃষ্টিশীলতাই তাদেঁর পরিচয়। তাদেঁর প্রাপ্য সম্মানকে তাদেঁর কাছে পৌছে দিতে হবে। এবং পাঠকেরাই লেখকের আবিষ্কারক। সেজন্যই আবিষ্কাকরকে প্রাধান্য দিতে হবে লেখককে, প্রকাশক তার সহায়ক।


শেষ করছি বাণিজ্য মেলা নিয়ে একটা কাহিনী দিয়ে,

ঘটনাটা গেল বাণিজ্য মেলায়, তেমন বেশী কিছু না। খুব সিম্পল। তিনি যে স্টলেই ঢুকছেন সবার দৃষ্টি তার দিকে, একেবারে সেলস্ ম্যানেজার, এক্সিকিউটিভ এমনকি যারা কেনাকাটা করছেন তারাও পর্যন্ত সবকিছু থামিয়ে তার কথা শুনছেন নয়তো তাকিয়ে আছেন। তিনি’টা যিনি তিনি সমাজের একজন উচুঁ দরের, চলনে আর কথার ধাচেঁই তা বলে। কিন্তু কি এমন ঘটনা ঘটাচ্ছেন যে প্রতিটা স্টলেই সবাই সবকিছু থামিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।

তিনি একটা “বুক শোপিস” খুঁজছেন, সোজা বাংলায় বইয়ের শোপিস। তা সে কাঁচ, সিরামিক, ইট-পাথরের যাই হোকনা কেনো! দাম কোন ব্যপারই না! কিন্তু শোপিস’টা হতে হবে হোমারের বইয়ের। অন্য কিছু নয়। বিপত্তিটা সেখানেই; কেউ এরকম শোপিস রাখা তো দূরে থাক নামও বোধহয় শুনেছে কিনা তাও সন্দেহ। শুধু ফুচকা-চটপটির কটা’ দোকান বাদ দিয়ে আর কোন স্টলেই তিনি বাকী রাখছেন না।

- “হোমারের ইলিয়াড বইয়ের শোপিসটা কি আপনার স্টলে আছে?”
স্যার, দু:খিত ... হোমার ..
- “হোমারের ইলিয়াড বই”

ঠিক পাশে দাড়িয়ে থাকা ফতুয়া পরনের আধা বয়সী একটা লোক বইয়ের নামটা শুনতেই পেছনে তাকান। একনজর তাকে দেখে ভাবতে বিন্দুমাত্র দেরী করলেননা তিনি একজন সাহিত্য বই সমঝদার লোক, যে কিনা এরকম বিশ্বখ্যাত সাহিত্যের খোঁজখবরও রাখেন।

- ‘ভাই, আপনি তো খুব সাহিত্য সমঝদার লোক ! তা এখানে কি ওই হোমারের বই পাবেন ?’ - লোকটা জিজ্ঞেস করলনে তাকে।
- ‘বই না ভাই, “শোপিস” খুঁজছি। বইয়ের শোপিস’ – উত্তর দিলেন তিনি

মেলা শেষ অব্দি হয়তো তিনি সবকটা’ স্টলেই চষে বেরিয়েছেন, কোথাও বইটি, দু:খিত বইয়ের শোপিস’টি পেয়েছিলেন কিনা তা আর জানা হয়নি। ইদানিং কালে উঁচুরা কাগুজের বই সংগ্রহ না করলেও আভিজাত্য বাড়াতে “শোপিস বই” কেনার ব্যপারে যে আগ্রহী হয়ে উঠছেন, এটা বেশ আশাব্যঞ্জক। সার্থক বাণিজ্যমেলা !
কাহিনীর শেষ এখানেই।

উপসংহার : “এনলার্জমেন্ট অব চয়েস” - ধার করা এ বাক্যটির সুরে তাই লেখার সর্বশেষ বাক্য “বাণিজ্য মেলাতে বই ? না ! বই মেলায় বাণিজ্য?” – চয়েস আপনার – ভূল বা ঠিক যাই হোক !]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29101640 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29101640 2010-02-20 15:07:26
৩১ ডিসে: এবং অত:পর ১জানু: ঘড়ির কাটায় তখন রাত ১১টা; বছরের শেষ দিন, ইতোমধ্যে সবজাগাতেই কাউন্টডাওন শুরু হয়েছে, ৫৯ – ৫৮- ৫৭ ... এভাবে মিনিটের হিসেব ..কতটা সময় পর বেজে উঠবে ২০১০ এর প্রথম ঘন্টাটা, চারদিক উল্লসিত হবে, হৈ-হুল্লোর ... তার আগেই ২০০৯এর পুরো ১২’টা মাসের এক বিশাল চ্যাপ্টার ক্লোজ হয়ে যাবে।

আমিও তখন টেলিভিশনের সামনে, ২০০৯ এর বিশেষ ঘটনাগুলো একে একে স্লাইড শো’র মত করে চোখের সামনে টেনে আনছে টিভি কর্তৃপক্ষ। ঝাপসা চোখে তার কিছুটা দেখছি বাকীটা নি:শব্দে এড়িয়ে যাচ্ছে। আমি যেখানটায় বসা ঠিক তার পাশেই বাবা শুয়ে আছেন। শীতের চাঁদরে পুরোটা শরীর ঢেকে রেখেছেন শুধু মুখ আর চোখ বাদে। আমার চোখদুটো বারবার চলে যাচ্ছিলো তার চোখের উপর। ডান হাতটা তার মাথার অল্প কটা চুলের উপর রাখতেই, বাবা ফিরে তাকায়। “খোকা খেয়েছিস ? সেই সকালের পর থেকে তো আর কিছুই খাসনি” –‘জ্বী বাবা, খেয়ে নেবো’ । ঠিক এ সময় বাড়ীর সামনের রাস্তা সোজা একটা ৩১ রাতের শেষ উৎসবের ছেলেমেয়েরা সশব্দে গাড়ীগুলোতে হর্ণ বাজিয়ে চলেছে। বাবা আমার কথা ঠিকমত শুনতেই পারেননি, অন্যমনস্কতায় শীতের চাঁদরে আবার ঢেকে গেলেন।

অফিস থেকে বাসায় ফিরেছি, তারপর ফ্রেশ হতে হতেই রাত ১০টার বেশী। বাবার কাছে সেই তখন থেকেই বসা। শুধু একটা ফতুয়াতে এখন কিছুটা ঠান্ডা লাগছে, যদিও বাবার জন্য সব দরজা-জানালা কোথাও কোনোটা খুলে রাখার জো নেই, তারপরেও আজ বাইরে বেশ ঠান্ডা ছিলো, ঘরের ভেতরও তাই। অফিসেই গিয়েছিলাম বিকেল ৫টার পর। এতোপরেও যেতে হয়েছিলো, কেউ এতটুকুন সৌজন্যবোধে বলেনি “থাক, আজ আর এসে কি হবে, সময় তো এম্নিতেই শেষ” কর্পোরেট ভদ্রতায় বোধহয় ওই সৌজন্যবোধের যথেষ্ট অভাব আছে।

আমার বাবা। আজ ছ থেকে সাত বছর হতে চললো পঙ্গুত্বের এক অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছেন। ২০০৩ সালের কথা, তখন বাবা একটা জরুরী কাজে ঢাকা থেকে বাড়ীতে গিয়েছিলেন যশোরে। সদ্য অবসরে এসেও পরিবারের কথা ভেবে আবার একটা চাকরীতেও জয়েন করেছেন ততদিনে। সেই চাকরীর বয়সও খুব বেশী দিন হয়নি, তার আগেই কোনকিছু ভাববার সুযোগটুকু না দিয়ে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গ্যালো। যশোরেই ‘ব্রেণ স্ট্রোক’ করলেন ডাক্তারদের ভাষায় ‘ব্রেণ হেমারেজ’, ৭২ঘন্টা ক্লিনিক্যাল অবজারভেশনে রাখা হলো, তখন তার জীবন বলতে শুধু প্রাণটুকুই ছিলো। আমরা, মানে ভাই – মা আর আমি খবর পাওয়া মাত্রই চলে গেলাম যশোরে। যা দেখেছিলাম, বাবা’র হাত – পা হাসপাতালের বেডের সাথে বাঁধা, মুখের বা পাশ’টা একদিকে বাঁকা, কথাও ঠিকমত বলতে পারছিলেন না, মা’কে চিনতে পারেননি, আমাদেরকেও না ... থাক সে কথা, এগুলো বহুদূরে যেতে হবে। ২৪ঘন্টা পার হলে ডাক্তারদের বিশেষ পরামর্শে প্লেনে আনা হলো ঢাকা’তে, এখানে শুরু হলো নতুন করে চিকিৎসা, এরপর প্রতিটি সেকেন্ড আমাদের পুরো পরিবারের জন্য কত’টা উদ্বিগ্নতা ছিলো হয়ত কথা বা লেখার ভাষায় তার প্রকাশ সেভাবে করা যাবেনা। আইসিউ১, আইসিউ২ এবং আইসিউ৩ এভাবে মাসখানেক তারপর কেবিন, কেবিনে ছিলো প্রায় মাস ছ’য়েকের মতো। বাবা আস্তে আস্তে শারীরিক সুস্থতা ফিরে পেতে থাকলেও তার শরীরের বা’পাশ হাত ও পা দুটোই অচল হয়ে যায়। আমরা বাবাকে ফিরে পাই এটাই আমাদের স্বান্তনা, আল্লাহ’র অশেষ কৃপা।

২০০৩সাল, কলেজ পাশ করে ইউনিভার্সিটি’র অপেক্ষায়। ছোটটা’র এইচএসসি পরীক্ষা। জীবনের কঠিন মুহুর্ত, বাড়ীতে মা একা, আমি হাসপাতালে দিন-দুপুর-রাত। এভাবে চলে গেলো হাসপাতালের ছ’টি মাস বা তারও বেশী। আর্থিকভাবেও তুলনামূলক সঞ্চয় ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকলো, উপার্যনক্ষম বলে আর কেউ রইলো না। পড়াশোনা অথবা চাকরী ? দুটো প্রশ্নে এক সিদ্ধান্ত ! বেছে নিলাম চাকরী। শুরু হয়েছিল জীবনের অন্য একটি অধ্যায়।

সেদিনের বাবার অসুস্থতা তার হাসপাতালের সময়কালীন আমাদের খুব কাছে থাকা, অনেকটা একই প্রাণ হয়ে গিয়েছিলাম, তাই অসুস্থতা সেরে বাড়ীতে নিয়ে এলেও সবসময় চোখে চোখে রাখা হোতো। অফিসে এসে ফোন, দুপুরে, ফিরবার সময়-একটা রুটিন দাড়িয়ে গ্যালো। বাবা’র প্রতি যে ভালবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ সেখান থেকে নতুন যে সম্পর্কের সূচনা হলো, তাতে অনন্ত এতটুকুন উপলব্ধি হয়েছিল, পৃথিবীতে বাবা এবং মা’ই সব, এক মুহুর্তও এই দুজন’কে ছাড়া নয়।

অন্যদিনের মত কাল সকালেও অফিস টাইমের হিসেবে মায়ের নাস্তার আয়োজন, বাবা’র ওই সময়ে ঘুমিয়ে থাকা, ছোটটা ততক্ষণে অফিসে রওনা দিয়েছে। আমি বের হবো হবো প্রস্তুতি, ঠিক এ সময় বাবার অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লো মায়ের চোখে। মা’ বাবাকে নাস্তা করিয়ে দিলেন। কিন্তু বিপত্তিটা ধরা পড়লো তখনই নাস্তা সেরে উঠতেই আবার জিজ্ঞেস করছেন ‘নাস্তা করেছেন কিনা’, ‘সকালে বাথরুমে গিয়েছিলেন কিনা’, ‘গত রাতে ওষুধ খেয়েছিলেন কিনা’ ইত্যাদি। তাড়াতাড়ি ব্লাড প্রেসার মেপে দেখি প্রেসার অনেক বেশী। সকালের ওষুধ যে কি খেতেন সেটাও মনে করতে পারছেননা। ওষুধ খাইয়ে শুইয়ে দিলাম, কিছুক্ষণ পর পরই প্রেসার মাপতে বলছেন, যতই বলছি এইতো মিনিট দুই আগে মাপলাম, তিনি বলছেন ‘কোই?’ মানে কিছুতেই স্মরণে আনতে পারছেন না। আমি কিভাবে বলবো, ঠিক ও সময় বাবার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিলো না। বাবাকে হাসপাতালে নিয়েছিলাম, ডাক্তার সাহেব ওষুধ দিলেন, বাবাকে আবার বাড়ীও নিয়ে এলাম।

আর অল্পক্ষণ বাকী ছিলো রাত ১২টা বাজতে, কতজনে হয়তো আগেই উইশ ম্যাসেজ পাঠাচ্ছে, মোবাইলে এসএমএস টোন বাজছে তাই। বাবার পাশেই বাসে থাকি অনেকক্ষণ। আস্তে আস্তে বাবা’র চোখদুটোতে ঘুম জড়িয়ে এলে উঠে আসতেই, আস্তে করে বাবা বলে বসেন “খোকা, এটা সেই তোকে দেয়া আমার ফতুয়া’টা না !, অনেকদিন পরিসনি, তাই না? বাবা’কে আমার দূর্বলতা বুঝতে দেবার আগেই রুম থেকে বেরিয়ে আসি।

বাইরে ততক্ষণে ডিসকো গানের আওয়াজ বাজছে, বন্ধ জানালা দিয়েও তা ভেতরে আসছিলো। মনিটরের সামনে বসে থেকেও কাউকে শুভেচ্ছা বাণী পাঠানো হয়নি, ইনবক্সের আনরিড ম্যাসেজগুলো থেকে প্রথম দিকের দু-একটা ম্যাসেজ পড়ে রিপ্লাই বাটন প্রেস করেছি, কিন্তু রিপ্লাই দেয়া হয়নি। সরি বন্ধুরা।

সকালের নিয়মমাফিক রুটিন অফিস। রাস্তায় বেরিয়ে তেমন কোন জ্যাম দেখিনাই আজ। তুলনামূলক খালি বাসের একটা জানলার পাশের সিটে বসে, অল্পদূর যেতেই বাবাকে ফোন দেই ‘বাবা, আজ সকালে নাস্তা করেছো ? কি দিয়ে করেছো’ .. বাবা মুখস্থ বলার মতো গড় গড় করে বলে দিলেন বিস্তারিত বিবরণ … আমি শুধু বলেছি ‘বাবা, ঠিক আছে, আর বলতে হবেনা’ বাবা’র চাপা কন্ঠস্বর গাঢ় হবার আগেই ফোনের লাইনটা কেটে যায়।


৩১ডিসে: রাত, এবং-অত:পর ১জানু: সকাল, অন্যকোন দিন বা রাত থেকে আলাদা করে দেখবার সময় বোধহয় আমার এখনো আসেনি, বাড়তি কোন উচ্ছাস বা পুরোনোকে পেছনে রেখে আসবার বিষাদও তেমন সক্রিয় নয়।
প্রতিদিনকার জীবন চলে, তাই চলি বা চলতে হয় – এটাই সুখকামনা যেন অন্তত আজকের প্রতিটি দিনই সর্বোচ্চ ভাল থাকুক বা ভাল কাটুক – আমার বা আমাদের সীমাবদ্ধতায়।

সকলের প্রতি রইল শুভকামনা ও নতুন বছরের শুভেচ্ছা।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29069914 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29069914 2010-01-01 18:08:48
"স্বাধীনতা" নিয়ে কটাউক্তি - - - 'কটুক্তি' নয় ! স্বাধীনতা” – বোল্ড অক্ষরে লেখা কতকটা বর্ণের একটা শব্দ।

আজকের এ দিনটাতে এ শব্দটাকেই নিয়েই যত হৈ-হুল্লোর, চারদিকে চেঁচামেচি, কোলাহল .. সবার মুখে মুখে স্বাধীনতা আর স্বাধীনতা, লাল-সবুজ পতাকার রং-এ গায়ে জড়িয়ে মহত্ব উপলব্ধির মহড়া। কত জ্ঞাণী-বিজ্ঞাণী এ নিয়ে কতকথা বলে চলেছেন, তার এখন আর কোন ইয়াত্তা নেই।

আজ সকালের পত্রিকায় আমাদের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর দেয়া লিখিত বাণী’টা পড়া হয়নি, ফোরাম, গ্রুপ, সোশ্যাল কমিউনিটি সাইটগুলোতেও শুধু এক বা দো অক্ষরের সীমিত বাণী, নয়তো গোটা চারেক লাইনের শুদ্ধ-চলিত ভাষায় স্বাধীনতার গুণকীর্তি।

আমিও বাদ যাব কেন, তবে অন্য যে কিছুর তুলনায় স্রোতে গা ভাসানোর মত তেমন কিছু নয়, স্বাধীনতা নিয়ে দু-চারটে কথা যা আমার ফেসবুক স্টাটাসে বিভিন্ন সময় লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলাম।

.
.
.


01 December
আমরা জীবনের সাথে যুদ্ধ করি; কখনো বা প্রতিনিয়ত : জীবনকে হারাতে পারিনা, আমরাই হেরে যাই !


02 December
স্বাধীনতা; 'বদলে যেতে নেই' - - 'বদলে দিতে নেই' ...


02 December
সেই তখন ১৯৭১; আর এখন ২০০৯ - সময়ের ব্যবধান না যত অথচ আমাদের মানসিকতায় 'এখন আর তখন' : ব্যবধান-টা বিস্তর !


03 December
স্বাধীনতা; আমরা কোন চিহ্ন'টি ব্যবহার করতে পারি - আশ্চর্যবোধক (!) অথবা প্রশ্নবোধক (?)

04 December
স্বাধীন স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতায় পরাধীনতা; স্বাধীনতায় কেন শ্রেণীবিভেদ ? - অন্তত স্বাধীনতাকে শ্রেণীভাগ হতে মুক্ত করো !


05 December
একদা গুরু বলেছিলেন "বৎস! কখনো তোমার হৃদয়ে অহংকার আনিবেনা, জানিবে; অহংকার পতনের মূল" - গুরু'র মুখের উপর সেদিন কয়েছিলাম "গুরুজী, মাফ করিবেন; আমি অহংকার করি; মাত্র একটি - "স্বাধীনতা" আমাদের বিজয়, এ অহংকার আমায় সৃষ্টিশীল হইতে শিখায়েছে, পতনের নহে"


06 December
পাশের বাড়ীর চঞ্চলা-চপলা অষ্টাদশী মেয়েটিকে প্রতি বিকেলে এক পলক দেখা; এইটা আমার ব্যক্তিগত 'স্বাধীনতা', -কিন্তু- আমার দেশের আশের এবং পাশের অন্য দেশ যেনো চোখ তুলে তাকাতে না পারে; সেইটা আমার দেশের "স্বাধীনতা"


06 December
"তাঁরে আমি চোখে দেখিনি .. তাঁর অনেক গল্প শুনেছি .. তাঁর অনেক গল্প শুনে ... তাঁকে আমি বেশী বেশী ভালবেসেছি .... " এই 'তাঁকে এবং তাঁর' - একটাই -স্বাধীনতা-, আমার দেশের স্বাধীনতা !


07 December
মানুষরুপী হায়েনা'দের কথা জেনেছি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে; সাধারণ কথায় আমরা যাকে বলি "হানাদার"

08 December
স্বাধীনতা; ‘লাঙ্গল’ দিয়ে চাষ করে ফলন হইলো ‘ধান’ সেইটা আবার নদীমাতা দেশ তাই ‘নৌকায়’ করে গঞ্জে আনলো, এইবারে ‘দাড়িপাল্লা’ দিয়ে মাপাজোকা – হায়রে স্বাধীনতা, ভাগযোগের এই রাজনীতিতে এভাবেই ব্যবচ্ছেদ করে চলেছি !

09 December
" স্বাধীনতা " - আক্ষরিক এ শব্দটি ' বলবার এবং লেখবার ' স্বাধীনতা - আমাদের অর্জিত বিজয় সেই স্বাধীনতাই আমাদের দিয়েছে !

10 December
স্বাধীনতায় জয়ের আনন্দ-ও আছে আবার হারানোর শোক-ও আছে - স্বাধীনতা কোন 'শোক দিবস' নয় - বিজয়ের আনন্দ উল্লাস !

11 December
স্বাধীন দেশে স্বাধীনতাকামী সৈনিক যখন স্বাধীনতা'র পদক বিক্রী করেন জীবন বাঁচাবার তাগিদে; আর যতবারই ভূলে যেতে চাই এ ঘটনাটি , পারি কি ? স্বাধীনতার বিজয়ের এ মাসে আত্মোপলব্ধিতে শুধু অনুতপ্ত আর অপরাধবোধ ছাড়া বাকী কিছুই অবশিষ্ট থাকেনা !


12 December
স্বাধীনতায় 'স্ব' শক্তি আছে; স্বাধীনতায় 'স্ব' গৌরব আছে।


14 December
হারানোই - ক্ষতি, কখনো সেই ক্ষতির পূরণ হয় নয়তো পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়। ১৪ ডিসেম্বরের গোটা জাতির যে ক্ষতি; না তা হয় পূরণ, না পুষিয়ে নেয়া যাবে কখনো।

.
.
.

আজকের এ দিনে আর কি বলবো ! কিইবা লিখতে পারি .. নিজের ভেতরকার পুরোনো কটা’ কথা তুলে দিয়ে আমার সীমাবদ্ধটাকে এভাবেই উপসংহারের পথে টেনে নিই
আসেন, আমরা সবাই – মানে পুরো গোটা জাতি; আজকের দিনটা পেরুলেই ভুলে যাবো স্বাধীনতার কথা, আমরা অপেক্ষা করবো আরো একটি ১৬ ডিসেম্বর

বিজয় ভোগ বা উপভোগের নয়, তবুও আমরা তারই স্বাদ নিয়ে চলেছি; অদ্যবধি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29059934 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29059934 2009-12-16 13:02:19
নিখোঁজ সংবাদ
এরকম একটা ব্যপারের সাথে যে পরিচয় জীবনের এটাই প্রথম; তা কিন্তু নয়। প্রথম হলে আশ্চর্যবোধ-টা বেশী থাকে। কতবার যে এরকম ঘটনায় আশ্চর্যিত হয়েছি, এখন ঠিক তার উল্টো - ‘আতংক’। না ফিরে পাবার আবার হারাবার এক অজানা আতংক।

এইতো, সেদিনের কথা - খুব কাছাকাছি সময়ের ব্যবধান। আমার এক সহকর্মী, তার পরিবারের জন্যও এরকম কত আয়োজন করতে হোলো, না করে উপায়ও ছিলোনা, ব্যপারটা এড়িয়ে যাবার মতও নয়। ঠিক সেদিনের সেই ঘটনার আগের সেই মানুষটিকে আর কখনো সেভাবে পাইনি, এখনও প্রতিদিনকার মত সকালে অফিসে তার ওয়ার্কষ্টেশনে চা কিংবা কফির মগ-টা বাড়িয়ে দিয়ে “বস, ক্যামোন আছেন !” স্বশব্দে উত্তরের প্রত্যাশা করিনা, মেকী হাসিতে বুঝিয়ে দেন জীবনের বাকীটা সময় এ ‘কেমন থাকার’ উত্তর-টা বোধহয় তার খুব অজানা। ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকেন; ডেবিট-ক্রেডিটের হিসেবে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান।

আমার দোতলা’র ঘরটাতে এম্নিতেই বিকেলের সূর্যটা পেছনে পড়ে যায়। জানালার পর্দাগুলো সব সরানো ছিলো। ছুটির দিন সেদিন; ড্রয়ই বুকে হাবিজাবি পেন্সিল স্কেচ; বাহিরে মাইকের এনাউন্সমেন্ট হচ্ছিলো। খুব সম্ভবত সেবার ইলেকশনের সময়, থেমে থেমে এনাউন্সমেন্ট-টা করছে, ঘর থেকে স্পষ্ট নয়, বিষয়টা ভালোভাবে শোনার জন্যই বারান্দায় যাওয়া। যা ভাবিনাই-ঠিক তাই। আজকাল হরহামেশাই এ ধরনের এনাউন্সমেন্ট হচ্ছে মোড়ের গলিগুলোতে, মুখস্থ পড়ার মতো একই ডায়লগ আউড়ে যাচ্ছে মাইকওয়ালা। হ্যামিলনের বাশিঁওয়ালার মতো কেউ আছে হয়তো এই শহরে।

‘পোষ্টারে’র হেডিংটা ছিলো এরকম “নিখোঁজ”। তার ঠিক ডান দিক নীচে পাসপোর্ট সাইজের একটা ছবি বড় করে পেষ্ট করা আর বাম দিকের কিছু সাদৃশ্য বর্ণনা, যেখানে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের আতংক, আকাঙ্খা, হারিয়ে ফেলার তীব্র বেদনা আর খুজেঁ পাবার তীব্রতর বাসনা। শতভাগই হারানোর; যে হারিয়েছে আর যে হারিয়ে ফেলেছে।
বয়স, গায়ের রং, পরনে শার্ট-প্যান্ট ... শেষবারের মত হারানো জনের বর্ণনাই এভাবেই তুলে দিয়েছে। একটা যোগাযোগের ঠিকানাও আছে আর মোবাইল নম্বর। শেষ আশাটুকুন; যদি খোঁজ পেয়ে কেউ তাদেরকে জানান। আমি অনুমান করতে পারি, এ পোষ্টারের সাথে মিশে থাকা পরিবারটি যদি তাদের প্রিয়জনকে আজও খুজেঁ না পেয়ে থাকেন; প্রতিদিনকার মতো আজ সকালেও হয়তো তাদের মেইল বক্সে মিথ্যে আশায় খোঁজ নিয়েছেন; নয়তো ফোনের স্ক্রীনে অপলক প্রতীক্ষা কখন একটা কলে ফিরে পাবার সংবাদ।

আপনার অভিজ্ঞতায় কি কখনো এমনটা হয়েছে ? এভাবে কোন হারানো পরিবারের মানুষগুলোকে কাছ থেকে দেখবার ? হোক বা না হোক একবার কল্পনায় ভাববার চেষ্টা করবেন কি ? এভাবে কেউ হারিয়ে গ্যালো, তাকে খোঁজবার জন্য পোষ্টার, মাইকিং, থানা, হাসপাতাল সব জাগাতেই ছুটোছুটি করছেন কিন্তু কোথাও পাচ্ছেন না, সময় কিন্তু থেমে নেই তাতে, যে মানুষটিকে ছাড়া একদিনও ভাবাই করা যেতনা সেই মানুষটিই ঘর হতে নিরুদ্দেশ এক দিন, দুদিন করতে করতে বছর ঘুরে আসে। জন্মদিনের মতো হারানো দিনটিতে কষ্টগুলো বুকের গভীরে জাপ্টে ধরে। তবু খুজেঁ পাওয়া যায়না। যে হারিয়েছে সে তো গ্যাছেই; আর যারা তারা অপেক্ষায়, তারা ?

আমার ব্যক্তিগত জীবনের একটা ঘটনা, কখনো ভোলা এটা সম্ভব না। আমার ছোটটা, প্রচন্ড দুরন্তপানার কাছে বাবা-মা-ও মাঝে মাঝে হিমশিম খেতো, তখন ও কত ক্লাশে পড়ে ? ক্লাশ নাইন কি টেন। বাবা কি কারণে রাগারাগি করেছেন, ও সকালে স্কুলে গ্যালো, দুপুর - বিকেল - সন্ধ্যা ও আর ফিরে এলোনা। রাত যখন একটু বাড়লো বাবা অফিস থেকে তখনও আসেননি, আমি তখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেবো। পুরো তন্ন তন্ন করে খোঁজা; কোথাও নেই, উদ্বগ্নিতা, আতংক, ভয় সবকিছু তখন একসাথে। রাত বারোটার উপর, বাবার কলিগরাও খুঁজতে বেরিয়ে গেলেন। মা’ এর কান্না আর তার আশংকা ‘ওকে ছেলে ধরারা নিয়ে গ্যাছে’; আমার মাথায়ও ভর করলো, যদি সত্যি তাই হয় তাহলে তো ওকে আর কখনোই দেখতে পাবোনা, ও কি আর ফিরে আসবে, যদি না আসে, কোথায় থাকবে - এরকম হাজারো কতশত ভয় মিশ্রিত প্রশ্ন। অবশ্য পরে ওকে খুজেঁ পেয়েছিলাম।

আজও যখন রাস্তায় এভাবে “নিখোঁজ” শিরোনামের পোষ্টরটি চোখে এলো, সেদিনকার সেই ক্ষনিকের হারিয়ে ফেলা আমার ছোটটার স্মৃতিগুলো ভেসে এলো, ওতো এখন চাকরী করছে - বড় হয়েছে, কিন্তু পোষ্টারের সাথে লেগে থাকা হারানো পরিবারটির উদ্বিগ্নতা, ভয়, স্নেহ, মায়া আর ভালবাসা - এটার কতটুকুই আমি অনুভব করতে পারি বা আমরা পারি ?

মাঝে মাঝে ভাবি; আমি নিজেই হারিয়ে যায়, নিরুদ্দেশ হোই - স্বইচ্ছায়; কেউ আমাকে যেনো চুরি করতে না পারে।
আমাকে নিয়ে কেউ কি কখনো “নিখোঁজ সংবাদ” পোষ্টার ছাঁপবে ? ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29048145 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29048145 2009-11-23 00:43:14
ছিনতাইকারী
“ওই মিয়া তাড়াতাড়ি করেন, যা আছে দিয়া দ্যান, বেশী কথা বাড়ায়েন না, মানুষ জমে গ্যালে কিন্তু সমস্যা হইবে” - এক উপুষে বলা কথাগুলোর মাঝে কিছুটা যতি চিহ্ন টেনে থামাতে চাইলে, পাশের ছেলেটার সতর্ক চাহনি আর অস্বস্তিকর উশখুশ করা থেকেই বুঝতে পারি, খুব একটা স্বস্তিতে কাজটি তারা করতে পারছেনা। চোখে-মুখেও সে কথা - কোথাও ভয়-আশংকা, আবার তড়িঘড়ি; কিন্তু যারা এ লাইনে প্রফেশনাল, তাদের তো এমনটা হবার কথা না! অভিজ্ঞতাটা আমার বেশ আগের - কারণ ছিনতাইকারীদের কবলে পড়া - এটাই প্রথম নয়।

‘দ্যাখো তোমরা সব নাও, ঠিক আছে, কিন্তু আমার মোবাইল টা ... ওটাতে অনেক..’ / “দ্যাখেন আপনে কিন্তু বেশী প্যাচাল পারতাছেন, বেশী কথা কন ক্যান ! মোবাইলটা এদিকে দ্যান ..” - ওদের হাতের ছোড়াটা যেভাবে অসংলগ্ন ছিলো, অপ্রস্তুত হাতে কখন যে তা ব্যবহার হয়ে যায় সে ভয়ও কাজ করছিলো; এক ঝাপটায় হাত থেকে কেড়ে নিতে চাইলো মোবাইলটা ‘আচ্ছা ঠিক আছে; নাও, কিন্তু নেবার আগে আমাকে একটা কল করতেই হবে .. সে সুযোগটুকুও দাও, প্লিজ’ - সত্যি বোধ হয় ছেলেদুটো এবার বিপদে ফেলে দিলাম, দুজনের তাকাতাকিতে আর অস্পষ্ট সিদ্ধান্তে আরো একবার স্পষ্ট হোলো তারা এ লাইনে কতটা আনস্মার্ট! “যা করবেন তাড়াতাড়ি করেন .... সময় নাই আমাদের” ওদের দূর্বলতার সুযোগকে আরো একবার হাতছাড়া করতে চাইলাম না। ওদের দুজনের একজন তুমি আরেকজন আপনি করে বলছিলো।

‘বাবা, বলো .. হুমম... না না ! .. আমি ঠিক আছি বাবা ... তুমি বলো ... না কোন সমস্যা নাই, জ্বী বাবা ... পথে .. আসছি ... নামগুলো বলো... তাড়াতাড়ি ...’ / “ওই মিয়া আপনারে না তাড়াতাড়ি কইতে কইলাম? রাখেন ?” এক ঝাপটায় আবারো কেড়ে নিতে চাইলো মোবাইল-টা। ‘কথা তো শেষই হয়নি .. তিনি অসুস্থ ...’

‘প্লিজ! আরেকটা’ .... ‘জ্বী ভাইয়া .. বলছি .. ভালো ... ভাইয়া, আমি তো রাস্তায় এখন .. জ্বী .. ফিরছি .. ভাইয়া আমি তো বিপদে পড়ে ..’ / “ওই ধরতো শালারে, শালা বেশী বাইরা গ্যাছে, ওই মিয়া তুমি কারে কও ..” / ‘ভাই শোনো শোনো .. আমি তো তোমাদের কথা বলতে চাইনি .. আমার সমস্যার কথা, ..’

“রাখেন আপনার ফোন ! একটা কইয়া প্যাচাল শুরু করছে” / “ওই দেখতো, ওর পকেটে কি আছে ?” / ‘দাড়াও দিচ্ছি .. এই নাও ঘড়ি’ “মানিব্যাগে টাকা নাই ক্যান? রাখচোছ কোই, বাইর কর ?” / ‘এইটা কি ? চালাকি করো ? এক্কেবারে দিমু যখন - তখন বুঝবা’

‘আসলে, আমার বাবা খুব অসুস্থ, প্রতিদিন তাকে ওষুধ দিতেই হয়, আজই বেতন পেয়েছিলাম .. শেষের দু-দিনের দুটো ডোজ দিতে পারিনি, আজ না দিলে ... তোমরা তো টাকাগুলো নিয়ে যাবে, তাই ভাইজানকে ফোন দিলাম - ও যদি কিছু পারে ...’

“ওই, শালার সব ভালো করে চেক কর” / ‘হাত উচা করেন ... দেখি .. মোজার ভিতর কিছু নাই তো!’, “আপনার বাবার কি হইছে” / ‘তিনি প্যারালাইসিস, ব্রেন স্ট্রোক করছিলো ...’ / “কবে ?” / ‘এইতো বছর ছয়েক হতে চললো’ / “ছয় বছর? এখনো বেঁচে আছেন?”/ ‘হুমম’

ছেলেটা আচমকাই থেমে গ্যালো, “আমার বাবাটাও .... করছিলো .. কিন্তু .....” বাম হাতটা পকেট থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে চোখের আড়ালে কিছু একটা লুকোতে চাইলো, পারলোনা, আবছা আলোতে স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ চোখের জল যখন টি-শার্টে জলের ছোপ ফেলে দিলো, ওটা কি এত দ্রুত শোকাবে?

“ওই, হইছে সব ? নে চল …কিরে দাড়ায়ে আছিস ক্যান” / “দাড়া, মোবাইল-টা দে তো !” / “ক্যান কি করবি” / “আরে দে না !”

“ধরেন, মোবাইল-টা রাখেন, টাকা-টা আমাদের দরকার”
“নে চল”

প্রাণহীন মানুষের মতো কিছুটা সময় নিস্তব্ধ দাড়িয়ে থাকি। বিচারবোধ এবং ভাবনাগুলোকে এলোমেলো করে দেওয়া সেই অমানুষ ছিনতাইকারী ছেলেগুলো এবং তাদের ভেতরে বাস করা পিতৃস্নেহের অমূল্য ভালবাসা, কোনটাকেই অগ্রাহ্য সম্ভব নয়।
ওদের হেটে চলা চেয়ে থাকি ... যতদূর না মিলিয়ে যায় ল্যাম্পপোষ্ট থেকে অদূরে আলো-অন্ধাকারের ত্রিমুখী সড়কে। আজ হৃদয়ের হাতেগোণা হিসেবি কতকটা আবেগ সত্যি সত্যি ছিনতাই হয়ে গ্যালো, ছিনতাই করে নিলো ছিনতাইকারী সেই ছেলেদুটো। মানিব্যাগের পকেট-টা খালি, সামনের বুক পকেটটাও।

“কোন সমস্যা ?” / ‘না ঠিক আছে, কোন সমস্যা নেই’ - ট্রাফিক পুলিশের সন্দেহের চোখটাকে এড়িয়ে যেতে আরও একবার সত্যিটা ছিনতাই করি এবার আমি নিজেই।

এক অর্থে, আমিও একজন ছিনতাইকারী; হয় আবেগের নয়তবা সত্যের।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29025962 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29025962 2009-10-15 01:19:15
জার্নি টু 'যশোর’ - পথে পথে প্রথম দিন ২৩ সেপ্টেম্বর,২০০৯; বুধবার। ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ী যশোর ভ্রমণের বাসের টিকেট পূর্বেই কনফার্ম ছিলো, অবশ্য আগের রাতে বাস সার্ভিসেরা ফোনে সময়টা একদফা চেঞ্জ করেছিলো, সময়টা একদম ভোরে । আমি আর বাবা যাবো মার্সিডিজে - নতুন বাস-এসপি গোল্ডেন লাইন, ঢাকা টু সাতক্ষীরা। আর বাকী তিনজন, মা, ছোটটা আর আমার বন্ধু ওরা একই সার্ভিসের অন্য বাসে, আমাদের সময় সকাল সাড়ে সাতটা আর ওদেরটা সাড়ে আটটা। অবশ্য রাতেই সব গোছানো শেষ। সমস্যা বাঁধলো যখন অত ভোরে রিকশাও পাওয়া যাচ্ছিলোনা; কল্যাণপুর থেকে শ্যামলী বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত যেতে হবে। শেষ মেষ একটা গতি হলো তাও অনেক চড়াই উৎরাই-এর পর।

বাস স্ট্যান্ডে পৌছে মায়ের খেয়াল হলো বাসার ছোট কাজের মেয়েটা গ্যাসের চুলা বন্ধ করেছিলো কিনা, ছোটটা আবার ছুট দিলো বাসায়, এর মধ্যে মার্সিডিজে আরো তিনটে সিটের বন্দোবস্ত হলো, গাড়ী ছাড়ারও সময় হয়েছে, ছোটটা তখনও বাসা থেকে ফিরতে পারিনি, অস্থিরতায় পায়চারী করছি আর ফোনে বারবার ডায়ালিং। গাড়ী থামিয়ে টিকেট চেঞ্জ করলাম ততক্ষনে, অবশ্য এক্সট্রা পে করতে হলো এজন্য। তবুও ভাল একসাথে সবার টিকেটও হলো আর মজা করেই একসাথে যাওয়া যাবে। ছোটটা গাড়ীতে উঠলে সাতটা চল্লিশে স্টেশন ছাড়লো গাড়িটি।

বেশ বিলাশবহুল বাস। মা আর বাবা সামনের সিটে; সি-থ্রি ও সি-ফোর, ছোটটা আর বন্ধু জি-থ্রি, জি-ফোর; আর আমি জি-টু, কিছুটা পেছোনে। আমার পাশের সিট জি-ওয়ানে একটা মেয়ের সিট, পায়ে সার্জারীর ব্যান্ডেজ, কম্বল গায়ে পা তুলে বসা ছিলো, আমি বসাতে সরে বসলো। গাইড কম্বল দিতে চাইলে প্রথমে না করলেও টেম্পারেচার এত লো’তে ছিলো পরে দেখি সবাই কম্বল জড়িয়ে আছি, আমিও বাদ গেলাম না। সাভার ক্রসের পরপরই বৃষ্টি; অল্প, তাতে কি ! নীল পর্দায় সাদা কাচেঁর ফাকে যতটুকুন দিনের আলো আসছিলো তাতে মেঘের আধাঁরই ছিলো বেশী। মেয়েটির বসতে অসুবিধা হওয়াতে পেছনের ফাঁকা একটা সিটে উঠে গ্যালো। আমার বন্ধুটির মিচকি হাসির অর্থ বুঝলাম না। বাসের মধ্যে এলসিডি স্ক্রীণে হুমায়ুর আহমেদের কিছু হাসির নাটক হচ্ছিলো তখন, অবশ্য ততক্ষনে হেডফোনের আওয়াজে কান ঝাঝালো।

আরিচা ঘাটে পৌছালাম সাড়ে ন’টার আগেই, ঈদের রাস্তা-এম্নিতেই ফাঁকা। ফেরী পেতে অসুবিধে হয়নি। ফেরীর একদম উপরের ডেকে উঠেছিলাম, আকাশও পরিষ্কার, নদী আর বিস্তীর্ণ পাড়ের সবুজ সজীবতা ছুয়ে গ্যালো এক পশলা। ও পাড়ের রাস্তাটা দূর হওয়ায় সময়ও লাগে বেশী। মাঝে একটা রেস্টুরেন্টে পনেরো মিনেটের ব্রেক, বার্গার, ক্লোড ড্রিংকস্ আর চমুচা নিয়ে উঠলাম। চমুচা জিনিসটি আমার খুব প্রিয়। যশোর শহরে পৌছতে পৌছতে দুপুর একটা। মেয়েটা সেখানেই নেমে গ্যালো। আমাদের গন্তব্য আরও দূরে। দু’টোর দিকে যখন গন্তব্যস্থল ‘বাগআচড়া’ পৌছালাম কড়া রোদের তেজে মাথা তেতে যাচ্ছিলো। খালাতো ভাই-শাপ্পু আর তৌহিদ আংকেল আগেই বাজারে অপেক্ষায় ছিলো আমাদের নেবার জন্য। ‘খালামণির’ বাড়ীর পথে ভ্যান-ই একমাত্র উত্তম মাধ্যম। প্রায় পৌনে তিনটেই পৌছে গেলাম আমরা সকলেই।

“খালু, আসসালামু আলাইকুম” – ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম, কেমন আছো বাবা’ নিজেদের পুকুরে কলার ভেলায় ভেসে জাল ফেলছিলো আর উত্তোর দিলো আমায়। “খালু, উঠে আসেন তো আর মাছ ধরা লাগবেনা” – ‘তোমরা যাও আসতিছি’, খালামণি’টা তো একদম পুরোদস্তুর মায়াবী। “কিরে কেমন আছিস” - ছোট খালাতো ভাইটা হাসি দিয়েই ব্যাগ গুলো বয়ে ভেতরে চললো।

ঈদের আগ থেকেই আমি কিছুটা অসুস্থ, আগের দিন হাসাপাতালের ইমার্জেন্সিতে ইনজেকশন নিতে হোলো আর সাথে তো হাই এন্টিবায়োটিক শুরু। সারাদিনের ক্লান্তির চেয়ে এমন অসুস্থতা বেশ অস্বস্তিতে ফেলে দিলো, এতদিন পর বেড়াতে এসে ... কার ভালো লাগে ! পুকুরের তাজা রুইয়ের ঝোল আর গরুর মাংসে দুপুরের খাবার খেতে খেতে প্রায় পাঁচটা বেজে গ্যালো। ছোটটা আর বন্ধু-নবীন, খালাতো ভাইদের সাথে বাইরে বের হোলেও আমি বিছানায় কাত হলাম। এক কাতেই সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত, তাও মাঝ রাত। ছোট খালাত ভাই আর মা দুজনের ডাকাডাকিতে যখন চোখ মেলে তাকালাম দেখি ঘড়ির কাটায় তখন রাত সাড়ে এগারোটারও বেশী। রাতের ওষুধ খেতে হবে বিধায় কোনমতে ঘুম চোখে দু-মুঠো খেয়েই আবার শুয়ে পড়লাম। ঘুমিয়ে পড়লাম তো পরলাম..... রাত কাবার ....

.
.
.

অনাবৃত সাত ! ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29019514 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29019514 2009-10-03 00:59:55
অনাবৃত সাত !
“লোকে বলে, বলেরে ... ঘর বাড়ী বানাইলো ......” না না, কিন্তু লোকে এটা ঠিক বলে, সাত (০৭) সংখ্যা না কি ভাগ্য (লাকি) নম্বর। সাত (০৭) সংখ্যা ধরলে ভালো কিছু হয়। আমি বাপু অতসব বুঝিনে, আমার কাছে সাত (০৭)-ও যা আবার ওই তেরো (১৩)-ও তাই। আর তাইতো সাত সমূদ্র - তেরো নদী পারি দিয়ে এসে এখন এ লেখা লেখবার প্রাক্কালে সাত ভাবনায় পড়ে গেলাম।

ব্যাস, আর না! সাত সকালে এ সাত প্যাঁচানী এবার বনধ্ ।
.................................................................................................................................
তেইশ (২৩) থেকে ত্রিশ (৩০) - এই মোট সাত (০৭) দিন। আমার ঈদের ছুটি। ২০০৯ সনের ঈদ-উল ফিতর। যদিও ঈদ হয়েছে একুশ (২১) তারিখ, তথাপি ঈদ ও তার পরদিন অফিস কর্মব্যস্ত থাকবার শর্তে এ তারিখের সাত দিনের ছুটি মঞ্জুর হয়েছিল। আক্ষেপ ছিলোনা, বরঞ্চ আনন্দিত হয়েছিলাম এ কারণে; প্রায় ৬ কি ৭ বছর পর এবার গ্রামের বাড়ীতে যাচ্ছি।

গ্রামের বাড়ী বলতে আগে যা বুঝতাম নানা-নানী’র বাড়ী। কিন্তু তাঁরা গত হয়েছেন এ কয় বছরে। দাদা-দাদী বাড়ীও সেখান থেকে কিছুটা দূরে। তাদেরকে কখনোই দেখিনি, আমার জন্মের আগেই তাঁরা চলে গিয়েছেন। তাই সেখানে যাওয়া - আসাটাও তুলনামূলক কম যদিও চাচা-চাচীরা সেখানেই থাকেন। গ্রামে এক টুকরো জমি রয়েছে - করি করি করেও একটা চিলেকোঠা তোলার ইচ্ছেটা বহুদিনের, হয়ে উঠছেনা। শহরে যেখানটায় নিজেদের বাড়ী সেখানে ভাড়া দেয়া থাকে। যাবার গন্তব্য ঠিক করা হলো “ছোট খালামণি” বাড়ী।

আমাদের বাড়ী, যশোরে। খালামণির বাড়ী যশোর থেকে সাতক্ষীরা’র পথে ‘বাগআচড়া’ ইউনিয়নে। বাগআচড়া থেকে সাতক্ষীরার পথ বাসে ৪৫ মিনিট। আর নানা বাড়ী ‘নাভারন’ - বেনাপোল থেকে কিছুটা আগে। আর “বড় খালামণি”র বাড়ী ‘ঝিকরগাছা’। নাভারন থেকে আরও আগে।

আমাদের এ ভ্রমণ সঙ্গী হিসেবে আগেই যুক্ত হয়েছিলো আমার এক বন্ধু। পরিবারের আমরা চারজন - আমি বড়ো, ছোটটা-অপু, বাবা আর মা আর আমার সেই বন্ধু-নবীন। এই মোট ৫ (পাঁচ) জন।

আমার এ লেখার সাত (০৭) রহস্য অনাবৃত হোলো এখানেই, আর যে সংকলনটি লেখা হবে তার মূল প্রতিপাদ্য সাত (০৭) দিনে গ্রামীণ জনপদে আমার অবস্থান, হাসি, হৈ-হুল্লোর, লুকোচুরি আবেগের কখনো উচ্ছাস, ফিরে দেখা শৈশব-কৈশোরের উচ্ছল আনন্দিত খন্ড সময়ের টুকরো টুকরো অনুভূতি। ঠিক ফিরে আসবার দিনে অনুচ্চারিত হাতছানি ‘যেওনা গো ছেড়ে’, তবুও ফিরতে হবে - কঠোর সতর্কতায় তাই অপ্রকাশিত অনুভূতিতে বারবার চোখদুটোকে মেলে দিই বিস্তীর্ণ আকাশে, পাছে সমান্তরালে ভেজা চোখ দুটোকে কেউ দেখে ফ্যালে, সেই ভয়ে।

সেই লেখাগুলোকে স্মৃতিমূলক একটা কিছু হিসেবে এখানে সংরক্ষণ করতে চাইছি শুধু। আবারও ঈদ আসবে সামনে, ছুটি হবে কি হবেনা - তবু এ লেখা রয়ে যাবে, পেছনের পাতা উল্টে শোনা যাবে হা হা - হো হো সশব্দের তীব্র জোড়ালো অট্টহাসির সুর, আর তখন বাঁকা ঠোটের মুচকি বয়স্ক হাসিতে মনে মনে শুধবো - “আহা কি সুন্দর দিন কাটাইতাম, কত সুন্দর ......”]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29019188 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29019188 2009-10-02 13:32:29
ঈদের ছুটি !
আমি জানতাম, এমন ব্যবহারই সে করবে, আজ বাদে কাল ঈদ, অথচ রোজার এ’কটা দিন খুব চটে আছে। কিছু হলেই রাগ করবে “দেখবে, সত্যি একদিন তোমায় ছেড়ে চলে যাবো”, খুব খারাপ লাগতো, ভয়ও হতো – সত্যি যদি ও চলে যায়! রাগ কি শুধু সেই করবে? আমিওতো করতে পারি, নেহায়েৎ ..!, আজ এমন রাগ করেছে;পর্দাগুলোতো সেটে দিয়েছেই, এখন জানলাগুলোও বন্ধ করছে। .. এত কিছুর পরেও যখন মিষ্টি মুখে এসে বলবে নয়তো আমিই ফোনে একটা ‘সরি’ এসএমএস পাঠাবো .. সব কোথায় যে উধাও হয়ে যায় - একেই জানি কি সেইসব বলে ? মেয়েটাকে বললে বলে “আমার ভাই অতো খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, তোমাকে ভালবাসবো”

আমি যে এপার্টমেন্টে থাকি ঠিক তার মুখোমুখি ওদের ঘরটা, অন্য এপার্টমেন্ট। রাত জেগে পড়তাম, সেও জেগে থাকতো .. কি ব্যপার? পর্দা সরিয়ে পড়া আমার অভ্যেস। কিছুদিন বাদেই লক্ষ্য করেছিলাম মেয়েটির ঘরের পর্দাও সরানো। ঠিক সবসময় দেখা যেতোনা, এই হয়তো একটু চুল আচড়াচ্ছে... নয়তো ছোট বোনটাকে পড়া দেখাচ্ছে ... আবার যখন তার বাবা বকতো .. পর্দা সরিয়ে দিতো।

কলেজে যাবার মুখে সেবারই প্রথম পথ আগলেছিলাম, ‘কি ব্যপার, পর্দা খুলে রাখেন কেনো ? আমার পড়াশোনা তো সব যাচ্ছেই যাচ্ছে, মাথাটাও নষ্ট করছেন’ অচেনা ঠোটে আর চোখের ইশারায় হাসলো .. “আপনি না তাকালেই হলো” ‘তাই বলে আপনি পর্দা বন্ধ করবেন না?’ “না” উত্তরে কোথায় যে হারালো, যখন খুঁজে পেলাম, এ হৃদয়খানিতেই সে লুকিয়ে ছিলো।

কাল রাতের রাগটা এখনো পুষে রেখেছে, “তোমায় ছেড়ে যখন চলে যাবো; আর ফিরে আসবোনা, তখন বুঝবে” খুব কষ্ট পেলে এ কথাগুলোই বলতো, কাল রাতেও একবার বলেছিলো, সেই থেকে জানালায় অপেক্ষা, একবারেও এলোনা, শুধু দেখেছিলাম কি জানি ব্যাগ ভর্তি করছে। ভয়ে কেপেঁ উঠলাম, ও যদি আর ফিরে না আসে? ওদের বাড়ীর গেটে একটা ট্রাভেল ব্যাগের পাশে ও দাড়িয়ে। অন্যপাশে কেউ আছে কিনা দেখতে পাচ্ছিনে। এ জানালা দিয়ে ছুটে বারান্দাতে গিয়ে দেখি ট্রাভেল ব্যাগটা আছে ও নেই, সত্যি ও বোধহয় খুব রাগ করেছে ‘না না, ও এভাবে না বলে যেতে পারেনা’
……………………
“কি ব্যপার তুমি রিকশার পেছনে দৌড়াচ্ছো কেনো ? বাবা দেখে ফেলবে তো”
: আমি সরি, দেখো আর কোনদিনও ভুল করবোনা
“যাওনা বাবা, দেখে ফেললে কিন্তু আমায় খুন করে ফেলবে”
: বলছিতো সরি, তুমি আমায় ছেড়ে যেওনা প্লিজ
: আমি আর কোনদিন ও .......
“এ্যাই তোমার কি হইছে; পাগলামী করতেছো কেনো?”
“আরে আমি যাচ্ছিনে ..... তো
.... ঈদের ছুটিতে বাড়ী যাচ্ছি”
শেষ কথাগুলো বাতাসে তখনও ভেসে ছিলো, যতক্ষন ওর রিকশাটা দেখছিলাম, গলির বাকেঁ মোর নিলেই চোখের আড়াল হয়, কথাগুলোকে বুক পকেটে নিয়ে ঘরে ঢুকি, হাত দিতেই দেখি উধাও, কখন যে সেগুলোও হৃদয়ে গিয়েছে, খেয়ালই হয়নি।
শেষটা - “দাড়াও এবার ফিরে এসে তোমায় মজা দেখাবো”

..........................................................................
আজ যখন ঈদের দিনেও কর্পোরেট হাউজের বিশ তলা উচুঁ ভবনের একটা ফ্লোরে নীল সান প্রটেকটিভ গ্লাসের পাশে কফি হাতে দাড়িয়ে শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত রাস্তায় ছুটে চলা মানুষগুলোকে দেখি, খুজে ফিরি সেই রিকশা, তার পেছনে ছুটে চলা আমি আর ও। মিষ্টি মুখের দুষ্টুমী হাসি কোথায় সব হারিয়ে গ্যাছে .... অতীত স্মৃতি শুধু তাই মনে করিয়ে আমায় কষ্ট দিতে চায়।

কাজের অযুহাতে যখন শর্ত সাপেক্ষে ছুটি মেলে, ঈদ ও ঈদের পরদিন অফিসের দায়িত্ব, ঈদের ছুটিটাই না কত দূর্বোধ্য, অথচ জানলাতে বসা সেই মেয়েটির ঈদের ছুটিতে বাড়ী ফেরা ....থাক !

আহা! ঈদের ছুটি !
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29014026 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29014026 2009-09-21 16:18:07
আড়ি
সামাজিক অবস্থানে সেসময় হাসানে’রা বেশ উঁচুতে, নিতান্তই সে তুলনায় পাকিস্তান আমলের একটা সরকারী কোয়ার্টারের তেতলা বাড়ীতে আমাদের আশ্রয়, তাও কাঁচা-পাকা পরিত্যক্ত একটা রাস্তার ধারে। অবস্থান আর শ্রেনীর বিভেদটা কখনোই আমাদের মাঝে আসতে দেয়নি ও। সংকোচে বহুবার নিজেই এড়িয়ে যেতে চেয়েছি, বারেবারে আটকে গ্যাছি ওর বাঁধনে। সীমাবদ্ধতা আকড়ে ধরতো, তখন স্বপ্ন দেখাতো আমাকে।

আড়ি-আড়ি খেলার বয়সটা তখন শেষের সীমানায়, পরিণত হবার ঝুকির আশংকাটাও মাথার উপর, বয়সটা এমনই - সন্ধিক্ষণ যাকে বলে। সময়ের যোগ বিয়োগে দুইজনাই কৈশোরের শ্রেণীবিভাগে। স্কুলের গন্ডীতে দুরন্তপনার নিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খলাবোধের বাধা নিষেধে কখনো সর্তক সংকেত, এসেম্বলী ফাকিঁর স্মৃতিময় কিছুক্ষন, ক্লাসের সময়টাতে একই বেঞ্চে পাশাপাশি, কখনো প্রতিপক্ষ হতে চাইতোনা, সে যেমন খেলায় কিংবা পড়ায়। বাড়ী ফেরার পথে রাস্তার শুরুতেই ওদের বাংলোটা, বাকীটা পথ একলাই ফিরতাম। কখনো ধরে রাখা শক্ত হাতের মুঠোটা ধরেই বলতো “চল, তোকে বাসায় পৌছে দেই” -// না রে হাসান, তুই যা, আমি একলাই যেতে পারবো “ক্যান, গেলে কি হয় ?” -// তুই এতদূর কষ্ট করবি ক্যান। ওর ‘কষ্টের’ অযুহাতে আমার পারিবারিক অসামর্থকে স্বকৌশলে আরো একবার লুকিয়ে ফেলতাম।

‘কাল কিন্তু তুই আমাদের বাসায় আসবিই আসবি’
-// ক্যান
‘আরে তোরে আসতে বলছি, তুই আসবি’
-// না, ঠিক আছে সে না হয় আসবো
-// কিন্তু কি ? কোন অনুষ্ঠান ?
‘হ্যা’
-// কিসের ?
‘আরে আগে তুই আয় না!’
-// কখন ?
‘সন্ধ্যায়’
‘শোন, তুই যদি না আসিস তাইলে কিন্তু ....’
-// আচ্ছা দেখি

হাসান, কিন্তু ...’ শেষ না করেই চলে যায়। বিকেলের সূর্যটা সন্ধ্যা অব্দি আকাশে ঝুলে থাকবে, আমিও একটা অনিশ্চয়তায় পড়ে গেলাম সিদ্ধান্ত নেবার আগ পর্যন্ত; কিসের দাওয়াত, কেন হঠাৎ, বাড়ীতে মা’কে জানাতে হবে, পারমিশন, কোন গিফট্ নিতে হবে কিনা .. আবার সেই নিত্য অতীত হওয়া অথনৈতিক অস্বচ্ছলতার হাতছানি। কোন ড্রেসটা পড়ে যাবো.. শেষ ঈদের শার্টটাও এখন পুরোনো.. স্কুলের নেভী ব্লু প্যান্টটা আয়রন করলে কিছুটা মানুষ্য সমাজের যোগ্য হয়.. না না ! এভাবে .. আসলে না জানি ওদের কত বড় আয়োজন .. কত মানুষ .. থাক, হাসানকে না হয় একটা মিথ্যে বলা যাবে। ও বুঝতেই পারবেনা।

‘তুই কালকে আসলিনা ক্যান’
-// আসলে হাসান ...
‘না, রে তুই কাজটা ভালো করিস নাই’
‘আমি খুব কষ্ট পাইছি’
-// হাসান শোন, আসলে .... হইছিলো কি জানিস ..
‘তুই আমার সাথে আর কথা বলবিনা’
‘কসম, একদম আড়ি তোর সাথে’
‘আর যদি জীবনে তোর সাথে কোনদিন কথা বলি’
-// হাসান দাড়া, হাসান ... শোন আমার কথা .. আরে শুনবিতো ..

হাসান কখনো এভাবে এর আগে আড়ি দেয়নি, হাসানকে আমার না বলা কথাগুলো সেদিন এবং আর কখনোই তা বলা হয়ে উঠেনি। ক্লাসে প্রতিদিন আসতো কিন্তু কথা হতোনা, টিফিনে যতবার গা ঘেষে দাড়াতাম, সরে যেতো। একটা সময় যখন বুঝলাম সেদিনকার মিথ্যে অযুহাতের জন্য ওকে ‘সরি’ বলা উচিত। আজ বলি, কাল বলি, তাও বলা হয়না, কিন্তু কিভাবে ? হাসান তো আমার বন্ধু, ওতো এম্নিতে রাগ করে আড়ি নিয়েছে !

মাঝের বেশ ক’দিন ও ক্লাসে আসলোনা। কেউ কিছু জানেওনা। ভাবলাম ওর বাড়ীতে গিয়েই ‘সরি’ বলবো। কতটা কষ্ট পেলে একটা মানুষ কষ্টের তিক্ততা ভুলে যায়, আমার বুঝবার সময় কাল ছিলোনা সেটা। সুখ-দু:খকে আলাদা করবার বয়সও নয়, অপ্রস্তুত অভিজ্ঞতায় সেটাই ছিলো প্রথম কষ্ট পাওয়া, যখন সন্ধ্যায় ওর বাড়ীতে গিয়ে জানতে পারলাম, হাসানের বাবা ট্রান্সফার হয়ে এ এলাকা ছেড়ে গিয়েছেন, সাথে হাসানদের পরিবারও। পশ্চিমের আকাশে সূর্য তখনও খানিকটা উকিঁ দিয়ে আছে, এ সময়কে শেষ বিকেলের ফাকিঁ বলে, হাসান আমাকে ফাকিঁ দিলো ক্যানো? চারপাশটা কেমন ফাঁকা হচ্ছে দ্রুত, যে যার ব্যস্ততায় ঘরে ঢুকে পড়ে, নীরবতা আশ্রয় নেয় রাস্তার সোডিয়াম বাতির আলো-অন্ধ পথে, আমি সে পথেরই পথিক হোই।

তারপর সময় পেরিয়েছে অনেকটা, খুজে ফিরেছি বহু জাগায়, বাবারও ট্রান্সফার হলো, ভাবলাম নতুন এলাকায় যদি পেয়ে যায় ওকে, প্রথমেই ‘সরি’ বলবো। মেট্রিক পরীক্ষার যে হলটাতে সিট পড়লো, সবকটা স্টুডেন্টকে দেখেছিলাম, হাসন কে পায়নি। তখন শহরে, কলেজে ভর্তি হয়েছি, =একজন মেস মেম্বার আবশ্যক.. ঠিকানা ...= রাতে শুয়ে ভাঙা কাচেঁর জানালায় মেঘ-চাদেঁর আকাশে তাকিয়ে ভাবতাম, হাসান একদিন এসে বললো বলে ‘মেস মেম্বার থাকতে চাই, সিট হবে?’ কত রাত এভাবে ভাবতে ভাবতেই শুয়েছি না খেয়েই, ওকি জানবে কখনো ? না জানুক, তাতে কি ? ও যে সত্যি আড়ি নিতে পারে? বুঝতে দেয়নি কখনো ..

আর্থিক টানপোড়নে তখনও গ্লানি টেনে চলেছি, এখন বন্ধুত্বে খুব সতর্কতা। একলাই কতটা পথ পাড়ি দিলাম। যখনই কাউকে ওভাবে খুজতে চেয়েছি, হাসানের স্মৃতিগুলো সামনে আসতো। ‘অলটারনেটিভ’ বলে হাসানের দ্বিতীয়টি আর কখনোই ভাবা হয়নি। ততদিনে চাকরীতে পুরোদস্তুর কর্মজীবি। এ্যাডমিনিস্ট্রেশন এন্ড পাবলিক রিলেশন ডিপার্টমেন্ট। কত মানুষের সাথেই প্রতিদিন কথা হয়, হাসিমুখে হ্যান্ডশেক করে আমার চাকরীদাতা কোম্পানীর গুণগাণ গাই। এখনও ভাবি, এইতো হাসান, আমার... পাবলিক রিলেশন সার্ভিসের এই ওয়ার্কষ্টেশনে .. এসে বলবে ..
‘হ্যালো মি: আই নিড ইউর হেল্প, প্লিজ’
-// ইয়েস স্যার, হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ ?

হাসানকে আমি স্যার বলবো ? হাসান ? মানে আমার সেই আড়ি নেয়া বন্ধু হাসান, স্যার হবে ?

নতুন একটা কোম্পানীতে সিভি দিয়েছিলাম, রিটেনের পর ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের ইন্টারভিউ, এটা পার হতে পারলেই পুরোনো চাকরীটা ছেড়ে এখানে আসার চিন্তা। এক ধাপেই বেশ ক’টা টাকা, আবার পজিশনটাও আপগ্রেড হবে।

-// মে আই কাম ইন স্যার
: প্লিজ, কাম ইন
: প্লিজ বি সিটেড
: ইউ মি: .........
-// ইয়েস স্যার

ইন্টারভিউ বোর্ডের এ রুমে একটা বড় কনফারেন্স টেবিল, টেবিলের এ প্রান্তে আমি। মাঝের ডান আর বাম দিকে এক্সিকিউটিভ আর সিনিয়র মিলে প্রায় গোটা দশ জন। শুরুতেই চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলাম, ক্ষনিকেই টেবিলের ও প্রান্তে থাকা মানুষটার চোখে চোখ আটকে যায়, এক মুহুর্তের জন্য পুরো পৃথিবী নিস্তব্ধ হয়, সেকেন্ডের কাটার টিক টিক শব্দ আর শোনা যায়না, সময়ের পতন হয়, হাত ঘড়িটায় চেয়ে দেখি সময় দ্রুত এগুচ্ছে, সময়ের মতো আমিও চলতে শুরু করি ......

-// আরে, ও হাসান না ! !
সংযত হোই।

: হ্যা, মি : ..... আপনি এর আগে কোথায় ছিলেন?
-// জ্বী ...............
: ওখান থেকে কেন আসতে চাইছেন?
-// আসলে ........
: তাহলে এবার আমাদের কিছু প্রশ্নে উত্তর দিবেন ?
-// জ্বী বলুন

আজ যখন চৌদ্দ বছর পর ওর সাথে এভাবে দেখা, কর্পোরেট কঠোরতায় দুজনা’র আলাদা দুটো পরিচয়, দাতা-গ্রহীতা সম্পর্ক ! বন্ধুত্বের আবেদনটা এখানে মলিন। হাসান একবারেই শুধু আমার দিকে তাকিয়েছিলো কিন্তু কোন প্রশ্ন করেনি।

ডান আর বামদিকের সবাই যে যার টপিকসে প্রশ্ন করছে, কমার্শিয়াল, এইচআর, পাবলিক মিটিং, কারেন্ট ইস্যুছ ... আমি সব উত্তরই ‘সরি’ বলেছি। জেনেও, না জেনেও। হাসান কি বুঝতে পেরেছিলো এই ‘সরি’ গুলো ওকেই বলা। এতদিন পর যখন দেখা ওর সাথে, এই ‘সরি’টাতো ওকেই আগেই বলা উচিত। সেই ‘আড়ি’; আর না বলতে পারা ‘সরি’, কতটা রাগ, অভিমানে চলেছে এতোটা বছর !
হাসান তো এখন অনেক বড়, ও কি আর আগের মতোই আছে ? সব কি মনে রেখেছে? চিনতে পেরেছে কি আমাকে? চিনতে পারলে কি কথা বলবে না এড়িয়ে যাবে? আমাদের ‘আড়ি’র’ বয়সও আজ প্রায় চৌদ্দ বছর, কতটা ভালোবাসলে এতটা রাগ করা যায়, ওকি সেই পরিমিত বোধটা বুঝে ? এরকম কতশত প্রশ্নে রিসেপশনের টেলিফোনে থাকা মেয়েটিকে একবার অনুরোধ করি ..

-// হাসান সাহেবের সাথে, আজ দেখা করা যাবে কি ?
; সরি, স্যার আজকে ইন্টারভিউ শেষেই চলে গিয়েছেন
; কোন ম্যাসেজ
-// না, ঠিক আছে, থ্যাংকইউ

না দেখা করেই হাসানের চলে যাওয়াটাকে অস্বাভাবিক মনে হয়না, স্বাভাবিক সেটাই, চিনতে না পারাটা। কিছু অপরাধবোধে সংকোচ আসে, ঘৃণা হয়, পুষে রাখা বন্ধুত্বের ভালবাসাটাকে অনেক ছোট করে ফেলি, সাথে নিজেকেও। রিসেপশন থেকে বিদায় নেবার আগে ওর কর্পোরেট হাউজের শ্বেত পাথরে খোদাই লেখা ....... গ্রুপ অব কোম্পানীজ এন্ড ইন্ড্রাসট্রীজে - হারানো হাসান’কে আরো একবার খুজেঁ পাই।

মাস খানেকও হয়নি, বাড়ীর দরজায় ফেলে রাখা এনভেলপ-টা আমার কাছে অনাকাঙ্খিতই ছিলো। কিসের লেটার এ অসময়ে ? অস্থিরতা এবং উত্তেজনায় খামটা খুলতে গিয়ে বারবার হাত কাঁপে। ‘এপয়েন্টমেন্ট লেটার’ সেই কোম্পানীর ম্যানেজিং ডিরেক্টর আমাকে এই চাকরীর চিঠি দিয়েছে, অনুজ্জ্বল স্মৃতিতে পাথুরে খোদাই ....... গ্রুপ অব কোম্পানীজের ঠিকানাটাই এই লেটার হেড প্যাডে দেখতে পাই। হাসান তাহলে এখন ম্যানেজিং ডিরেক্টর !
এ লেটার-টা হাসানকে নয়, সেই কোম্পানীর এম.ডি কেই লিখছি ...
টু
ম্যানেজিং ডিরেক্টর
... গ্রুপ অব কোম্পানীজ এন্ড ইন্ড্রাসট্রীজ

ডিয়ার স্যার,
আই এ্যাম সরি টু ছে দ্যাট, আই এ্যাম আনবল্ টু একসেপ্ট দ্যা ....... পজিশন এ্যাট ইউ কর্পোরেট এ্যাডমিনেস্ট্রেশন ..
..............................................................
..............................................................
‘এ ঠিকানায় ও থাকতোনা আগে?’
- জ্বী, ছিলো, কিন্তু গত মাসে বাসাটা ছেড়ে দিয়েছে
‘গত মাসে ?’
- জ্বী
‘কোথায় গ্যাছে কিছু জানেন? বা কোন এড্রেস ?’
- না কিছুই বলে যায়নি ..
- আপনি ?
‘আচ্ছা ঠিক আছে, থ্যাকইউ’
..............................................................
‘ও না এখানে কাজ করতো আগে?’
= করতো, কিন্তু ও তো চাকরীটা ছেড়ে দিলো মাস খানেক হয়েছে
‘মানে, গত মাসে?’
= হ্যা, বললো ভালো বেতন, বড়ো কোম্পানী
= তাই চলে গ্যালো
= আপনি ?
‘আমি হাসান’
‘ওকে খুজছিলাম এম্নিতে’
‘কোথায় জয়েন করেছে, কিছু বলেছে?’
= না, ও কিছুই জানায়নি আমাদেরকে
‘ঠিক আছে, আসি’
..............................................................
..............................................................

চাকরীটা ছাড়বার আগেই বাসাটা বদলে ছিলাম। নতুন বাসা-চাকরীটাও নতুন - মাঝের সময়টাতে গুণে গুণে দম ফেলা, অপরিপূর্ণতায় নিজেকে কিছুটা গোছানো, সর্বময় এলোমেলোতায় একটু হাফ ছেড়ে বাঁচার চেষ্টা। কতক কোলাহলকে নির্বাসনে পাঠিয়ে আত্মগোপন। “আউট অফ সাইট; আউট অফ মাইন্ড” - মানতে চাইতাম না, এখন বিশ্বাস করি।

গোধূলী বেলার এ শেষ আলোটা যখন বাড়ীর সামনের দু-চারটে নারকেল গাছ টপকে আমার ব্যলকনীতে এসে পড়ে, বিকেলের অবসরে চেয়ারে হেলান দিতে গিয়ে রাস্তায় খেলতে থাকা শিশুদের সারল্যতায় দৃষ্টি পড়ে। ওরা খেলা থামিয়ে কি একটা য্যানো বোঝাপড়াতে ব্যস্ত, অল্প সল্প কোলাহলের মৃদু আওয়াজ পাচ্ছি ... কেউ বোকছে, কেউ সামলাচ্ছে .. সবাই কিন্তু একই বয়সী!
.... ‘যা, তোর সাথে আর কোনদিন কথা বোলবোনা, এই আড়ি-আড়ি-আড়ি’ - আমি স্পষ্ট শুনতে পাই ‘আড়ি’ শব্দটা, খুব পরিচিত একটা শব্দ, পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম শব্দের একটি ...
জোড়ে চিৎকার করে বলতে চাই -// না তোমরা আড়ি নিওনা, কখ্খোনা .... তোমাদেরকে অনুরোধ, প্লিজ তোমরা আড়ি নিওনা
ছেলেটি শুনতে পায়না আমার আত্ম চিৎকার, না বুঝেই খেলার সাথীকে পেছনে ফেলে যায়

আমি জানি, এ ছেলেটি হয়তো আর জীবনে কখনো ওই ছেলেটির সাথে কথা বলবেনা, সম্পর্কও রাখবেনা
হারিয়ে যাওয়া অতীতে; হাসানকে মনে পড়ে, এভাবেই ‘আড়ি’ নিয়েছিলো একদিন
‘আড়ি’ ‘আড়ি’ই- থেকে গ্যাছে, আজও ভাঙ্গা হয়নি - সুদীর্ঘ চোদ্দটি বছরের আমাদের ‘আড়ি’ সম্পর্ক।


কৃতজ্ঞতা: : হাসান ভাইকে লেখাটি উৎসর্গ করছি।
(চরিত্র, ঘটনা কাকতালীয়ভাবে মিলে গেলে কেউ কাউকে দায়ী করা চলবেনা)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29011806 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29011806 2009-09-17 00:55:15
যানযট ভালোবাসা ! “আরো একবার চোখ ফিরিয়ে নেই, একটু আগেই একবার দেখা হয়েছে, তারপরেও আরো একবার। মনে মনে হাসি “ধ্যাৎ ! কি হচ্ছে এসব !”

কই ! আজও তো সকালে মায়ের সেই চেনা সুরেই ভোর হওয়া “খোকা ওঠ, অফিসে যাবিনা, দেরী হয়ে যাচ্ছে তো ! ... কত করে বলি রাত জাগিস না ..............” ব্যতিক্রম তো কিছুই হয়নি, কার মুখ দর্শনে ওঠা ? নামাযের মাদুরে কোরআন শরীফ রেখে ডাকতে আসা ঘোমটার আড়ালে ছোট্ট নিষ্পাপ আমার মায়ের মুখখানি।
আটটার ঠিক মিনিট পাচেঁক আগেই পৌছেছি, আজ একটু তড়িঘড়ি, এক হাতে টিফিন ক্যারিয়ার, অন্য হাতে এক্সিকিউটিভ ব্যাগ, টাইয়ের শেষ অংশটুকু ভেতরে ঠিক মতো ঠোকানো হয়নি, বাস স্ট্যান্ডে এসে বাকী পরিপাটিটুকু হলাম, চিরুনীটা পকেটে রাখতে রাখতে হাত ঘড়ির সময় যে আরো এগিয়েছে সেটাও খেয়াল হল। যদিও বাস পেতে একটু সময় নিলো, তারপরেও একই রুট, একই বাস, সময়ের এদিক-সেদিক।
“এবারও দেখে নিলাম, এ নিয়ে বেশ ক’বার হলো”

ডেভিড কপারফিল্ডকে আপাতত বাদ দিলাম, আমারও যদি সেরকম চোখ বেধেঁ দেয়া হয়, নির্ঘাত সত্যি বলছি - বাসের রাস্তায় কখন কোথায় হুবহু বলতে পারবো। অবশ্য এখানেও যে ইল্যুশন নেই ! সে সত্যিটাই বা ক’জনা জানে ! হেল্পার ছোকড়াটা যখন স্টপেজ প্রতি ডাক দিবে প্যাসেঞ্জারকে “এ্যাই, কলেজ গেট নামেন” “আসদগেট কেউ আছে ?” “নামেন, নামেন - পান্থপথ আইছে” ওইটাই ইল্যুশন ‘আসাদগেট’ ‘কলেজগেট’ ‘সোবহানবাগ’; চোখ বাঁধা থাকলেও, কানে তো কেউ তুলো দেয়নি !
“চোখে ধুলো পড়েছে, চোখ মুছতে গিয়ে আরো একবার, গোণা হচ্ছেনা এ নিয়ে কতবার হলো”

আমি নেমে পড়বো পান্থপথে। সোবহানবাগ হয়ে গাড়িটা ঘুড়ে পান্থপথ হয়ে সোজা সার্ক ফোয়ারা দিয়ে বেরিয়ে যাবে। অফিস ঠিক পান্থপথ মোড় হতে কিছুটা পথ হেটেঁই সামনে। ন’টায় অফিস ধরতেই হবে, নচেৎ ‘বিলম্ব’ সূচক ‘লাল কালি’ যতটা না এটেনডেন্স খাতার জন্য অসৌজন্য, একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হয়ে বিষয়টি অন্যদের কাছে অনুকরণীয় মনে হতে পারে।
“ধূর, রাখো তোমার প্রশাসন, নিয়ম ভাঙ্গছি তো ভাঙ্গছিই, তাকানো হলো আরো দু’বার”

আজকাল রোডগুলোকে ডিভাইড করে ফ্যালা হয়েছে। নরমাল, লো-রেটেড, ভিআইপি, পাবলিক রোড আরো কত ক্লাস। ভেবে হাসি পেতে পারে কখনো ‘শহীদ ........ রোড’ সেটা পাবলিক রোড বলে ঘন্টার পর ঘন্টা জ্যামে বসে ব্যস্ত যাত্রীরা স্মরণ করতে থাকে আমার সেই শহীদ ভাইয়ের স্মৃতি কথা আর ওদিকে ‘বিজয় স্মারণী’ খুব ভিআইপি গোছের রাস্তা সেটা, বিজয়ের কথা তো আমরা সকলেই জানি .. তাই আর ভিআইপিদের মনে করবার দরকারের বোধটুকু-ও হয়না। ট্রাফিক পুলিশ ভাইদের যথেষ্ট হিউমার আছে বলতে হবে।
“আমার ওসব হিউমারের বালাই নেই, তাকিয়ে যাচ্ছি তো যাচ্ছিই -- নিরলস চেয়ে থাকা”

তবুও এতকিছু ঝক্কিকেই ভালোবেসে পথ চলতে হয়, চলতেই ভালোবাসি - এ ভালোবাসাতেই যেন অভ্যস্ত হয়ে পড়া। জ্যাম, ঝুলতে থাকা নয়ত ভীড়ে গাদাগাদি শরীরের সাথে লেগে বাসের টপ স্ট্যান্ড ধরে দাড়িয়ে থাকা, কখনো অপরিচিত মানুষের সাথে গলাবাজি, ভদ্রতা-অভদ্রতার দর কষাকষি। বাসের গায়ে সাটানো আছে ‘ব্যবহারে বংশের পরিচয়’ হা: হা: হা: ব্যবহারের অব্যবহার যারা করেন তাদের কি তাহলে কোন বংশ নেই ?
“ভাবছি আর তাকাচ্ছি, যেন তাকাতেই কিছু খুঁজে ফেরা”

.......................................................................................................

‘মা, তুই এখানে বস - একটা জায়গা আছে’
- বাবা তুমি বসো, আমি দাড়াতে পারবো
‘না, তুই বস - পথ তো সামনে’
- না; বাবা, তুমি বসোনা !
‘বলছি তুই বস, তুই দাড়িয়ে থাকতে পারবিনা’
পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী সম্পর্কগুলোর একটি দেখছিলাম “বাবা-মেয়ে” অনির্দিষ্টকালের জন্য নিরবিচ্ছিন্ন এক পরিণত সম্পর্ক।

এতক্ষণ যার দিকে তাকিয়ে থাকা, অযুহাতে - বিনে অযুহাতে, এ সেই মেয়টা, কিছুক্ষণ আগেই পেছনের স্টপেজ থেকে উঠেছে। মেয়েটি খালি সিটটাতে বসলে, তার বাবা দাড়ানোর একটা জায়গা করে নেয়। আমি দাড়িয়ে থাকি মেয়েটা যেখানে ঠিক তার সাথেই।

“চট্টগ্রাম সমূদ্র বন্দর সহ দেশের সকল নদী-বন্দরকে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে” - রাত গড়ালেও টিভি নিউজটা এখনও কানে ভাসছে, আকাশও গাড় অন্ধকার, প্রচন্ড বাতাস বাইরে, দমকা হাওয়ায় ক্ষনিকেই এলোমেলো করে দিতে চেয়েই আবার শান্ত স্বরুপ, অদ্ভূত খেলায় মেতেছে প্রকৃতি, আমার সেদিকে বিন্দুমাত্র নজর ছিলনা, অশান্ত প্রকৃতির মাঝেই নিরিবিলি শান্ত রহস্যে তাকিয়ে থাকি অবিকল নির্লজ্জের মতো, আমি দেখি মেয়েটিকে।

শাড়ীতে জড়িয়ে থাকা মেয়েটির আচলের সবুজ রং, লাল-মেরুন রং-এর বাহারী চুরী, সোনালী কানের দুল, কালো আঁধারের চুল - যেন সাতআসমানীর বাহারী রং তুলি দিয়ে গায়ে ছেটানো। রং কে উপভোগ করি ভাবতে ভাবতে; যদি চিত্রশিল্পী হতে পারতাম একটা ক্যানভাস হয়ে যেতো, যা হতো শ্রেষ্ঠ ‘কালার কম্বিনেশন’।

বাসটা এখন অনেক স্পীডে ছেড়েছে, এ রাস্তায় সাধারণত জ্যাম তেমন থাকেনা। সামনের মোড়ে পেরুলেই হালকা একটা জ্যাম তারপর ফ্রী। সিগন্যালের জ্যাম তো, কিছুক্ষন আটকে থাকা, তারপড়েই ছেড়ে দেয়। আমি দাড়িয়ে থাকি, মেয়েটি বসা। আমি তাকিয়ে থাকি, ভাবতে থাকি। জ্যাম না পড়লেও গাড়ী দিব্বী দাড়িয়ে আছি অনেকক্ষণ। “কি ব্যপার ড্রাইভার সাহেব, হঠাত এতো জ্যাম কেনো ?” – ‘সামনে মিনিষ্টার যাইবে, সিগন্যাল দিছে’; ব্যাস হয়েছে!

“তুই কবিতা লিখতে পারিস?” –‘না, কেনো?’ “একটা কবিতার দু’লাইন লিখেছি, পড়বি?” –‘বল, শুনি’ “সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর, তেমনি দেখিছি তারে অন্ধকারে” স্মরন হতেই–‘আরে, তুই তো বনলতা থেকে কপি দিয়েছিস রে’; ও হাসতে হাসতে লুটোপুটি খায়, জীবনানন্দ বাবু বনলতা’কে দেখেছিলেন কিনা জানিনে, কিন্তু আজ যে চোখে তাকিয়ে আছি সে চোখেই কবিতার লাইন লেখা হয়, যাকে খুঁজে চলেছি। এবার কি তাহলে কবি হতে পারবো ? বাঁকা ঠোটের হাসিতে অপ্রস্তুত হয়ে তাকিয়ে দেখি- ‘না, যাক কেউ দেখে ফেলেনি’

হাতের কাঁকন দেখেই বিভাজিত ধর্ম নিশ্চিন্ত হই। যখন চুরী দেখি তখনও। এক জোড়া হাতে দেড় ডজন চুরী; লাল, সবুজ, হলুদ - কত রং। “এ লাল রং-এর চুরিটা আমার অতীত, রক্তাক্ত অধ্যায়, সবুজটা বর্তমান - সবুজের মতন সজীব, আর এ কালোটা আমার ভবিষ্যত - অন্ধকারময়” - ওকে থামিয়ে দেই -‘কালোটা খুলে ফেললে কি হয় !’ “তুই কি তোর জীবনকে বদলাতে পারিস? তোর ভাগ্যকে?” –‘ভাগ্যকে তুই বিশ্বাস করিস ?’ ও নিশ্চুপ থাকে, আমার স্কুল জীবনের বন্ধু, পরের অধ্যায়ে কর্পোরেট ক্লায়েন্ট - এখন কোথায় তাও জানিনা। মেয়েটার হাতে একটা কালো চুরী ছিলো, ইচ্ছে হলো খুব করে বলে ফেলি ‘কালো চুরীটা খুলে ফেলুন না, ওটা না রাখলে নয় ?’ অধিকার খুজে পাইনা। মেয়েটার বাবা একটা খালি জায়গা পেয়ে সেখানে বসে পড়েছে।

-‘দিদিমণি, তুই এক কানে দুল পরিস নাকি?’ “কেন বলতো ?” –‘আমি কি বলবো, তুই দেখ’ “হায় হায় আরেক কানের দুল কোথায় পড়লো” হু হয়েছে আমার দিদিমণির দুল খোজা শুরু, এরকম যে কতবার হয়েছে, ইয়াত্তা নেই। -‘দিদিমণি তুই দুল পড়া ছাড়তো, বারবার পড়িস আর হারাস’ দিদিমণি আবার এক জোড়া নতুন আনে। কতদিন হলো দিদিমণির যে কত জোড়া যে হারিয়েছে, জানা হয়না, ওর শ্বশুর বাড়ীতে কেউ কি খুজে দেয় ওর দুল? আমার কথা নিশ্চয় মনে পড়ে। মেয়েটির দুলগুলো যে অযত্নে পড়ে থাকে দেখেই বোঝা যায়, হালকা পোলিশের রং-ও কেমন মলিন হয়ে আছে। সাদাসিধে দুলগুলো বাসের ঝাকুনিতে দুলতে থাকে, আমার চোখের মণি সমান্তরালে দেখে যায়।

“আচ্ছা খোকা ! তোর কেমন মেয়ে পছন্দো বলতো ?” – মা আমার মজা করেন, আমিও করি; ‘মা, শোন যদি তুমি মেয়ে দেখেই থাকো তাহলে প্রথম দেখবা তার চুল, লম্বা চুলের মেয়ে আমার চাইই’; এবার মা ঠাট্টা করেন “চুল দিয়ে কি করবি শুনি!”, ‘যেদিন আমার অফিস ছুটি থাকবে, সেদিন ওর চুল গুছিয়ে দেবো, আর একটা গল্পো বলবো - ‘রাজকণ্যার চুল’, “তুই পারলে এরকম খুজে নিস, আমি পারবোনা !” মা হাসতে হাসতে হেসেল ঘড়ে ছুটে যান, আমি মায়ের হাসির শব্দ পাই, মেয়েটির চুলে সকালের ভেজা-শুকনো একট গন্ধ লেগে আছে, সে গন্ধ নাকে আসে। আজ বাড়ীতে গিয়ে মা’কে বলতে হবে ‘মা, তুমি খুজেঁ পেয়েছো’

বাইরের বাতাসটা আরো জোড়ে বইছে, জানালার কাঁচ দিয়ে ভেতরে আসতে চাইছে, কয়েকজন যাত্রীর চেঁচামেচিতে কেউ কেউ জানালা বন্ধ করলেও কয়েকটা জানালা খারাপ থাকায় তা আর সম্ভব হলোনা, মেয়েটা যেখানটায় সে জানালাটাও খোলা। বাতাস বুঝি তার সঙ্গ পেয়েছে, সব এলোমেলো করে দেয়া তার চুলে। পিঠের নীচ অব্দি চুলে চোখ বেঁধে যায়, কানের কাছের চুলগুলো গুছিয়ে নিলো, আবার পেছনৈর ছড়ানো চুলের অবাধ্যতায় কখনো হাসি খেলা ইষৎ ঠোটের কোণে, নিশব্দ হাসির সুর কানে আসে, যেন বৃষ্টি পতনের ছন্দ। আমি তাকিয়ে থাকি, চোখ ফেরানোই দায়।

আচ্ছা অপরিচিত আগুন্তুক এ মেয়েটার যথার্থ নাম কি হতে পারে? যাকে নিয়ে এতক্ষন কবিতা, গল্প, সুর, ছন্দ - কতকিছুই তো হল অলস যানযটকালীন সময়ে! চারুলতা, বনলতা, ললিতা ? সব নামের শেষেই অদ্ভূত ভাবে ‘তা’ বর্ণটা যুক্ত হয়ে গেছে, মজার একটা ব্যপার। ভেতরে ভেতরে একাই যে সব মজা পাচ্ছি কেউ কি বুঝতে পারছে ? মেয়েটি কি পারছে ?

“পান্থপথ, যারা নামবেন গেটে আসেন” আমার গন্তব্যে পৌছুতে আর মিনিটের কম সময় বাকী, খুব কাছাকাছি চলে এসেছি। যানযটটা আর একটু দীর্ঘ হতে পারতো, অন্যদিনও তো এর থেকে বেশী সময় লাগে, আজ না হয় প্রশাসনিক কর্মকর্তার এটেনডেন্সে লাল কালি পড়তো তাও দোষের হতোনা, একজন মিনিষ্টার যে কেন গেলেন, আরও দু-একজন সাথে গেলেও তো জ্যামটা ধরে থাকতো। “এই যে ভাই, পান্থপথ নামবেন না আপনি?” –‘হ্যা আসছি’

“বাবা, আমার হাত ব্যগটা কোথায় দেখেছো ?” ; ‘ওই তো মা, সিটের পাশেই রয়েছে’ নামবার মুহুর্তেই চোখ ফেরাই, পাশে থাকা হাত ব্যাগটিও মেয়েটা দেখেনি, আমার বোঝার অপূর্ণতা কেটে যায়। নামবার আগে মেয়েটিকে আরেকবার দেখি, তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি। মেয়েটি অপলক তাকিয়েই আছে, আমার দিকে এক বিন্দুও তাকায়নি। অন্ধ মেয়েটির জন্মে যায় ততক্ষনে আমার অন্ধ ভালোবাসা।

আমি নেমে পড়ি, বাসটা আবার যানযটে পড়ে, আমি হেটেঁ ততক্ষনে অফিসের পথে। সিকিউরিটি গার্ড স্যালুট দেয়, আমার চোখ এড়িয়ে যায়, অফিসের গেটে যখন, তখনও বাসটা যানযটে।

ভালোবাসা দীর্ঘ হয়, কখনো এত স্বল্প, ক্ষনস্থায়ী হয় - অনুমানও ছিলোনা। আজও আমি গল্পে কিংবা বাস্তবে যখন স্মৃতি রোমন্থন করি, সত্যিটা ফস করে বলে ফেলি ; আমার “যানযট ভালোবাসা”


কৃতজ্ঞতা : সামহোয়ারইন আওয়াজ -এর মাইক্রো ব্লগার বন্ধু adnaneus এবং ajnabee কে পোষ্টটি উৎসর্গ করছি। তাদের করা সাউট থেকেই লেখাটির জন্য চেষ্টা করেছি। ধন্যবাদ দু'জনকেই। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29007794 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/29007794 2009-09-10 00:51:21
দোস; তুই তো শালা ভুলে গেছিস ! ............ “ভাল থাকিস তুই !”
দোস, তোকে কখনও বন্ধু বলে ডেকেছি কিনা সন্দেহ ! বন্ধু তো শুধু সম্পর্কের নাম বা তার চেয়েও বেশীকিছু। 'শালা' ডাকটা খুব কমন ছিল, তাই না ? তুই আসলেই একটা শালা ছিলি।

তোর যা মন, মনে আছে কিনা ! প্রথম পরিচয়, স্কুলের এসেম্বীলেতে “আমার সোনার ময়না, আমি তোমায় ভালবাসি” এই তোর জাতীয় সঙ্গীত! টিচারের কাছে নালিশ করতেই, কান ধরে এক পায়ে স্কুলের মাঠে আধ ঘন্টা ! পরে জেনেছিলাম ‘নীলা’র জন্য তোর এ গান !

বদলা নিতে চেয়েছিলি, পারিসনি, সারা রাত ভাইরাস জ্বর শরীরে কতবার বলেছি “তোকেও ভাইরাস ধরবে, তুই যা” “- ধরলে ধরুক;” ধরেওছিল তোকে, তখন পাশে থাকতে দেয়নি, অথচ আমরা কিন্তু পাশাপাশিই থাকতাম।

-নাম্বার ওয়ান ফাকিঁবাজ- তোর নাম পিছিয়ে দেবে, সাধ্য কি কারো ছিল? পড়া পারতিনা, কান ধরে বেঞ্চের উপর, সেদিন পড়া শিখেও পারিনি, শুরুটা তো সেখানেই। কি পেলাম, আর কি দিলাম আর তুই কি নিলি, কখনো তো বলিসনি, আর বলবিও-নে জানি !

প্রজাপতির দুটো রঙিন ডানা এনে দিলি, “কোথায় পেয়েছিস এগুলো ? ” “ -- বাগান থেকে ধরেছি” .. দশ কি বারো দিন তোর সাথেই কথাই বলিনি, দেখা তো দূরে থাক। সকালে বারান্দায়, একটা খাঁচায় দুটো হলুদ পাখি। তুই পেছনে দাড়িয়ে, খেয়াল করিনি। খাঁচাটা খুলে “ -- জানিস, পাখিরদুটোর একটা তুই আর একটা আমি”, দোস সেদিন তোর বুকের প্রশস্ততা টের পেয়েছিলাম, আজও ভুলতে পারিনি। হলুদ যে আমার প্রিয় রং সেটাও তুই জানতি।

দেখতে দেখতে বড় হলাম, তোর আগে গোফ উঠল, ছোট-ছোট কুচ-কুচে কাল। মহল্লার মোড়ে যে নাপিত বাবুর দোকান, চুরি করে গোফটা একবার ছেটেও এলি। ‘বুড়ো’ ‘বুড়ো’ বলে খেপালাম, ফলাফল; শুধু আমাকে রেহাই দিলি, বাকীদের অবস্থা ! সাত দিন কাসে অ্যাবসেন্ট।

‘প্রাইমারী’ - প্রায় মারামারি হত, তারপর ‘হাইস্কুল’ - হ্ইাটে তুই আমার চেয়ে এগিয়ে। নিতান্তই তোর কাধের নীচে মুন্ডুখানি রগরগে ঘাড়ে সোজা হয়ে উচ্চতা বাড়াতে চাইতাম। এরপর তো মিনিট তিরিশ ঝুলে থাকা নিয়মিত অভ্যেস হচ্ছিল, তখনই তোর পরামর্শে ‘গরু মোটা তাজাকরণ ট্যবলেট’ যোগাড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম, ভাগ্যিস ... সেদিন বাবার মার খেলাম, নইলে এ জীবনের বাকীটা, গরু-ই হয়ে থাকতে হত !

‘অনুপা' - আমাকেই শুধু বলতিস, সাহস ছিলনা ওকে বলবার। কতবার যে বুকে ফু দিয়ে পাঠিয়েছি, এখন তো আর সেই সংখ্যাটা মনে নেই। তবুও পারতিনা। একবার .. “শালা ! ছাগল কোথাকার, প্রেম করবি অথচ বলবিনা, বুঝলি আর যাই হোকম তোকে দিয়ে আর এ প্রেম-ট্রেম কিচ্ছু হবেনা” কিছু বলতিনা, মাথা গুজে শুধু হাতে ঝুলে থাকা ক্যাসিও ঘড়িটার সময় দেখতি।

‘প্রদীপ স্যার’-এর কাথা মনে আছে তোর। স্যারের এমন একটা নাম দিলি, অভদ্র সমাজেও উচ্চারণ করা যাবেনা! স্যারের বাসার জানলার কাঁচ ভাঙ্গা, চেয়ারে চকের গুড়োতে কালো প্যান্টের পশ্চাতদেশে যে শিল্প অংকন, সবই তো তোর হাতের। স্যার সেবার যখন স্কুল থেকে বিদায় নিলেন, একটা গিফট্ কিনব বলে টাকা যোগাড় হচ্ছিল, টিফিনের জমানো টাকাগুলোর সবটাই দিলি। জানতাম, তুই-ই সবচেয়ে বেশী ভালবাসতি স্যারকে।

সেদিনের চুরি করে সিনেমা দেখে বাড়ী ফেরা, বাবার দেড় হাত শক্ত বেতের মার, ঘর পালানো - ভুলে গেছিস তুই? এইটা তোর মনে থাকবে, শেষ যেবার ঘর ছাড়লি, হন্তদন্ত হয়ে সবাই খুজছে, আমি নিশ্চিত তোর শেষ দৌড় কোথায়। রাতে তো সিঙ্গেল খাটে দুজনের সে কি গুতোগুতি, ঠেলাঠেলি ! জানিস, খাটের পায়াটা আজও নড়বড়ে।

স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে তখন কলেজে, সেবার কষ্টটা ছিল খুব বেশী। এই প্রথম তোকে ছেড়ে থাকতে হবে। তোর বাবার ট্রান্সফার। অবশ্য দুজনেই ঢাকাতেই। এলাকা তফাত দূর। তুই ভর্তি হলি এক কলেজে আমি অন্যটাতে। যোগাযোগ আগের মতনই ছিল, শুধু পাশাপাশি থাকা হলনা।

‘অনুপা'কে’ তখনও ভুলিসনি। মেয়েটা'কে বড় রহস্যময়ী লাগত, তোকে বলেছিলামও কতবার, তোর সরলতায় কখনো বারন করা হয়নি। শুধু বলেছিলাম, “কষ্ট পাবিনা? যদি চলে যায় ও” “ - - কষ্ট না হয় একবারই পাব, বেশী তো নয়
তুই বলতি তোর হার্ট একটা আর হৃদয় আরেকটা। আমার ভেতর সেরকমটা কখনো অনুভব হলনা। “ --- হার্ট ফেল করলে তাতে কি? হৃদয়টাতো থাকবে !” কথা ছিল হৃদয়ের ভালবাসা, স্নেহ, মায়া, মমতাগুলো রেখে যাবি। সত্যি বলেছিলি সেদিন, হৃদয়টা এখনও আছে, নিতে পারিসনি তুই !

এই তো সেদিনের কথা, ছাদের কোনায় রেখে দেয়া তোর গীটারে টুং টাং সুর তোলা। তুই ভাল গাইতি তখন, পরে তো গানটাও ছাড়লি। মোড়ের চায়ের দোকানে তোর বাকী টাকা শোধে আমার পকেট প্রায় শূন্য, শুধু বলতি “ - - আগে চাকরী-টা পাই, সব শোধ করে দেব”, তুই কথা রাখিসনি, দোস, এখনও অনেক বাকী।



২০০৬ সন

ফয়সল তখন বি.কম শেষ করেছে মাত্র। ততদিনে পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী। নীলেেতর হুবহু কপি করবার দোকানের ক্যাশ বক্সের কড়কড়ে নোটের কচকচে শব্দে প্রায় গুন গুন করে কি গাইত। আমায় শুধু বলত “ - - বুঝলি, টাকাই সব, টাকা না হইলে জীবনটা ..” থামিয়ে দিতাম “আগে বলতো! টাকা আগে? না, জীবন ? ” কিচ্ছু বলতনা !

রাত তখন দুটোর’ও কিছু বেশী, আমার মাষ্টার্স চলছিল, মাত্র শুয়েছিলাম, সেলফোনটা বাজতেই, দেখি ফয়সলের ফোন ..
“ কিরে শালা, কি খবর.. এত রাতে ..”
.........................
“ ওই, কথা বলছিসনে ক্যান”
--- দোস্ত !!!
.......................
“কি হইছে ? ”
“তাড়াতাড়ি বল, কাল পরীক্ষা একটু ঘুমাইতে হইবো”
--- দোস্ত, আমি পয়জন খাইছি !
“কিরে শালা, ফাইজলামী মারার আর টাইম পাওনাই !”
“ওই শালা, আজ কয় গ্লাস টানছস ? ”
--- না রে, দোস্ত সত্যি
“শোন, পাগলামী করিসনে, যা খাইছিস . খাইছিস”
“এইবার একটু ঘুমা, সব ঠিক হয়ে যাইবো”
“আর শোন, কাল নীলতে যামু, কিছু নোট কপি করতে হইবো”

হাইস্কুলে থাকতেই সিগারেটটা ধরেছিল, অনেক চেষ্টা করেছিলাম, ছাড়েনি আর ছাড়াতেও পারিনি। উন্নতি হল। এবার ড্রিংকস্। মাঝে মাঝেই খেত। এটা জানি, তাও প্রায় বছর খানিক হল। তাই ওর মাতলামী স্বভাবটার সাথে প্রায় অভ্যস্ত। আজও তাই মনে হল। হয়ত একটু বেশীই টেনে ফেলেছে, আর এখন মাতলামী করছে।

আকাশে মেঘ ছিল, সাথে বৃষ্টি। পরদিন পরীক্ষা শেষে, নীলেক্ষেতে ওকে দোকানেই পেলাম ...
“কিরে, কুইচ্চা মুরগীর মত ডিমে তা দিচ্ছিস কেন?”
--- না দোস্ত, কিচ্ছুনা, এই তো ...
“চল, আগে চা খেয়ে আসি, মাথাটা ধইরা গেছে”
.........................................................
“আর এভাবে কতদিন, ওইসব ছাইপাশ এবার ছাড়”
“বললাম, একটা বিয়ে করে ফেল, না সেই অনুপা আর অনুপা”
“বলেছিলাম না? একটু ভাব, ভাবলি না তো !”
“হলো এখন, মেয়েটা তো সুখেই আছে”
“নতুন জামাই, নতুন ঘর”
“আর তুই, সারা রাত মদ টেনে, সকালে কুইচ্চা মুরগীর মত ঝিমানি”
“আর কি সব আলতু-ফালতু, --পয়জন খাইছি---”
“কিরে, কিছু বলছিসনে ক্যান”
........................
“চল, কাজটা সেরে নিই, আজ তাড়াতাড়ি বাসায় যাব”


রাত সোয়া এক’টা। এত তাড়াতাড়ি কোনদিন শোয়া হয়না। সেদিন কান্ত ছিলাম বেশ। মা নিজেই ফোনটা ধরলেন।
‘ফয়সলের বাসা থেকে ফোন এসেছে, তোমাকে খুজছে’
মায়ের কথায় আমার ভেতরটা তখন তোলপাড়, ফয়সলের বাসা কেন হবে? ফয়সল কোথায় ...
---- ---- ---- ---- ---- ---- ---- ---- ---- ---- ---- ---- ---- ----

রাত সাড়ে বারোটারও পর, বুকের জ্বালাপোড়ায় ছটফট করেছিল, দম বন্ধ হয়ে আসছিল। হাসপাতালে নিতে পারেনি, ততনে সব শেষ হয়ে যায়।
চারিদিকে কান্না, আমি নির্বাক তখন, নিথর ওর দেহটার পাশে।
---- ----

ফয়সল চলে গেছে আর বছর তিন হল। দোস্ত বোলে, মাতলামী, যত সব পাগলামী করার এখনটি আর কেউ নেই। ওদের নীলেেতর দোকানটা এখনও আছে। মাঝে মাঝেই যায়, কিছুটা সময় কাটিয়ে আসি।

মায়াগুলো আজ মলীন, আবেগ-টা হিসেবের কারসাজিতে শূন্যের কোঠায়, আর চোখের জল-ড্রামা মুভী’তে কেঁদে ফেলি ঠিকই, অথচ তোর জন্য না, কতটা হিসেবি হয়েছি, দেখছিস।
তোর জন্য যা রেখেছিলাম, আজও কাউকে দিতে পারিনি, গলে-পচে-শুকিয়ে নষ্ট হয়েছে, ভাবছি মমি করে রাখব, যা পারিনি তোকে করে রাখতে।

আজ এ বন্ধু দিবসে সবাইকে বা কাউকে কাউকে শুভেচ্ছা জানাতে ভুল করি
সেলফোনের ইনবক্সে আনরিড উইশ ম্যাসেজগুলো না পড়েই যখন ডিলিট করি, তখন, খুব মনে পড়ে-রে দোস তোকে !
প্রথম মেসেজটা তোর থাকবেই, তুই বরাবরই জিততিস, আমি হারতাম

অথচ জীবনের কাছে আজ তুই হারলি, আর আমি মাঝামাঝি !

জানিস দোস, সেদিনের পর থেকে আমি কত সিরিয়াস, বাবার ওষুধের কথা আর ভুলিনা, মায়ের ডাক্তারী চেকাপ-ডায়েরীতে নোট করে রাখি, টেস্টিমোনিয়াল লেটারে --হাইলি সিনসিয়ার--, চাকরীর এসিআর ফরমে-সিনসিয়ারিটি--তে ‘গ্রেড এ-প্লাস’, কায়েন্ট সাপোর্টে বেষ্ট টিম মেম্বার, এবার ডাবল প্রমোশন হল। সব তুই শিখিয়ে দিয়ে গিলি। সবটাই তোর !

আজও একটা অপরাধবোধে নিজেকে ক্ষমা করতে পারিনি, ও কি পেরেছিল ? জানা হয়নি। সেদিন যদি আমি সিরিয়াস হতাম, হয়ত ওর মৃত্যুটা ঠেকাতে পারতাম। ওর কাধে হাত রেখে এখনও বলতে পারতাম
“কিরে, শালা, কাপুরুষ কোথাকার, মরে বীর হতে গিছিলি, মরলে বুঝতিস!”
..............................................
“দোস, তুই একটা কথা দে, কোনদিন ক্ষমা করিস না-রে, আমাকে শাস্তি পেতে দে, কোনদিনও ক্ষমা করবিনা কিন্তু ! ওই জীবনেও না !”

“ভাল থাকিস তুই !”




উৎসর্গ : আমার বন্ধু, কলিগ, বড় ভাই, উপদেশদাতা, পরামর্শদাতা - সাইফুর]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/28987802 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/28987802 2009-08-02 19:39:36
জুতা চুরি - হায় হায় জুতা জোড়া গেল কই
এইখানেই তো রাখছিলাম
কার্পেটের নীচে ঢুকে গেল না তো !

- এই যে, ভাই দেখি দেখি একটু
= কি হইছে ভাই, আপনার
- না ভাই, ঢোকার সময় তো জুতা জোড়া এইখানেই রাখছিলাম কিন্তু,
= কি ভাই, জুতা পাচ্ছেন না ?
- কই কোথাও তো দেখছিনারে, ভাই
= তাইলে আর খুইজ্যা কি হবে, ওইটা শ্যাষ
- শ্যাষ মানে ?
= শ্যাষ মানে বুঝেননাই ?
= এতক্ষন ধরে খুজছেন, অথচ পাচ্ছেন না, তাইলে কি ওগুলো আর এখানে আছে
= যে নিয়ে গেছে তাকে কি আর খুজে পাবেন ?


দেয়ালেই সাটা ছিল, “জুতা!নিজ দায়িত্বে রাখুন”
আগেই খেয়াল হওয়া উচিত ছিল
(উহু ! ভারী জুতা ! তার জন্য আবার দায়িত্ব কাধে নিতে হবে, দায়িত্ববান হতি হবে !)
একবার খেয়াল হয়েছিল বটে, আবার ভাবল এই তো আর কতক্ষন!
যা হবার এর মধ্যেই হয়েছে ..
এত জুতা থাকতে আর কারোরটা নজর পড়লনা, শেষ মেশ ..ওরটাই ..


জুতা জোড়ার জন্য খুব মন খারাপ হচ্ছে
মাথার জিনিস না হোক, অন্তত; পায়ের তো বটে
তারপরেও খুব খারাপ লাগছে
অনেকদিনের পথ চলার সঙ্গী, আজ হারিয়ে ..
কেমন জানি,

জুতা জোড়া নিয়ে একটা লম্বা ইতিহাস-ও আছে ..

প্রথম যেবার এ জুতা জোড়া হাতে এল, সে কি কম কসরত করতে হয়েছে .
এক এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় যাওয়া
পজিশন, টাইমিং, ট্রান্সফারিং ..
আরো কত কিছু
জুতা দেখলেই বুঝতে পারে, চামড়া এলাকার মানুষ সে
চামড়ার গন্ধেই বলে দেয়, কোনটা রেক্সিন আর কোনটা টায়ারের চামড়া
জুতা জোড়া সে কিছুতেই ছাড়তে চায়না
বৃষ্টি-বাদলেও পড়েনা
রোদে-বালুতে ধুলা পড়লে, পরক্ষন বাড়ী এসে-
ধুয়ে মুছে সাফ করে রাখে
শেষ বছরে কাঠাল কাঠের যে আলনাটা তৈরী করল
সেইটার ঠিক মাঝে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখত !

জুতা জোড়ার এক মহত্ব আছে,
যেন তেন লোকের নয়
ওই এলাকার এক সাংসদের জুতা
পড়বি তো বেটা বড় মানুষের জুতা পড়বি
এমনটাই ভাবে সে,
জুতাও চিনে – জুতার মালিককেও চিনে


পরেরবার যখন এ জুতা জোড়া পড়ে আবার গেল
সেবার সে কিছুই করতে পারেনি
এর চেয়েও দামী কিছু পেয়েছিল ঠিকই,
কিন্তু তার চেয়ে বেশী মায়া ছিল,এ জুতাটার দিকে
বাড়ী ফিরলে, বৌ খুব গাল মন্দও করল
তাতে একটু মন খারাপ হল তার
কিন্তু জুতা জোড়া ছাড়ল না।


অভাবটা সেবার ঘরের দরজায়
বৌ-পোলাপান সব ক্যাচ ক্যাচ করছে সারাদিন
এখন লোকজন সব সাধু হয়েছে
যার যারটা তার কাছে রাখে
আর, যেভাবে দেয়ালে লিখে রাখছে
“জুতা, কাছে রাখুন” তাতে.. নাহ
অনেকদিন হল, ভাল কিছু হাতে আসছেনা
স্যান্ডেল, চপ্পল এগুলো দিয়ে আর যাই চলুক
সংসার তো চলেনা !


জুতা জোড়ায় সেদিন কালি করল
চকচকে নিজের চেহারাও দেখা যায়
অবশ্য, সে তার চেহারা ভুলেও জুতা জোড়ায় ফেলেনা
অনেকদিনে, চামড়ায় একটু খসখসে এসেছে
ছোট ছেলেটে জুতা জোড়ে টানতেই
ঠাস, করে অমন বাচ্চাটার মুখে থাপ্পর কষিয়ে দিল
ছেলেটি হু হু করে কাদল কতক্ষ


সেবাই ঈদ বেলা, নতুন পোষাক কিনল
কিন্তু জুতা কিনলনা
বলল, “আমার এ দুটোই ভাল, এখনও তো নতুনই আছে”
ছেলের জুতা, মেয়ের জুতা, গিন্নীরও একটা যোগাড় হল
সবাই বেশ খুশি।


“বুঝলে গিন্নী, মানুষ যখন পরখ করে, আগে দেখে জুতা, তারপর মাথা”
স্বাস্থখানি তার লম্বা-চওড়া বেশ
পত্রিকায় বিজ্ঞাপণ বেরিয়েছিল
নতুন কোম্পানী, ভাল বেতন
নিরাপত্তার পদে চাকরী নিতে গিয়েছিল, সে


নাহ! এ কথা সে কথা,
কিন্তু,
তার মন ভরেনা
জুতা জোড়া শেষ মেশ চুরিই হল
নষ্ট হয়ে ছিড়ে গেলেও তো
তুলে রাখা যেত।


ভাবছে আর হাটছে,
হাটছে আর ভাবছে,
খালি পায়ে হাটতে কষ্টও হচ্ছে
মানুষ কি ভাবছে সেটা বড় নয়
এর আগেও সে কত লোককে দেখেছে,
জুতা পায়ে এসে,খালি পায়ে বাড়ী ফিরেছে
ইচ্ছে করলেই, আজ কেও এক জোড়া ম্যানেজ হত
হয়ত একটু কম দামী হত, তাতে কি ?
নাহ ! মনটা আসলেই খারাপ
জুতা জোড়া হারিয়ে
সত্যি বেচারা !


আজকেই সে বুঝল,
হারানো জুতার কষ্টটা কি !
জুতা চুরির আনন্দটা ..
সেটাতেই সে অভ্যস্ত
কারণ..
সে তো নিজেই একজন জুতা চোর !




........ জুতা চোরের জুতা চুরি .........]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/28986780 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/28986780 2009-07-31 17:53:14
আত্মহত্যা; নিখোঁজ ছেলেটিকে মনে পড়ে ?
সেদিন রাতে যা ঘটল, সত্যি বলতে আমি আর ওসব এখন মনে করতে চাইনা। একদন্ডও না। এক মুহুর্তের জন্যও না। তবুও দু:সহ স্মৃতিগুলো পিছু ছাড়ছিল না। অনেক সমাধানের পথ খুজেছিলাম, কোনটাই দীর্ঘস্থায়ী মনে হচ্ছিল না।
রাত তখন আড়াইটা। মোবাইল ইনবক্সের শেষ ম্যাসেজটা একবার-দুবার করে কয়েকবারই পড়া হল। জানালা সোজা ফ্লাটটার তিন তলায় যে এপার্টমেন্টে তখন লাইট জ্বলছিল; সেটাও নিভে গেল।চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছিল। যে পথ খুজছি, সেখানেই বুঝি আনন্দ, কিন্তু সে পথও তো আলো নেই। ঘড়ির কাটায় চারটা প্রায়, তখনও ঠিক সেখানেই।

পরদিন সকালে ভোরেই জেগে গেলাম। মা তখনও ঘুমিয়ে, নামাজ পড়বার জন্য দু-একবার ডেকে চুলোয় চা বসিয়ে এলাম।

ভোরে মা'কে নিজ হাতে চা বানিয়ে খাওয়ালাম, বাসা থেকে বেরুবার সময় মা’র দিকে তাকাতে খুব কষ্ট হচ্ছিল” [June 25, 2009, 11:56 am]

আসবার সময় বাবা’র মাথায় হাত রেখেছিলাম “বাবা, রাতে ঘুম হয়েছিল ? ” বাবা মাথা নাড়লেন, হাতটা সরিয়ে নিলেও চোখটা ফেরাতে পারিনি।” [June 25, 2009, 01:34 pm]

ছোটটাকে সকালে বকা দিয়ে ঘুম থেকে উঠাতে হয়, না হলে প্রতিদিন অফিস দেরী করবেই, সেদিন বকা দিতে পারলাম না .” [June 25, 2009, 04:17 pm]

অফিস শেষে রাতে যখন বাসে উঠেছি, তখনও একবার নয় বহুবার ভেবেছি। সারাটাদিন কাউকে বুঝতে দেইনি। ভাবছি বোধহয় জিতেই গেছি। ক্রমশই নিয়ন্ত্রণ বোধটা হারিয়ে ফেলবার ভয়ও কাজ করছিল, আবার ভাবলাম এই তো প্রায় এসে গেছি, আর সময়ও বেশী নেই।

যখন পৌছলাম রাস্তার দু-ধারে প্রচুর গাড়ী দাড়িয়ে ছিল, সব ওপাড়ে যাবে। এমনিতেই কিছুক্ষন আগে বৃষ্টি হয়েছিল মনে হয়, রাস্তা সব কাঁদা কাঁদা। দু-একটা আস্ত ইটের টুকরোও রাস্তার মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, হোচটও খেলাম একবার। পকেটে হাত দিয়ে নিশ্চিত হলাম, না, সব ঠিকই আছে।

জায়গাটা অন্ধকার, ঠিক ডেকের ডান দিকে রেলিং এর কাছে। অদ্ভূত একটা সময় ছিল সেটা, খুব দ্রুত যেন পেছনে চলে যাচ্ছিলাম, একবার, মা, বাবা, ভাই অফিস সবার কথা মনে হচ্ছিল। ভাবছি.... না থাকা সে কথা । আমার এক শিক্ষকের কথা হঠাত মনে পড়ল, তিনি সবসময় বলতেন, সারাদিনের সব ভাল কাজ, কথাগুলো রাতে একবার ভাবতে। সেদিন তো আমার ভাল বলে কিছু ছিলনা ...

রাশিকা’র একটা কথা খুব খেয়াল হল, সেদিন সকালের ...... এক সাউটের মন্তব্যে বলেছিল ... (rasheeka June 26, 2009, 06:45 pm)
asholei onek shahosh dorkar suicide korte...bhabteo pari na ekta manush kotokhani depressed hole nijer jibon nijer haatei shesh kore dite pare....

তাইত আমি কতট ডিপ্রেসড! কতটুকু ডিপ্রেস তা মাপার যন্ত্র থাকলে হয়ত মেপে ক্যালকুলেশন করে ফেলতাম, আর কতটা ডিপ্রেসড্ থাকলে মানুষের এ পথে আসা উচিত..

হাসান ভাইয়ের শেষ মন্তব্যটি ...... (hasan June 25, 2009, 08:14 pm)
কেনরে ভাই আপনার সমস্যাটি কি ? কি নিয়ে চিন্তিত ? যখন আমার নিজের প্রতি রাগ হয় তখন আমি ঘুমাই ব্রেন শান্ত থাকলে সব ঠিক হয়ে যায় আমার সাজেশন থাকবে পারলে একটু ঘুম দেন আমি জানি আপনে সব চেয়ে সফল মানুষ, নিজেকে জানুন বিশ্বাস করুন আর ভালবাসুন মানুষ কে

আমি নাকি একজন সফল মানুষ, এটাতে খুব উৎসাহ পেয়েছিলাম, কে বলল ওনাকে, কোত্থেকে পেল এ কথা, কি জানি, না কি গাজাখুরি গল্প জুড়ে দিয়েছিলেন ......

মোবাইলটা অন করতেই ইনকামিং ম্যাসেজ, ছোটটার নন্বর থেকে “ভাইয়া, তুই কোথায়” ম্যাসেজটা পাঠিয়ে ছিল অনেক আগেই।
কিছুন বাদেই বাসার নম্বরের কল, ফোনটা রিসিভ করতেই ......
এবার মা
বাবা, তুই কোথায়
অনেকন কোন কথা নেই, মা কিছু বলতে পারছিলেন না, শুধু কান্নার শব্দ পাচ্ছিলাম, আমি তখনও নিশ্চুপ।
বাবা বোধহয় ততনে ঘুমিয়ে পড়েছেন অথবা ছোটটা জোড় করে ঘুমিয়ে দিয়েছে না হলে ...
অফিসের জিএম স্যারের ফোন
এই তুমি কোথায়, তোমার বাসায় সবাই টেনশন করছে, তোমার কি হইছে বলতো ..... স্যার হ্যালো হ্যালো করতে থাকেন... আমি ফোনটা রেখে দিই
একটাই বন্ধু, “হ্যালো দোস্ত, কোথায় তুমি.. এত রাত হইছে .. সবাই খোজাখুজি করতেছে ..
ওর লাইনটাও কেটে দিলাম
মোবাইলের চার্জ প্রায় শেষ তখন

প্যথিড্রিনের সিরিঞ্জ দুটি তখনও আমার হাতে। থর থর করে শরীরটা কাঁপছিল, অনেক শব্দ করে কাদঁছিলাম। একটা মানুষও তখন পাশে ছিলনা।
পারিনি সেদিন নিজেকে হত্যা করতে, ফিরে এসেছিলাম।
....................................................................................................................
- নেওনা তোমার চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে তো !
= ভাইয়া এক গ্লাস পানি হবে ?
- তারপর, তোমার বাবা-মা তোমাকে কিছু বলেনি ?
- ছোট ভাই-টা, অফিস, অন্য সবাই
= না, ভাইয়া কেউ কিছু বলেনি
- ভাল
- নেপোলিয়ান সাহেব কি বলেছিল জান ?
= নেপোলিয়ান কে ভাইয়া ?
- আরে নেপোলিয়ান কে চেন না !
= ও, আচ্ছা
= কি বলেছিলেন ?
- তিনি বলেছিলেন, “আত্মহত্যা যে করে সে একটা কাপুরুষ”
(ছেলেটি এই প্রথম হাসছে, অনেকক্ষন ধরে হাসছে)
= ভাইয়া,
= আমি কাপুরুষ না !
........................................................................................................................
এই সেই ছেলে, যে আত্মহত্যা করবার পথে পা বাড়িয়েছিল, আর সেই পথের মাঝে দেখা হয়েছিল আমার সাথে কিছুক্ষনের জন্য। এক বাসের যাত্রায়। নামবার আগে বিজনেস কার্ডটা দিয়েছিলাম, ঘটনা বেশীদিনের না, আজই অফিসে এসেছিল। ছেলেটিই এতক্ষন সব বলল, শুরু থেকে শেষ অবধি। কিন্তু, ছেলেটি বলেনি কি সেই কারণ, যে কারণে আত্মহত্যার মত পথ বেছে নিয়েছিল ...
........................................................................................................................

একটা অনুরোধ করেছিল ও, এ পোষ্টটা রাশিকা আর হাসান ভাই-এর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করবার জন্য। তাইত ! করাই উচিত, যাদের কারণেই হোক আর যে ভাবেই ফিরে যে এসেছে তার অনুরোধটা রাখতেই হবে ..

উৎসর্গ : rasheeka ও hasan ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/28985732 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/28985732 2009-07-29 16:54:02
আত্মহত্যা
লোডশেডিং-এর সময়টাতে ৯টা বাজতে না বাজতেই রাস্তার দু-পাশের দোকানপাটের সবগুলো প্রায় সাটার নামিয়ে ফেলে, যা দিনকাল পড়েছে আজ, অন্ধকারে পথ চলাও বিপদজনক, লেনের পাশে যে সরু জায়গাগুলো - সেখানে বেশীরভাগই উদ্বাস্তু টোকাই, পথ শিশু, বস্তিদের দখলে, প্রায় সময় মাদকাসক্ত আর যৌনকর্মীদের দেখাটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়।

বাসের জন্য অপো করছি প্রায় ২০ কি ২৫ মিনিট হবে। যে গন্তব্যে যাব সে রুটের বেশীরভাগই তাদের লাস্ট ট্রিপ ছেড়ে গিয়েছে। ভাগ্য ভালই বলতে হবে, অনেকণ পর একটা বাস পাওয়া গেল - হাতে গোণা যে কয়েকজন যাত্রী আছে সবাই ওইদিকেই যাবে বোধহয়।

বাসের সামনের দিকে ড্রাইভার যেখানে বসেন ঠিক সেখানে মাত্র একটি লাইট জ্বলছে, পেছনে যেখানটাতে বসে আছি সেদিকটা প্রায় অন্ধকার, জানালার পাশে যে ছেলেটি বসে আছে তাকেও ভালভাবে দেখা যাচ্ছেনা, মাঝে মাঝে রাস্তার ল্যাম্পপোষ্টের আলো যখন ভেতরে আসছে আবছা আলোয় যতটুকু দেখা যায়।

বয়স কত হবে ছেলেটার ? ২৭ এর বেশী তো নয়ই, মনে হচ্ছে অফিস থেকেই ফিরছে, ইন করা শার্ট-প্যান্ট, হাতে একটা অফিস ব্যগ আর টিফিন ক্যারিয়ার। চোখের কান্তির চেয়ে মুখের মলিনতাটাই বেশী। এর মধ্যে কয়েকবার সময় দেখে নিল হাত ঘড়িটায়। দু-একবার কথাও বলল মোবাইলে। বোধহয় তারও দেরী হয়ে গিয়েছে।

হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছিল ছেলেটা, অনেকণ কোন সাড়া শব্দ নেই, শুধু ব্যস্তহীন - যটহীন পিচ রাস্থায় শো শো করে চলা গাড়ীর শব্দটাই বেশী শোনা যাচ্ছিল। আকষ্মিক খেয়ালে ল্য করলাম ছেলেটি চোখ মুছছে, একবার ভুল হলেও পরেরবার তো আর ভূল হতে পারেনা, ঠিকই কাদঁছে ছেলেটা।
বাসের যখন ভাড়া নিতে এসে লাইটগুলো জ্বেলে দিয়েছিল, ওই আলোয় যতটুকুন তাকে দেখেছি তাতে কান্নার দাগটা আরো স্পষ্ট করে বুঝতে পেরেছিলাম। নিজেই আগ্রহী হয়ে ...........

- কি হয়েছে তোমার ? কোন সমস্যা ?
(অনেকন কোন উত্তর না পেয়ে)
- তুমি এভাবে কাদঁছ কেন ?
- আমাকে বল তোমার কি হয়েছে ?
- স্যার ভাড়াটা দেন - আমাকে বলল
- ছেলেটাকে বলল - ভাই ভাড়াটা দেন
= আমার কাছে টাকা নেই (স্বল্প স্বরে ছেলেটার বলল)
- এই কয়জন মাত্র যাত্রী উঠাইছি, তার মধ্যে কন ভাড়া নাই -
- আচ্ছা ঠিক আছে, দাড়াও আমি দিয়ে দিচ্ছি
- তুমি কোথায় নামবে ?
= আরিচা
- তোমার কি বাসা সেখানেই ?
.....
- এতদূর থেকে কি প্রতিদিন এভাবে অফিস কর ?
- কিছু বলছনা কেন ?
- আমি তো তোমাকে অনেককিছু জিজ্ঞেস করলাম
= আমার বাসা সেখানে না
- তাহলে এই রাতে আরিচা কেন যাচ্ছ?
= আমি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছি

(প্রথমত, ভড়কে একটু বিস্মিত হয়ে যাই)

- কিন্তু আত্মহত্যার জন্য ওখানে যেতে হবে কেন ?
= আমার লাশ যেন কেউ কোনদিন না পায়

(কি বলব, কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না, আর এভাবে পাশে বসে থাকা একটা জীবন্ত মানুষ কিছুণ পর মৃত্যুর দিকে পা বাড়াবে তাকে কি বলা উচিত, তাও জানি না)

- তোমার নামটা জানতে পারি ?
=......
(বিড়বিড় করে ওর নামটা বলল, বুঝতে পারলাম না)
- তুমি কি করছ এখন
= চাকরী করছি, সাথে পড়াশোনাও
- বেশ ভাল
- কিন্তু ! ...
= আমাকে আজ মরতেই হবে
= আমি যে পাপ করেছি, আমাকেই তার শাস্তি দিতে হবে
- আচ্ছা ঠিক আছে, শোন
- তোমার বাসাতে আর কে কে থাকেন ?
= বাবা, মা আর আমার ছোট ভাই
- তারা কি জানেন তুমি এভাবে ...
= আমার মৃত্যুর পর জানবে
- ঠিক আছে
- তুমি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছ, সেটা তোমার ব্যক্তিগত ব্যপার
- কিন্তু বল, তোমার বয়স কত হবে ? ২৭ ?
= ২৭ চলছে
- তোমার মত এ বয়সের ছেলেরা কি করে যান ?
- ইউনিভার্সিটি শেষ করে ভাল চাকরী খুজে, নয়ত শেষ বর্ষে
= আমার সে সৌভাগ্য হয়নি
= ইউনিভার্সিটি ভর্তি হয়েও বাদ দিতে হয়েছে
- একদিক থেকে ভাল, চাকরী করছ, পড়াশোনা শেষে কষ্ট করতে হবেনা
- এ বয়সে ছেলেপুলেরা তো আড্ডা দেয়, হৈ হুল্লোর করে
= আমার কোন বন্ধু নেই
- ঠিক আছে, বাবা - মা তো আছে, ওনারাই তো সবকিছু
= বাবা অসুস্থ, মা একাই সংসার সামলান
- বুঝছি, ছোট ভাই কি করেন
= আমি যখন একা সংসার চালাতে পারছিলাম না, তখন থেকে সেও চাকরী শুরু করে
= আজ বাবা ৭ বছর বিছানায়
= তিনি অসুস্থ হবার পর থেকেই আমাদের সবকিছু ওলট পালট হয়ে যায়
= তখন আমি মাত্র ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেছি
- হুমম ! বুঝতে পারছি অনেক স্ট্রাগল করেছ লাইফে
- তোমার কষ্টগুলো কারও সাথে শেয়ার করতে পারতে
= বলেছি তো আমার কোন বন্ধু নেই
= আমি সবসময় একা থেকেছি, একা চলেছি
= আমার বাবা-মা আমাকে খুব বিশ্বাস করেন
= আমার কলেজ - অফিস সবাই খুব ভাল জানেন
= কিন্তু তারপরেও যে পাপ অনেকবার করেছি
= এ কথাতো কেউ জানে না
= যতবার নিজে ভেবেছি ততবারই পাপবোধটা আমাকে ধ্বংস করেছে
- কিন্তু তুমি আত্মহত্যার এমন সিদ্ধান্ত নিলে, অনেক সাহসের ব্যপার
- তুমি কেন আত্মহত্যা করতে যাচ্ছ, আমি এখনও ঠিক তা জানিনা
- হয়ত প্রচন্ড কষ্টবোধ, ােভ, জীবনের প্রতি অতৃপ্ত, বিতৃঞ্চা - কোনটাই জানিনা
= আমি তো আগেই বলেছি, আমি পাপ করেছি - তার শাস্তি দিতে যাচ্ছি
- তুমিই জান, তুমি কি পাপ করেছ, কিন্তু এমন অনেক পাপ তো আমরা প্রতিনিয়তই করছি
- তাই বলে কি, আমরা সবাই আত্মহত্যা করব ?
= আমার ভেতর প্রবল অনুশোচনাবোধ আছে, আমি সেই অনুশোচনার কাছে বারবার হেরে গিয়েছি
= প্রতিজ্ঞা করেছি, আবার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেছি
= এখন নিজের জীবনের প্রতি ঘেন্না ধরে গেছে
= জানেন ? আমি আয়নায় নিজের চেহারার দিকেও তাকাই না
= বিশ্রী লাগে, কুৎসিত মনে হয়
= নিজেকে পাপী ভাবতে আর ভাল লাগেনা
= অপরাধবোধ এতটাই আমাকে কষ্ট দিচ্ছে
= সে কষ্ট থেকে আমি রেহাই পেতে চাই
- কিন্তু আত্মহত্যা কি সমাধান দিতে পারবে ?
- তুমি তো শুধু তোমার কথা ভাবলে, বাড়ীতে তোমার বাবা - মা, ভাই
= আমি ওদের কারো কথা ভাবতে চাই না
= আত্মহত্যা আমাকে স্বার্থপর করে তুুলেছে
= আমি আর পাপী হতে চাইনা
= আর কখনো না ...

ছেলেটি এবার অনেক শব্দ করে কাঁদছে। কাঁদুক, কেঁদে যদি ওর মনটা হালকা হয় তারপর সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলে সেটাই ঢের ভাল।
আমি ভাবতে থাকি কিন্তু ভাবনার চেয়ে চলন্ত গাড়ির গতির দ্রুততা অনেক বেশী, খুব দ্রুত আমার গন্তেব্যের কাছে পৌছে যাচ্ছি।

= কোথায় নামবেন আপনি ?
(ছেলেটির আকষ্মিক প্রশ্নে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত, কারণ এতণে এই প্রথম সে আমাকে একটা প্রশ্ন করেছে)
- কল্যাণপুর
- তুমি চাইলে ..
(ছেলেটি কোন উত্তর করেনা, মাথা নীচু করে থাকে)

আমি আমার গন্তব্যে নেমে যাই, বাসটা আবার দ্রুত গতিতে চলতে শুরু করেছে, বাসের প্লেটের লাইসেন্স নম্বরটাও এবার আমার কাছে অষ্পষ্ট মনে হলে কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে, হয়ত চোখে ধুলোবালি জমেছে।

বাসটা শুধু যাত্রী-ই বহন করছে না, একজন আত্মহননকারীকেও নিয়ে যাচ্ছে তার মৃত্যুর দিকে, একথা কেউ না জানলেও শুধু জানি আমি আর আত্মহননকারী ছেলেটি।
মৃত্যুর আগে হয়ত ছেলেটির সাথে আর কারো কথা হবেনা, কেউ তাকে একবারের জন্যও ফিরে আসতে বলবেনা, তার পরিবারের কেউ কোনদিন জানতেও পারবেনা কেন কোথায় তাদের সন্তান নিরুদ্দেশ হল, শুধু জানবে সে হারিয়ে গিয়েছে। তাও চিরতরে।
.
.
.
.
.

এমনিতেই আজকাল পত্রিকাগুলোর যে হাল হয়েছে, বিজ্ঞাপণ বাণিজ্যের মাঝে যে কয়েকটা খবর থাকে তাতেই দীর্ঘশ্বাস ওঠার যোগাড়, জঙ্গি, অর্থনৈতিক মন্দা, বিদ্রোহ, আন্দোলন .................... হঠাৎ একটা কোণায় ৪ ইঞ্চি কলামের ছোট্ট নিউজে চোখ আটকে গেল ..

“অজ্ঞাতনামা এক যুবকের লাশ উদ্ধার, .............. প্রাথমিক ধারণায় যুবকটি আত্মহত্যা করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে”

চায়ের কাপের চা-টুকু অনেক আগেই ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে
ওয়ার্কস্টেশনের ডেক্সটপ পিসিতে শুধু একটা গানের সুর তখন ভেসে আসছে .....


হয়না এমন তো হয়না
নদীর বুকে বৃষ্টি ঝরে
পাহাড় তারে সয়না

সূর্য লাল বৃ সবুজ
আমি কান্দি ঘরের কোনায়
তুমি অবুঝ

বৃ আকাশ সূর্য মিলে
ঝরনার কথা কয়না
নদীর বুকে বৃষ্টি ঝড়ে
পাহাড় তারে সয়না

মেঘ কালো, আধার কালো
মৃত্যুর বুঝি মরণ হলো
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/28970431 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/28970431 2009-06-27 18:51:32
অবাঞ্চিত গর্ভধারণ, গর্ভপাত - ভ্রূণ হত্যা; সার্থক হোক "মা" দিবস "কে ফোন করে এ সময়?" অপরিচিত নম্বর দেখেই কলটা রিসিভ করি, একটা মেয়ের জড়ানো কন্ঠ "চিনতে পারছ তুমি" স্বভাবতই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি, কন্ঠটা মনে করতে পারছিনা যে তার সাথে কোন পূর্ব পরিচয় আছে কিনা, আবার তুমি করে স্বম্বোধন করছে দেখে "কিন্তু আপনাকে তো ঠিক?" তখনও মাথার সমস্ত ডাটাবেস খুজে বের করার প্রানন্তর চেষ্টা মেয়েটা কে "এত সহজে ভুলে গেলে আমাকে, সত্যি, তুমি আমাকে চিনতে পারনি", ও সবসময় 'সত্যি' কথাটা খুব একটা ঢং দিয়ে বলত, সত্যি যেন সত্যি করেই বলত, আমি বুঝতে পারলাম "তুই হ্যাপী না ! এতদিন পর" ও যে কাঁদছে বুঝতে পারেনি "তুমি কি একবার আসতে পারবে" আমার ভেতরটাতে তখন ঝড় বইছে "হ্যাপী, তুই আমাকে তুমি করে বলছিস কেন ? কি হয়েছে তোর" ও বিড়বিড় করে যেন কি বলছে, এতটুকুন শুনলাম "তুমি তাড়াতাড়ি আস"

ও ইউনিভার্সিটির হোষ্টেলেই থাকত। মাঝের অনেকদিন কোন যোগাযোগ ছিলনা, মাস ছয়েক আগে ওর খোজ পেয়েছিলাম তাও এক বন্ধুর সুবাদে। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করা অব্দি পাশাপাশি ফ্লাটে থাকা, এক স্কুল-কলেজে পড়া, সেই ছোট থেকে বড়বেলার সাথী, সবই বাবার চাকুরীর সুবাদে।

ইউনিভার্সিটির হোষ্টেলে ওকে পেলাম না, ওর এক বান্ধবীর বাসায় যখন পেলাম তখন সন্ধ্যা প্রায়। দোতলা বাড়ীর একদম শেষের ঘরটায় জানলার পাশে জড়ো সড়ো হয়ে বসা। প্রথম দেখে ওকে চিনতেই পারিনি। চোখের নীচে কালো দাগে মুখটাও কেমন শুকনো। বিশ্রী রকম লাগছে। একটা চাদড় গায়ে জাড়ানো ছিল, মনে হচ্ছিল সমস্ত জগৎ থেকে ও নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চাইছে।

ইউনিভার্সিটিতে আসার পর প্রথম বর্ষ শেষে এক সিনিয়র ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয়েছিল। সাধারণ প্রেমে যা হয় সেরকমই, কথা, গল্প, আড্ডা আরো বেশী কিছু হলে একান্ত কিছুক্ষন, এভাবেই বছর দেড়েক চলে যায়। শেষমেষ ওদের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি রকমের কিছু হয়ে গেল "শারীরিক সম্পর্ক"। যথারীতি "অবাঞ্চিত গর্ভধারণ"। প্রথমে ও কাউকে জানায়নি, অপেক্ষায় ছিল, কিছুটা সময় যেতেই বুঝতে পেরেছিল কি ঘটতে যাচ্ছে ওর ভাগ্যে, তখন শুধু ওর মা'কে জানায়। তিনিও সরাসরি না করে দিলেন।

"এ সন্তানকে বাঁচিয়ে রেখে কি লাভ, একে দিয়ে আমি কি করব, ও কার পিতৃ পরিচয়ে বড় হবে। কে নেবে এই ভার। মানুষ যখন আমাকে খারাপ বলবে, আমার সন্তানের দিকে আঙুল তুলে বলবে ও .. না না আমি ভাবতে পারিনা, এ সন্তান আমি চাইনা। আমি এ পাপ থেকে মুক্ত হতে চাই"

হ্যাপীর জড়ানো কথাগুলো বারবার আটকে যাচ্ছিল। ওর বান্ধবী জানিয়ে গেল সবকিছু ঠিক আছে। রাগ আর ক্ষোভে ওর দিকে তাকাতেও ইচ্ছে হচ্ছিল না কিন্তু অসহায়ত্বের কাছে বারবার হেরে যাচ্ছিলাম, আমার হাত দুটো ধরে চিৎকার করে কাঁদছে।

এবোরশন শব্দটা এর আগেও বহুবার শুনেছি, কিন্তু এই প্রথম যখন মুখোমুখি হলাম এমন নিষ্ঠুর বাস্তবতার সামনে যেখানে মা হত্যা করতে যাচ্ছে তার ভ্রুণ সন্তানকে যে হত্যা দ্বারা মোচন হবে তার পাপ কিন্তু পাপী নয়। কি অদ্ভূত আত্ম অবিশ্বাস!

রাত তখন অনেক, যখন ওকে বাসায় পৌছে দিয়ে ফিরছি। পেছনে ফেলা আসা দু:সহ স্মৃতিকে কিছুতেই ভুলতে পারছিনা, হৃদয়হীন নয় বলে ... কারণ আজ আমি পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম খুনের একমাত্র স্বাক্ষী।

এ ঘটনাটি প্রায় বছর এক আগের। এবোরশন করানোর পর মাস দুয়েক ওর শরীর বেশ খারাপ ছিল। শুনেছি পরে বিয়েও করে ফেলেছে। সেদিনের পর থেকে আর কোন যোগাযোগ হয়নি। এ লেখাটি হত না যদি না সেদিন সে ফোন করত "তুই কেমন আছিস, কোন খবর নাই" আমি ওর কথাগুলো শুধু শুনি "তুমি অনেক বদলে গেছ" হ্যাপী তখন হো হো হাসছে "কিরে আজ তুই আমাকে তুমি করে বলছিস কেন" আস্তে করে ফোনটা রেখে দিই।
.
.
"মা" দিবসের শিরোনামে কিছু একটা লেখবার যখন মনস্থির হল, পজিটিভ কিছু লেখার ইচ্ছে ছিল, যে দৃশ্যে সন্তান মা মা ডাকে মায়ের বুকে দৌড়ে যাবে আর মা পরম মমতায় তাকে বুকে টেনে নিবে। সার্থক মা, সার্থক মা দিবসের পরম রচয়িতা রচিত হবে। সে আর হলনা, এমন একটা বণর্না তুলে দিলাম যেটা হয়ত হৃদয়হীন মানুষের কাছে আবেগের খুব একটা অনুভূতি সৃষ্টি নাও করতে পারে, কিন্তু অন্তরালে যে সত্য লুকিয়ে থাকল সেখানে মূল চরিত্রে "মা" হয় একজন ভ্রূণ হত্যাকারীনি, একজন খুনী।

কবিতাটির কিছু লাইন খুব মনে পড়ছে, ...
প্রথম যেদিন তুমি এসেছিলে ভবে
তুমি মাত্র কেদেঁছিলে
হেসেছিলে সবে ..

"একটি নবজাতকের কান্না একজন মায়ের মুখে স্বর্গীয় হাসি ফোটাতে পারে তা নিজের চোখে না দেখলে আর প্রাণের গভীর অনুভব না করলে সঠিক মূল্যায়ন করা যায়না" - অধ্যাপিক ডা. সুলতানা জাহানের এ উক্তিটি আমার সেই ছোটবেলা সাথীর জন্য প্রযোজ্য নয়। যারা সজ্ঞানে, বিচারে ভ্রূণ হত্যা করতে পারে, শরীরী কামনা আসক্তিতে অবাঞ্চিত গর্ভধারিত ভ্রূনকে নির্দিদ্ধায় বৈধতার সংকোচে পাপ মোচনের অযুহাত দিয়ে শরীরের কলংককে মুছে ফেলতে চায়, সমাজের চোখে বিশুদ্ধতাই যখন প্রধান অবলম্বন, নিদারুন স্বার্থপরতা, হিংস্রতার পাশবিক আচরণের শেষ পরিণতি হয় তখন গর্ভনাশ।

এ লেখাটির প্রসঙ্গ "স্বতস্ফূর্ত গর্ভপাত" এর দিকে বিন্দুমাত্র লক্ষ্য নেই, শুধুমাত্র "আবিষ্ট গর্ভপাত" যার মাধ্যমে স্ব-ইচ্ছায় নষ্ট করে দেয়া একজন নারীর ব্যক্তিগত, সামাজিক অবস্থানকে দেখানো হয়েছে।

উদ্বেগজনক হবারই মত বিষয়, বিশ্বে যেখানে ৬৪ শতাংশ গর্ভপাত ঘটানো হচ্ছে অবিবাহিত মহিলাদের, ১৮ শতাংশ বিবাহিত এবং ৯ শতাংশ বিপত্মীকদের ক্ষেত্রে যার কারণ অনুসন্ধানের চিত্রটি এমন, ১ শতাংশ ধর্ষণ বা ইনসেস্ট এর কারণে, ৬ শতাংশ মা বা শিশুর শারীরিক সমস্য এবং বাকী ৯৩ শতাংশই হয়ে থাকে সামাজিক কারনে যার প্রধান ইস্যু অবাঞ্চিত, অনাকাঙ্খিত এবং অবৈধ। (সূত্র : The Alan Guttmacher Institute)

কিন্তু কেন গর্ভপাতের মত রক্তপাত আজকের সময়কে আহত করছে? সামাজিক অবক্ষয়, উদার নৈতিকতা যখন প্রশ্নবিদ্ধ তখন পশ্চিমা বিশ্বের দিকে তাকালেই সহজেই অনুমেয় 'সমকামীতার' মত বিতর্কিত বিষয়টিকে তারা অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছে, দেয়া হয়েছে গর্ভপাতকেও। যৌন স্বাধীনতাকে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে এভাবে উপস্থাপিত ও বাস্তবায়িত করা হচ্ছে যেখানে প্রতিনিয়ত নৈতিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক কাঠামো ধ্বংস হচ্ছে। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, যৌন অনাচার, মাদকের বহুমাত্রিক ব্যবহার সমাজের নীতির দৈন্যতাকে আরো প্রকট করছে। সামাজিক এ রক্তক্ষরণ শারীরিক রক্তক্ষরণের চেয়ে কোন অংশে কম নয়।

গর্ভপাত বলতে যে শুধু স্বইচ্ছায় ভ্রুণ নষ্ট (আবিষ্ট গর্ভপাত) করাকে ধরে নেয়া হবে তা নয়, world abortion policies এর ৩১ডিসেম্বর ২০০৬ তথ্য অনুযায়ী যে ক্ষেত্রগুলোতে গর্ভপাতের অনুমোদন দেয়া হয়েছে সেগুলো :
১) নারীর জীবন বাঁচাতে
২) শারীরিক স্বাস্থ্য রক্ষার্থে
৩) মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার্থে
৪) ধর্ষণ বা ইনসেস্ট এর কারণে
৫) ভ্রূণ নষ্ট বা ক্ষতি সাধিত হলে
৬) অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণে এবং
৭) অনুরোধের প্রেক্ষিতে
কিন্তু বিশ্বের সব রাষ্ট্রই উপরোক্ত সব বিষয়গুলিতে অনুমোদন দেয়নি।
(Source: The Population Policy Data Bank maintained by the Population Division of the Department of Economic and Social Affairs of the United Nations Secretariat.)

সারা বিশ্বে আনুমানিক ৪২ মিলিয়ন গর্ভপাত হযে থাকে যেখানে দিনে গড়ে ১,১৫,০০০ জনের গর্ভপাত হয়। সূত্রমতে ৮৩ শতাংশ এবোরশন উন্নয়নশীল দেশে এবং ১৭ শতাংশ উন্নত দেশে হয়ে থাকে। (সূত্র : The Aan Guttmacher Institute)

গর্ভপাত নিয়ে হৈ হট্টগোল কম হয়েছে তা কিন্তু নয়, বৈধতা-অবৈতার বিষয়গুলি সমাধানে রাস্তায় পর্যন্ত মানুষ নেমে এসেছে, যখন হাজার হাজার মানুষ মাদ্রিদের রাস্তায় "এখান থেকে বেরিয়া যাও, আমাদের শিশুদের বাঁচতে দাও" শ্লোগানে গর্ভপাত বিরোধী প্রতিবাদে মুখর হল সারা বিশ্ব কিন্তু তখন তা দেখেছে। ভারতে গর্ভপাত বিষয়ক আদালতের একটি রায় সেদেশেও বির্তকের সৃষ্টি করে। নিয়মানুযায়ী সে দেশে ২০ সপ্তাহের গর্ভাবস্থার পর গর্ভপাত করতে দেয়া হয় না, কিন্তু যে দম্পত্তি আদালতের অনুমতি চেয়েছিলেন সেখানে ২০ সপ্তাহের চেয়ে পরিণত ভ্রূনে জন্মগত ব্লক দেখা গিয়েছিল, কিন্তু আদালতের রায় না পাওয়ায় ক্রটিযুক্ত সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে বিষয়টি পরিপূর্ণ সুরাহা হয়নি।

একটি বিষয় না উল্লেখ করলো অসমাপ্ত থেকে যাবে, আমি বীরাঙ্গনাদের কথা বলতে চেয়েছি। আমাদের গৌরবজ্জ্বল স্বাধীনতার পেছনে যারা রেখে গিয়েছেন নীরব অবদান। (ব্রাউনমিলার, ১৯৭৫;৮৪) তথ্য মতে ৭১' এ ধর্ষণের ফলে বেঁচে থাকা নারীদের ২৫ হাজার জন গর্ভধারণ করেছিলেন। অন্যদিকে ড: জিওফ্রে ডেভিসের মতে প্রায় ৫হাজার জনের গর্ভপাত সরকারীভাবে ঘটানো হয়েছিল, এয়াড়াও ১ লাখ ৫০ হাজার নারীর ভ্রƒণ সরকারী উদ্যোগ নেয়ার আগেই স্থানীয় দাই, ক্লিনিকসহ যে যেভাবে পেরেছিলেন ষেভাবে নষ্ট করেছে। এখানে আমরা তাঁদেরকে শ্রদ্ধা করি সম্মান জানাই। (ব্লগ হতে তথ্য সংগৃহীত)

আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি লেখাটি শুধুমাত্র আবিষ্ট গর্ভপাতকে চিহ্নিত করেছে। তথ্য উপস্থাপানের কারণে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
.
.
.

অন্য সবার মত আমারও একটি দিন আছে সেদিন "মা" দিবস। যেখানে মা তার বিশেষত্বে বিশেষায়িত। আমি তা ভুলে গিয়েছি এমনটি নয়। কেউ ভেবে থাকলে ভূল করবেন এ লেখার প্রসঙ্গটি 'মা' কিংবা তাঁর নামের মর্যাদার সামান্য অংশ ক্ষুন্ন করেছি কিনা। আমি মার্জনা প্রার্থনা করছি, বিধাতা যেন একদন্ড সেই সাহসও আমাকে কোন দিন না দেন 'মা'কে নিয়ে একটা কটু কথা বলি।

এখানে সেই নারীদের কথা বলা হয়েছে যারা 'মা' হবার পথে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্বকে নিজ হাতে বিসর্জন দেন। যাকে আমরা শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিচ্ছি সেই নিষ্পাপ ভ্র'ণকে 'অবাঞ্চিত' 'অবৈধ' নামকরণে সামাজিক বৈধতার দু:শ্চিন্তায় আত্মরক্ষার্থে গর্ভেই তাদেরকে হত্যা করে।

কাকে অবৈধ বলছি ? মাতৃ জঠরে বেড়ে ওঠা সেই ভ্রূণ ? ভ্রূণ কখনো অবৈধ হতে পারেনা। অবৈধ সেই সম্পর্ক যা তার পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র স্বীকৃতি দেয়না, তখন লোপ পাওয়া মনুষ্যত্বে অন্যায়ভাবে "অবৈধ-সন্তান" উচ্চারণটি অবৈধভাবে চাপিয়ে দেয়া হয় ভ্রূণের উপর। এক অন্যায় মোচনে করা হয় আরেক পাপ।

abortion is murder? abortion is terrorism? উন্মুক্ত বিশ্বযুগে ফোরাম, ব্লগের পাতায় প্রকাশ পাওয়া প্রশ্নগুলো যখন তুমুল বিতর্কের মুখে পক্ষে - বিপক্ষে সাফাই গাইছে তখনও কি থেমে আছে এবোরশন ? একথা ঠিক, আপনার এই সারমর্ম আলোচনার ক্ষনিকটুকুতেও পৃথিবীর কোন না কোন প্রান্তে মা তা গর্ভজাত ভ্রূণকে হত্যা করছে।

লেখাটি সংকলন করবার সময়কালে মনুষ্যত্বের আঘাতে যে ঘৃণা জমা হয়েছে তার প্রকাশটা বাঞ্চনীয়।
ঘৃণা সেই নারীদের, যারা হত্যা করে গর্ভজাত মানব বীজকে, কলংকিত হবার তাড়নায় যারা সেই কলংক লেপে দেয় নিজেদের আত্মায়। ক্ষণিকের জরায়ুমুখের রক্তরণ যতটা না তাদেরকে আহত করে, বিবেক আর মনুষ্যত্ব যে অবিরত রক্তক্ষরিত হয়ে মৃত্যুবরণ করে একটিবারের জন্যও তারা তা বুঝতে পারেনা। ঘৃণা সেই অপ্রকৃতস্থ, জ্ঞান বিবর্জিত মানুষগুলোর প্রতি।

ঘৃণা সেই কুৎসীত মন ও দেহধারী পুরুষদের প্রতি, সত্যকে ধারণ করার মতো শক্তি এবং সাহস কোনটিই যাদের নেই। ঘৃণা তাদের জন্য, সেইসব অসাধু, ভন্ড ও কাপুরুষদের, যাদের লোভ, ছলনার আকুতিতে অভিশপ্ত হয় মানব ভ্রূণ। অসুস্থ, বিকৃত মননের সেই পুরুষধারী মুখোষগুলি, আত্ম -পরিচয়ে যারা শংকিত।

গর্ভপাত : রক্তপাত, ভ্রূণ হত্যা : মানব হত্যা

উপসংহার টেনে দিলে লেখাটির হয়ত পূর্ণতা আসবে, প্রাপ্তি প্রত্যাশায় এ রচনা নয়। যে ঘটনা ও ব্যক্তিচরিত্রের সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং অবস্থানে শংকিত, সে অবক্ষয় কি এত সহজেই মুছে যাবে ? কলংকের দাগ শুকাতেও তো কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হয়।

"মা" দিবস নিয়ে কিছু লেখা হলনা। কিছু লেখার তাগিদও অনুভব করিনি, কারণ এক, মা সত্য, মায়ের ভালবাসা সত্য। একজন প্রকৃত মা কখনো পারেন না তার সন্তানকে হত্যা করতে, এ সত্যকে আরো একবার স্বীকার করে নেবার কোন অর্থ হয়না কারণ যে সত্য জেনে এসেছি এবং জানি এবং যে সত্য ধ্রুব - "মা" যে চিরন্তন সত্য। -
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/28949012 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/28949012 2009-05-10 21:22:06
একটি ছবির কথাই শুধু বলতে এসেছি !

ছবিতে যাকে চোখের জল মুছতে দেখছেন, সাধারণ পরিচয়ে সে একজন মানুষ, কোন একটি পরিবারের সদস্য, একজন বাবা-মায়ের সন্তান কিংবা সেও কোন সন্তানের পিতা কিন্তু যে পরিচয়টা তার কাছে মূখ্য আমাদের কাছে পরিচিত সে দেশের একটি সংস্থার কর্মী, সোলজার যার পরিচিতি, সৈনিক তার পদবী।

প্রসঙ্গটি পরিচয়-ই মূখ্য নয়। মাথায় হেলমেট, কাধে এসএমজি, খাকি সবুজের কম্ব্যাট জ্যাকেট, ম্যগজিন ভর্তি বুলেট, পিচ ঢালা পথে শক্ত বুটের আঘাত, ইষ্পাত দেহের ঘামে ভেজা শরীরের এ মানুষগুলোকে আমরা খুব সহজেই শক্ত মানুষ বলেই জানি, যারা অস্ত্র ধরতে জানে, যারা অস্ত্র চালাতে জানে, দেশের জন্য যারা প্রাণ দেবার শপথ করে তারা শক্ত হবে না তো কারা হবে ?

কিন্তু কি দেখছি আজ, এ ছবি কি মিথ্যে ? ছবিটি কি তাহলে ভুল ? এ শক্ত মানুষটির কান্নার দৃশ্যে তার ভেতরে যতটা অসহায়ত্ব পেয়েছি নিজেকে বিশ্বাস করাতে প্রথম কষ্ট হলেও, অবিশ্বাস করনেনি সেই ফটোগ্রাফার, যিনি বাস্তবতায় দাড়িয়ে এই ফটোটি তুলেছিলেন।

কেউ হয়ত প্রশ্ন করতে চাইবেন না, তিনি কেন কাঁদছেন ? কান্নার উপলটি যখন হারিয়ে যাওয়া একশ’র বেশী আর্মি অফিসারের করুণ মৃত্যুর উপলব্ধি, সামান্য এ সৈনিকের কঠিন সত্য তখন একটিই “আমাদের স্যার-রা আর কেউ বেঁচে নেই”

যাদের জন্য তিনি কাঁদছেন তারা হয়ত তার কেউ না, না কোন এক পরিবারের, না ভাই না রক্তের সম্পর্কের কেউ। শুধুমাত্র এলপিআর-পেনশন যাবার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত চাকুরী জীবনের কর্মেেত্রর সঙ্গী।

আমি যদি তার সামনে থাকার একটি সৌভাগ্য পেতাম, একবার তাকে মনে করিয়ে দেবার চেষ্টা করতাম “তুমি কাঁদছ কেন ? তুমি কার জন্য কাঁদছ ? যারা তোমাদের প্রভু ছিল তাদের জন্য ? যে একদিন তোমাকে উঠতে বসতে পশুর বাচ্চা বলে গালি দিয়েছিল? মাথা পেতে মেনেছিল ! সামান্য কোন অপরাধে কোয়ার্টার গার্ডে তিন দিন তিন রাত শেকল বাঁধা করে রেখেছিল, সেই অফিসারদের জন্য ? কিছু প্রাপ্য চাইতে গিয়ে ট্রান্সফার করে দেওয়া হল খাগড়াছড়িতে ! কি কথা বলছনা কেন ? এই তো !- এরকম আরো কত কিছু বলেছ তাদের অপরাধ, শুধু দোষই খুজেছ গুণ খোজনি ! ”
আজ কাঁদছ কেন ?
তোমাদের মত সেইসব জওয়ানরা তো তাদের শাস্তি দিয়েই দিয়েছে, এখন তো তাদের উল্লাসের দিন, কোথায় তারা, ডাক তাদের, মৃত পঁচা লাশের গন্ধে শকুনের পালে তাদেরকে উল্লাস করতে দাও, একবার দেখি তাদের সে হাস্যোজ্বল মুখগুলো, ওদের হাসতে দাও, বারবার হাসতে দাও, আমৃত্য হাসুক ওরা, উল্লাসে থাকুক !

..........................

“আমাদেরকে গালি দিয়েছেন, কোয়ার্টার গার্ডে রেখেছেন, ট্রান্সফার করেছেন, লাথি দিয়েছেন - তবুও তো আমরা সব মেনে নিয়েছি, আমরা তো সাধারন সৈনিক ছিলাম, আমাদের যোগ্যতায় আমাদের এ পরিচয়, কিন্তু, এমন মৃত্যু তো চাইনি। যে অস্ত্রের প্রশিণ পেয়েছি শত্র“র দিকে ট্রিগার চাপব বলে, যে কমান্ডো জাম্প, অ্যাকশন, বোয়েনেটের আঘাত তা তো নিজেদের শরীরে বিধতে চাইনি”

আমি নিরুত্তর থাকি ছবির দিকে তাকিয়ে, ছবির কান্নার অসহায়ত্ব আমাকে গ্রাস করলেও আবেগ দূর্বল আমি নই, , , , -তাই কেউ যেমন আমাকে বুঝতে পারেনা, খুব সহজেই তেমনি প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলি।

ঠিক তেমনি এ ছবিটি উল্টে ফেললেই একদিন ঠিকই হারিয়ে যাবে আবার এ স্মৃতি ! প্রশ্নযুক্ত হয় বাক্যটি ?
সত্যি কি হারাবে ?
না কি, ! ২৫ ফেব্র“য়ারী আমাদের জীবনে জাতীয় শোকের উপলক্ষ হয়েই রইবে ?



প্রসঙ্গ : (২৫ফেব্রুয়ারী'০৯- এর বিডিআর সদর দপ্তরে নারকীয় হত্যাকান্ড)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/28918229 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/28918229 2009-03-01 00:36:33
সাতক্ষীরায় গোলাগুলি শুরু - বিডিআর সদস্য অস্ত্রসজ্জিত রাস্তায় এখন, বেনাপোল বর্ডার এখনো শান্ত সব দোকান পাট রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ....
আতংকিত এলাকাবাসী

বেনাপোল - বর্ডারের খবার নেয়ার চেষ্টা করছি


আপডেট : ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সকাল ১১:১৩

যশোরের প্রধান ঝুমঝুমপুর বিডিআর ক্যাম্প
এবং
দেশের প্রধান স্থল বন্দর বেনাপোল বর্ডার এখনও পর্যন্ত শান্


আপডেট : ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সকাল ১২:১০

যশোর রাইফেলস্ বিদ্রোহ শুরু করেছে ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/28916666 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/28916666 2009-02-26 10:31:11
আর্মি বনাম বিডিআর; তার মাঝে সিভিলিয়ান
এদিকে তাদের হেডকোয়ার্টের ভেতর থেকে আর্মি ইউনিটগুলো আজ রাতেই সরিয়ে নেবার জন্য বারবার মাইকিং করছেন বিডিআর দলের সদস্যরা।

আজ রাতটা ঢাকা সহ পুরো দেশের জন্য উৎকন্ঠার রাত, সাধারণ জনগণ খুবই উদ্বিগ্ন কি হতে যাচ্ছে, কি হচ্ছে বা হবে। বিডিআর দপ্তরের ভেতরে যারা আছে তাদেরও অবস্থা কি তা এখনও জানা যায়নি কিন্তু ভেতরে অফিসার, নন অফিসার অনেক ফ্যামিলিম্যান থাকেন তাদেরও বা অবস্থা কি ?

ভেতরে যে সকল আর্মি অফিসার ছিলেন তাদের জীবিত বা মৃতের খবর বেশ কয়েকবার প্রচার হলেও সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি।

আর বিডিআর সদস্যরা যে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, যা নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত তাদেরই বা কি খবর।

কিন্তু আমার কাছে বড় আশ্চর্য লাগে এত বড় সংস্থা'র এরকম অভ্যূথ্যান সেখানে সরকারী বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা কি ছিল ?

একটি বিষয় লক্ষ্যনীয়, এখানে বিডিআর সদস্যরা একতরফা-ভাবে গুলি চালিয়েছে, যে বহু সংখ্যক আর্মি অফিসার মারা গিয়েছেন তাদের সঠিক হিসাব এখনও পর্যন্ত কোন সংস্থায় দিতে পারছেনা। কিন্তু আর্মিকে যেভাবে মেধাশূণ্য করা হল তারই বা রিপ্লেসমেন্ট কি ? কারণ যারা মারা গিয়েছেন তাদের অধিকাংশই উর্ধ্বতন পদে কর্মরত ছিলেন, তাহলে একটি সংস্থার এত গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে যে এভাবে হত্যা করা হল তা কি পূর্ব পরিকল্পিত ছিলনা ? অনেক প্রশ্ন থেকে যায় ...

কিন্তু দেশের যে দুটি সংস্থার উপর দেশের অভ্যন্তরীন প্রধান নিরাপত্তার দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল সে দু্টি দলই এখন কিছুটা হলেও দূর্বল, বিশেষত এই ঘটনা দ্বারা। এই সুযোগ যেন থার্ড পার্টি কেউ না নিতে পারে সেদিকেও দেশ ও জাতিকে সতর্ক হতে হবে।

সংঘাতটি এমন একটি পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে যখন আর্মি বনাম বিডিআর ; প্রত্যাশা থাকবে সরকার যে ব্যবস্থাই নিক না কেন তার মাঝে মাঝে যেন সিভিলিয়ান জড়িয়ে না পড়ে। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/28916349 http://www.somewhereinblog.net/blog/prochettoblog/28916349 2009-02-25 20:10:40