কিছুকাল আগেও আমার ব্যক্তিগত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার বাইরে ছিলো এই শব্দটি, তবে খুব বেশীদিন তা স্থায়ী হয়নি। মার্কিন মুল্লুকে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকেই এই শব্দটি এত বেশী বার উচ্চারিত হয়েছে যে, এর মানে জানার আগ্রহকে আমি কোনভাবেই দমিয়ে রাখতে পারিনি। হামলার পরপরই মার্কিন কংগ্রেসে ইউ.এস প্যাট্রিয়ট এ্যাক্ট পাস হয়। আর সেখানেই মেলে আমার প্রশ্নের উত্তর, যেখানে সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এভাবে: ...the gathering of intelligence information on potential terrorist targets, the solicitation of funds for a terrorist organisation or the solicitation of others to undertake acts of terrorism. Those who provide knowing assistance to a person who is planning to perform such activities are defined as undertaking terrorist activities. Such assistance includes affording material support, including a safe house, transportation, communications, funds, transfer of funds or other material financial benefit, false documentation or identification, weapons (including chemical, biological, or radiological weapons), explosives, or training to perform the terrorist act. এবং যে কোন দেশ এ ধরনের কর্মকান্ড সমর্থন করে অথবা কোন প্রকার বাধা প্রদান করেনা তাকেই সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।
হামলার পর স্বাভাবিকভাবেই মার্কিন মুল্লুকের প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশের উপর নানা প্রকার চাপ চলে আসে, বিশেষ করে দেশের জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যর্থ একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি স্বদেশীদের কাছেই নিন্দিত হয়েছেন। আর তাই পৃথিবী থেকে সন্ত্রাসবাদ র্নিমূলের নামে নিজেই আর্বিভূত হয়েছেন সন্ত্রাসবাদীদের নেতা হিসেবে। খোঁড়া অজুহাতে যুদ্ধ শুরু করে হত্যা করেছেন অগণিত মানুষ। বোমা মেরে, সাধারণ মানুষ হত্যা করে তিনি কি প্রমাণ করতে চেয়েছেন? আফগানিস্তান ও ইরাকে নিহত সবগুলো মানুষের রক্তকে কলমের কালি বানিয়েও যদি তিনি তার স্বপক্ষে লিখে যুক্তি দাঁড় করাতে চেষ্টা করেন, তবুও যে কোন মানুষের(মার্কিনী নন) নিরপেক্ষ বিবেচনায় তাকে মানবাধিকার লংঙ্ঘনের অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দেয়া যায় অনায়াসে।
মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গিতে সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ইরাণ, যথাক্রমে সিরিয়া, লিবিয়া, কিউবা, উত্তর কোরিয়া ও সুদান। এসব দেশের কথা আমরা সবাই কম-বেশী জানি, তাই এসব দেশ নিয়ে আমি আলোচনায় যাচ্ছিনা। আসুন এবার দৃষ্টি ফেরানো যাক খোদ আমেরিকার দিকেই। পুরো ব্যাপারটা বুঝতে হলে আমাদেরকে একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। দৃষ্টি দেয়া যাক আমেরিকা-কিউবা সম্পর্কের দিকে। ১৯৫৯ সাল থেকে শুরু করে প্রায় ৭০'র দশকের শেষ পর্যন্ত(অফিসিয়ালি) আমেরিকা কিউবায় ছোট-বড় অনেকগুলো সন্ত্রাসী হামলার সাথে জড়িত ছিলো, যার মধ্যে Bay of Pigsদখল ও বিজারীকে দিয়ে ফিদেল কাস্ত্রোকে হত্যা পরিকল্পনার সাথে আমেরিকা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। ১৯৮৯ সালে সিনিয়ব বুশ, ফিদেল কাস্ত্রো বিরোধী ভয়ানক সন্ত্রাসী অরল্যান্ডো বোশকে আমেরিকার বিচার বিভাগ উপক্ষো করে ক্ষমা ঘোষণা করেন, যার বিরুদ্ধে ১৯৭৬ সালে কিউবার যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে বোমা হামলার মতো মারাত্মক অভিযোগ ছিলো, বলা হয়ে থাকে অরল্যান্ডোই ছিলো এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী। কাস্ত্রো বিরোধী সন্ত্রাসীদের আমেরিকার মদদ দেয়ার বিষয়গুলো আঁচ করতে পেরে কিউবার গোয়ন্দা দল পুরো সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কটিকে ভেঙ্গে দেয়। ১৯৯৮ সালে এফ.বি.আই-এর কয়েকজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাকে হাভানায় আমন্ত্রন জানানো হয় এবং সেখানে তাদেরকে কয়েক হাজার পাতার বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ ও বেশ কয়েক ঘন্টার ভিডিওচিত্র দেখানো হয়। যাতে কাস্ত্রো বিরোধী সন্ত্রাসীদের আমেরিকার প্রত্যক্ষ মদদ দেয়ার অভিযোগ সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। জবাবে এফ.বি.আই কিউবায় যারা এসব তথ্য-প্রমান সংগ্রহে সাহায্য করেছে তাদের গ্রেপ্তার করে আমেরিকায় নিয়ে এসে বিচারের সম্মুখীন করায়, যাতে বেশ কিছু কিউবান দোষী সাব্যস্ত হয়, এবং যাবজ্জ্বীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হয়, যারা এখনো এ শাস্তি ভোগ করছেন, এরা কিউবান ফাইভ নামে অধিক পরিচিত।
আমেরিকার মাটিতে নির্বিঘ্নে বসবাসকারী আর্ন্তজাতিক সন্ত্রাসীদের তালিকা নিতান্তই ছোট নয়, যার মধ্যে হাইতির প্রাক্তন আধা-সামরিক বাহিনীর নেতা ইমানুয়েল কনসটান্ট ও রয়েছেন, যিনি মূলত টোটো নামেই পরিচিত। ৯০'র দশকে তার বাহিনীই সেদেশে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড শুরু করে এবং পরবর্তীতে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট র্বাট্রান্ড আর্তিসদতিদি কে ক্ষমতাচ্যুত করে। পরবর্তীতে হাইতি টোটোকে সেদেশে পাঠানোর প্রস্তাব পাঠালেও আমেরিকা তাকে ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করে,যার বিরুদ্ধে ৪-৫ হাজার মানুষ হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। যতদূর জানা যায়, টোটো এখনো নিউ ইয়র্ক শহরের কুইন্সে বসবাস করছেন।
এতো গেল কয়েক দশক আগের ঘটনা। আমেরিকা অতি সম্প্রতি বিন লাদেনকে(আর্ন্তজাতিক সন্ত্রাসী?) আশ্রয় দেয়ার অভিযোগে আফগানিস্তানে আর লাদেনকে সহযোগিতা ও ব্যাপক বিধ্বংসী মারনাস্ত্র(নিউক্লিয়ার, কেমিক্যাল ও বায়োলজিকাল)তৈরী ও মওজুদের অভিযোগে ইরাকে আক্রমন করে। যদিও দুটো যুদ্ধেই স্পষ্টভাবে আমেরিকার অভিযোগ ভুল প্রমাণিত হয়েছে এবং তার প্রমাণ এই বিশ্ববাসী দেখেছে ও জেনেছে।
একটা কথা আবারও মনে করিয়ে দিতে চাই, বিন লাদেন এবং সাদ্দাম হোসেন এ দু'জনই আমেরিকার সৃষ্টি। ব্যবসায়ী থেকে আজকের সন্ত্রাসী লাদেন এবং সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী থেকে কিছুদিন আগের সাদ্দাম এর উত্থান কিভাবে হলো? এবং কিভাবে তাদের ভাগ্য আমেরিকা কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয়েছে এবং হচ্ছে তা নতুন করে বলার অবকাশ নেই। সোভিয়েত ইউনিয়নকে আফগানিস্তান থেকে সরানোর জন্যে এই তালেবান আর লাদেনকে ব্যবহার করেছে আমেরিকা তার নিজ প্রয়োজনে, সাদ্দামকে ব্যবহার করা হয়েছে ইরাণ ও কুয়েত আক্রমণ করার জন্যে। একজন সন্ত্রাসী ছাড়া এত জটিল আর সূক্ষ্ম কাজ কোন প্রকৃত গণতন্ত্রমনা রাষ্ট্রনায়ক আজ পর্যন্ত করতে পেরেছেন কিনা তা আমার জানা নেই। এ দৃষ্টিকোণ থেকে সিনিয়র বুশকে একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক না বলে উপায় নেই!
আর জুনিয়র বুশ? র্নিবুদ্ধিতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি অনেকবার, নিজ দেশেও তিনি বহুল সমালোচিত। ছিলেন স্পোর্টস ক্লাবের ম্যানেজার, হয়েছেন প্রেসিডেন্ট। বলা চলে অনেকটাই আঙুল ফুলে কলাগাছ, যদিও আমেরিকাতে বুশ পরিবারের প্রভাব-প্রতিপত্তি আরো অনেক আগে থেকেই। কূটনীতিতে বাবার যোগ্য উত্তরসূরী না হতে পারলেও যুদ্ধবাজ নেতার তালিকায় তিনি তার বাবার চেয়ে অন্তত এক ধাপ উপরেই আছেন সে কথা বলা যায় নির্দ্বিধায়। বার বার যুদ্ধ করে নিজ দেশের অর্থনীতির বারোটা বাজিয়েছেন, তবুও নতুন করে আবার যুদ্ধ শুরু করতে যেন তার আর তর সইছেনা, সম্ভাব্য তালিকায় বোধ করি ইরাণ সবার আগে এগিয়ে, কারণ বুশ প্রশাসনের চোখে ইরাণ একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র।
এখন প্রশ্ন হলো, প্রকৃত অর্থে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র কি? যদি আমেরিকা প্রদত্ত সংজ্ঞাকেই আমরা মেনে নিই, তবে কি আমেরিকাকে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায় না? যদি তাই হয়, তবে সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের সংজ্ঞা আমেরিকার জন্যে একটি আত্মঘাতী সংজ্ঞা বৈ আর কিছু নয়।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই নভেম্বর, ২০০৭ সকাল ১০:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



