somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইরাক যুদ্ধের পাঁচ বছরঃ আমেরিকার খতিয়ান

২২ শে মার্চ, ২০০৮ সকাল ১০:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গত ২০শে মার্চ পালিত হয়ে গেল আমেরিকার ইরাক যুদ্ধের পাঁচ বছর। আমেরিকার অন্যান্য স্টেটের মতো নিউ ইয়র্কেও দিনটি পালিত হয়েছে ইরাক যুদ্ধে নিহত সৈনিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, বড় বড় নেতাদের কিছু গত বাঁধা বুলি আর যুদ্ধ-বিরোধী মানুষের মানববন্ধনের মধ্য দিয়ে। ইতিমধ্যে যারা তাদের প্রিয়জন হারিয়েছেন, আর যারা এখনো ইরাকে অবস্থান করছেন তাদের পরিবার আবারও দাবী জানিয়েছেন অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করে সব সৈন্যদের দেশে ফিরিয়ে আনার। কিন্তু সেদিকে তাকিয়ে দেখার মতো সময় নেই বুশ প্রশাসনের।

আজ যুদ্ধের পাঁচ বছর পরে অনেক মার্কিনিরাই প্রশ্ন তুলেছেন এই যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে, কিন্তু প্রশ্ন হলো, যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন আরো আগে হয়নি কেন? যখন মার্কিন বাহিনী ইরাকে কোন ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র খুঁজে পায়নি, যখন সাদ্দামকে বিচারের নামে একটা নাটক মঞ্চস্থ হলো? আজ যখন মার্কিন অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ছে, দেশের আবাসন ব্যবসায়ীরা ক্রমাগত আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, বাণিজ্যিক বাংকগুলোর ঋণগ্রহীতারা ঋণের টাকা দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন, যখন চীনের মতো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হিসেবে ডলারের পরিবর্তে পাউন্ড অথবা ইউরোর কথা চিন্তা করছে তখন সবাই সোচ্চার হচ্ছেন এ ব্যাপারে, বড় বড় বুলি আওড়াচ্ছেন যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে। ইরাক যুদ্ধের বিষয়টি এখানেই থেমে নেই। আমেরিকাতে আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীরা ইরাক যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টিকে তাদের নির্বাচনী এজেন্ডা হিসেবেও ব্যবহার করছেন। এক নেতা সন্ত্রাসীদের হাত থেকে দেশের জনগণকে বাঁচাতে প্রায় এক সাথে দু’টো যুদ্ধ শুরু করলেন, আর আরেক নেতাই সে যুদ্ধ বন্ধের লেবেল গায়ে লাগিয়ে একের পর এক স্টেট থেকে প্রাক-নির্বাচনী যুদ্ধে জয়ী হয়ে চলেছেন। অনেকে তাকেই আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্টও বলতে শুরু করে দিয়েছেন। বোধ করি একেই বলে রাজনীতি!?

প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে ইরাক যুদ্ধ থেকে আমেরিকার প্রাপ্তি কি? প্রশ্নটার উত্তর এক বাক্যে দেওয়া খুব সহজ নয়, তবে এ নিয়ে কিছুটা অর্থনৈতিক আলোচনা হলে হয়তো এ প্রশ্নের একটা উত্তর খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।

ইরাক যুদ্ধ বাবদ বুশ প্রশাসনের প্রস্তাবিত খরচের পরিমাণ ছিলো ৫০-৬০ বিলিয়ন ডলার, কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। প্রতি মাসেই খরচ হয়েছে ১২ বিলিয়ন ডলার (তথ্যসূত্র: এপি), সে অনুযায়ী গত পাঁচ বছরে ৭২০ বিলিয়ন ডলার খরচ হওয়ার কথা, কিন্তু বুশ প্রশাসন বলছে ভিন্ন কথা, তাদের হিসেব অনুযায়ী এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৫০০-৬০০ বিলিয়ন ডলার। এই টাকার বেশীরভাগই এসেছে সরকারকে প্রদত্ত আমেরিকান জনগনের আয়কর থেকে। কিন্তুু এক জনমত জরিপে দেখা যায় শতকরা ৭৩ ভাগ আমেরিকানই চাননা ইরাক যুদ্ধে তাদের প্রদত্ত আয়করের ১টি সেন্টও ব্যয় করা হোক। অন্যদিকে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ ও কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ফ্যাকাল্টি মেম্বার “জোসেফ স্টিগলিজ” এর মতে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলতে থাকলে তার খরচ দাঁড়াবে ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। অথচ প্রেসিডেন্ট বুশ ২০০৮ ও ২০০৯ সালের জন্যে ফেডারেল বাজেট ঘোষণা করেছেন যথাক্রমে ২.৯ ও ৩.১ ট্রিলিয়ন ডলার, সুতরাং আমেরিকার মতো অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশের পক্ষেও এত বড় আর্থিক ক্ষতি কাঁটিয়ে উঠতেও বেশ সময় লাগবে তা খুব সহজেই অনুমান করা যায়। আমেরিকায় চলমান অর্থনৈতিক সমস্যার পেছনে ইরাক যুদ্ধের ব্যয়ভারকেও অনেকাংশে দায়ী করেছেন খোদ মার্কিন অর্থনীতিবিদরাও। তারপরেও থেমে নেই বুশ প্রশাসন। এখনো তারা নানা ধরনের লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে নতুন করে সৈন্য সংগ্রহ করছেন। মাত্র কিছুদিন আগেই এ লক্ষ্যে নিউ ইয়র্কে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণ চালানো হয়েছে, আমি নিজেও তা দেখেছি।

আমেরিকার ইরাক যুদ্ধের প্রথম দিন থেকে শুরু করে ১৬ই মার্চ, ২০০৮ পর্যন্ত ৩,৯৮৮ জন মার্কিন সৈন্য নিহত হয়েছেন, যাদের প্রত্যেকের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হবে ৫ লাখ মার্কিন ডলার। সে হিসেবে সর্বমোট ৩,৯৮৮ জন মার্কিন সৈন্যের পরিবারের পেছনে খরচ হবে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। অপর দিকে বিগত ৫ বছরে মার্কিন আগ্রাসনে নিহত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ইরাকি, যার অনেকেই ছিলেন পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, যাদের মৃত্যুতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে অসংখ্য ইরাকি পরিবার কিন্তু তাদেরকে আর্থিকভাবে সহয়ায়তা করার কোন পরিকল্পনাই কেউ গ্রহণ করেনি।

ব্যাপক বিধ্বংসী মারণাস্ত্র ও স্বৈরাচারী সাদ্দামকে সরানোর যে ঢোল পিটিয়ে তিনি যুদ্ধের আয়োজন করেছিলেন সেটা যে ভুল ছিলো তাও আজ পৃথিবীর সবাই জানতে পেরেছেন। মার্কিন সৈন্যরা ইরাকে গিয়ে ব্যাপক বিধ্বংসী মারণাস্ত্রের টিকিটাও খুঁজে পাননি। সাদ্দাম হোসেনকেও ইতিমধ্যে তথাকথিত বিচারের নামে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে, যা কেবলই প্রহসন, তবুও তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সাধারণ মানুষ তা মেনে নিয়েছে। মারণাস্ত্র আর সাদ্দামই যদি যুদ্ধের কারণ হয় তাহলে এখনো প্রতিমাসে ১২ বিলিয়ন ডলার খরচ করে ইরাকে আমেরিকান সৈন্য রাখার কারণ কি হতে পারে? উত্তরটাও খুব সহজ, ব্যাপক বিধ্বংসী মারণাস্ত্র ধ্বংস বা সাদ্দামকে সরিয়ে ইরাকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নয় বরং ইরাকি তেলের উপর আমেরিকার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণকারী একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক মুনাফা বৃদ্ধি (যার সাথে বুশ পরিবারের ব্যবসা জড়িত), একটি তেল কোম্পানীর ব্যবসায়িক সুবিধা বৃদ্ধি (যার প্রতিষ্ঠাতা হলেন সিনিয়র বুশ) ও ইরাকে এমন একটা সরকার গঠন করে দেওয়া যারা কিনা পরবর্তীতে আমেরিকার হাতের পুতুর হিসেবে কাজ করবে।

ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেঁড়েই চলেছে, আর খোদ আমেরিকাতেও প্রতিদিনই বাড়ছে তেলের চাহিদা। বিশ্বের অন্যতম তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো মধ্যে সৌদি আরব, কুয়েত, ইরান ও ভেনিজুয়েলা অন্যতম। যাদের মধ্যে শেষ দুটি দেশের সাথে মার্কিন সরকারের কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো নয়, সুতরাং আমেরিকা তার ভবিষ্যত তেলের চাহিদা মেটাতে এমন একটি দেশ চাচ্ছে যেখান থেকে সে বিপুল পরিমাণে তেল আমদানি করতে পারবে বা ঐ দেশের তেল খনিগুলোর উপর প্রাধান্য বিস্তার করতে পারবে, পরিবেশ পরিস্থিতিতে তাই ইরাকই ছিলো সম্ভাব্য লক্ষ্য। এ ছাড়া ইরাক যুদ্ধ এখনো টিকিয়ে রাখার কোন কারণ খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন।
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×