somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিপ্রতীপ ভালবাসা...(২য় পর্ব)

০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১১:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অনিন্দ্য-উপাখ্যান


অনিন্দ্য আজ অনেকদিন পর ওদের ব্যালকনিতে, ওর ছোট্ট বাগানটাতে ঢুকল। ক’দিন পরই ওর ইয়ার ফাইনাল এক্সাম। ইদানিং তাই পড়াশোনার বড্ড চাপ যাচ্ছে। প্রিয় ফুল গাছগুলোতে পানি দেবার সময়ও হয় না। ভাসির্টি থেকে ফিরতে দিন পার হয়ে যায়। আগে কত ভেবেছিলো ও, অনার্সের জীবনে বুঝিবা অফুরন্ত অবসর। এখন দেখছে উল্টোটা। প্রথমদিন সিলেবাস দেখে তো ওর হার্টফেল করার মত অবস্থা। আর ফার্স্ট ইয়ারটা যেন হুট করেই চলে গেল। - ‘এই তো আর মাত্র তিনটা বছর-’ মনে মনে বল্ল ও- ‘তারপরই তো এম বি এ’র জন্য অষ্ট্রেলিয়ায় চলে যাচ্ছি।’ কারন লোপা আপু বলতে গেলে শর্তই দিয়ে দিয়েছেন ওকে। অনিন্দ্য একদিন কথায় কথায় জানতে চাইল- ‘কেমন ছেলে পছন্দ আপনার?’ Ñ ‘অষ্ট্রেলিয়া থেকে সদ্য এম বি এ কমপ্লিট করা মুসলমান একটা হ্যান্ডসাম ছেলে পারিবারিকভাবে আমাকে বিয়ের প্রস্তাব করবে।’ একটু ভেবে নিয়ে এক নিঃশ্বাসে বল্ল লোপা আপু। সেই থেকে ঐ কথাটা ওর মাথায় পাকাপাকিভাবে গেঁথে আছে। ও এটাকে অনেকটা চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছে। সে প্রায় দু’বছর আগের কথা। কত শখ ছিলো ঢাকা ইউনোভাসির্টিতে ইংরেজীতে পড়ার। চান্সও পেয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু আপুর কথা রাখতে গিয়ে ওর ঐ শখটাকে ও জলাঞ্জলি দিয়েছে। হুট করেই নর্থ সাউথ ইউনোভাসির্টিতে বিবিএ ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়ে গেল। ওর প্ল্যানের কথা এখনও বাসায় বলা হয়নি। বাবা -মা’র একমাত্র ছেলে ও, তাঁরা ওকে, বিশেষ করে ওর মাতো ওকে কিছুতেই দেশের বাইরে যেতে দিতে চাইবেন না। আশুলিয়ায় বড় খালার বাসায়ই একা যেতে দিতে তার কত আপত্তি! আর তো অষ্ট্রেলিয়া! তবুও ও যাবে, যে করেই হোক, আপুকে ও জয় করতে বদ্ধ পরিকর।
কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে থাকতে হঠাৎ একদিন রং নাম্বারে আপুর সাথে পরিচয়। সেই থেকে শুরু। ওর এক বছরের সিনিয়র। ঢাকা মেডিকেল কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে। যদিও ও তাকে বহুবার আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছে অমব ফড়বংহ’ঃ সধঃঃবৎ. মজার ব্যাপার হলো, ওদের দেখা হয়েছে মাত্র মাসখানেক আগে। অবশ্য এর আগে ও বহুবার দেখা করতে চেয়েছে এবং প্রতিবারই আপু তা বিভিন্ন অজুহাতে এড়িয়ে গেছে। শেষে একদিন ভাল করে চেপে ধরল ও।
লোপা আপুই যেন ওর জীবনের সর্বপ্রথম এবং সর্বশেষ অধ্যায়। কিভাবে যে ও সারাদিন তার কথা চিন্তা করে ও নিজেও জানে না। যেদিন থেকে ও জানল হৃত্বিক তার ফেবারিট হিরো, সেদিন থেকেই হৃত্বিকের মত বডি আর হেয়ার স্টাইল করার জন্য ও উঠে পড়ে লেগেছে। আপু ওকে একদিন কি প্রসঙ্গে যেন বলেছিলো -‘জানো, মাঝে মাঝে আমি পাগলের মত পড়ি। কখন রাত হয়, কখন দিন হয়, খেয়ালই থাকে না।’ ব্যস্, আর যায় কোথায়? - ‘আপু পারলে আমি পারব না কেন?’- এ কথা ভেবে সেদিনই ও সিদ্ধাšত নিল যে ও-ও রাত-দিন পড়বে। তবে বেশী দিন দেখতে হয়নি, তিন দিন পরই ও হাল ছেড়ে দিলো -উফ্, আপু যে কি করে পারে?’- বলে। এ তিন দিনে ওর অবস্থা হালুয়া টাইট। দু চোখের নীচে কালচে দাগ পড়ে গেছে, চোখ কোটরের ভেতর চলে গেছে। আবলুশ কাঠের চেয়ারে বসে থেকে দিনের অধিকাংশ সময় কাটানোর দরুন কোমরের হাড্ডিগুলোয় যে চিনচিনে ব্যথাটার জন্ম হয়েছিলো, সেটা ক্রমেই তার রাজত্ব বিস্তার করে অনিন্দ্যর গোটা শরীরে ছড়িয়ে পড়তে চাইছিলো। সপ্তাহখানেক বিছানায় শুয়ে থেকে আর ডজনখানেক ঔষধ-পত্র গিলে শেষে রক্ষে। এসব কথা আপুকে বলাতে সে তো বাধ ভাঙ্গা হাসিতে অনিন্দ্যকে ভাসিয়ে দিল। কিছুদিন আগে লোপা আপু অনিন্দ্যকে দলছুটের একটা অডিও ক্যাসেট গিফট্ করেছে। নাম:- ‘বায়োস্কোপ’। মিউজিক কম্পোজিশন সহ সেটার প্রায় প্রত্যেকটা গান ওর মুখস্থ। বাপ্পা মজুমদার হলো লোপার প্রিয় সিঙ্গারদের মধ্যে একজন। প্রতিবার গান শোনে আর খাপের গায়ের লেখাটা পড়ে - ‘‘অনিন্দ্যকে লোপা আপু।” ছোট্ট এই বাক্যটা খুব ছোট্ট করেই লেখা হয়েছে। আম্মুর প্রশ্নবানে র্জজরিত হবার আশঙ্কা না থাকলে এটাকেই ও বড় করে বাঁধিয়ে ওর ঘরে টাঙ্গিয়ে রাখত। অবশ্য তার আগে ও বাক্যটার শেষে ‘ভালবাসে’ শব্দটা যুক্ত করে দিতো। গত রাতে হঠাৎ ও একটা কবিতা লিখে বসল। ওর কখনো এমন হয় না, গল্প-কবিতার প্রতি ওর ভীষন এর্লাজি। কিন্তু ইদানিং যে ওর কি হয়েছে; রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ আর জীবনানন্দের কবিতাগুচ্ছ কোন্ এক বন্ধুর কাছ থেকে ধার করে এনে সে দু’টো এখন প্রায় নিয়মিত পড়ছে। গতকাল রাতে ও তো একটা জলজ্যান্ত কবিতাই লিখে বসল। কবিতাটির বিশেষত্ব হচ্ছে, প্রতি লাইনের প্রথম অক্ষরগুলো একসাথে পরপর সাজালে লোপা আপুর পুরো নাম তৈরী হয়ে যায়। সারাদিন ও যা কিছু করে, আপুকে জানানোর জন্য পাগল হয়ে যায়। এইতো সেদিন, আপুকে ফোন করল ও Ñ
- ‘হ্যালো, আপু কেমন আছেন? ’
- কে অনিন্দ্য? আমি ভাল, তুমি?
- হ্যাঁ,ভাল আাছি, ইয়ে...আপু, আপনার একটু সময় হবে?
- কেন?
- একটু জরুরী কথা ছিল। হবে?
- কতক্ষন লাগবে?
- এই...ধরেন দুই মিনিট।
- হ্যাঁ, দুই মিনিট সময় হবে। বলো।
- ‘আপু আমার গোল্ড ফিশটা না গত রাতে একসাথে অনেকগুলো ডিম পেড়েছে।’ মহা উৎসাহে বলে যায় অনিন্দ্য। নতুবা - ‘আমার নতুন কেনা গোলাপের গাছটায় টকটকে লাল একটা ফুল ফুটেছে!’ কিন্তু প্রায় প্রতিবারই তিনি হতাশ গলায় বলে- ‘এই তোমার জরুরী কথা?’ মাঝে মাঝে এও বলে - ‘শোন অনিন্দ্য, ক্লাসের অনেক পড়া জমে আছে। আমি এখন পড়তে বসব। আর কিছু বলবে?’ নিজের অনীহা প্রকাশের জন্য সৌজন্যতা রক্ষা করে এরচে স্পষ্ট ভাবে আর হয়ত বলা যায় না। অনিন্দ্যর বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। আপুকে নিয়ে এবারের ভ্যালেনটাইনস্ ডে’র পোগ্রামটা ফোনে ঠিক করতে হবে। মনে মনে ও পুরো ঘটনাটা সাজাল।
-হ্যালো লোপা, আমি অনি। (কল্পনায় ভালবাসার মানুষকে আপু বলা যায় না)
- অনি! কেমন আছো লক্ষী?’ উৎকন্ঠিত হয়ে বলবে লোপা। এতদিন পর?’ এবার ভীষন অভিমানি স্বর।
-এতদিন কই? পরশুও তো করলাম...
-তুমি কি জান এই দু দিন আমি তোমাকে কিভাবে চেয়েছি? তোমার হার্ট তো নিরেট গ্রানাইট দিয়ে তৈরী। তোমার তো সেটা বোঝার কথা নয়’ অভিমান যেন ওর কন্ঠস্বও থেকে ঝওে ঝওে পড়ছে।
-তা হয়ত ঠিক বলেছ, তাইতো তোমায় ভালবেসেছি। তোমার নরম প্রেমে আমার হƒদয় তুলো হবে।
-হয়েছে আর পটাতে হবে না। কাল ফোন করনি কেন সেটা আগে বল।
-ক্লাসের একটা এ্যাসাইনমেন্ট ছিল...মিনমিনে গলায় বলবে, যেন লোপা বুঝতে পাওে যে সে তার অপরাধ স্বীকার করছে।
-আমাকে বাদ দিয়ে কিসের এ্যাসাইনমেন্ট তোমার?’ এ পর্যায়ে এসে লোপা কপট রেগে উঠবে ’আগে আমি তারপর তোমার অন্যসব কিছু।’ এ পর্যায়ে আবার ও অভিমানি।
-আচ্ছা ঠিক আছে, এখন তো ফোন করলাম। শোন, জরুরী কথা আছে তোমার সাথে...
-তোমার জরুরী কথা পরে রাখ, আগে বল ভ্যালেনটাইনস্ ডে তে আমরা কোথায় যাচ্ছি? তারপর তোমার জরুরী কথা ’ অনিন্দ্যকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বলে উঠল লোপা।
-আওে এটা বলার জন্যই তো ফোন করেছি, কিন্তু সে চান্সটাই তো পেলাম না। মন দিয়ে শোন, একটা লং ড্রাইভে গেলে কেমন হয়?
-মানে?
-ধর যদি কান্ট্রি সাইডে যাই! এই ধর, এই গ্যানজ্যাইমা শহর ছেড়ে অনেক দূরে...মফস্বল কোন শহরে, অথবা আরো দূরে, গ্রামের কোন নির্জনতায়!
-সপ্ন দেখাচ্ছ?
-মোটেই না। সে সাহস আমার নেই। সিরিয়াসলি বলছি। যাবে?
-যাব মানে! তোমার সাথে আমি সৌর জগতের যে কোন জায়গায় যেতে রাজি।
-জাহান্নামেও?
-ধ্যাৎ, সব সময় ফাইজলামি!
-না মানে...ওটা সৌর জগতের বাইরে তো...তাই জিজ্ঞেস করলাম আরকি। যা হোক, আপাতত: সৌর জগতের বাইরে কোথাও যাচ্ছি না, তুমি চিন্তামুক্ত থাকতে পার।
-ফাইজলামি এখনও শেষ হল না?
-ফাইজলামির সন্ধি বিচ্ছেদ করতে পারলে আর করব না...
-ফাজিল যোগ তুমি।
-হয়নি...সুতরাং ফাইজলামি থামবে না।
-আরে বাবা অনেক হয়েছে, এবার দয়াকরে বল না কি ঠিক করেছ? আমাকে কৌতুহলে রেখে খুব মজা পাচ্ছ, তাই না?
-তা তো একটু পাচ্ছিই! আচ্ছা, যশোর গেলে কেমন হয় বলো তো? শুনেছি এসময় ওখানকার প্রকৃতি নাকি অপরুপ রুপ ধারন করে। শাইয়াজদের পিকআপটা ওদের বিজনেস পারপাসে ভ্যালেনটাইনস্ ডে’র দিন ভোর বেলায় যশোর সদরের দিকে রওনা দিবে। দুপুর নাগাদ পৌঁছে যাবে। সেখানে আমাদের এক দূর সর্ম্পকের আতœীয়ের বাসায় লাঞ্চটা সেরে নেব। তাদের বাড়ির পাশে গোলাপের চাষ হয়। কিভাবে সেটা করা হয় আমরা তা চাক্ষুস দেখব। দেখতে দেখতে বোর লাগলে গাছ থেকে আম,বরই আর পেয়ারা পেড়ে খাব। তাদেও এই তিনটা গাছে ঝাকরা ফল ধরে। এরপর সারাদিন আশেপাশে টো টো কওে ঘুরে বেড়াব। গ্রামবাসী আমাদের দেখে ফিসফাস করবে। আমরা তাতে বিরক্ত না হয়ে পুরো ব্যাপারটা উপভোগ করার চেষ্টা করব। দূরে ঘুরতে গেলে হেলিকপ্টার নেব...
-হেলিকপ্টার নেব মানে?
-ও তুমি তো জান না, যশোরে ভ্যানকে হেলিকপ্টার বলে।
-বাহ, মজা তে!
-হু,একেক দেশের একেক বুলি। এটা ছাড়াও... যেমন আমরা যেটাকে মাইক্রবাস বলি, অষ্ট্রেলিয়ায় ঐ একই জিনিসটাকে নাকি ভ্যান বলা হয়। যা বলছিলাম, রিজিকে যদি ওখানকার ডিনারও থাকে, তাহলে সে ডিনার খেয়ে আমরা রাত সাতটার নাইটকোচ ধরব। কপাল ভাল থাকলে মাঝ রাতের আগেই ঢাকা পৌঁছে যাব।
-তুমি দেখি সব গুছিয়ে রেখেছো!’ অবাক কন্ঠে বলবে লোপা।
-হু, । তবে পুরোটা এখনো গুছিয়ে উঠতে পারিনি। আমার ক্যামেরা আর কাপড় চোপড় গুলো শুধু গুছানো বাকি। সিডিউলটা কেমন হয়েছে বলতো!
-একদম ফাটাফাটি! যাকে বলে অল প্র“ফ প্লান।
-হু, এখন সবকিছু প্লান মত হলেই হয়! দেখি, আংকেলকে বলে আমাদের জন্য পিকআপের ছাদে কোন ব্যবস্থা করা যায় কিনা। শোন, তুমি খুব নীল রঙ্গের একটা শাড়ী পরবে। আর আমি কি পরব লোপা?
-তুমি গাঢ় সবুজ রঙ্গের একটা টি শার্ট পরবে। আকাশের রং আর প্রকৃতির রঙ্গে আমরা দুজন একাকার হয়ে যাব।
-কিন্তু নীল আকাশ সবুজ প্রকৃতির কত দূরে থাকে জানোতো?
-দূর! রোমান্টিক কথা শুরু করলেই তুমি শুধু ফোড়ন কাটো। এটা কি ঠিক?’ মন খারাপ করে বল্ল লোপা।
-একদম না।’ অনিন্দ্য স্বীকার করল। দাড়াও, ফোড়ন কাটার পায়শ্চিত্ত করছি। আমি তোমাকে খুব রোমান্টিক কিছু কথা শোনাচ্ছি। শোধ-বোধ। আমি খুব ছোট্ট একটা ঘটনা বলব। খুব মনো যোগ দিয়ে শুনবে এবং আমি বলার সাথে সাথে তুমি ঘটনাটা কল্পনা করবে। ঠিক আছে?
-ঠিক আছে।’ সায় দিল লোপা।
-রাতের আধার কেঁটে বিশাল একটা যান তীব্র গতিতে ছুটে যাচ্ছে। পেছন দিককার একটা সিটে তুমি আমি পাশাপাশি, তুমি আমার কাঁেধ মাথা রেখে আছো, আর আমার মাথার একপাশ দিয়ে তোমার মাথাটা আমি চেপে ধরে আছি। বাইওে তখন চোখ ধাঁধানো জোছনা। গাছ –পালা, বন জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে ফালি ফালি জোছনা একটু পরপর অত্যন্ত অল্প সময়ের জন্য আমাদের গায়ের উপর আছড়ে পড়ছে। তুমি তখন ঘুমোচ্ছো। তোমার ফর্সা গালের উপর দুধসাদা জোছনা ঘনঘন পড়াতে তোমাকে অদ্ভুত মায়াময় দেখাচ্ছে। মায়াবতীকে তো মায়া দেয়া উচিৎ। তাই আমি তখন আমার ঁেঠাট দুটো তোমার ঠোঁটদুটোর খুব কাছে নিয়ে এলাম। গাড়ার প্লেয়ারে বাজছে ’এস নীপ বনে ছায়াবীথী তলে, এস কর স্নান নব ধারা জলে।’
-উফ্, অনি আমি আর পারছি না, তুমি এত লোভ দেখাতে পার! ভ্যালেনটাইনস্ ডে’র এখনো পাঁচ পাঁচটা দিন বাকি। এই পাচঁ রাতের ঘুম তুমি নষ্ট করে দিলে।’ খুব আস্তে আস্তে কথাগুলো বল্ল লোপা।
-তাই? তাহলে আমি সত্যিই খুব দুখি:ত। লোপা শোন, আমার না কেমন গা সুড়সুড় করছে, তোমার সাথে দীর্ঘ সময় পাশাপাশি বসব ভেবে, তাও আবার নাইট কোচে!
-কে বলেছে তোমাকে পাশাপাশি বসব?’ রসিকতা করে বল্ল লোপা, ’শোন, আমি বসব মেয়েদের সিটে,একেবারে সামনের দিকে। আর তুমি ছেলেদের সিটে, পেছনের দিকে। খুব বেশী কিছু হলে দূর থেকে আমাদের খানিকটা চোখাচোখি...মাঝে মাঝে হলেও হতে পারে, এর বেশী কিছু না। সুতরাং, তোমার গা সুড়সুড় করার কিছু নেই।’ প্রচন্ড হাসিতে ফেটে পড়ল দুজনে।

লোপ কে নিয়ে এমন সপ্ন ও প্রায়ই দেখে। আরো কত শত সপ্ন ওর মনে বাসা বেঁধে আছে। তার মধ্যে একটা হল অনেকটা সাংসারিক টাইপের সপ্ন । ছোট্ট একটা নদার তীরে ছোট্ট একটা ডুপলেক্স বাড়ী হবে ওদের। বাড়ীটার চারপাশে নানাজাতের ফুলের বাগান থাকবে। আর সে বাড়ির ছাদে থাকবে অতি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটা টেলিস্কোপ। রাতে দুজনে মিলে মহাকাশের নীহারিকা দেখবে। আর থাকবে ধবধবে সাদা রংয়ের বেশ বড় সাইজের একটা দোলনা। নীহারিকা দেখতে দেখতে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়বে তখন দুজনে দুলবে। -‘আচছা, দোলনাটা বাগানে থাকলে ভাল হয় নাকি ছাদে?’ - হঠাৎ প্রশ্নটা ওর মনে উঁকি দিল - ‘আপুকে একদিন জিজ্ঞেস করতে হবে।’ মনে মনে বল্ল ও। এমন সময় আম্মুর গলা শোনা গেল - ‘কি রে অনিন্দ্য, কি হল তোর? ফোন ধরছিস না কেন?’ রান্নাঘর থেকে বল্ল সে। ও চিন্তায় বিভোর ছিলো। আর এদিকে ফোন বেজেই চলেছে।
- হ্যালো, স্লামালাইকুম, কে বলছেন?
- ‘ভাইয়া আমি জুলিয়া।’ অনেকক্ষন পর ও প্রান্ত হতে শোনা গেল।
- ও জুলিয়া, তা কি খবর? কেমন আছো?
- ‘ভালো, খুব ভালো।’ হি হি করে হাসতে হাসতে বল্ল জুলিয়া। যেন ভাল থাকাটা অত্যন্ত মজার কিছু। কথায় কথায় হাসা এই মেয়ের একটা মুদ্রাদোষ। পাগল নাকি মেয়েটা? মাঝে মাঝে ভীষন বিরক্ত হয় অনিন্দ্য। ভুলেও যদি ও শুধায় - ‘হাসছ কেন? হাসির কি হল?’ তাহলেই হয়েছে! আরো তিনগুন হাসি দিয়ে ও এ জাতীয় প্রশ্নের উত্তর দেয়। ওর হাসিকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য অনিন্দ্য বল্ল- ‘ইকবাল বাসায় আছে?’
- ভাইয়া তো সেই সকালে বেরিয়েছে, এখনও ফেরেনি।’- বলেই একচোট হেসে নিল ও। কি হাস্যকর একটা কান্ড ঘটে গেছে যেন! অনিন্দ্যর ধৈর্য্যের বাঁেধ ভাঙ্গন ধরল। বল্ল- ‘ফোন করেছ কেন?’
- ‘এমনিই’ - বেশ সহজ গলায় বল্ল ও।
- ‘এমনিই মানে?’ অনিন্দ্যর কন্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি।
- ‘এমনিই মানে এমনিই।’ আগের চেয়েও সহজ গলায় বল্ল -‘কেন, এমনি এমনি ফোন করা যায় না বুঝি? আইনে নিষেধ আছে নাকি? জুলিয়া নামধারি কোন বালিকা অনিন্দ্য নামধারি কোন বালক কে প্রয়োজন ব্যতিরেকে ফোন করিতে পারিবে না, করিলে দন্ডবিধির ৪২০ ধারা মোতাবেক তাহাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং পরবর্তীতে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হইবে। এরকম?’ এবার যেন ওর হাসি আর থামতেই চায় না। একটু পর বল্ল- ‘জানেন, কয়েকদিন যাবৎ আমার খুব জ্বর...’ ওকে শেষ করতে না দিয়েই অনিন্দ্য বলে উঠল ‘তাহলে বল্লে কেন ভালো আছো?’
- ওটা তো কথার কথা, আর তাছাড়া ...আপনার সাথে কথা বল্লে ভাল থাকি।
- কি? এর মানে কি?
- মানে হল, আপনার সাথে যতক্ষন কথা বলি ততক্ষন ভাল থাকি, কথা শেষ হলেই আবার জ্বর উঠা শুরু হবে।
- তাই নাকি? বাহ্ বেশ ভাল তো। আচ্ছা, এসব ফালতু কথা কোথায় পেয়েছো, জানতে পারি?
- ‘অবশ্যই পারেন। আসলে কোথাও পাইনি, বানিয়ে বল্লাম। কিন্তু আমার শরার যে খুব খারাপ সেটা বানানো না, সেটা সত্যি। জানেন, জ্বরের সাথে সাথে আবার আরেকটা ব্যাপার ঘটেছে, দুটো মিলে আমাকে একদম কাহিল করে ফেলেছে।'
- ‘ব্যাপারটা কি?’
- ‘সেটা তো আপনাকে বলা যাবে না।’ কথাটা বলার সময় খুব মজা পেল জুলিয়া।
- ‘আচ্ছা ঠিক আছে, এতই যখন শরার খারাপ, তোমার তো এখন তাহলে বিছানায় শুয়ে থাকার কথা, ফোন করে অন্যকে বিরক্ত করার কথা না।’ শেষের বাক্যটা ও বলতে চায়নি, মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল।'
- ‘এতক্ষন শুয়েই ছিলাম, একটু আগে উঠে পুরো গা পন্স করলাম, জানেন, কি গরম পানি বেরুল! এখনও গা টা বেশ গরম, আপনি কাছে থাকলে আপনাকে বলতাম আমার কপালে হাত ছুঁেয় আমার জ্বরটা দেখতে।’ শেষের কথাটা শুনে ও খুব বিব্রত বোধ করতে লাগল, প্রতুত্তরে কি বলবে ভেবে পেল না। মেয়েটার কথা অনেকটা বিশ্বাস হয় না। প্রিয়জনের সহানুভূতি পাবার জন্য অনেকেই এমন বলে থাকে। ওর কথা যেন শুনতেই পায়নি এমনভাবে বল্ল- ‘তোমাকে না বলেছি পড়ার সময়ে ফোন করবে না। মনে থাকে না?’
- ‘মনে থাকবে না কেন? মনে অবশ্যই আছে। কিন্তু আপনি তো পড়ছিলেন না।’- যথারীতি হাসতে হাসতে বল্ল জুলিয়া- ‘ছিলেন তো এতক্ষন বেলকনিতে।’
- ‘কে বল্ল তোমাকে?’- জেরা করার ভঙ্গিতে বল্ল অনিন্দ্য।
- ‘কেউ বলেনি, নিজের চোখে দেখলাম।’ জুলিয়াও পরিপূর্ণ আতœবিশ্বাসের সাথে বল্ল।
- ‘দেখলে? কি দেখলে?’
- ‘দেখলাম যে আপনি বিশাল একটা বই হাতে নিয়ে উদাস হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছেন। আচ্ছা, কি ভাবছিলেন ওতো মনোযোগ দিয়ে? কবি-টবি হয়ে গিয়েছিলেন নাকি? হি হি হি।
অনিন্দ্যর পিত্তি জ্বলে গেল। সহ্যের একটা সীমা আছে। -‘এত দূর থেকে দেখলে কি ভাবে? তোমার তো দেখছি শকুনের চোখ।’ মৃদু কটাক্ষ করল ও। কিন্তু যার উদ্দেশ্যে কথাটা বলা তাতে তার কোন ভাবান্তর হল না।
- ‘ঠিকই বলেছেন, তবে আমার না, শকুেনর চোখ হল আমার বাইনোকুলারের। প্রথমে অবশ্য ঘোলা দেখাচ্ছিল, তাই অটোজুম এনাবেল করে...ইয়া আল্লাহ্, বলে ফেল্লাম তো’- এবার অট্টহাসি। -‘ভেবেছিলাম আপনাকে বলব না।’ শেষের বাক্যটা শুনলেও প্রচন্ড হাসির তোড়ে কিছু বুঝতে পারল না অনিন্দ্য।
- ‘উফ, কি বিচ্ছু মেয়েরে বাবা!’ মনে মনে বল্ল অনিন্দ্য - ‘বাইনোকুলার দিয়ে আমার উপর নজরদারি শুরু করেছে।’ - ‘বেশ ভাল করেছ, মহা পূন্যের কাজ করেছ।’ রেগে বল্ল - ‘শোন, আমি এখন পড়তে বসব। আর কিছু বলবে?’ ওকে এ ধরনের প্রশ্ন করা বেশ ঝুকিপূর্ণ। কারন সারারাত বল্লেও ওর কথা শেষ হবার নয়। মনে মনে তাই প্রমাদ গুনল অনিন্দ্য।
- ‘হ্যাঁ, আপনাকে অনেক কথা বলার আছে আমার’ -গম্ভার স্বরে এই প্রথম না হেসে বল্ল ও- ‘কিন্তু আপনি তো কিছু শুনতেই চান না। আচ্ছা আপনি এমন কেন? আমি যদি আমার ফোনের বিল তুলে আপনার সাথে কথা বলি, তাহলে আপনার সমস্যাটা কোথায়?’ ব্যাগ্র স্বরে বল্ল জুলিয়া।
- ‘সমস্যাটা বিলের নয়, সময়ের।’ দ্রুত বল্ল অনিন্দ্য। ‘তুমি নিশ্চয়ই জান যে আগামী সপ্তাহে আমার ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে। পড়তে পড়তে আমার নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে...’
- ‘কচু উঠে যাচ্ছে’ মনে মনে বল্ল জুলিয়া। অভিমানি কন্ঠে বল্ল- ‘তা তো জানি, কিন্তু লোপা আপু ফোন করলে কি এমন কথা বলতে পারতেন, বলেন? আমার বেলাতেই যত ওজর-আপত্তি, তাই না?’ অনিন্দ্য চুপ। একটু পর ওকে শুনতে হল- ‘আমার জা’গায় লোপা আপু হলে তাকে তো বলতেন, আপু আপনার সাথে কথা বল্লে আমার ফ্রেশ লাগে, আর রাতের পড়াটাও ভাল হবে, কি বলতেন না?
- ‘মেয়েটা বড্ড পেকে গেছে’ -মনে মনে বল অনিন্দ্য।- ‘হ্যাঁ, হয়ত বলতাম’ নীচু স্বরের স্বীকারোক্তি ওর।
- ‘তাহলে শুধু শুধু কেন মিথ্যা অজুহাত দেখাচ্ছেন? আমার কাছে সত্য লুকিয়ে আপনি খুব মজা পান না?’ আশাহত গলায় বল্ল জুলিয়া। উপায়ান্তর না দেখে অনিন্দ্য বেশ শান্ত স্বরে বল্ল- ‘জুলিয়া, তুমি অসুস্থ্য, বিশ্রাম নাও। তুমি সেরে উঠলে আমরা অনেক কথা বলব কেমন? আমি তো আর হারিয়ে যাচ্ছি না।’ বাচ্চা মেয়েকে বোঝাবার ভঙ্গিতে বল¬ অনিন্দ্য। অবশ্য অনিন্দ্য ওকে বাচ্চা একটা মেয়ে ছাড়া আর কিছু ভাবে না।
- ‘তা ঠিক। তবে হারালেও বোধহয় ভাল ছিল। খুঁেজ নিতাম। না হারালে তো আর সে সুযোগটা থাকছে না।
- ‘মানে?’
- ‘হারালেই তো শুধু খোঁজা যায়। যে হারায়ইনি, তাকে খুঁজব কোথায়?’- কথাটা বলার সময় জুলিয়ার গলা ধরে এল। এ পশ্নের উত্তর অনিন্দ্য কি দেবে ভেবে না পেয়ে চুপ করে রইল। একটু পর জুলিয়া বল্ল-আগামী মঙ্গলবার আপনার কোন কাজ আছে?
- কেন?’ শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল ও।
- আহ্, বলুন না আছে কিনা?
- আগামী মঙ্গলবার,তাই না?’ ভাবতে ভাবতে বল্ল ও, ... হ্যাঁ, ক্লাস টেস্ট বুধবাওে, ... হ্যাঁ, মঙ্গলবার ফ্রি...’ হঠাৎ এমূহুর্তে ওর মনে পড়ল মঙ্গলবার ভ্যালেনটাইনস্ ডে, আপুকে নিয়ে বেরুতে হবে, অন্য কোন কাজে কিছুতেই বিজি হওয়া যাবে না। ’...না না, মঙ্গলবার না, মঙ্গলবার সম্ভব না, তোমার যদি খুব জরুরী কোন কাজ থাকে তাহলে তোমাকে অন্য যে কোন দিন আমি সময় দিতে পারি।’ খুব ভদ্রভাবে বল্ল অনিন্দ্য।
- না, অন্য কোন দিন না, আপনাকে আমার সেদিনই চাই।’ গোঁয়ারের মত বল্ল জুলিয়া।
- তুমি চাইলেও আমার কিছু করার নেই। একটু বোঝার চেষ্ট কর বোকা মেয়ে...
- হ্যাঁ, আমি সেটা করছি, আমি এখন বুঝতে পারছি যে ঐ দিনটাতে আপনি পৃথিবার সমস্ত কাজ থেকে নিজেকে ফ্রি রাখবেন। ঠিক না?’ ওর স্বরে হালকা ব্যঙ্গ।
- এই তো... গুডি গার্ল...
- এবং কি কাজ আপনার সেদিন, সেটাও বেশ বুঝতে পারছি।
- আপনি কি জানেন আগামী মঙ্গলবার ভ্যালেনটাইনস্ ডে?
- তাই নাকি? জানি না তো...’ ভানটা ভাল হল না ওর, তাই আবার বল্ল- না মানে জানি, কিন্তু মনে ছিল না,
- অবশ্যই আপনার মনে ছিল। আপনি মিথ্যা বল্লে যে আমি বুঝতে পারি সেটা আপনি বুঝতে পারেন না কেন?
- তোমার মত আমার এত বুঝ নাই যে!
- একটু সময়ও কি আপনি দিতে পারবেন না?...অল্প কিছুক্ষন?...’ প্রচন্ড কষ্টে জুলিয়ার গলা আটকে যাচ্ছে।
- ‘জুলিয়া, আমি এখন সত্যিই পড়তে বসব।’ জুলিয়ার জন্য ওর এই প্রথম ভীষন মায়া লাগল। তাই সরাসরি না করতে পারল না। আপুর ব্যাপারটা না থাকলে ও ওকে অব্যশই সময় দেয়া যেত, জুলিয়া যতক্ষন চায় ততক্ষন।ও ওর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বল্ল-’ আর তাছাড়া, একটু পর আমার একটা জরুরী কল আসবে, নতুবা তোমাকে আমি আরেকটু সময় দেয়া যেত।’
- ‘ফোনটা কে করবে? লোপা আপু? আমার তো মনে হয় উনি নয় বরং আপনিই তার কাছে ফোন করবেন, কি ঠিক বলিনি?’ জুলিয়া দেখল অনিন্দ্যকে পাবার প্রতিটি সময়ে লোপা ভাগ বসিয়ে বসে আছে। তাই বেশ রাগ নিয়েই কথাটা বল্ল।
- ‘না’ খটাস করে ফোন রেখে দিল অনিন্দ্য, ওর রাগ চরমে উঠে গেছে। কারন জুলিয়া ঠিক বলেছে ।
- ফোন রাখার পর থেকে ওকে কিছুটা হীনমন্যতা এসে গ্রাস করল। ‘না’ না বলে হ্যাঁ বলে দিলেই পারত। পিচ্চি একটা মেয়ের সাথে সত্য কথা বলতে ওর এত বাঁধে কেন তা ও নিজেও জানে না। গত বছর ওর সাথে পরিচয়। বন্ধুর বোন। একই এলাকায় থাকে। পুরো একটা বছর ধরে জ্বালাচ্ছে ওকে। মাঝ রাতে ফোন করে হাসাহাসি করে। একবার ভেবেছিলো ইকবালকে ব্যাপারটা জানাবে কিন্তু চক্ষুলজ্জার জন্য ও আর জানাতে পারেনি। -‘কেমন গাধী মেয়েরে বাবা! লোপা আপুর কথা জেনেও পেছনে ঘুরঘুর করে। এখন আবার বাইনোকুলার দিয়ে নজরদারিও শুরু করেছে। এই ‘নাছোড়বান্দার’ হাত থেকে কি আমার আর নিস্তার নেই?’ এসব কথা ভাবতে ভাবতে ডাইনিং রুমে গিয়ে এক গ্লাস কফি বানিয়ে এনে আবার ওর ঘরে এসে ঢুকল। এর মধ্যে ওর মা একবার ওকে জিজ্ঞেস করল ‘কে ফোন করেছিলো রে?’ - ‘ইকবালের বোন’- অনিন্দ্যর সংক্ষিপ্ত জবাব। রুমে ঢুকেই ফোন করল ও, অনেকক্ষন পর রিসিভ করা হল। ওপাশ থেকে ভারী, ঘুম জড়ানো গলা শোনা গেল- ‘হ্যালো...
- আপু আমি অনি, (লোপা আপু ওকে অনি বলে ডাকে) কেমন আছেন?
- ও অনি! আমি ভাল, তুমি কেমন আছ?
- আমিও ভাল, কি করছিলেন?
- ‘ঘুমাচ্ছিলাম’ - হাই তুলতে তুলতে বল্ল লোপা।
- ‘সরি, ডিসটার্ব করলাম মনে হয়?’ গলায় কেজি খানেক মধু ঢেলে বল্ল অনিন্দ্য।
- না, তুমি বরং আমার উপকার করলে, রিংয়ের শব্দে ঘুম না ভাঙ্গলে হয়ত আরো কয়েক ঘন্টা ঘুমাতাম, তাহলে রাতের পড়াটাই মাটি হয়ে যেত।
- এরপর কি করবেন?
- হাত মুখ ধুয়ে হালকা কিছু খাবার খেয়ে পড়তে বসব।
- কটা পর্যন্ত পড়বেন?
- দেখি কতক্ষন পড়া যায়, গতকাল তিনটায় ঘুমিয়েছিলাম, আজকেও হয়ত তিনটা বাজবে, সামনে পরীক্ষা তো, তুমি তো আমার রুটিন জানো, অথচ এমনভাবে প্রশ্ন করছ...’ বিরক্তি চেপে রাখতে রাখতে বল্ল লোপা।
- আপনার রুটিনটা ঠিক আছে কিনা সেটা যাচাই করে নিলাম।
- ‘তোমাকে যাচাই করতে বলেছে কে?’ - মনে মনে আরো বিরক্তি হল ও। কিন্তু মুখে কিছু বল্ল না।
- আচ্ছা আপনি রাত জেগে পড়ার অভ্যাসটা বাদ দিতে পারেন না ?
- না, পারি না- অনেকটা আদুরে গলায় বল্ল লোপা।
- কেন?
- কারন এটা আমার অনেক ছোট বেলার অভ্যাস। আর তাছাড়া দিনে পড়লে পড়া আমার মনে থাকে না।
- কি অদ্ভুত কথা!
- আমি যে একটু অদ্ভুত টাইপের মেয়ে, এটাও তুমি বেশ ভাল করেই জানো, আর এ-ও জানো, তোমার সাথে আমি যতটুকু সময় কথা বলব রাতে আমাকে ঠিক ততটুকু সময়ই বেশী পড়তে হবে। কারন এখন আমার পড়ার টাইম।’ বুঝাবার ভঙ্গিতে বল্ল লোপা।
- ‘আমি তো জানি সারাদিনই আপনার পড়ার টাইম’- লোপার কথায় মন খারাপ হলেও হাসতে হাসতে বল্ল অনিন্দ্য।
- ‘সেটা হতে যাবে কেন?’ -অনিন্দ্যর হাসি লোপা গায়ে মাখল না- ‘আমি তো আর রোবট না...’
- ‘রোবটরা বুঝি সারাদিন পড়ে?’
- ‘আমি এখানে রোবটের পড়ার ব্যাপারটা বুঝাইনি, বোকা কোথাকার!’ মিষ্টি করে একটা গাল দিল লোপা। ‘আচ্ছা ঠিক আছে, এই ভর সন্ধ্যায় ফোন করেছ কেন এখন সেটা বল।’ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা না করে পারল না ও।
- ওমা, একট ু ফোনও করতে পারব না? আইনে নিষেধ আছে নাকি? অনিন্দ্য নামক কোন যুবক লোপা নামক কোন যুবতীকে প্রয়োজন ব্যতিরেকে ফোন করিতে পারিবে না, করিলে দন্ডবিধির ৪২০ ধারা মোতাবেক তাহাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হইবে। এরকম?’ মজা করে জুলিয়ার ডায়ালগটা এখানে চালিয়ে দিল।
- ‘হ্যাঁ, পড়ার সময় ফোন করে বিরক্ত করলে মৃত্যুদন্ডই দিতে হয়।’ লোপার সোজা সাপ্টা উত্তর -‘তোমাকে না বলেছি পড়ার সময়ে ফোন করবে না।’
- ‘আপনি পড়ছিলেন নাকি? ছিলেন তো এতক্ষন বেলকনিতে।’ দেবার মত কোন অজুহাত না পেয়ে জুলিয়ার আরেকটা সংলাপ অযৌক্তিকভাবে বলে দিল।
- ‘কি? আমি বেলকনিতে ছিলাম? কি বলছ তুমি?’ ওর কন্ঠে স্পষ্ট বিস্ময়।
- না মানে , গেইস করলাম আরকি ...
- ‘কিসের গেইস? তুমি জান না আমাদের বেলকনি নেই।’ রাগতস্বরে বল্ল লোপা।
- আহ্হা, আমি কি একটু ফানও করতে পারি না?
- ‘না, পার না।’ রীতিমত ক্ষেপে গেছে ও। ‘আমি তো তোমার এমন কেউ না যে তুমি আমার সাথে ফান করবে।’
- ‘রাজন ভাইয়াকে কখনও এমন করে বলতে পারতেন, বলেন?’- আহত গলায় বল্ল অনিন্দ্য।
- ‘ও কখনোই আমার সাথে এমন বস্তাপঁচা ফান করে না’- একটু চুপ থেকে ধীরে ধীরে বল্ল।
- ‘আর করলেও সেটাকে আপনি অতি উচ্চদরের রসিকতা মনে করতেন। আর আমি না ফোন করে যদি ও করত তাহলে তো বলতেন ওহ রাজন ভাইয়া, আপনার ফোনের জন্যই তো ওয়েইট করছিলাম, পড়ার টাইম তাতে কি? বরং আপনার সাথে কথা বলার পর পড়ায় মনোযোগ আরো বেড়ে যায়। কি বলতেন না?’ -অনিন্দ্য অনেকটা রেগেই বল্ল।
- না বলতাম না। আচ্ছা, কি শুরু করলে তুমি বলতো? আর... এইসব আজেবাজে কথা কই পাও?
- আজেবাজে না, এটাই সত্যি।
- ‘অনিন্দ্য,’ মৃদু স্বরে বল্ল লোপা -‘অনেক হয়েছে আর না, আমার মাথা ধরেছে, আমি এখন রাখব। আর তাছাড়া...
- আর তাছাড়া...’ লোপার আগেই বলে উঠল ও- ‘একটু পর একটা জরুরী ফোন আসবে আপনার, তাইতো?’ বেশ ঝাঁঝের সাথেই বল্ল অনিন্দ্য।
- ‘ইউ আর এ রিয়েলি ব্রিলিয়ান্ট বয়, সত্যিই তাই’ -খুশি হবার ভান করল লোপা।
- ফোনটা কে করবে? রাজন?
- অনিন্দ্য, ভদ্রভাবে কথা বল, উনি তোমার অনেক বড়।
- অনেক বড় না, শুধু বয়সে কয়েক বছরের বড়। শুনুুন লোপা আপু, সে আপনার কাছে ফোন করবে না, আপনিই তার কাছে করবেন। এই সত্যটা আমার কাছে আড়াল করবার কোন প্রয়োজন ছিল না’ -বলেই ও ফোন রেখে দিল। ইস্, আপুকে আজ কত কথা বলাার ছিল। ভ্যালেনটাইনস্ ডে’র কথাটা তো বলাই হল না। প্রচ›ড রাগে, দু:খে, কষ্টে আর অপমানে ও স্তদ্ধ হয়ে বসে রইল কিছুক্ষন। এমন আশাহত ও জীবনে কখনও হয়নি। মনে মনে কি ভেবে রেখেছিলো আর হলটা কি! মানুষের কল্পনা কি সবসময় কল্পনাই থেকে যায়? কখনও সত্যি হয় না? কি এমন ক্ষতি সত্যি হলে?

জুলিয়ার ব্যাপারটার সাথে অনেকটা মিলে গেল। ওকে কষ্ট দিয়েছে বলেই হয়ত আজ আপুর সাথে ঝগড়াটা হল। এর আগেও ও খেয়াল করে দেখেছে, যেদিন জুলিয়ার সাথে ও একটু খারাপ আচরন করে সেদিনই আপুর সাথেও ওর কিছু না কিছু হয়। একবার ঐ পিচ্চি মেয়েটাকে ফোনে কি কারনে যেন একটু বকাঝকা করেছে, অমনি কি হতে কি হল, সেদিন থেকেই আপুদের ফোনটা ডেড হয়ে গেল, একটানা আটদিন ফোন ডেড ছিল।
অসম্ভব মন খারাপ কওে ও বারান্দায় এসে দাঁড়াল, আকাশে আজ অনেক তারা । হঠাৎ দেখল অনুজ্জল একটা তারা তার পাশের আরেকটা তারার দিকে ছুটে গেল, যেন জড়িয়ে ধরতে চাইছে, কিন্তু ঐ তারাটি ব্যাপারটাকে পাত্তা না দিয়ে অন্য আরেকটি তারার দিকে সরে গেল, অনিন্দ্য অবাক হয়ে দেখছে, কিন্তু ৩য় তারাটিও একসময় আরো দূরে সরে গেল, তিনটা তারা মিলে প্রায় একটা ত্রিভুজ হয়ে গেল। আসলে তারাগুলো তখন আকাশে ছিল না। ছিল অনিন্দ্যর মনে। অনিন্দ্যর অবচেতন মনে। (চলবে...)

(৩য় পর্ব আগামী সপ্তাহে। কনভার্টারটা বেশ ঝামেলা করছে, অনেকগুলো ক্যারেক্টার ঠিকমত কনভার্ট হয়নি। আমি পাঠকদের কাছে আন্তারিক ভাবে দুঃখিত।)
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১০:২৪
১৮টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×