রাজন সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠল। একটু আগে সন্ধ্যা নেমেছে। সাধারনত দুপুরে ও ঘুমায় না। কিন্তু যেদিন ঘুমায়,
সেদিন বলতে গেলে পুরো দিনটাই ও ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়। অথচ রাতের ঘুমের তাতে কোন অসুবিধা হয় না। আগে ওর
এমন ঘুম ছিল না, রাত একটার আগে তো ওর ঘুমই আসত না, দুপুরের ঘুমের জন্যও তো রীতিমত যুদ্ধ করতে হত।
গত ছয় মাস ধরে ঘুমের এমন বাড় বেড়েছে। দুপুরে ঘুমুলে আর দেখতে হয় না, ঐ ঘুমেই দিন পার। আজও তেমন
হল। বাথরুমে গেল প্রশাব করতে, প্যানের উপর বসার সাথে সাথে বড় বেগ পেল। ইদানিং ওর এই সমস্যা
হয়েছে, বাথরুমে ঢুকে ছোটটা করতে, বের হয়ে আসে বড়টা করে। বুড়োদের মত অবস্থা। বুড়োদের নাকি এমনটা বেশী হয়। ‘তাহলে আমিও কি দ্রুত বুড়ো হয়ে যাচ্ছি?’ মাঝে সাঝে ভাবে ও। বাথরুমে থাকাকালীন সময়টা ওর ভীষণ বোরিং লাগে তাই প্রায়ই ও এসময়টা বিভিন্ন কিছু চিন্তা করে কাটায়। আজ বিকেলে ও ঘুমের মধ্যে
কি সপ্ন দেখেছে সেটা এখন মনে করার চেষ্টা করতে লাগল। সপ্নের কথা ওর সাধারনত মনে থাকে না। বিছানায় যতক্ষন
গড়াগড়ি দেয় ততক্ষন মনে থাকে, বিছানা থেকে নামার সাথে সাথে ভুলে যায় সব। তাই ও সিদ্ধা›ত নিয়েছিলো বিছানায়
থাকতে থাকতেই ও ওর সপ্নের কথা একটা খাতায় লিখে রাখবে । নতুবা সপ্নের কিছু অংশ নয়, পুরোটাই ভুলে যায়,
শুধু সে সপ্নের রেশটুকু থেকে যায়। যেমন দু:সপ্ন দেখলে মানুষ সাধারনত মন খারাপ করে বা ভয় পায় কিন্তু ওর এ
সবের কিছুই হয় না। সপ্নের কথা মনে করতে না পেরে শুধু মেজাজ খারাপ হয় ভীষন। মজার ব্যাপার হল এ পর্যন্ত
একটা সপ্নের কথাও লিখতে পারেনি কারন সপ্ন লেখার সিদ্ধান্ত নেবার পর থেকে ঘুম ভাঙ্গার পরই ও সপ্নের কথা ভুলে
যায়। আজও একই ব্যাপার, তাই সঙ্গত কারনেই ওর মেজাজ খুব খারাপ। নিশ্চয়ই দু:সপ্ন দেখেছে এবং যথারীতি তা
মনে নেই। এখন বাথরুমে বসে বসে সেটাই মনে করার চেষ্টা করবে যদিও ও জানে মনে পড়বে না তবুও সময় কাটানো
আরকি। বাথরুমে বসে ও কুলকুল করে ঘামতে লাগল। ইদানিং ওর এই ব্যাপারটা ঘটছে, প্রচন্ড গরমেও ওর তেমন
একটা ঘাম হয় না কিন্তু টয়লেটে গেলেই ও দরদর করে ঘামে, এটা আরেকটা রোগের লক্ষন কিনা সেটা নিয়ে ও বেশ
সংশয়ে আছে। টয়লেট থেকে বের হলে যে কেউ ওকে দেখে বলবে ও যেন টয়লেট থেকে নয়, বাথরুম থেকে গোসল
করে বের হয়েছে। তাই ও ভাবছে আজ- কালকের ভেতরেই টয়লেটে একটা একজস্ট ফ্যানের ব্যাবস্থা করবে। কিন্তু
বাথরুমে কেউ ফ্যান লাগিয়েছে এমন তথ্য ওর জানা নেই। আর তাছাড়া ফ্যানের হাওয়া খেতে খেতে একজন মানুষ
প্রাকৃতিক কাজ সারছে এই দৃশ্যটাও তেমন সুবিধার না। এমন সময় ওকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ করেই ওর মস্তিস্ক ভুলে যাওয়া
সপ্নটা ওকে মনে করিয়ে দিল। কারন ওটা ফ্যান সংক্রান্ত।। ও সপ্ন দেখেছে জুলিয়াকে। জুলিয়া আর ও একটা খাটে
চুপচাপ বসে আছে, হঠাৎ জুলিয়া উঠে দাঁড়াল, লম্বা মানুষ, দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মাথার উপর ঘুরতে থাকা একটা
ফ্যানের সাথে লেগে ওর মাথার একটা পাশ থেঁতলে যায়। পাশের দেয়ালে রক্তের ছিটা এসে লাগে। একেবারে স্পষ্ট
মনে পড়ে গেল সব। রাজন ভীষন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ল। এই সপ্নটা ও কি করে ভুলে গেল? নিজের উপরই খুব রাগ
হচ্ছে ওর। আর তাছাড়া হঠাৎ করে এই সপ্ন দেখার মানেটাই বা কি? জুলিয়ার কিছু হয়নিতো? এমনিতেই মেয়েটা
অসুস্থ, একবার তাহলে খোঁজ নিতে হয়।’ ভাবল ও। এসব ভেবে তাড়াতাড়ি টয়লেটের কাজ শেষ করতে লাগল।
বাথরুমে ঢোকার সময় ভেজা স্যান্ডেলে পা পড়ে পিছলে গিয়েছিলো, কোনমতে নিজেকে সামলিয়েছে ও, আব্বু এমন
বিশ্রী ধরনের টাইলস্ লাগিয়েছে, খালি পায়ে হাঁটলেও স্লিপ খেতে হয়। সপ্নের কারনে মেজাজ গরম ছিলো, পিছলে পড়ার
পর আরো গরম হয়েছে, এখন আবার টিস্যু বক্সের দিকে হাত বাড়িয়ে দেখে সেটা খালি, মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল।
রাগের চোটে বাইরে এসে চেঁচামেচি শুরু করে দিল। ‘আম্মু, টয়লেটে টিস্যু নেই কেন? এটা আর কারো চোখে পড়ল না?
নাকি টিস্যু শুধু আমি একাই ইউজ করি?’ ইত্যাদি ইত্যাদি। আর কারো বলতে ও ওর বাবা-মা কেই বুঝিয়েছে, এই
তিনটি প্রাণি নিয়েই ওদের পরিবার। ওর মা মুখ বুঝে সব সহ্য করেন। হয়ত এ কথা ভেবে ‘আর কদিন পর চেঁচামেচি
করার কেউ থাকবে না’, রাজন যখন হাত মুখ ধোয়া শেষ করে বাথরুম থেকে বেরুল, ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।
ও ধরল, ওপাশ থেকে মেয়েলী কন্ঠ শোনা গেল- ‘হ্যালো’-
-‘হ্যালো’ কে বলছেন? রাজনের জিজ্ঞেস। পর মূহুর্তেই লোপার সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। রাজনের প্রশ্নের কি
উত্তর দেবে ভেবে পেল না, একটুপর ধাতস্ত হয়ে হড়বড় করে বলে চল-- ‘হ্যালো’ রাজন ভাই আমি লোপা, আপনি এ
সময়ে বাসায়? কি আর্শ্চয! পড়াতে যাননি? শরীর খারাপ নাকি? আমাকে জানাবেন না?’ চুপ করে রইল রাজন, জবাব না
পেয়ে লোপা আবার ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলে উঠল 'কি হল চুপ করে আছেন যে?’
- তোমার প্রশ্নবান থামার অপেক্ষায় ছিলাম, থেমেছে ওটা?
- ‘না মানে,’ লজ্জায় লাল হয়ে লোপা আমাতা আমতা করে বল-- ‘আপনার তো এসময় বাসায় থাকার কথা
না...’ আমার শরার ভাল আছে, তবে আমার ছাত্রীটার জ্বর হয়েছে, খুব টেনশনে আছি ওকে নিয়ে।’
অজানা এক আশঙ্কায় হঠাৎ লোপার বুকটা ধ্বক্ করে উঠল কারন রাজন যে ওর ছাত্রীটাকে নিয়ে একটু বেশীই
টেনশন করে সেটা ওর অজানা নয়। ও গলার স্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করতে করতে বল-- ‘টেনশনের কিছু
নেই, আজকাল তো অনেকেরই জ্বর হচ্ছে,’
- লোপার এমন মন্তব্যে খানিকটা বিরক্ত হল রাজন, বল-- ‘তা হচ্ছে, কিন্তু ওরটা ভাইরাস জ্বর কিনা কে জানে?
ইদানিং ভাইরাস জ্বরে নাকি নরমাল এন্টিবায়োটিক কাজ করছে না, কড়া ডোজ দিতে হয়, সেটা আবার সব সময়
রোগ শরীরে স্যুটও করে না। জুলিয়ার শরীরে করবে কিনা কে জানে? তবে আমার মনে হয় না ওরটা ভাইরাস জ্বর
নয়, তুমি কি বল? হবু ডাক্তারের মতামতটা জানা থাকা দরকার’ -হালকা ফান করে বল- ও।
- ‘আপনার এত চিন্তা কেন? আপনার তো বরং আরো খুশী হবার কথা, স্টুডেন্ট অসুস্থ মানেই তো টিচারের ছুটি!
আপনি ছুটি পাননি?’ রাজনের ফানের উত্তরে ও-ও ফান করল কিন্তু কন্ঠে ন্যাচারিলিটি না থাকায় সেটা ফান
বলে মনে হল না, মনে হল যেন ও সিরিয়াসভাবেই কথাটা বলেছে।
- ‘আমার উত্তরটা তো পেলাম না ।’
উত্তর দেবে কি, রাজনের কথা শুনে ও নিজেই দুঃচিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে । মেয়েটার জন্য ওর এত ভাবনা কিসের?
‘হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হয়, ভাইরাস জ্বর এখন হচ্ছে ঠিক, কিন্তু খুব একটা না। ওর ভাইরাস জ্বর না-ও হতে
পারে।’ দায়সারা উত্তর দিল লোপা।
- যাক তুমি আমাকে আশ্বস্ত করলে।
- ‘আপনার প্রশ্নের উত্তর তো পেলেন, এবার আমারটা দিন।’
- ও হ্যাঁ, ছুটি পেয়েছি, এক সপ্তাহের ছুটি পেয়েছি।’ নির্লিপ্ত গলায় বল- রাজন, যেন ছুটি পেয়ে ও খুব ঝামেলায়
পড়ে গেছে। কিন্তু লোপা বেশ উৎফুল- হয়ে বল --‘সত্যি, পুরো এক সপ্তাহের ছুটি?
-‘হ্যাঁ, কিন্তু আমার ছুটিতে তুমি এত খুশী কেন?’ রাজনের স্বরে সন্দেহ।
আবার লজ্জা পেল লোপা, একটু আগে একগাদা প্রশ্ন করে বোকার মত কাজ করেছে। এখন আবার আরেকটা।
এখন থেকে কথা-বার্তায় আরো সাবধানী হতে হবে। ও আর লজ্জা পেতে চায় না। কৈফিয়ত দেখানোর ভঙ্গিতে
বল-- ‘না মানে, আপনি তো আমাদের বাসায় আসার সময়ই পান না, আম্মু তো প্রায়ই আপনার কথা বলে, কাল
বিকেলে চলে আসুন না একবার...
-তোমাদের বাসায় তো কয়েকদিন আগেই গেলাম, মোবাইলের বিলের কাগজটা দিয়ে আসলাম না? তুমি বাসায়
ছিলে না। কেন আন্টি তোমাকে কিছু বলেননি?’ অবাক হয়ে বল- রাজন।
লোপা আবার ধরা খেল। কারন কয়েকদিন আগে রাজন যে ওদের বাসায় এসেছিলো এটা ও ভাল করেই জানে। ও
কলেজে ছিলো। রাজন বাসায় আসা সত্ত্বেও ওর সাথে লোপার দেখা হয়নি বলে নিজের আর কলেজটার উপর ওর
ভীষন রাগ হয়েছিলো সেদিন। বাসা ওদের খুব একটা দূরে নয়। কোনমতে বল- ‘হ্যাঁ বলেছে...’
-তাহলে আবার বাসায় আসতে বলছ কেন? আগামী মাসের আগে হয়ত আর তোমাদের বাসায় যাওয়া হবে না।
কষ্টে লোপার বুকটা ফেটে যাচ্ছে, রাজনকে বাসায় আনার জন্য ও মরিয়া হয়ে উঠল। তাই আরেকটা ভুল করল।
বল--‘আগামী মঙ্গল বার আমার জন্মদিন, কাল বিকেলে তাই আপনাকে আসতেই হবে।’
- আগামী মঙ্গল বার তোমার জন্মদিন নাকি? কই আন্টি তো আমাকে কিছু বল্লেন না!
-হয়ত তাঁর মনে ছিলো না, ........ আপনি আসছেন তো?
- আসতে পারি, তবে কথা দিতে পারছি না,
- ‘না আপনাকে কথা দিতে হবে, আপনি এখন পুরোপুরি ফ্রি, কোন কাজটাজ নেই, আপনি আগামী মঙ্গল বার
বিকেলে অবশ্যই আমাদের বাসায় আসছেন।’- অনেকটা আদেশের সুরে বল- লোপা ।
- ‘আচ্ছা ঠিক আছে, সময় করে আমি আসব।’ - রাজন রাজি হয়ে গেল।- ‘লোপা, আমার খুব জরুরী একটা
ফোন করা লাগবে, এখন রাখি?’ খুব ভদ্র ভাবে বল- ও।
- আচ্ছা, আসতে ভুলবেন না যেন’- নিতান্ত অনিচ্ছাভরে বলে ফোন রেখে দিল।
আগামী মঙ্গল বার , ভ্যালেনটাইনস্ ডে’র দিন বিকেলে ও খুব সুন্দর করে নিজেকে সাজাবে, শুধু রাজনের জন্য।
ফোন রেখে রাজন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেল-। লোপা প্রায়ই ওকে ফোন করে উদ্ভট আর এলোমেলো সব কথা বলে।
প্রথমে তেমন একটা পাত্তা দেয়নি ওকে, তারপরও অবস্খার পরিবর্তন না হওয়াতে ও মনে করত মেয়েটা হয়ত
মানসিকভাবে সম্পূর্ন ম্যাচিউরড্ না। কিন্তু লোপা যে রাজনের প্রেমে পড়েছে এটা রাজন মাত্র কিছুদিন হল বুঝতে
পেরেছে। আর প্রেমে পড়লে মানুষ তো কত উদ্ভট কান্ডই করে! ও নিজেই তো...সেদিন জুলিয়া এত করে বল-
স্যার, বৃষ্টি হলে আসার দরকার নেই। জুলিয়ার সে বারন শুনেনি রাজন। পরদিনই বৃষ্টি হয়েছে এবং সে ও
যথারীতি বৃষ্টিতে ভিজে কাই হয়ে জুলিয়াকে পড়াতে গেছে। গাড়ি ছিল সার্ভিসিংয়ে, তাছাড়া বৃষ্টি বাদলের দিনে খুব
একটা গাড়ি বের করা হয় না। রিক্সাতে চেপেই জুলিয়াকে পড়াতে গেছে। অর্ধেক রাস্তায় এসে রিক্সা পড়ল খোলা
ম্যানহোলের গর্তে, বৃষ্টির পানি জমে সেটা ডুবে যাওয়ায় রিক্সাওয়ালা সেটা দেখতে পায়নি। অনেক কষ্টে রিক্সা
উঠানোর পর দেখা গেল বাম দিকের চাকা বেঁকে গেছে। আশেপাশে রিক্সা তো দূরের কথা, কোন যানবাহনই ছিল
না, তবে সাথে ছাতা ছিল, সেটাই মাথার উপর মেলে ধরে হাঁটা ধরল। কিন্তু সেদিন ওর কপাল খারাপ ছিল, কয়েক
মিনিট যেতে না যেতেই একটা দমকা বাতাস ওর ছাতাটাকে উড়িয়ে নিয়ে ফেল্ল- পাশের উপচে পড়া একটা ড্রেনের
মধ্যে। অগত্যা ছাতা ফেলেই আবার হাঁটা ধরেছিলো ও। পুরো পনের মিনিট বৃষ্টিতে ভিজে একসা হয়ে জুলিয়াদের
বাসায় পৌঁেছছে। যদিও তার পরের তিনদিন ও জ্বরের কারনে বিছানা থেকে উঠতে পারেনি।
একেই কি প্রেম বলে? জীবনের প্রথম প্রেমে পড়া নিয়ে রাজন এখনও বেশ দ্বিধান্বিত। ও যদি জুলিয়ার প্রেমে না পড়ত তাহলে
হয়ত কোনদিনও এমন কাজ করত না, প্রেমের জন্য বন্ধুদের পাগলামি দেখে এতদিন ও মজা পেয়েছে, কখনওবা
বিস্মিত এমনকি বিরক্ত পর্যšতও হয়েছে। কিন্তু লোপার ব্যাপরটা ওকে ক্রমেই চিন্তিত করে তুলেছে। কিছুদিন
আগে রাত তখন প্রায় একটা, লোপা ওকে ফোন করে ঘুম থেকে জাগিয়ে বলছে-‘প্লিজ রাজন ভাই একটু হাসুন
তো!’ ওতো আকাশ থেকে পড়ল। ও ঠান্ডা স্বরে বল- -‘আমার সাথে ফাইজলামি কর?’
- ‘ফাইজলামির কি হল? আর, আপনার সাথে আমি ফাইজলামি করব কেন? আমার কি ফাইজলামি করার
লোকের অভাব? তাছাড়া এখন কি ফাইজলামির সময়? নাকি আপনার সাথে আমার ফাইজলামির সম্পর্ক?
- এতকিছু যখন বুঝ্ছ তাহলে ফাইজলামিটা করছ কেন? মাঝরাতে অযথা ফোন করে বিরক্ত করা আর
ফাইজলামি করা একই জিনিস।
- ‘পি-জ হাসুন না।’ -নিজেই হাসতে হাসতে বল- লোপা। অনিন্দ্যর কথা যেন শুনতেই পায়নি।
- ‘শুধু শুধু হাসতে যাব কেন?’ মহাবিরক্ত হয়ে উঠল রজান।
- ‘আহ্, শুধু শুধুই না হয় হাসলেন...আমি তো আপনাকে বিরাট কোন অপরাধ করতে বলছি না...’
- ‘অনেকটা সেরকমই,’ হঠাৎ চেঁচালো ও, ‘দেখো লোপা,’ একটু থেমে শান্ত স্বরে বলার চেষ্টা করল রাজন
‘তুমি বুদ্ধিমান একটি মেয়ে, ঢাকা মেডিকেল কলেজের মত জা'গায় ডাক্তারি পড়ছ, আর যাই হোক তোমার মধ্যে এই পাগলামি এই শোভা পায় না।
রাত বিরেতে আমারও এসব ভাল লাগছে না, একদম না।’
- 'এত কথা বলছেন কেন? আপনাকে হাসতে বলেছি আপনি হাসেন। হাসার উপর তো গভার্ণমেন্ট এখনও টেক্স
বসায়নি। হাসুন তো!'
এই পাগলকে থামাবার একটাই উপায়- মনে মনে বলল- রাজন। জোর করে হাসাটা যে কি কষ্টের কাজ সেটা
হাড়ে হাড়ে টের পেল রাজন, তারপর খ্যাক খ্যাক ভিলেনের মত খানিকটা হাসল, ‘থ্যংক ইউ সো মাচ’ তাতেই
মহা খুশি হয়ে গেল লোপা ‘আচ্ছা, আপনি আমাকে উন্মাদ ভাবছেন না তো?’ ফোন রাখার আগে লোপার
প্রশ্ন।
- কথা নেই বার্তা নেই রাত দুপুরে ফোন করে যদি কোন তরুণী মেয়ে কাউকে অযথা হাসতে বলে তবে তার
মস্তিস্কের স্থিরতা সমন্ধে সন্দেহ দেখা দেয়াটাই তো স্বাভাবিক, তাই না?’
যথেষ্ট শান্তভাবে বল- রাজন-‘আমার জায়গায় হলে তুমি কি করতে?’
- ‘সত্যি করে বলব?’ লোপার আগ্রহী কন্ঠ শুনতে পেল রাজন।
- হ্যাঁ, তোমার কাছ থেকে আমি সেটাই আশা করছি।
- আপনি যদি আমায় কোন রাতে ফোন করে হাসতে বলতেন তাহলে সেই রাত হত আমার বিয়ের আগের শ্রেষ্ঠ
রাত, আমি আপনাকে সারারাত আমার হাসি শোনাতাম।’
- ‘জীবনে কোনদিন ভুলেও আমি ঐ কাজটি করতে যাব না’ মনে মনে ভাবল ও, ’বিয়ের আগে কেন? ’ এই
প্রশ্নটি করতে গিয়েও করল না, পাগলের সাথে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, ফোন রাখতে পাড়লেই ও বাঁচে। ‘গুড
নাইট’ বলে রেখে দিল, ’দাঁড়ান দাঁড়ান, আসল কথাটাই তো বলা হয়নি’ প্রায় চেঁচিয়ে উঠল লোপা।
- ’ এখনও কথা বাকি আছে?’
- হ্যঁ, যে কারনে ফোন করেছিলাম সেটা বলতেই তো ভুলে গেছি।
- কারনটা কি?
- প্রচন্ড বিরক্তিতে ঘুম চলে গেছে। নাহ্, এর একটা বিহিত করতেই হবে। মাঝে মাঝে যখন ওর সহ্যের সীমা
ছাড়িয়ে যায় তখন ও এমনটা ভাবে। হয় লোপার আব্বু-আম্মুকে ব্যাপারটা জানাবে নয়ত ওকে একদিন চরম
অপমান করবে। ২য় কাজটা করা ওর জন্য খুব কঠিন। ও সেটা করতেও চায় না। যে কেউই চাইবে তার
জীবনের শেষ ক’টা দিন কারো মনে কোন কষ্ট না দিতে। রাজনও চায়। ‘ওর সাথে আমার আরো
সংকীর্ন হতে হবে। মনে মনে সিদ্ধাšত নিল। ড্রেস চেন্জ করে নীচে নেমে এল ও, জুলিয়াকে
ফোন করার কথা ভুলে গেল। রাগের চোটে মেইন গেট প্রচন্ড জোরে লাগাল। পেছন থেকে ওর মা চেচিঁেয়
উঠল। কিরে রাজন, এত রাতে কোথায় চলি-?’ জবাবে প্রায় খেঁকিয়ে উঠল ও -‘ঘড়ি চিননা তুমি? সন্ধ্যা
সাতটাকে কি করে এত রাত বল-া?’ গজ গজ করতে লিফটের দিকে হাঁটা ধরল। পনের তলা বিল্ডিংয়ের নয়
তলায় ওদের বিশাল এ্যাপার্টমেন্ট। প্রচন্ড রাগে ওর মাথার ভেতরটা দপদপ করছিলো কিন্তু ও অবাক হয়ে
লক্ষ্য করল, রাগের কারনটা ওর কাছে ¯পষ্ট নয়। দোকানে গিয়ে ৫০ টাকার নোট দিয়ে টিস্যু চাইল,
দোকানদার বল-- ‘ভাংতি নাই।’ ‘ব্যাবসা করেন ভাংতি রাখেন না কেন?’ চেচিয়ে উঠল ও-‘নাকি আপনারা
মনে করেন যে আমরা ভাংতি টাকায় পকেট ভর্র্র্তি করে রাখি? লাগবে না ভাংতি, পুরো টাকার টিস্যু দিন।’
একটু পর ও দুহাতে চারটি টিস্যুর প্যাকেট নিয়ে বাসায় ঢুকল। ওর ঘরে ঢুকেই বেড সাইড টেবিলের উপর
রাখা ফোন সেটটার দিকে ওর চোখ পড়ল, এই জিনিসটা ওর ঘরে এমনভাবে রাখা যে কেউ ওর ঘরে ঢুকলে
প্রথমেই তার চোখ পড়বে ওটার উপর। ওরও পড়ল, আর সাথে সাথেই জুলিয়াকে ফোন করার কথা মনে
পড়ল। দৌড়ে গিয়ে বাথরুমে ঢুকে টিস্যু হ্যাঙ্গারে একটা টিস্যুর রোল সেট করেই দৌড়ে আবার ওর ঘরে এসে
ঢুকল। জুলিয়াদের নাম্বারটা ফোনের মেমরিতে সেইভ করা, নির্দিষ্ট একটা সুইচ টিপতেই লাইন চলে গেল
জুলিয়াদের নাম্বারে। কিন্তু লাইন এ্যানগেইজড। মেজাজ আবার চড়তে শুরু করল ওর। বেশ কয়েকবার
রিডায়াল করেও কোন ফল হল না। ধৈর্য্য হারিয়ে ফেল- ও, অনেক দাম দিয়ে কেনা সেটটা ও এক আছাড়ে দু
টুকরো করে ফেলল। শব্দ শুনে দৌড়ে এলেন ওর মা। -‘কিরে রাজু কি হয়েছে তোর? সেই সকাল থেকে
এমন করছিস কেন?’ মার গলায় ¯পষ্ট উৎকন্ঠা। মার দিকে তাকিয়ে অনেক কষ্টে হেসে বল- ‘জুলিয়াদের
লাইনটা এ্যানগেইজড্ মা...’ - ‘তাতে কি হয়েছে? ফোনের লাইন তো এ্যানগেইজড্ থাকতেই পারে।’ মা
ওকে বোঝালেন-‘তাই বলে জিনিস পত্র ভাঙ্গচুর করতে হবে?’ ওর মা বলতে বলতে ছেলের কাছে এসে মাথায়
হাত বুলিয়ে দিলেন, চেষ্টা করলেন কিছু শাšতনার বাণী ছেলেকে শোনাতে। পারলেন না, বরং গলাটা ধরে এল
তার, একমাত্র সšতানের নিশ্চিত অকাল মৃত্যুর ভবিষ্যতদ্ব্যানী তিনি জানেন, এ অব¯থায় কি শাšতনা তিনি
ছেলেকে দিবেন? এই ছেলের দিকে তাকালে বুক ফেটে কান্না আসে তার। রাজন উঠে গিয়ে ভাঙ্গা ফোন
সেটটার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে সেটাকে ঠিক করার চেষ্টা করতে লাগল। খুব একটা ক্ষতি হয়নি। সিগন্যাল
ট্রান্সফার ডিভাইসটা ঠিক আছে, প্রচন্ড ঝাঁকিতে প্রধান সার্কিটের কয়েকটা তারের সংযোগ শুধু বিছিন্ন হয়ে
গেছে। তাতাল দিয়ে ও নিজেই লাগিয়ে নিতে পারবে। ‘জুলিয়ার আব্বা বিকেলে ফোন করেছিলো’ -ওর মা
হঠাৎ বলে উঠলেন। ও সাঁই করে মার দিকে তাকাল-‘আমাকে ডাকনি কেন?’ - ‘তুই ঘুমাচ্ছিলি বলে।’ মনে
মনে ও নিজের উপর ভীষণ বিরক্ত হল। ও মাঝে মাঝে এমন মরার মত ঘুমায় যে কানের কাছে ফোনের
আওয়াজটাও শুনতে পায় না। -‘কি বলে-ন উনি? ’ -‘জুলিয়ার জ্বর নাকি আরো বেড়েছে। জ্বরের ঘোরে প্রলাপ
বকছে। তোকে এ সপ্তাহেও যেতে মানা করেছে।’ -‘ও...আচ্ছা’ মনে মনে একটু দমল রাজন। ব্যাপারটা মার
চোখ এড়াল না। তিনি বেশ ভাল করেই জানেন, যে রাজন গত ছয় মাস ধরে সব কিছুতেই বোর ফিল করছে,
সে রাজন কেন সামান্য একটা টিউশনিতে চার মাসেও বোর হয়নি? ’ প্রায়ই ভাবেন জুলিয়ার ব্যাপারটা নিয়ে
রাজনের সাথে খোলাখুলি একদিন আলোচনা করবেন। কিন্তু হাস্যকর হলেও সত্য যে কাজটা করতে তার
সাহসে কুলায় না। মাঝে মাঝে মানুষের জীবনে এমন সময়ও আসে যখন চিরচিরিত সব কিছুর নিয়মও পাল্টে
যায়। এই যেমন মা হয়ে তিনি তার ছেলেকে ভয় পাচ্ছেন। -‘সকালবেলা ক্যাটালগ দেখে ফোনটা একটু
টেপাটেপি করছিলাম, নতুন কোন ফাংশন জানার জন্য। মনে হয় তখন ওটা লক হয়ে গেছে, দেখতো খুলতে
পারিস কিনা।’ আসলে নতুন কোন ফাংশন জানার জন্য নয়, রাজনের আম্মা ওটা টেপাটেপি করছিলেন রাজন
প্রতিদিন গড়ে কোন নাম্বারে কতক্ষন সময় দেয় সেটা জানার জন্য। তিনি দেখেছেন যে জুলিয়াদের নাম্বার
ছাড়া ওর ফোনের ডিজিটাল ইনডেক্সে আর কোন নাম্বার নেই, ঐ একটা নাম্বারই ঘুরেফিরে চার-পাঁচ বার
সেইভ করা। তিনি যে রাজনের ইনডেক্স চেক করেছেন সেটার রেকর্ডটা নষ্ট করতে গিয়ে উল্টাপাল্টা টিপে
ফোন লক করে ফেলেছেন। সেই লক খুলার চেষ্টা করতে গিয়ে লকটাকে আরো পার্মানেন্ট করে ফেলেছেন।
আগের ফোনে এত ঝামেলা ছিল না, কিন্তু রাজনের আব্বা ওকে কি এক ছাতার ফোন সেট কিনে এনে দিলেন,
পিচ্চি একটা জিনিসে হাজারটা ফাংশান। দেখতে চান একটা, দেখায় আরেকটা। তবু তিনি যা চেয়েছেন তা
পেয়েছেন বলে রক্ষে। রাজনের ঘরে তিনি খুব একটা আসেন না, যদিওবা মাঝে মাঝে আসেন তাহলে সেটা
শুধু রাজনের ফোনের ইনডেক্স চেক করতে নয়ত ওর পার্সোনাল ডায়রি পড়তে। জানেন কাজটা ঠিক নয়,
তবুও নিজেকে প্রবোধ দিতে পারেন না।
.- ‘তাইতো বলি’- ছোট্ট করে একটা নি: শ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বল- রাজন- ‘লাইন এ্যানগেইজড্ ক্যান্’।
- কিরে কি বলছিস?
- না, কিছু না।
- সেটটা ঠিক হবে?
- সেট ঠিক হবে, তবে লক খুলতে পারব না, এক্সপার্ট আনতে হবে।
- তোর আব্বুকে মোবাইলে বলে দে, ওঁ-ই আনবে।
- ‘এখন পারব না, পরে...’ হাই তুলতে তুলতে বল- রাজন।
আবার ও নীচ তলায় নেমে একটা ফার্মেসীর দোকান থেকে জুলিয়াদের বাসায় ফোন করল। কিন্তু আবার সেই
এ্যানগেইজড টোন। মহা বিরক্ত হয়ে ও কম্পাউন্ডারকে জিজ্ঞেস করল-‘আপনাদের লাইনও কি লকড্ নাকি?’-‘কি যে
বলেন’- সে মুচকি হেসে উত্তর দিল -‘আমাদের প্রফেশনাল লাইন, লক করলে ইনকামও লকড্ হয়ে যাবে।’ এই কথা
শুনে রাজনও হেসে ফেল-। একটু পর আবার করল, ফোন ধরল জুলিয়াদের কাজের মেয়ে, জুলিয়াকে চাইতেই একটু পর
ও এসে ফোন ধরল। ‘-হ্যালো-’
জড়ানো কন্ঠে বল- জুলিয়া। -‘হ্যালো আমি রাজন, কেমন আছো জুলিয়া?’
-ও, স্যার...আমি ভাল আছি স্যার...’
-সেই সন্ধ্যা থেকে তোমাদের বাসায় ট্রাই করছি, কার সাথে কথা বলছিলে?’
ব্রিবত বোধ করল জুলিয়া। কারন ও কথা বলছিলো অনিন্দ্যর সাথে। কিন্তু স্যারকে সে কথা বলতে চায় না। বল-- আমি
না, -আম্মুর এক বান্ধবী ফোন করেছিলেন...
-ও আচ্ছা, আমি ভেবেছিলাম... প্রশ্নটা করেছি বলে কিছু মনে করনি তো?’
-‘না না’ বিনয়ী স্বরে বলল ও ‘আপনি যেহেতু অনেকক্ষন ধরে আমাদের লাইনে ট্রাই করছেন সেহেতু এ প্রশ্ন করার
অধিকার আপনার আছে।’ একটু থেমে আবার বল--‘আব্বু মনেহয় বিকেলে আপনার কাছে ফোন করেছিলেন...’
-হ্যাঁ, আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। আম্মু বলেছে। আমি একবার আসব নাকি জুলিয়া?
‘ন্...না, আব্বু বলেছিলেন আমি সুস্থ্য না হওয়া পর্যšত... কেন, তিনি আপনাকে এ ব্যাপারে কিছু বলেননি?’ উদ্বিগ্ন স্বরে
বল- জুলিয়া।
‘আরে না না বোকা মেয়ে!’ রাজন হেসে ফেল- -‘পড়াতে নয়, আমি বলছিলাম যে তোমাকে দেখতে আসব কিনা?’
কেন আমাকে দেখতে আসার কি হল?’ মনে মনে ভীষণ বিরক্ত হল ও ‘আমার কি নতুন করে রুপ গজিয়েছে নাকি?’
জুলিয়া কাছে কেন যেন মনে হয় ওর এই স্যার ওর প্রতি অস্বাভাবিক আগ্রহ দেখায়। তাই ও রাজনের সাথে ফোনে কথা
বলতে বিব্রত বোধ করে। মনে হয় যেন রাজন ওর লাভার, আর ও ওর লাভারের সাথে কথা বলছে। ছিহ্। তাই রাজনের
ঐ প্রশ্নের উত্তরে আমতা আমতা করে বল- -‘হ্যাঁ, আসতে পারেন, যদি আপনার কোন সমস্যা না হয়...’
‘না না আমার আবার সমস্যা কিসের?’ খুশী হয়ে উঠল রাজন। দীর্ঘ (!) নয় দিন পর জুলিয়ার সাথে দেখা হতে যাচ্ছে।
‘আগামীকাল বিকেলে আসছি আমি। ভাল থেকো। রাখি।... ও হ্যা আর একটা কথা...
- ‘কি স্যার?’
- ‘না কিছু না, এমনিই, রাখি, আল-াহ হাফেয।’ কি মনে করে শেষ পর্যন্ত সপ্নের কথাটা চেপে গেল রাজন। ফোন রেখে
তমার মোবাইলে ফোন করল- ‘কিরে তুই কোথায়?’-
- আমি এখন এ্যাগোরায় রাজু ভাই, শপিং করছি,
- তাতো বুঝতেই পারছি, ওখানে তো আর কেউ হাওয়া খেতে যায় না।
- কে বলেছে তোমাকে? আমি নিজেই তো মাঝে মাঝে এখানে হাওয়া খেতে আসি।
- তাই নাকি? এ্যাগোরায় কি আজ কাল বিনামূল্যে হাওয়াও বিক্রি করছে নাকি?
- তা একটু আধটু করছে। আচ্ছা, তুমি তো ফোনে খাজুরে আলাপ করার লোক নও। ফ্রেশ মুডে আছো মনে হচ্ছে। কি
ব্যাপার?
- কোন ব্যাপার না, পরীক্ষার সময়ই শুধু শপিং করতে মন চায়, তাই না? একজন ফোনে ম্যরাথন আড্ডা দেয়,
আরেকজন শপিং করে বেড়ায়। বাহ্। তোদের দেখলে কে বলবে তোদের সামনে ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা।’ হালকা মজা করল
রাজন।
-পরীক্ষা কারো পেছনে থাকে না, সামনেই থাকে, বিনা পয়সার উপদেশ শুনাবার জন্যই কি ফোন করেছ?’
- বিনা পয়সায় না রে, আমার আজ নগদে বিল দেয়া লাগবে, শোন, একটা কাজ আছে. তুই তো এখন রাইফেলস্
স্কয়ারে তাই না?
- কোন সন্দেহ নাই,
-ভালই হল, শোন, তোর বান্ধবী লোপার জন্য দেখেশুনে একটা গিফট্ কিনে আমার বাসায় দিয়ে যা, আমি তোকে টাকা
দিয়ে দেব, তোর গাড়ীর তেলের দাম সহ’ আবার মজা করল ও।
- ‘ও এই ব্যাপার!’ ও মজা করল ‘তা লোপার জন্য হঠাৎ গিফট কেন? বিশেষ কোন ঘটনা আছে?’
-আরে ধ্যাৎ, বিশেষ কোন ঘটনা ফটনা না, ও জন্মদিন বাঁধিয়ে ফেলেছে, আগামি মঙ্গলবার নাকি ওর জন্মদিন!’
-কি? কাল ওর জন্মদিন?’ তমা রীতিমত বিস্মিত।
-কেন তুই জানিস না? তুই না ওর বেস্ট ফ্রেন্ড?
-আমি তো জানি ওর জন্মদিন আগামী মাসে, আগামীকাল নয় !
-ত্ইু শিওর?’ রাজন থমকে গেল।
-সেন্ট পারসেন্ট, গত বছরই তো সবাই মিলে ওর বার্থ ডে সেলিব্রেট করলাম।
-তবে ও যে বল- কাল ওর জন্মদিন। মিথ্যুক কোথাকার!
-তোমাকে ইনভাইট করেছে?
- হ্যাঁ...
-‘আগামি মঙ্গলবার যেহেতু বলেছে,আমার মানে হচ্ছে সেহেতু সেই মঙ্গলবারের বিশেষ কোন একটা তাৎপর্য আছ।’
এই প্রথম মঙ্গলবারের কথাটা নিয়ে ও চিন্তা করল, ঠিকই তো...জন্মদিন হলে তো ডেট বলাটাই স্বাভাবিক ছিল। নির্দিষ্ট
করে ‘বারের’ কথা বল- কেন? মঙ্গলবার কয় তারিখ?...এবং সাথে সাথেই পুরো ব্যাপারটা ওর কাছে পরিস্কার হয়ে গেল।
এই জন্যই তারিখটা বলেনি ও, তাহলে অনেক আগেই বুঝে যেত। তবু কেন এটা এত দেরিতে বুঝল! নিজের উপর
ভীষন রাগ হল ওর। আর এমনি সময় তমা প্রায় চেচিঁয়ে উঠল, ’এ্যাইরে, সেরেছেরে! মঙ্গলবার তো ভ্যালেনটাইনস্ ডে।’
-হু, তাই তো দেখছি।
- হু, তাই তো দেখছি মানে? তুমি আগে থেকেই জানতে এটা? তাহলে এত ঢং করলে কেন?
-আরে না, এইমাত্র বুঝতে পারলাম,... হঠাৎ।
-আগে কিছু আন্দাজ করতে পারনি? তুমি তো দেখছি বিরাট গবেট।
-আচ্ছা ঠিক আছে, আমি না হয় বিরাট গবেট, কিন্তু মহামান্যা জ্ঞান কন্যা, আপনি আর কি কি আন্দাজ করতে
পেরেছেন?
-ভ্যালেনটাইনস্ ডে তে একজন তরুনি মেয়ে একজন যুবককে তার বাসায় বিশেষ ভাবে আমন্ত্র্রন জানিয়েছে। এখানে
আলাদা করে আন্দাজ করা - করির কি আছে?
-সেটা ঠিক আছে, কিন্তু তাই বলে এমন ডাহা মিথ্যা বলে?
-শোনো, শুধু শুধু মিছে বলার মত মেয়ে ও নয়। তোমার সাথেও বলেনি। এমনও তো হতে পারে যে, ভালবাসার
জন্মদিন বলতে গিয়ে, মানে ভালবাসা দিবসের কথা বলতে গিয়ে নিজেরটা বলে ফেলেছে।’ হাসতে হাসতে বল- তমা।
মঙ্গলবার তো? এখনও সপ্তাহ খানেক বাকি। তুমি গিফট নিয়ে ওর বাসায় যাও, দেখ তারপর কি হয়। আমি গিফট নিয়ে
আসছি।
-ধুর, আমার আর খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, তাই না? স্টুপিডটার কথা আমি তখনি অবিশ্বাস করেছিলাম। শোন আমি রাখি,
তুই তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যা, রাত অনেক হয়েছে।’ তমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ও লাইন কেটে দিল।
লোপা যে ওর সাথে এমন করবে তা ও কোনদিন চিšতাও করেনি। মিথ্যুকের সাথে রাজনের কোন কথা নেই। রাজন
মনে মনে তৃপ্ত হল- ‘যাক্, ওর পাল-া থেকে রেহাই পাবার ভাল একটা অজুহাত পাওয়া গেল। আর ওর বাসায় যাবার তো
প্রশ্নই উঠে না। ও ওর কেনা গোলাম না। লোপার ব্যাপারটা
ও মাথা থেকে পুরো ঝেরে ফেল-। এরপর ওর আব্বুকে ফোন করে ফোনের মেকানিক আনতে বল-। ফোন করে ফেরার
সময় ভেবেছিলো এক পাতা ডিসপ্রিন নিয়ে যাবে, ভীষণ মাথা ধরেছিলো, কিন্তু জুলিয়ার সাথে কথা বলার পর সেটা যেন
কর্পূরের মত উবে গেছে। মনে মনে প-ান করল আগে থেকে জুলিয়াকে কিছু জানাবে না, কাল ওদের বাসায় যাবে, পরশুও
যাবে, পারলে ১৪ তারিখের আগে আরো একবার যাবে। তাতে করে, ও ভ্যালেনটাইনস্ ডে’র দিন গেলে জুলিয়া বা ওর
বাবা-মা ব্যাপারটা হয়ত কিছু সন্দেহ করবে না। তবে জুলিয়া বুঝলেও বুঝতে পারে। মেয়েরা সাধারনত অল্প বয়সেই
ম্যাচিউরড্ হয়ে যায়। আর এজাতীয় ব্যাপারে ওরা চোখ কান আরো খোলা রাখে। ওর এখন কেমন যেন একটা কেয়ার
লেস ভাব। জুলিয়া বুঝতে পারলেও ভাল, না পারলেও ভাল। ও বাসায় ফিরল গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে।
ইন্ডিয়ান ব্যান্ড সিঙ্গার ব্যালী সাগোর নতুন একটা র্যাপ গান। রিলিজ পাওয়ার কিছুদিনের মাথায়ই এমটিভি মিঊজিক
এ্যাওয়ার্ড পেয়ে গেছে। গানের মিউজিক ভিডিওটা এরকম:- বেশ সুদর্শন এক তরুন বৃষ্টিতে ভিজে সাইকেল চালিয়ে
প্রেমিকার জন্য একগাদা ফুল নিয়ে আসছে, জন্মদিনে উপহার দিবে বলে। কিšতু নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই সে চলে
আসে বলে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজেই সে তার প্রেমিকার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। আর সে সময়টাতে সে বিভিন্ন মধুর
স্মৃতিচারনে ব্য¯ত থাকে। এক সময় দেখা যায় বৃষ্টি থামে, রোদও উঠে কিন্তু মেয়েটির আসার নাম নেই, অগত্যা ছেলেটি
ফুলগুলো মেয়েটির বাসার গেটের সামনে রেখে চলে যায়। একটুপর সে বাড়ার দারোয়ান এসে ফুলগুলো ডাস্টবিনে ছুঁেড়
ফেলে দেয়। আর অন্যমনস্ক থাকায় ছেলেটি মাঝপথে ট্রাক চাপা পড়ে। ঠিক সেই সময়টাকেই মেয়েটি তার জন্মদিনের
কেক কাটে। একটি ছেলেকে যে সে আমš্রন জানিয়েছে সেটা হয়ত তার মনেও নেই। রাজন যখন এ গানটি গাচ্ছিল ঠিক
সে সময়টাতে লোপা নিজেকে সাজাতে ভীষণ ব্য¯ত। রাজন হয়ত কোনদিনও জানবে না ঠিক এমন সময়টাতে লোপা
কতটা সুখের ডালি সাজিয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করার প্রস্তুতী নিচ্ছিল।
বাসায় এসে আবার মাথা ব্যাথা শুরু হল ওর এবং আ¯েত আ¯েত সেটা বাড়তে থাকল। এই হয়েছে এক যন্ত্রনা, রোগ
একটা হলে আর দেখতে হয় না। সেটা ওর পিছু আর কিছুতেই ছাড়তে চায় না। বরং ধীরে ধীরে আরো বিকট আকার
ধারন করে। সব ক্যান্সার রোগীদেরই কি এমন হয়? নিত্য নতুন একেকটা অসুখ শরীরের ভেতর বাসা বাঁধে? আর রোগ
প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্রমেই কমতে থাকে বলেই কি রোগও তার ডালপালা ছড়িয়ে দেয়? সেদিন রা¯তায় ওর পাশ দিয়ে
একটা লোক সিগারেট খেতে খেতে হেটেঁ গেল, আর তাতেই ও কাশতে কাশতে শেষ। এখন ও পানি ছুঁেতও ভয় পায়।
যদি নিউমোনিয়া হয়ে যায়!
গত বছরের শেষ দিকে ওর ব-াড ক্যান্সার ধরা পড়ে। মানুষের শরীরে প্রতি চার মাস পর পর রক্তকনিকা আপনাআপনিই
পরিবর্তন হয়, এটা প্রাকৃতিক ও চিরšতন প্রক্রিয়া, যে প্রকিয়াটি ওর রক্ত হঠাৎ করেই বছরখানের আগে বন্ধ করে
দিয়েছে। তবে কৃত্রিমভাবে সেটা চালু করা সম্ভব। রাজনেরটা সেভাবেই চলছে। কৃত্রিমভাবে প্রতি চার মাস পর ওকে রক্ত
দেয়া হয়। সংগৃহীত রক্তকে হাজারটা পরীক্ষা করা হয়, তারপর আবার মাঝে মাঝে ব-াড গ্র“প ম্যাচ করে না, করলেও ওর
বডিতে স্যুট করে না, সে এক বিরাট ঝামেলা। সবচে’ বড় কথা হল পদ্ধতিটা অত্যšত ব্যয় বহুল। ডাক্তার বলেছে
আগামী মাসেই ওর ব-াড ট্রান্সফার করা লাগবে। কিšতু ওর তাতে কোন আগ্রহ নেই। কারন, এটা তেমন একটা
নির্ভরযোগ্য নয়। বড় জোর এক কি দেড় বছর। তারপর হয়ত আর সিস্টেমটি কাজ করবে না, অর্থাৎ রাজনের আয়ু ঐ
এক-দেড় বছরে গিয়ে ঠেকেছে। যদিও ডাক্তার খোলাখুলি ভাবে এখনও ওকে কিছু বলেনি। ব্যাপারটা ও আর ওর মা
বাবা ছাড়া আর কেউ জানে না। মাদ্রাজের ডাক্তাররা চেকাপের পর ওকে রেজাল্ট জানানোর সময় বিভিন্ন কথা বলে স্বান্ত
না দিচ্ছিল, তখন ও বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলো, আসল ঘটনাটা জানার পর ও হাফ ছেড়ে বাঁচল। যেন এমন একটা ভাব
Ñ‘ও, ক্যান্সার? এ আর এমন কি?’ অথচ ওর আব্বু-আম্মু ওকে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না। মৃত্যুর আগে ও পৃথিবীটা ঘুরে
ফিরে দেখতে চেয়েছিলো, ওর আব্বু সব ব্যবস্থা প্রায় কমপি-ট করে ফেলেছিলেন, কিšতু ‘কি হবে শুধু শুধু মায়া
বাড়িয়ে?’ ভেবে শেষ পর্যšত ওর আর কোথাও যাওয়া হয়নি। একটা প্রাইভেট ফার্মে বেশ মোটা বেতনের চাকরি
পেয়েছিলো ও। মাদ্রাজ থেকে ফিরে সেটাতে রিজাইন দিয়ে দিয়েছে। এখন ও প্রাায়ই ভাবে কাজটা ঠিক হয়নি। চাকরিটা
করে অšতত: সময় কাটানো যেত। একটা মাস শুধু ও ঘরে বসে কাটাল। ঠিকমত খাওয়া হত না, ঘুম হত না। কারো
সাথে কথা বলতে ইচ্ছে হত না। বাথরুমে গেলে দম বন্ধ হয়ে আসত। সে এক ভয়াবহ সময় কাটিয়েছে ও। সে সময়ের
স্মৃতি ওকে এখনও আতঙ্কিত করে দেয়। সাধারনত মৃত্যুর আগে মানুষের জীবন¯পৃহা বেড়ে যায়। ওর হয়েছে উল্টোটা।
সার্বক্ষনিক সাথী মোবাইলটাও ঝামেলা মনে করে মামাত বোন তমাকে দিয়ে দিয়েছে। কিšতু গাধীটা সেটা বিক্রি নতুন
আরেকটা সেট কিনে ওকে আবারও ঝামেলার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ওকে এখন প্রতিমাসে বিল দিয়ে বেড়াতে হয়। তবে
ও ডিশিসান নিয়েছে আগামী মাস থেকে ও আর যাবে না, লোক পাঠাবে। হোক বাসা কাছে।
ওর বেঁচে থাকার সাধ গোসল করার সাবানের মত একটু একটু করে ক্ষয়ে যাচ্ছে। এক সময় হয়ত নি:শেষ হয়ে যেত,
কিšতু একটু সময় কাটানোর জন্য ও যখন একটা টিউশানি নিল, তখনই ঘটনা প্যাঁচ খেয়ে গেল। জুলিয়া ওকে পুরো
এলোমেলো করে দিল। ওর বেঁচে থাকার সাধ মেয়েটা ক্রমেই বাড়িয়ে তুলছে। এখন তাই ও ভাবছে টিউশানিটাই ছেড়ে
দেবে, কিšতু সেটা কি আদৌ ওর পক্ষে স¤ভব হবে? ও ফিরে গেল পাঁচ মাস অতীতে।
পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে
গিয়েছিলো ও জুলিয়াদের বাসায়। বাসার চারপাশে ডজনখানেক গলি। গলির ভেতর গাড়ি নিয়ে বাসা খোজাঁটা বেশ
কষ্টকর। তাই একটা গলির মুখে ওর গাড়িটা পার্ক করে জুলিয়াদের বাসা খুজতে বেরুল। গলির গোলক ধাঁধাঁ থেকে
ওদের বাসাটা খুজেঁ বের করতে ওর কাল ঘাম ছুটে গেল। কিšতু জুলিয়ার আব্বা যখন ওকে জিজ্ঞেস করল- ‘বাসা খুঁজে
বের করতে কোন অসুবিধা হয়নি তো?’ ও হাসি মুখে মাথা নেড়ে জানিয়েছে যে ওর কোন অসুবিধাই হয়নি। তারপর
মুখে বলেছে আপনাদের বাসাটা বড় রা¯তার আরেকটু ধারে হলে ও আরো তাড়াতাড়ি খুঁেজ বের করতে পারত।
(ব্লগের কারিগরি ঝামেলার জন্য পুরোটা দেয়া গেল না। বাকীটা কাল দেব।)
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১২:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



