মার্টিন প্লেস থেকে আগে কখনো বাসে উঠিনি। তাই স্টপিজটাও ঠিক ঠাহর করতে পারছি না। চারদিক শুনশান। উইক ডেজে যেখানটায় লোকে গিজগিজ করে, উইকএন্ডে সেটা খা খা। একটু আগে পশলাখানেক বৃষ্টি হয়েছে। বাতাসে সোঁদা মাটির স্যাতঁস্যাঁতে গন্ধ। আমি খোলা আকাশের নীচে বুক ভরে শ্বাস নিলাম। আমার কাছে এ গন্ধটা অসম্ভব ভালো লাগে। একটু এগোতেই ল্যাম্পপোস্টে ঝোলানো একটা কর্মাসিয়াল দেখলাম। আমাকে বলছে, 'আপনি এখানে এসে দয়াকরে আপনার মোবাইল ফোনের ব্লু টুথ অন করুন।' খানিকটা অবাক হলাম।আমার মোবাইল ফোনের ব্লু টুথ অন করলাম। সাথে সাথেই একটা ম্যাসেজ পেলাম। যেটা ছিল আসলে 'দি অস্ট্রেলিয়ান' পত্রিকার একাট আধুনিক বিঞাপন! সেদিনের পুরো পত্রিকাটি সেখানে ইন্টার এ্যাকটিভ এমএমএস এ রুপান্তর করে দেয়া ছিল। মুচকি হেসে ভাবলাম, প্রযুক্তি আজ কোথায় চলে গেছে! আচ্ছা, প্রযুক্তি কি পারে না আমার ভেজা মাটির স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধটা একটা পারফিউমের বোতলে ভরে দিতে?
কিছুদূরেই বাসের একটা প্লাটর্ফম দেখলাম। একদম ফাকাঁ। কাছে গিয়ে দাড়াঁলাম। একটুপর একটা মেয়ে এসে বসল পাশে। আমার ব্যক্তিগত ধারনা হল, ওজি মেয়েদের গড়পড়তা চেহারা সুরত খুব একটা আর্কষনীয় নয়। তাই সচারচর ওদের দিকে দ্বিতীয়বার আর তাকানো হয় না। কিন্তু এই মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আমার চোখের তারাগুলো যেন আবার কথা বলে উঠল। দেখতে অদ্ভুত সুন্দর মেয়েটি! মেয়েদের চোখের দিকেই আমার চোখ সবার আগে যায়। যার চোখ যতবেশী সুন্দর, আমার চোখে সে ততবেশী সুন্দরী। এই মেয়েটির চোখ দেখে মনে হল প্রশান্ত মহাসাগরের সবটুকু নীল এই মেয়ের চোখদুটোতে গুলে দেয়া হয়েছে। কাঁধ পর্যন্ত মোলায়েম তন্তুর মত গাঢ় সোনালী চুল, পরনে ফেড জিনসের সাথে ফুল স্লীভ হালকা হলুদ রঙ্গয়ের টি শার্ট, সাথে গলায় আলতো করে জড়ানো আকাশী রংয়ের ছোট্ট একটা মাফলার। হাতে বিশাল একটা ব্যাগ, ফুলে আছে। বড়জোর ২০/২১ হবে বয়স। আমি খুব স্বাভাবিক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম, সেটা খেয়াল করে মেয়েটা হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিয়ে খুব মৃদু স্বরে বল্ল- 'হাই!' আমিও ভদ্রতা করে পাল্টা একটা হাসি দিয়ে বল্লাম- 'হ্যাল্লো!'
একটু পর খুব মোলায়েম স্বরে বল্ল- 'Could you let me know if there is any bus departs to the city from here?'
আমি বল্লাম - 'sorry, i dont know either, umm...but I hope so.'
আমার আশাবাদ ওকে বেশ খুশী করে দিল। তাই এবারের হাসিটা আগের চেয়েও চমৎকার করে দিল। আমি কথা আরো বাড়ানোর জন্য মুখ খোলার আগেই দেখি একটা বাস এসে আমাদের সামনে দাঁড়ালো। এমনিতে সিটি রেইলের বাস কখনোই টাইম মত আসেনা। সেদিন মরার বাস মনে হল টাইমের একটু আগেই চলে এসেছিলো। মনে মনে বাসের ১৪ গোষ্টি উদ্ধার করলাম মুখে একটা সুন্দর হাসি ঝুলিয়ে রেখে ওকে বল্লাম 'here you go!'
বাসওয়ালার কাছ থেকে জানা গেল বাস সিটির দিকেই যাচ্ছে। বাসে প্রচন্ড ভীড়। আমি আর ও একদম বলতে গেলে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছি। এই ব্যাপারটি আমাকে বিরাট এক অস্বস্তির ভেতর ফেলে দিল। ঠিকমত দাঁড়াতেও পারছি না, আবার ব্রেকের জন্য ওর উপর গিয়ে যাতে না পড়ি সেই কসরতও করতে হচ্ছে। মহা জ্বালা। আমি বাইরে তাকিয়ে ছিলাম, হঠাৎ দেখলাম একটা কড়া ব্রেকে ও আমার প্রায় গায়ের উপর এসে পড়েছে। খুব লজ্জা পেল মেয়েটা। লজ্জিত কন্ঠে বল্ল -'সরি'। আমিও খুব লজ্জা পাচ্ছিলাম , শুধু বল্লাম- 'ইউ আর অলরাইট।'
একটুপর একটা সিট পেলাম, ভাগ্যক্রমে। আমি না বসে স্বভাবতই ওকে বসতে দিলাম। ভীষন আন্তরিক একটা ধন্যবাদ পেলাম।
ও বসে আছে। আর আমি ঠিক ওর সামনেই দাঁড়ানো। ভীড়ের কারনে অন্যদিকে সরতেও পারছি না। সে আরেক অস্বস্তিকর অবস্থা। কাকতালীয়ভাবে হাবিবের কৌতুহল গানটা তখন শুনছিলাম। গানের প্রায় প্রতিটা লাইনের সাথেই আমাদের ঘটনাগুলো মিলে যাচ্ছিল। মনে হল আমরা বুঝি গানটার মিউজিক ভিডিওতে অভিনয় করছি। সে এক আর্শ্চয অনুভূতি!
একটুপর ও ব্যাগ থেকে ফোন বের করে কার ভয়েস মেইলে যেন একটা ম্যাসেজ রাখলো, Hello, its April, can u give me a call when u're available. Thanks very much.
ও ফোন করার আগেই আইপডের ভলিউম কমিয়ে দিয়েছিলাম। নামটা জানার পর অবাক চোখে আরেকবার দেখলাম ওকে। কি অদ্ভুত নাম! "এপ্রিল!"
আমি আমার সুনয়নার নামটা জানতে পারলাম!
(মাবুদে এলাহী, এই লেখাটা যেন নওরীনের চোখে না পড়ে
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ১১:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


