উপদেষ্টারা ব্যর্থ, টিম লিডার কি সফল
◙ মতিউর রহমান চৌধুরী ◙
উপদেষ্টারা পদত্যাগ করেছেনÑ এটা এখন আর খবর নয়। খবর হচ্ছে, কেন তারা পদত্যাগ করলেন। কি তাদের অপরাধ। এটা তো জানার অধিকার রয়েছে জনগণের। তাছাড়া মুখ্য প্রশ্ন হচ্ছে, উপদেষ্টাদের পদত্যাগ করার কথা প্রধান উপদেষ্টা কি বলতে পারেন? আমরা যদি সংবিধান মানি, আমরা যদি নিয়মকানুন মানিÑ তাহলে উপদেষ্টাদের পদত্যাগ করার কথা বলার কোন অধিকার নেই বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ড. ফখরুদ্দীন আহমদের। কেবলমাত্র প্রেসিডেন্ট ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদই এখতিয়ার রাখেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর না হলে হয়তো ফখরুদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতেন না। গভর্নর হওয়ার কথা ছিল বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. শামসুল হুদার। নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ আপত্তি তুললে সাইফুর রহমান সাহেব সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। তখনও ড. ফখরুদ্দীন আহমদ ওয়াশিংটনে। ঘন ঘন যোগাযোগ রাখছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের সঙ্গে। বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নাম বিবেচনায় আসে। সাইফুর রহমান এক পর্যায়ে তাকেই মনোনীত করে সামারি পাঠান প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছে। এরপর নিজেই ফোন করে ফখরুদ্দীন আহমদকে অতিসত্বর দেশে চলে আসার পরামর্শ দেন। তিন দিন পর দেশে আসেন ফখরুদ্দীন। এরপর দায়িত্ব নেন গভর্নরের। পাক্কা দুই মাস সাইফুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের যাবতীয় কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। কারণ ফখরুদ্দীন আহমদের কাছে বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ অজানা। যা-ই হোক, গভর্নরের দায়িত্ব পালন শেষে পরে পিকেএসএফ-এর দায়িত্ব নেন। এই যখন অবস্থা তখনই ওয়ান-ইলেভেনের ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটে যায়। কাকে করা হবে প্রধান উপদেষ্টা? বঙ্গভবনে বসেই পর্দার আড়ালের নীতিনির্ধারকরা ছুটে যান নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ইউনূসের বাসায়। তাদের একান্ত ইচ্ছা, তাকে এ পদে আসীন করা। প্রায় দু’ঘণ্টা কথা চললো। ইউনুস কিছুতেই রাজি নন। তার ব্যস্ততার কথা জানালেন। বললেন, তাকে অনেকগুলো বক্তৃতা করতে হবে দেশে এবং বিদেশে। এ জন্য সময় দেয়া সম্ভব নয়। তবে তিনি তাদের পরামর্শ দেন। বলেন, আমি পারলাম না তাতে কি? আমার বন্ধু ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে আপনারা বলে দেখতে পারেন। সে খুব ভাল চয়েস হবে। ইউনূস সাহেবের অবশ্য নজর ছিল প্রেসিডেন্ট হওয়ার। উপায়ান্তর না দেখে নীতিনির্ধারকরা ফখরুদ্দীন আহমদের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন রাতেই। এর আগে প্রফেসর ইউনূস বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে ফেলেছেন। নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা হলো প্রায় দু’ঘণ্টা। রাজি হলেন ড. ফখরুদ্দীন আহমদ। নীতিনির্ধারকরা তখনও জানতেন না কেমন করবেন ড. ফখরুদ্দীন।
একের পর এক সঙ্কটে পড়ছে সরকার। জনবিচ্ছিন্নতার দিকে ছুটে চলেছে। প্রশাসনে গতি নেই। ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির। ঋণে ডুবে যাচ্ছে সরকার। কিন্তু নির্বিকার ড. আহমদ। সব দোষ উপদেষ্টাদের ওপর চাপিয়ে নিজে ক্লিন থাকার চেষ্টা করছেন। শিক্ষা ও সংস্কৃতি উপদেষ্টা ড. আইয়ুব কাদরী বিদায় নিলেন পুরাকীর্তি ইস্যুতে। ফ্রান্সের গিমে জাদুঘরে পুরাকীর্তি যাবে এই সিদ্ধান্ত কি সংস্কৃতি উপদেষ্টা এককভাবে নিয়েছিলেন? এই সিদ্ধান্ত হয়েছিল উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে। একা সংস্কৃতি উপদেষ্টা বিদায় নেবেন কেন? প্রধান উপদেষ্টার কি এখানে কোন দায়িত্বই নেই? বলা হচ্ছে, সংস্কৃতি উপদেষ্টা চুরি ঠেকাতে পারেননি। এটা কি উপদেষ্টার কাজ? বিমানবন্দর হচ্ছে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও নিয়ন্ত্রিত এলাকা। জনসাধারণের প্রবেশও নিষেধ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখের ডগায় কিভাবে চুরি হলো?
এরপর একযোগে চারজন উপদেষ্টাকে পদত্যাগ করতে বলা হলো। তারা তাৎক্ষণিকভাবে পদত্যাগ করলেন। পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে উপদেষ্টারা হাজির ছিলেন। এক ঘণ্টার মধ্যে এমন কি ঘটলো তাদেরকে পদত্যাগ করতে বলতে হবে? রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে উপদেষ্টারা খোশ মেজাজেই ছিলেন। তিন বাহিনীর প্রধানগণ ছাড়াও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসারও সেখানে উপস্থিত। উপদেষ্টারা পদত্যাগ করতেই পারেন। তাদেরকে পদত্যাগ করার কথা বলা যেতে পারে। তাই বলে একদম সময় দেয়া যাবে নাÑ একি কথা! তারা তো তাদের কাজ গুছিয়ে যথাযথভাবে বিদায় নিতে পারতেন। সেটাই হতো শোভনীয়। কিন্তু এভাবে টার্মিনেট করা হলে ভবিষ্যতে উপদেষ্টা হতে কেউ এগিয়ে না-ও আসতে পারেন। মনে করা প্রয়োজন, এই ব্যক্তিত্বদের কেউই ধরনা দিয়ে উপদেষ্টা হননি। তাদেরকে ডেকে আনা হয়েছিল। তাছাড়া প্রশ্ন উঠেছে আরও। দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। জাতীয় প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী। এক ভাগ প্রবৃদ্ধি কমলে রাষ্ট্রের ১৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। গত ১৫ বছরেও ১৫ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছেÑ এর তো কোন দালিলিক প্রমাণ নেই। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে নিত্যপণ্য। চালের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। মানুষ বাঁচার তাগিদে খাদ্যাভ্যাসও পরিবর্তন করতে পারছে না। কারণ চালের চেয়ে আটার দাম বেশি। ড. ফখরুদ্দীন সরকারের বোধ করি এটাই অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অর্থনীতিতে সব সূচক নিচের দিকে। বিগত ৩৬ বছরে এমনটা হয়নি। এ রকম এক অবস্থায় অর্থ উপদেষ্টা মীর্জা আজিজুল ইসলাম দায় এড়াবেন কি করে? সবাই জানে, মীর্জা সাহেব প্রধান উপদেষ্টার জানি দোস্ত। এ কারণে তাকে প্রটেকশন দিয়ে চলছেন তিনি। অথচ উপদেষ্টাদের বাদ দেয়ার তালিকায় অর্থ উপদেষ্টার নাম ছিল শীর্ষে, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।[/sb
এই সরকার রাজনৈতিক নয়। তবে রাজনীতিকদের মধ্যেকার অবিশ্বাস, ভুল বোঝাবুঝি ও অনৈক্যের ফসল হচ্ছে অ™ভুত ধরনের এই সরকার। রাজনীতিবিদেরা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন সেদিন তারা কি ভুলই না করেছিলেন। সরকার রাজনৈতিক না হলেও রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার কথা এই সরকারের। এক বছর পার হয়ে গেল, ড. ফখরুদ্দীন রাজনীতিবিদদের সঙ্গে একটি বারের মতো কথা বললেন না। বরং বক্তৃতা-বিবৃতিতে একতরফা দোষারোপই করে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক কোন দিকনির্দেশনা তিনি দিতে পারেননি। রাজনৈতিক সংস্কারও হলো না। অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনাই বা কি দিয়েছেন? নিজের ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা করেছেন পাঁচ উপদেষ্টাকে পদত্যাগ করতে বলে। প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন যেমনটা করেছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাজ হচ্ছে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা। সে পথে কি সরকার যাচ্ছে? কেন মানুষের মনে নির্বাচন নিয়ে সংশয়। উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন যখন কথা বলতেন তখন মনে হতো তিনিই সরকারপ্রধান। তার কথাবার্তায় সরকার যে অপ্রিয় হয়ে উঠছে, মানুষের যে রাগ বাড়ছেÑ তা কি সরকারপ্রধানের নজরে পড়েনি? তিনি কি একবারও ডেকে ব্যারিস্টার হোসেনকে নিবৃত্ত হতে বলেছেন যে, মি. উপদেষ্টা, আপনি সীমা লঙ্ঘন করে জনগণকে নিয়ে খেলা করছেন। রাজনীতিবিদদের অপমান করছেন। এটা দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর হবে না। অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছিলেন ব্যারিস্টার হোসেন। মার্কিন লেখক অ্যালান কেইজের বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে, ‘স্বাধীনতা মানে সীমাহীন লাইসেন্স নয়, সীমাহীন পছন্দের সম্ভাবনা কিংবা অসীম সুযোগও নয়। স্বাধীনতা প্রথমত একটি দায়িত্ব, ঈশ্বরের কাছে, যার কাছ থেকে আমরা এসেছি।’
খাদ্য উপদেষ্টা তপন চৌধুরী শুধু সরকারের বারোটা বাজাননিÑ মধ্যবিত্তের বেঁচে থাকার ওপর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। তিনি ওই মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাননি, দুঃখও প্রকাশ করেননি। এই যখন অবস্থা তখন টিম লিডার হিসেবে কি প্রধান উপদেষ্টার কোন দায়িত্বই নেই? নিজের ক্লিন ইমেজ রেখে সরকারকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়ার মধ্যে কি কোন আনন্দ আছে? আমরা খেলার মাঠে কি দেখি? টিম হারলে ম্যানেজার মুহূর্তের মধ্যে পদত্যাগ করেন। ম্যানেজার মনে করেন এটা তার ব্যর্থতা। দেশে দেশে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এমনটা দেখা যায়। বাংলাদেশ কি এর বাইরে?
http://www.manabzamin.net/lead-01.htm

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



