আতাত, প্রস্থান পথ, তারপর...
আহসান মোহাম্মদ
বাংলাদেশের রাজনীতির নিকট ভবিষ্যৎ যে অনেকটাই নির্ধারিত হয়ে গেছে তা বিগত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে :
১. একটি কম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২৬ ডিসে¤¦র পদত্যাগ করেন শিক্ষা ও সংস্কৃতি উপদেষ্টা আইয়ুব কাদরী। বিষয়টি অনেককেই বিস্মিত করেছিল। কেননা এ ধরনের চেয়ারে একবার বসলে ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছা ছাড়া বেরিয়ে আসা যায় না। কিন্তু কয়েক দিন পর যখন আরো চার উপদেষ্টা পদত্যাগ করলেন তখন বোঝা গেল আইয়ুব কাদরীর পদত্যাগে ক্ষমতাসীনদের সায় ছিল।
আইয়ুব কাদরীর পদত্যাগের দুই সপ্তাহের মধ্যে ৮ জানুয়ারি একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা, যাকে সরকারের মুখপাত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তাকেসহ চারজনকে পদচ্যুত করা হয়। বেশ কিছুদিন ধরে আওয়ামী লীগ নেতারা এবং দলটির সমর্থক মিডিয়া ওই উপদেষ্টার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। দেখা যাচ্ছে, উপদেষ্টা পরিষদের সংস্কারের মাধ্যমে একদিকে যেমন স্বাধীনচেতা ব্যক্তিদের সরিয়ে দেয়া হয়েছে, তেমনি তাদেরও বাদ দেয়া হয়েছে যারা আওয়ামী লীগের প্রতি অপেক্ষাকৃত কম সহানুভূতিশীল।
২. এর পরপরই শেখ হাসিনা তার দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেন তাকে জেলে রেখেই নির্বাচনে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়ার। তার এ নির্দেশ এমন সময়ে আসে যখন দুই নেত্রীর মুক্তির দাবি জোরালোভাবে উত্থাপিত হচ্ছিল। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আতাতের বিষয়টি আলোচিত হতে থাকলে ১৩ জানুয়ারি আদালতে জেরার সময় তিনি বলেন, ‘কোনো মিলিটারি ডিক্টেটর ক্ষমতায় আসুক বা প্রেসিডেন্ট হোক তাতে আমি রাজি হইনি। রাজি হলে আমার এ অবস্থা হতো না। এ দেশে বারবার মিলিটারি ডিক্টেটর ক্ষমতায় এসেছে। আমি চাইনি কোনো মিলিটারি ডিক্টেটর ক্ষমতায় আসুক।’ মিলিটারি ডিক্টেটর এরশাদের ক্ষমতায় আসা এবং টিকে থাকার ব্যাপারে শেখ হাসিনার ভূমিকা কারো অজানা নয়, যেমন অজানা নয় এ সরকারের ক্ষমতায় আনার আওয়ামী লীগের দাবি ও তার সব কার্যক্রমকে বৈধতা দেয়ার বিষয়ে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য অঙ্গীকারের বিষয়টি। নিছক হাস্যরস যোগানোর জন্য সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী কোর্টে ওই বক্তব্য দেননি। বরং এটি ছিল ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে তার নতুন আতাত ধামাচাপা দেয়ার প্রচেষ্টা।
৩. এর পরদিনই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দ্রুত নির্বাচন দাবি করা হয় এবং বলা হয়, এ সরকার যদি আগামী বাজেট দেয় তাহলে ৮০ টাকা কেজি চাল খেতে হবে।
৪. কেয়ারটেকার সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. আকবর আলি খান ও আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল অন্য সুশীলরা তারপরও বলতে থাকেন, আগামী বাজেটের আগেই নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
৫. জানুয়ারির চতুর্থ সপ্তাহে পত্রিকাগুলোতে খবর বের হয়, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ ইত্যাদি সহযোগী ও অঙ্গ সংগঠনগুলো শেখ হাসিনাকে মুক্ত করার আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করার জন্য ভারপ্রাপ্ত সভাপতির কাছে লিখিত স্মারকলিপি দিলে তা নাকচ করে দেয়া হয় এবং তাদের ভর্ৎসনা করা হয়।
নেত্রীকে জেলে রেখে এবং নির্ধারিত সময়ের আগে নির্বাচনের বিষয়ে আওয়ামী লীগের আগ্রহের কারণ বুঝতে আরো কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন :
১. দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা ধ্বংস করে বাংলাদেশকে গত ৩২ বছরের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বিদেশ নির্ভর, বিশেষ করে ইনডিয়া নির্ভর করার কাজটি যে বর্তমান সরকার সাফল্যের সঙ্গে সম্পাদন করেছে তা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। এ পরিস্থিতিতে সরকার ও প্রশাসন যন্ত্রকে প্রভাবিত করা দেশটির জন্য সবচেয়ে বেশি সহজ।
২. সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে এককভাবে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাওয়া দলটিকে পুরোপুরি ছত্রভঙ্গ করার কাজটিও ইতিমধ্যে সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়েছে। দলটির নেত্রী ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবসহ প্রথম সারির প্রায় সব নেতাই জেলে। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অসংখ্য অভিযোগ শতকণ্ঠে প্রচার করে দলটির নেতাকর্মীদের মনোবলও পুরোপুরি ভেঙে দেয়া হয়েছে। কেবল যারা দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পেরেছেন তারাই বাইরে রয়েছেন। হান্নান শাহর মতো মধ্যম সারির নেতাও যখন দলকে ধরে রাখার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন, তখন তাকেও জেলে পাঠানো হয়েছে। সাবেক এমপিদেরও একই অবস্থা। অধিকাংশই হয় জেলে, না হয় ফেরারি। বাকিরা গা বাচাতে বিভীষণের দলে। নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সংস্থা দলটি ভাঙার ব্যাপারে প্রকাশ্য ও প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছে।
৩. ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার প্রধান অংশটি বরাবরই বিএনপি বিরোধী। কিন্তু বর্তমানে একটি নীরব মিডিয়া ক্যুর মাধ্যমে বিএনপি নেতাদের মালিকানাধীন মিডিয়াও দলটির বিরুদ্ধে পাল্লা দিয়ে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।
৪. বিএনপির পরীক্ষিত বন্ধু জামায়াতের অবস্থা ‘চাচা, আপন প্রাণ বাচা’র মতো। বিগত নির্বাচনগুলো থেকে ভোটের একটি সরল সমীকরণ সবাই বুঝে গিয়েছিলেন। তা হচ্ছে জামায়াতের ১৫ শতাংশের মতো একটি ভোট ব্যাংক রয়েছে, যা কমবেশি সারা দেশে বিস্তৃত। পাচ বছর ক্ষমতায় থাকার সুযোগে দলটি ভোট ব্যাংকের পরিধি আরো বাড়াতে পেরেছে বলেই অনেকের ধারণা। ফলে জামায়াতকে সঙ্গে পেলে আবারো বিএনপি নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারে। তাছাড়া দলটির রয়েছে সুসংগঠিত, শক্তিশালী ও বিস্তৃত তৃণমূল সংগঠন। ফলে রাজপথের আন্দোলনেও দলটি বিএনপির সহযাত্রী হলে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব। এ কারণে জোট সরকারের পুরো পাচ বছর ধরে চেষ্টা চলতে থাকে বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্কে ফাটল ধরানোর।
৫. দুই নেত্রীই জেলে বা দুজনই মুক্ত থাকলে কার কতো লাভ-ক্ষতি সে বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে। খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে ছত্রভঙ্গ বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ করা কঠিন। নেতাকর্মীদের মনোবলও ফেরানো সম্ভব হবে না। অন্যদিকে শেখ হাসিনাকে জেলে রেখেও আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ এবং সক্রিয় রয়েছে। আবার মুক্ত খালেদা মুক্ত হাসিনার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও ক্যারিসম্যাটিক। খালেদা মুক্ত হলে পুরো হিসাব-নিকাশই পাল্টে যাবে। অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শোচনীয় ব্যর্থতা, দুর্নীতির মামলাগুলো প্রমাণ করতে না পারা, এ সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য আতাত ইত্যাদি কারণে খালেদা জিয়া জেলের বাইরে আসতে পারলে খুব দ্রুত জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে যাবেন।
দেখা যাচ্ছে, সরকার ইতিমধ্যে এমন একটি অবস্থা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে যার ফলে রেফারি শতভাগ নিরপেক্ষ থাকলেও এবং খেলার মাঠটি পুরোপুরি সমতল হলেও বিএনপিকে সহজেই ধরাশায়ী করা যাবে এবং এ অবস্থায় দুই নেত্রীকে জেলে রেখে নির্বাচন হলে তাতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়ে আসবে। ক্ষমতাসীনদের নিরাপদ প্রস্থানের জন্য তাদের পছন্দের দলটির সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। প্রধান দুটি দল থেকে নেতা ভাগিয়ে নিয়ে নতুন দল গড়ার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে সে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে তারা মনে করছেন এ ধারণা হওয়া স্বাভাবিক।
তবে এ সবই হচ্ছে হিসাব-নিকাশের কথা। প্রেম আর বিদ্রোহে পাগল বাংলাদেশিরা হিসাব করে পা ফেলে না। এখানে রাজনৈতিক ও প্রেম বিষয়ক সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় মাথার থেকে হৃদয় বেশি প্রভাব বিস্তার করে এবং হৃদয়ের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়
হিসাব-নিকাশ করে বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন স্বাধীনতার ঘোষণা না দিয়ে পাকিস্তানের জেলে যাওয়ার। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন একজন হিসেবি ব্যারিস্টারকে। ভেবেছিলেন, অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন তিনি। হতবিহ্বল ও নেতৃত্বহীন জাতিকে পথ দেখাতে এগিয়ে এসেছিলেন এক ‘অখ্যাত মেজর’। এ জাতি সেই বেহিসেবি ভালোবাসার মূল্যায়ন করতে যে ভুল করেনি, তার প্রমাণ তার জানাজা। এখনো তিনি তারুণ্য, বীরত্ব ও দেশপ্রেমের প্রতীক হয়ে রয়েছেন।
হিসাব-নিকাশ করে শেখ হাসিনা ১৯৮৬ সালে জাতির সঙ্গে বেইমানি করে স্বৈরাচারকে বৈধতা দিতে নির্বাচনে গিয়েছিলেন। বেহিসেবি সাহস আর দৃঢ়তা দেখিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। তার ফলও কারো অজানা নয়।
অনেক হিসাব-নিকাশ চলছে। তার কিছু পরিণতি তো মান্নান ভূঁইয়াদের মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। এমনকি শেখ হাসিনাও কিছু দেখেছেন।
মুজিব-জিয়া নেই; কিন্তু তাদের উত্তরাধিকার হিসেবে রয়েছেন দুই নেত্রী। রয়েছেন সেই হিসেবি ব্যারিস্টারও।
একাত্তর এবং নব্বইয়ের মতো এবারো যে সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে যাবে না, তা কে বলতে পারে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



