মৃত্যুর পথে বিবিয়ানা গ্যাসফিল্ড ও শেভরনের বিভ্রান্তিকর তথ্যঃ
স্বাধীন বাংলাদেশের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকান্ড দেখলে যে কোনো দেশপ্রেমিক সচেতন মানুষের মেজাজ ও তার বিক্ষুব্ধতা এবং খ্যাপার মাত্রা নিশ্চয় বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। কারণ, বাংলাদেশের খনিজ সম্পদের মালিক জনগণ হলেও সেই সম্পদ আমাদের জ্বালানি মন্ত্রণালয় তুলে দিয়েছে বিদেশিদের হাতে। জনগণের স্বার্থ, দেশের স্বার্থ কিছুই সেখানে রক্ষিত হয়নি। বিষয়গুলো নিয়ে বহুবার লিখেছি। এবারও লিখতে বাধ্য হচ্ছি।
চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক। কয়লা নীতি অনুমোদনের উদ্যোগ নেয়া হয় সেই বৈঠকে। বাংলাদেশের জ্বালানি খাত নিয়ে এযাবৎকালে যা কিছু হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে ভালো কাজ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে প্রস্তাবিত কয়লানীতি। এ কয়লানীতি অনুযায়ী দেশের কয়লাখাত পরিচালিত হবে, সেটা সবারই প্রত্যাশা। কিন্তু উপদেষ্টা পরিষদে ওঠানোর আগে প্রস্তাবিত কয়লানীতির বেশ কিছু ধারা সংশোধন করা হয়েছে। যে ধারাগুলো বাদ দেয়া হয়েছে সেগুলো থেকে উপকৃত হবে লুটেরা বিদেশি কোম্পানিই।
কয়লা উত্তোলন শেষে জমি পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে প্রকৃত মালিককে ফেরত দিতে হবে। এ ধারাটি বাদ দেয়া হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ড· এম তামিম বলছেন, 'এই ধারাটি বাদ দেয়া হয়েছে কারণ এটা জটিল প্রক্রিয়া।' এর অর্থ কী? জটিল বলে বিদেশি কোম্পানিকে ছাড় দেয়া হবে কেন?
জমি পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে হবে কয়লা উত্তোলনকারী বিদেশি কোম্পানিকে। পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া না হলে এ জমি অব্যবহৃত পড়ে থাকবে দীর্ঘ সময়। রয়েলিটি, পরিবেশসহ আরও বেশ কিছু বিষয়ে ছাড় দেয়া হয়েছে বিদেশি কোম্পানিকে। প্রস্তাবিত কয়লানীতিতে 'কোলবাংলা' গঠনের সুপারিশ করা হয়েছিল। কোলবাংলা হবে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। পেট্রোবাংলা যেমন তেল গ্যাস সেক্টরের অথরিটি। কোলবাংলা হবে কয়লা সেক্টরের অথরিটি। কিন্তু জ্বালানি মন্ত্রণালয় এটাকে সংশোধন করে একটা অধিদপ্তরের মতো করতে চেয়েছে। সত্যিকার অর্থে যার কোনো ক্ষমতাই থাকবে না। তিন বছর পর এটা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপ নেবে। ততদিনে কয়লা সেক্টরে লুটপাট যা হওয়ার হয়ে যাবে।
এরমধ্যে ভালো খবর এটাই যে, উপদেষ্টা পরিষদে কয়লানীতি অনুমোদন হয়নি। দেশ এবং জনগণের স্বার্থবিরোধী এ কয়লানীতি অনুমোদন না হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন মেজর জেনারেল (অব·) গোলাম কাদের এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব·) এমএ মালেক। এই দু’জন ছাড়া অন্য সবাইকে ড. এম তামিম অনুমোদনের পক্ষে রাজি করিয়ে ফেলেছিলেন। আপাতত আশাহত হয়েছেন ড. এম তামিম। তবে বিদেশি কোম্পানির পক্ষে তৎপরতা জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে এখনো চলছে।
আমাদের সাঙ্গু গ্যাস ক্ষেত্রে প্রকৃত মজুদ ছিল দশমিক ৬ টিসিএফ। কিন্তু কেয়ার্ন এনার্জি দেখিয়েছিল দ্বিগুণের বেশি ১·৩১ টিসিএফ। মিথ্যা তথ্য দিয়ে বাংলাদেশকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্য ছিল একটাই, অল্প সময়ে বেশি গ্যাস তোলা। মজুদ যত বেশি দেখানো যাবে, প্রতিদিন তত বেশি উত্তোলন করা যাবে। মজুদ বেশি দেখিয়ে উত্তোলন বেশি করেছে কেয়ার্ন এনার্জি। ২০ বছর যে সাঙ্গু গ্যাস ক্ষেত্র চালু থাকার কথা তা মাত্র ১০ বছরেই পরিত্যক্ত হতে চলেছে। বাংলাদেশে সর্বজনশ্রদ্ধেয় বিশেষজ্ঞ ড. নূরুল ইসলাম, ড. বদরুল ইমামসহ সবাই বলছেন কেয়ার্ন ভুল তথ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিশাল বড় ক্ষতি করেছে। আর জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ড. এম তামিম বলছেন স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই সাঙ্গু পরিত্যক্ত হচ্ছে! কেয়ার্ন কেন মজুদ বেশি দেখাল এ প্রশ্ন জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও ড. এম তামিম করছেন না! তাহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, কাদের হাতে আমাদের জ্বালানি মন্ত্রণালয়?
বাংলাদেশের আরেকটি বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানা। এ ক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে মার্কিন বহুজাতিক লুটেরা কোম্পানি শেভরন। বিবিয়ানার প্রমাণিত মজুদ ২.৪ টিসিএফ। আর শেভরন বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে বলছে মজুদের পরিমাণ ৪.৪ টিসিএফ। বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত বেশি মজুদ দেখিয়ে বেশি উত্তোলন করছে শেভরন। লাভ হচ্ছে শেভরনের। অল্প সময়ে বেশি উত্তোলন করে খরচ উঠিয়ে লাভ করছে। বাংলাদেশ কী পাচ্ছে? সাঙ্গুর মতোই অল্প সময়ে পরিত্যক্ত হতে যাচ্ছে বিবিয়ানা। দেশীয় বিশেষজ্ঞরা বিবিয়ানাকে বাঁচানোর জন্য চিৎকার করছেন। কিন্তু জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও ড. এম তামিম নির্বিকার।
মজুদের পরিমাণ বেশি দেখানোটা যদিও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নতুন কিছু নয়। এক সময় ড. এম তামিমও এমন তথ্য দিয়েছেন। গ্যাস রপ্তানি করতে বলেছেন। আর এখন বলছেন গ্যাস নেই, কয়লা তুলতে হবে। বোঝা যায় সব কিছুর পেছনে উদ্দেশ্য একটাই, বিদেশি কোম্পানির স্বার্থ দেখা!
এশিয়া এনার্জিকে রক্ত দিয়ে প্রতিরোধ করেছে ফুলবাড়ীর মানুষ। কালো কয়লা লাল হয়েছে ফুলবাড়ীর মুক্তিকামী মানুষের রক্তে। রক্ত দিয়ে প্রতিরোধের সেই ২৬ আগস্ট ছিল গণঅভ্যুত্থান দিবস। ফুলবাড়ীর মানুষের সঙ্গে চুক্তি করেছিল একটি নির্বাচিত সরকারের প্রতিনিধি। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার সেই চুক্তি বাস্তôবায়নের কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
বর্তমান সরকার হয়ত ভাবছে জোট সরকারের করা চুক্তি নিয়ে তারা কথা বলবে না। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে যা করার করবে। এমনটা ভাবা যেতেই পারে। কিন্তু সবক্ষেত্রে কি সরকার একই আচরণ করছে? ফ্রান্সে প্রত্মসম্পদ পাঠানোর চুক্তিও তো জোট সরকার করেছিল। সেটা বাস্তôবায়নের জন্য কী না করেছে সরকার! তবে জনস্বার্থের জায়গায় এত উদাসীনতা কেন?
পূর্বেই বলেছি দু’জন উপদেষ্টার বলিষ্ঠ পদক্ষেপের কারণে উপদেষ্টা পরিষদে কয়লা নীতি অনুমোদন করা সম্ভব হয়নি। অতীতের প্রায় সব সরকারের জ্বালানি মন্ত্রণালয়, জ্বালানি মন্ত্রী, সচিব··· জনগণের সঙ্গে, দেশের সঙ্গে বেইমানি করেছে। দেশের স্বার্থ দেখার শপথ নিয়ে বিদেশি কোম্পানির স্বার্থ দেখেছে। বিদেশি কোম্পানির কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। বর্তমানেও সেই একই ধারা চলছে।
এ রকম একটি সময়ে দৃষ্টান্তôমূলক নজির সৃষ্টি করলেন মেজর জেনারেল (অব) গোলাম কাদের এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এমএ মালেক। ফুলবাড়ীর মানুষ, দেশের মানুষ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মনে রাখবে ও বিশ্বাস করবে এ দুজন মানুষ দেশের স্বার্থে, সময়মতো জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। দূর থেকে ফুলবাড়ীর মানুষ শুভ কামনা জানাবে এ দুই উপদেষ্টাকে। নেপথ্যে থেকে দেশের স্বার্থে কয়লানীতি নিয়ে যারা কাজ করেছেন, করছেন তাদের কথাও মানুষ মনে রাখবে সারাজীবন। আর ধিক্কার জানাবে, ঘৃণা করবে বিদেশি কোম্পানির স্বার্থ দেখা দালাল শ্রেণীকে।
সাহসী এবং সময়োপযোগী ইতিবাচক ভূমিকার জন্য অভিনন্দন জানাই মেজর জেনারেল (অব) গোলাম কাদের ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) এমএ মালেককে। গভীরভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি নেপথ্যে ভূমিকা রাখা বিশেষজ্ঞদের প্রতি। উপদেষ্টাদ্বয় ও বিশেষজ্ঞরা কাজ করেছেন দেশের স্বার্থে, বিবেকের তাড়নায়। ভবিষ্যতে, আগামী পাঁচ মাসে- কয়লানীতি, জ্বালানি সেক্টর নিয়ে যে ষড়যন্ত্র হবে, আশা করি সে বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন এ মানুষগুলো। বিশেষ করে সমুদ্র সীমার গ্যাস ক্ষেত্রগুলো যে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়, তড়িঘড়ি করে বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার চক্রান্ত চলছে সে বিষয়ে সতর্ক থাকার বিনীত অনুরোধ করছি এই উপদেষ্টাদ্বয়কে। যদিও তাদের মন্ত্রণালয় ভিন্ন। তারপরও প্রত্যাশা তাদের কাছেই। সেই প্রত্যাশার জন্ম তারাই দিয়েছেন। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রত্যাশা করে কোনো লাভ আছে বলে মনে হয় না। কারণ এ মন্ত্রণালয়টি দীর্ঘ ক’বছর ধরে বিদেশি কোম্পানির স্বার্থ দেখতে দেখতে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে। তারা হয়তো সেই অভ্যস্থতা ছাড়তে পারছে না, ছাড়তে চাইছে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

