বলা হইয়া থাকে আর্যরাই প্রাচীন ভারতে জাতিভেদ প্রথাটি আমদানী করিয়াছিলেন। আমদানীকৃত চারটি জাতির মধ্যে শুদ্ররাই ছিলেন সবচেয়ে নীচু প্রজাতির। মানুষের সেবামূলক কাজগুলো সম্পন্ন করাই ছিলো তাহাদের প্রধান দায়িত্ব। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, সমাজে তাহারা ছিলেন সবচাইতে অসন্মানীত ও নিগৃহীত। শাস্ত্রমতে তাহাদের এই প্রকারের পরিণতির দায়ী তাহাদের পূর্বজন্মের অপকর্ম। নাপিতরা ছিলো সেই শুদ্র জাতিগোষ্ঠীরই একটি অংশ। তবে নিগৃহীত হইলেও ইহা সর্বদাই সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পেশা হিসেবে স্বীকৃত ছিলো। জীবনে নাপিতের কাছে যাইতে হয় নাই এমন লোক খুঁজিয়া পাওয়া সুখী মানুষের জামা খুঁজিবার চাইতেও কঠিন কর্ম।
জীবনে অনেক নাপিতের মাধ্যমে চুল কাটাইয়াছি। ইহাদের ভীড়ে ছেলেবেলার নানাবাড়ির সেই নাপিতটি ছিলেন অতিমাত্রায় অনন্য। তাঁহার স্মৃতি কখনও ভুলিবার নয়। আমার নানাদের অবস্থা ভালো ছিলো। শুনিয়াছি কোন একসময় তাহারা স্থানীয় জমিদারের গোমস্তা পর্যায়ের কিছু একটা ছিলেন। সেই সুবাদে তাহারা ধন-সম্পদ ভালোই রপ্ত করিয়াছিলেন। তাহাদের চুল কাটাইবার জন্য নাপিতের কাছে যাইতে হইতোনা। নাপিতেরাই বাড়িতে আসিয়া সেই কর্মটি সম্পন্ন করিতেন। মাঝে মাঝে নানাবাড়িতে বেড়াইতে গেলে আমরাও সেই সুযোগটি পাইতাম।
নাপিত বাড়িটি ছিলো নানাবাড়ির নিকটেই। বাড়িটি স্থানীয় লোকজনের নিকট নাপিত বাড়ি নামেই পরিচিত ছিলো। তবে যাহারা কিছুটা ভদ্রগোছের ছিলেন কিংবা কিছুটা পড়ালেখা শিখিয়াছিলেন তাহারা শীল বাড়ি নামে ডাকিতেন। নাপিতেরাও নিজদিগের নামের শেষে শীল শব্দটি যুক্ত করিত। সম্ভবতো তাহারা নিজদিগকে নাপিতের চাইতে শীল পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করিতেন।
যাহা হউক, বর্ণিত নাপিতের আলোচনায় ফিরিয়া আসি। সে ছিলো সন্দেহাতীতভাবেই অন্য সবার চাইতে আলাদা। তাহার তুলনা একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'আমার ছেলেবেলা'র ব্রজেশ্বর মহোদয়ের সহিতই করা যাইতে পারে। প্রায় দু'যুগ পার হইয়া গেলেও তাহার চালচলনের ঠাট, সেই গোফের বাহার, গাম্ভীর্য্য এবং সর্বোপরি চুল কাটিবার সেই পদ্ধতি এখনও আমাকে নস্টালজিক করিয়া তুলে। তবে তাহার এই ঠাট কেবলমাত্র শিশুদিগের চুল কাটিবার সময় পরিলক্ষিত হইতো। বড়দের চুল কাটিবার সময় তিনি ছিলেন যথারীতি মার্জিত এবং অতিশয় অনুগত। চরিত্রের এই দ্বৈততা আমার চোখ না এড়াইলেও তাহার চুল কাটিবার পদ্ধতিকে আমার নিকট সবসময়ই উচুদরের শিল্পকর্ম বলিয়াই মনে হইত। চুল কাটিবার ক্ষেত্রে তিনি যেমন শৈল্পিক ছিলেন তেমনি যে তাহাকে দিয়া এই কর্মটি সম্পাদন করিত তাহাকেও যথেষ্ট শৈল্পিক হইতে হইতো। চুল কাটিবার সময় তিনি নড়াচড়া একদমই বরদাশত করিতেন না। যেইভাবে মাথা কাত করিয়া রাখিতে বলিতেন তাহার বিচ্যুতি ঘটিলে তাহার অবয়বের বিরক্তি দেখিলে মনে হইতো মহাভারতের কোন একটি চরণ বোধ হয় মারাত্বকভাবে ভুল উচ্চারিত হইয়াছে। বলাবাহুল্য, তাহার অবয়বের এই রূপটিও শুধুমাত্র শিশুদিগের চুল কাটিবার সময়েই দেখিতাম। বড়দের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন যথারীতি মার্জিত এবং অতিশয় অনুগত। চরিত্রের এই স্ব-বিরোধীতা সত্ত্বেও তাহার চুল কাটিবার ধরণকে আমার কাছে অনন্য মনে হইত এবং সে যখন চুল কাটিত তখন একদৃষ্টিতে তাহার হাত পরিচালনা দিকে তাকাইয়া থাকিতাম। মনে মনে ভাবিতাম, বড় হইয়া যদি তাহার মতো এমন অনন্য নাপিত হইতে পারিতাম। তবে লোকলজ্জার কারণে কিংবা সামাজিক বা পারিবারিকভাবে অপদস্থ হইবার ভয়ে তাহা কোনদিনও বাহিরে প্রকাশিত হয়নি।
সময়ের বিবর্তনে ছেলেবেলায় খুব নিকট হইতে দেখা 'নাপিত' পেশাটিতে অবশ্য ইতোমধ্যেই অনেক গুণগত পরিবর্তন আসিয়াছে। আগে যেখানে শুধুমাত্র শীল গোত্রের নমশুদ্ররাই এই নিগৃহীত কর্মটি সম্পাদন করিত সেখানে ধীরে ধীরে বাঁচার তাগিদে অন্য গোত্রের হিন্দুরাও এ পেশায় সামিল হইতে লাগিল। অল্পকাল পরে দেখা গেল যে মুসলমানরাও এই নিগৃহীত কর্মে সামিল হইতেছেন।
তবে এই পেশাটি সবচাইতে বেশি আলোচনায় আসিল যখন সুশীল নামে অভিহিত এক প্রকারের গোষ্ঠী ইহাতে প্রবেশ করিলেন। তাহাদের আগমনে নিগৃহীত এই পেশাটি রাতারাতি মহৎ পেশায় রুপান্তরিত হইলো। স্বাভাবিক কারণেই এই সুশীলদিগের চুল কাটার ধরণ অন্য শীলদের চেয়ে আলাদা। তাহারা নিজ হাতে এ কর্মসম্পাদন করেন না। দূর হইতে আদেশ, উপদেশ, বিবৃতি দিয়া থাকেন। ইহার কারণে তাহাদিগকে সুশীলের পাশাপাশি পরামর্শক নামেও অভিহিত করা হইয়া থাকে। তাহাদের পরামর্শের কারণে কর্মটি সফলভাবেসম্পাদিত হইলে পুরো কৃতিত্বটিই তাহার নিয়া নেন। ব্যর্থ হইলে পরামর্শ গ্রহীতাকে দায়ী করিয়া তাহার আপাদমস্তক ধোলাই করিতে পিছপা হননা। বলাবাহুল্য, এই সুশীলেরা কোন দেশীয় সেলুনে নিজেদেরকে জড়িত করেন না। বরং বিদেশী সেলুনে বিদেশী মালিকের অধীনে চাকুরী করিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করিয়া থাকেন। তাহারা দেশীয় মুদ্রায়ও বেতন গ্রহণ করেননা। বৈদেশিক মুদ্রায় বেতন উত্তোলন করিয়া থাকেন। সম্ভবতো অতিরিক্ত দেশপ্রেমই ইহার অন্তর্নিহিত কারণ। এই বিবর্তনের ধারায় গত কয়েক বছরে যেটা লক্ষণীয় তাহা হইলো, এই সমস্ত সুশীল নাপিতদের দাপটে আগে যাহারা পেশাদার নাপিত ছিলেন তাহারা একে একে তল্পীতল্পা গুটাইয়া বিদায় হইতেছেন।
পূর্বেই বলিয়াছি যে, একসময়ে নাপিত হইবার স্বপ্ন দেখিতাম। তবে সুশীল নাপিতদের দাপটে যেখানে পেশাদার নাপিতেরাই ভাত পাইতেছেনা সেখানে আমার মতো অনভিজ্ঞের অবস্থাতো সহজেই অনুমেয়। আশংকা করিতেছি এ জন্মে বোধ হয় আর নাপিত হইবার সাধ মিটিবেনা। তবে রাজা রবার্ট ব্রুস যার আদর্শ সে অতো সহজে দমিবে এটা আশা করাও উচিত হইবেনা। তাই সোজা পথে ব্যর্থ হইয়া বাকা পথে আগাইতেছি। শাস্ত্রে আছে যে যাহারা এই জন্মে বেশি পাপকর্ম করিবে তাহারাই পরজন্মে নমশুদ্র হইয়া জন্মিবে। সেই ভরসায় সর্বদাই ইচ্ছাকৃতভাবেই নানা পাপকর্ম সম্পাদন করিতেছি। আশা করিতেছি এ সমস্ত পাপকর্ম এবং ভগবান বিষ্ণুর আশীর্বাদে পরজন্মে নমশুদ্র হইয়া জন্ম নিয়া অবশ্যই নাপিত হইবো।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে মার্চ, ২০০৯ বিকাল ৩:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


