দেশ বিভাগ - সুফল ও কুফল
২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ রাত ৮:৫২
মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বিভাগে কিছু পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি ছাত্র ছাত্রী রয়েছে। ওদের সাথে নিয়মিত দেখা হলেই আমরা প্রাণ খুলে বাংলায় কথা বলি। যদিও কথার আঞ্চলিক টান দুই বাংলায় দুই রকম, তবু বাংলা ভাষার এই পুরানো বন্ধন এক করে রাখে বাঙালিদের।
তাই মাঝে মাঝে মনে হয়, ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ আমাদের কী সুফল দিয়েছে, আর কী সর্বনাশ ডেকেছে।
সুফলের মধ্যে প্রথমেই আসে পূর্ববঙ্গের উন্নতি। হ্যাঁ, পাকিস্তানী আমলে কিছুটা সমস্যা হয়েছে, কিন্তু তবুও তো পূর্ববঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় একটা দুটো করে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বুয়েট একটা স্থানীয় কলেজ হতে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয়েছে। কলকাতাকেন্দ্রীক রাজনীতির জন্য পূর্ববঙ্গ সব সময় অবহেলিত হয়েছিলো, নগরায়ন, শিল্পায়ন সব দিকেই পিছিয়ে ছিলো। অন্তত সে দিক হতে আলাদা হয়ে পূর্ববঙ্গ নতুন দিক নির্দেশনা পেয়েছে। এখানকার সংখ্যালঘুদের অনেক সমস্যা হয়েছে, কিন্তু পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের ব্যাপক সামাজিক, শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক উন্নতি হয়েছে। আজকেই প্রথম আলোতে আবদুল গাফফার চৌধুরীর লেখা পড়ছিলাম, উনি লিখেছেন, দেশভাগের পরে পঞ্চাশের দশক হয়েছিলো বাঙালি মুসলমানের বাঙালি হয়ে ওঠার সময়, আত্মপরিচয় ফিরে পাওয়ার সূচনার সময়।
এবার আসি কী সর্বনাশ হয়েছে। পূর্ববঙ্গের এক বিশাল বুদ্ধিজীবী, শিক্ষিত জনগোষ্ঠী দেশ ভাগের সময় ও পরের বছরগুলোতে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। নিজের দেশ ছাড়তে তাঁদের কী পরিমাণ কষ্ট হয়েছে, তা আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব না কোনোদিনই। আজো অনেক পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির সাথে কথা হলে তাঁরা আমাকে বলেন, তাঁদের বাবা বা মার বাড়ি চট্টগ্রাম, বা বরিশাল, আজো তাদের বাবা-মায়েরা পূর্ববঙ্গের দেশের বাড়ির কথা বলেন। আমরা হারিয়েছি জীবনানন্দ দাশ, অমর্ত্য সেন, মেঘনাদ সাহা, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, এদের। পশ্চিমবাংলার বর্তমানের প্রচন্ড খ্যাতনামা অনেক সাহিত্যিকের বাড়িই কিন্তু পূর্ববঙ্গে।
আরবানার টেগোর ফেস্টিভ্যালে সুনীল আর মমতাজউদ্দিন এসেছিলেন। দুজনের কথাতেই এই বেদনার প্রকাশ ঘটলো। সুনীলের বাড়ি ফরিদপুরে, আর মমতাজউদ্দিনের বাড়ি মালদহে। ৪৭ এর দেশ বিভাগের পরে দুজনেই নিজের মাটি ছেড়ে চলে গেছেন পরদেশে। সুনীলকে কাছ থেকে দেখে সহজেই দেখতে পেলাম, সেই বাঙ্গাল চেহারার ছাপ। কথাতেও আজও কলকাতার প্রভাব অতটা লাগেনি।
অমর্ত্য সেনের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তাঁর বাড়ি পুরানো ঢাকায়। সেরকমই জ্যোতি বসুর বাড়ি।
এভাবে দেশ ভাগের ফলে আমাদের বাঙালি সত্ত্বা দ্বিখন্ডিত হয়ে পড়েছে আজ।
অবশ্য, সুফল কুফল বিচার করে দেশ বিভাগ না হলে কী হতো, তা বলাও কঠিন। দেশ ভাগ না হলে অমর্ত্য সেন হয়তো ঢাকার অর্থনীতিবিদ হিসাবে আমাদের খুব কাছে থাকতেন, কিন্তু দুলা মিঞা সওদাগরের ছেলে মুহাম্মদ ইউনুস হয়তো ডঃ ইউনুস হতে পারতেন না, সুযোগের অভাবে।
যাহোক, অনেক লম্বা করে ফেললাম কথা। আসলে একটু আগে আমার অ্যালবামে !@@!526149 আর মমতাজউদ্দিনের সেই ব্যথিত চাহনির ছবিগুলো চোখে পড়লো, তাই এতো কথা এলো মনের মাঝে। হাজার পাসপোর্ট আর কাঁটা তারের বেড়া সত্ত্বেও দুজনেই বাঙালি, বাংলার মাটির সাথেই নাড়ির টান
(ম্যাপটি ১৮৯৩ সালের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ম্যাপ, উইকিপিডিয়া হতে মুক্ত লাইসেন্সে প্রাপ্ত)।
প্রকাশ করা হয়েছে: আমার ডায়েরি বিভাগে । সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ রাত ৯:১২ | বিষয়বস্তুর স্বত্ত্বাধীকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
আরশাদ রহমান বলেছেন:
মাঝে মাঝে মনে হয় বঙ্গ ভংগ না হলে হয়তো অন্য রকম একটা বাংলাদেশ হতো। অন্য রকম বলতে ভালো বুঝাচ্ছি। আমার কল্পনায় দুই বাংলা মিলে যে বাংলা তার সাথে আজকের বাংলাদেশের কোনো তুলনা হয়না।
অতিথি বলেছেন:
[গাঢ়]তেলের শিশি ভাঙলো বলেখুকুর উপর রাগ করো,
তোমরা যে সব বুড়ো খোকা
বাংলা ভেঙে ভাগ করো
তারবেলা?
[গাঢ়]
রাগীব:
আপনার এই অনুভুতি খুবই মানবিক । রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ যাই থাক, দেশবিভাগ ছিলো এক মারাত্নক মানবিক বিপর্যয় ।
একটা মানুষ ঠিক কতোটুকু অসহায় হলে তার ভিটামাটি ছেড়ে যায় সেটা আসলেই আপনি, আমি আজ আর বোঝবোনা ।
মেঘালয়ের এক বৃদ্ধা বাঙালী মহিলা আমাকে অনুরোধ করেছিলেন দেশ থেকে যেনো তার জন্য খেজুরের গুড় নিয়ে যাই । মুলত: এ ছিলো 45 বছর আগে ছেড়ে আসা জন্মভূমির জন্য তার টান ।
রাগিব বলেছেন:
@আরশাদঃ অন্যরকম হতো তা তো বটেই। কিন্তু জানিনা পূর্ব বঙ্গের মানুষের কি অবস্থা হতো। জানিনা, চাষ বাস ছেড়ে আমার বাবা পড়াশোনা করতে পারতেন কি না। আবার এত সব বিজ্ঞানী, সাহিত্যিকেরা তো সব এক বাংলার মাটিতেই থাকতেন।
রাগিব বলেছেন:
@হাসান মোরশেদঃ আসলেই, দেশের বাইরে থাকলে টান আরো বাড়ে। আর যাদেরকে দেশ ছেড়ে যেতে হয়েছে, তাঁদের টানটা আরো হৃদয় বিদারক।
অতিথি বলেছেন:
ধর্ম আলাদা শুধুমাত্র এই কারণে নিজের জন্মভূমি ছেড়ে চলে যেতে হবে, এটাই তো একটা হৃদয়বিদারক ব্যাপার।এটা তো কোন যুক্তিতেই পড়ে না।
রাগিব বলেছেন:
মেন্টাল, সুনীলের মনের গহীনে কিন্তু দেশ বিভাগ নিয়ে প্রচন্ড বেদনা আছে বলে মনে হয়। পূর্ব পশ্চিমের প্রধান চরিত্র প্রতাপ মজুমদার পুরাটা সময় দেশের জন্য , পূর্ববঙ্গের জন্য মন খারাপ করেছেন। ওটা তো আসলে সুনীলেরই প্রতিচ্ছবি।
রাগিব বলেছেন:
আসলে, বঙ্গবিভাগের ফলে পূর্ববঙ্গের সংখ্যালঘুরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, কিন্তু মোটের উপরে এখানে অনেক উন্নতি হয়েছে অবকাঠামোগত। না হলে হয়তো কম্পিউটার প্রকৌশলের বদলে টাইপিং শিখতে হতো আমাকে, মফস্বলের কলেজে। কিন্তু অন্যদিকে দেশের বরেণ্য সব বুদ্ধিজীবী বিজ্ঞানীদেরকে পূর্ববঙ্গ হারিয়েছে, আর পশ্চিমবঙ্গ হিন্দিভাষী ভারতে কোন ঠাসা হয়ে আছে। দিল্লীকা লাড্ডুর মতো, হয়েছে বলে পস্তাই, না হলেও হয়তো পস্তাতাম।
অতিথি বলেছেন:
[link|http://www.somewhereinblog.net/mahbubblog/post/28700423|wimvP
বিজলীর খড়ি বলেছেন:
রাগীব ভাই,খুব ভাল লেখা।
আমি 47 ও 71 দুটো বিভাগেরই বিরেধীতা করি। অখন্ড ভারতই বেস্ট ছিল।
ইয়াহইয়া ফজল বলেছেন:
বিজলী ছড়ি আপনার বোধ হয় কাদিয়ানি নিয়েই মাথা ঘামানো উচিত। ঐ যে বললেন 71 এর বিরোধীতা । মিয়া ওটা প্রত্যাহার করেন।
অখন্ড বাংলাই স্বাভাবিক ছিল। গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পূর্ববাংলার অবস্থা খারাপ হওয়ার কথা নয়।
বিলেতীরা ১৯০৫ সালে বাংলা ভাগ করে একটি শক্তিশালি জাতিকে শক্তিহীন করার জন্য, যাতে তাদের অপশাসন দীর্ঘায়িত করা যায়।
একদিন হয়ত বাংলা মায়ের সন্তানেরা আবার এক হবে।
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...














