আমার এক বন্ধু একবার বলছিল, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ক্লাসে তাঁকে যতবার না রোল কলে 'ইয়েস স্যার' বলে ডাক দিতে হয়েছে শিক্ষকের উদ্দেশে; তারও চেয়ে বেশি জ্বি ভাই আছি' বলে সাড়া দিয়েছে হল গেটে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রদলের ক্যাডারের অলিখিত হাজিরার 'রোল কলে'! শুনে কৌতুক বোধ করতে পারেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের হল 'প্রবাসী' আবাসিক ছাত্রদের জন্য এটাই নির্মম বাস্তবতা ছিল, অন্তত আমার চার বছরের হল জীবনের অভিজ্ঞতায়।
'প্রবাসী' লিখলাম সতেচনভাবেই। তৃতীয় বিশ্বের হতভাগা শ্রমিক প্রবাসীরা যেমন কুঁকড়ে, মাথা নত করে থাকে থাকে বিদেশ বিভুঁইয়ে, মুখ বুজে সহ্য করে অন্যায়; বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীরাও ঠিক তেমনি অদৃশ্য, এবং কখনো-কখনো প্রকটভাবে দৃশ্যমান মতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের পেশিশক্তির কাছে নতজানু হয়ে থাকে। আমি নিজে, চিরকালের ভিতু বাঙালি, প্রতিবাদের সাহস না পেয়ে সাত বছরের হল জীবনের ইতি টেনে দিয়েছিলাম চার বছরে। চার ফুট প্রস্থের একটা বিছানার অর্ধেকভাগের কষ্টদায়ক 'আরামে'র জন্য দাসত্ব মেনে চলা সম্ভব হয়নি বেশিদিন।
কিন্তু আমার মতো সবার সৌভাগ্য হয় না। ঢাকা শহরে প্রায় বিনা খরচে দুই ফুট বিছানার ভাগ কম কী সে! তাই মতাসীন ছাত্রসংগঠনের অলিখিত শর্ত মেনেই থেকে যেতে হয় হলে। অলিখিত শর্তগুলোর কিছু কিছু জানিয়ে দেওয়া হয় হলে ওঠার প্রথম দিনে। অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি:
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর জানলাম, প্রশাসনের বদলে হলে ওঠার যাবতীয় পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করে মতাসীন ছাত্রসংগঠন। হলে উঠতে চাইলে সংশ্লিষ্ট হলের কোনো ছাত্রনেতাকে ধরতে হবে। আমিও গিয়ে ধরলাম। তার মাধ্যমে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো ছাত্রদলের হল শাখার সভাপতির কাছে। প্রতি সন্ধ্যায় সভাপতি তার 'পারিষদ' নিয়ে হলের 'দরবার হলে' (গেস্ট রুম) বসে নানা আর্জি শোনেন। তাঁকে ঘিরে চাটুকারের দল। সভাপতির চেয়ে বাকিদেরই হম্বিতম্বি বেশি। গিয়ে যথারীতি সালাম দিলাম। শুরু হলো সাক্ষাৎকার পর্ব। কলেজে থাকতে রাজনীতি করেছি কি না? বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা কে? অমুক মন্ত্রী কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে? গুচ্ছের প্রশ্ন। এ যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার চেয়েও কঠিন এক পরীক্ষা!
সেই পরীক্ষায় পাস হলে দ্বিতীয় ধাপ। শোনানো হবে শর্ত। যার প্রথমেই থাকবে, ডাকা মাত্র হলের গেস্ট রুমে এসে হাজির হতে হবে। এখান থেকেই বেরোবে মিছিল। নিয়মিত সেই মিছিলে অংশ নিয়ে যেতে হবে মধুর ক্যান্টিন। হলের মিছিল সে রকম প্রকাণ্ড না হলে জাত যাবে নেতাদের! দরকার হলে যেতে হবে পল্টনের জনসভাতেও।
আপনি নিরুপায়। 'সামান্য' কষ্টটুকু কেন সইবেন না? আপনাকে তো পড়াশোনা করতে হবে। পাস করে বেরিয়ে চাকরির সন্ধানে জুতার তলা য়ে ফেলতে হবে রাজধানীর রাজপথ ঘুরে ঘুরে। বাড়িতে আপনার মধ্যবিত্ত পরিবারের অসহায় মা যে আশায় বসে আছে। ছেলে তার সুদিন আনল বলে!
জায়গা হবে গণরুমে। যেখানে ৫ জনের একটা কক্ষে গাদাগাদি করে থাকে ২৫ জন। খাটের আশা ছেড়ে দেওয়াই ভালো। মেঝেতে সারি সারি তোষক বিছিয়ে ঘুমানো। সকাল হলে তোষক গুটিয়ে রাখা। তার আগেই কোনো এক পাতি নেতার নির্দেশে হল গেটে বা গেস্ট রুমে হাজিরা। সেখানেই ক নম্বর ধরে ধরে খোঁজ নেওয়া সবাই আছে কি না। 'জি্ব ভাই আছি' বলে নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়া, আসলে মেঝের জায়গাটুকু নিরাপদ করা! তার পর শিখিয়ে দেওয়া স্লোগান আওড়ে মধুর ক্যান্টিন উদ্দেশে যাত্রা।
দুপুরে হলে ফিরে ক্যান্টিনে খেতে যাবেন। গিয়ে দেখবেন, নেতা-পাতিনেতাদের ভালো ভালো খাবারের ব্যবস্থা, তাও আবার 'ফাও', একেবারে নিখরচরায়! আর সেই ভর্তুকি জোগাতে ছোট হয়ে আসা আপনার মাংস কিংবা মাছের টুকরো। যেসব টুকরোর নাম, আমাদের ক্যান্টিনের দেয়ালে লেখা দেখেছিলাম, 'মাইক্রোস্কপিক টুকরা', মানে কিনা যে টুকরো খালি চোখে নজরে পড়ে না, মাইক্রোস্কপ দিয়ে দেখতে হয়। পাশে কে যেন আদর করে লিখেছে, 'দাদা, পুরোটাই খেতে হবে কিন্তু!'
রাতে সামান্য বিনোদনের জন্য টিভি হলের ভিড়ে আশ্রয়। ভুল করেও সামনের সারিগুলোর সিটে বসবেন না, ফাঁকা থাকলেও না। ওসব সংরতিক্ষ আসন। আর রিমোট হাতে পাওয়া আপনার জন্য বামুন হয়ে চাঁদের দিকে হাত বাড়ানো। সবচেয়ে মতাধরের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ওটা। যে তার ইচ্ছে মতো চ্যানেল পাল্টায়, বাকিরা সেই চ্যানেল দেখতে রাজি হোক আর না হোক। কেউ কেউ দেখেছি, নিজের মতা জাহির করার জন্য ইচ্ছে করেই খেলা দেখানোর মাঝপথে পাল্টে দেয় চ্যানেল। বাকিদের অস্বস্তি দেখার মধ্যেই যেন তার বুনো আনন্দ! টিভি রুম থেকে পরিত্রাণ পেতে ক্যারম খেলবেন বা টেবিল টেনিস, সেটাও যে তারা দখল করে বসে আছে!
প্রতিনিয়ত হলে চলাফেরা করতে হবে পান থেকে চুন খসলেই অত্যাচারের ভয় নিয়ে। কারণ হল থেকে মেরে তাড়িয়ে দেওয়া, হুমকি-ধামকি, বন্ধুদের সামনে কান ধরে উঠবোস করানোর মতো লজ্জা দেওয়ার নজির প্রায়ই হাজির করা হবে। যেন মুখ ফুটে প্রতিবাদ করার সাহসটুকু কোনো দিন না জোটে। ভাগ্য ভালো হলে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বর্ষে মিলবে 'ডাবলিং' করার সম্মান। যেখানে চার ফুট প্রস্থের বিছানার অর্ধেকটারর গর্বিত মালিক হবেন আপনি। এমনও অনেককে দেখেছি, কোনো পাতি নেতার রুমমেট হওয়ার সৌভাগ্য পেয়ে খুশিতে টগবগে। কদিন পরেই সেই খুশি হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া, কারণ নেতার ফুটফরমায়েশ খাটতে খাটতে নাজেহাল অবস্থা!
প্রতিটা হল আমার কাছে একেকটা দেশের মতো মনে হয়েছিল। যেখানে মতাসীন ছাত্র সংগঠন সরকার চালায়। আর ছাত্ররা অবস্থাভেদে দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক। ভাবছেন, এত অন্যায়ের প্রতিবাদ কি কেউ জানায় না। না, জানায় না। কারণ, 'চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা'র বিরাট অপরাধের কারণে আমি নিজে বেশ কজন ছাত্রকে মার খেতে দেখেছি। নেতাদের কাছ থেকে এমনও সান্ত্বণার বাণী শুনেছি, 'আমরা আর কী করছি, ছাত্রলীগ আমাদের চেয়ে আরও অত্যাচার করত!' নিজেকে ঈশপের সেই পুকুরের ব্যাঙের মতো মনে হতো। ঈশ্বর, নিষপ্রাণ কাঠকেই নেতা হিসেবে দিয়েছিলে, সেই তো ভালো। কেন ইগলকে নেতা করে পাঠালে!
প্রতিবাদ শেষ পর্যন্ত জানায়। আর সব ভোটারের মতো, সাধারণ নির্বাচনে। আমার ব্যক্তিগত মত, এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী ছাত্রদলের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে, বাড়িতে ফিরে গিয়ে অন্যদেরও তা করতে অনুপ্রাণিত করছে। সেই ছাত্রের মত হলে না থাকতে পারে; তার বাড়িতে, পাড়া-পড়শিদের মধ্যে অবশ্যই আছে। তাদেরকেও সে প্রভাবিত করে অবশ্যই।
পরিবর্তনের জন্য মানুষ ভোট দিয়েছে। আশাকরি ছাত্রলীগও সেটা জানে। ৫ বছর পরই তো আবার হাজির হতে হবে জনগণের দোরগোড়ায়!
............
কিছু ভুল সংশোধন করে আবার দিলাম--লেখক
পারলে এই খবরটাও দেখুন:
Click This Link
দুঃখজনক হলো, ছেলেটা আমার ছেলেবেলার বন্ধু
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে আগস্ট, ২০০৯ রাত ১২:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



