somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হাজার বছর পরেও তোমার, কাসে ছুটে যাব

০৬ ই জানুয়ারি, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

টেন্স্ নিয়ে ভীষণ টেন্সড ছিলাম। স্কুলে পেঁৗছেই খোঁজ নিয়েছি, জয়েন স্যার বা সুবোধ স্যার এসেছেন কি না। কেউ একজন দিল দুঃসংবাদটা, দুজনই এসেছেন। কী আর করা? সযত্নে দুজনকে এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। একটা ভয় তবুও ছিল। পাছে হুট করে দেখা হয়ে যাক এঁদের কারুর সঙ্গে, আর বলে বসেন, 'শুনলাম তুই নাকি টুকটাক লেখালেখি করিস। কী করে সম্ভব! তুই তো টেন্্স্ কয় প্রকার সেটাই কোনোদিন বুঝে উঠতে পারিসনি। আচ্ছা দেখি তোর বুদ্ধি কতটা খুলেছে। বাংলাতেই বল, কাল কয় প্রকার?'
আমরা যারা ব্যাক-বেঞ্চার ছিলাম, মানে নিয়ম করে কাসের শেষ বেঞ্চ দখলে রেখেছি স্কুলের প্রথম থেকে শেষদিন পর্যন্ত, তাদের কাছে কাল বরাবরই তিন প্রকার_আকাল, মাকাল আর নাকাল!
না, শেষ পর্যন্ত স্যারদের মুখোমুখি হলেও বুদ্ধির আকাল নিয়ে জন্মানো এই মাকাল ছাত্রকে প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আর নাকাল হতে হয়নি। বরং স্যারেরা সস্নেহে বুকে টেনে নিয়েছেন। শৈশবে যাদের কড়া অনুশাসনের শিা দেওয়া রাশভারী পিতার ছবিটাই দেখেছি, রংপুর জিলা স্কুলের ১৭৫ বছর পূর্তি উৎসবে গিয়ে নতুন চেহারাটাও দেখা হয়ে গেল। দেখলাম, একেক জনের হূদয়ে খেলে যায় কী উথাল-পাথাল আবেগের ঢেউ!
ভাষার সাধ্য নেই স্কুল নিয়ে এই আবেগ, ভালোবাসার অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা প্রাণের ছবিটা অাঁকে। হূদয় দিয়েই সেটা অনুভব করতে হয়। না হলে সেই ১৯৪০ সালে ম্যাট্রিক পাশ করে বেরিয়ে গেছেন যিনি, মাসুম আলী, সেই তিনিও কেন ছুটে আসবেন উৎসবে? কেন ১৯৪৮ সালের মো. শফিকুল হক রোদ মাথায় পেতে দীর্ঘণ অপো করবেন লম্বা লাইনে? স্মৃতি হিসেবে রেখে দিতে একটা স্মরণীকা পাওয়ার জন্য কণ্ঠে ঝরে পড়বে আকুতি? ১৯৪৫ সালের ব্যাচের মো. খবির উদ্দিন শাহ্ই বা কেন স্কুলের ওপর নির্মীয়মাণ প্রামাণ্যচিত্রের শুটিংয়ে অংশ নিতে সব ঝক্কি-ঝামেলা মেনে নেবেন হাসিমুখে?
কোথায় লুকিয়ে থাকে এত আবেগ! যে আবেগের টানে ১৯৫৩ সালের ছাত্র ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের প্রাক্তন মন্ত্রী, বিধান সভার বর্তমান এমএলএ ডা. ফজলে হক ঠিকই সময় মতো নিবন্ধন করেন উৎসবে অংশ নিতে। ১৯৫২ সালে পাশ করে বেরিয়ে যাওয়া, রংপুর পৌরসভার সাবেক শ্রদ্ধাভাজন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আফজাল কিংবা ১৯৬২ ব্যাচের জহীরুল হক রন্জুকে চৌপর-দিনভর খাটতে দেখা যায় উৎসব কমিটির সবার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। সেই চট্টগ্রাম থেকে ট্রাকে করে শখের বশে তোলা ছবি নিয়ে চলে আসেন ১৯৭৫ ব্যাচের আব্দুল কুদ্দুস, প্রদর্শনীর জন্য।
১৯৭৭ ব্যাচের মাহমুদুল ইসলাম টুটুল কিংবা এবিএম আরশাদ হোসেনের মতো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত প্রাক্তন ছাত্রেরাও যে শত-ব্যস্ততা অস্বীকার করে ছুটে আসেন, সে তো হূদয়ের গভীর থেকে ডাক আসে বলেই। এই দুজনের নাম আলাদা করে বলার কারণ, মিলিত প্রাণের এই স্রোত যেন প্রবহমান থাকে, যেন অটুট থাকে ঐক্যের এই বন্ধন, সেই স্বপ্ন নিয়ে গড়া অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের মূল ধারণা এসেছে এঁদের কাছ থেকেই। লিখতে গিয়ে এঁদের নাম মনে পড়ছে বলেই উল্লেখ করা। আসলে দুই মাসব্যাপী প্রস্তুতি থেকে শুরু করে ২৩ ও ২৪ ডিসেম্বর উৎসবের দুই দিন পর্যন্ত কয়েক শ কর্মীর হাড়ভাঙা খাটুনির কারণেই রংপুর জিলা স্কুলের উৎসব পরিণত হয়েছিল রংপুরবাসীর সার্বজনীন উৎসবে। প্রায় পনের হাজার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মিলন শেষবার কবে হয়েছিল রংপুরে!
কুদ্দুস স্যার ছিলেন আমাদের প্রধান শিক। প্রতিদিন সকালে, আরামে দাঁড়াও ভঙ্গীতে অ্যাসেম্বলিতে দাঁড়িয়ে থাকা এই আমাদের উদ্দেশে গমগম কণ্ঠে একটি করে উপদেশ দিতেন। দেখা হলো তাঁর সঙ্গেও। বয়সের ছাপ পড়েছে। কিন্তু এতটুকু ফিকে হয়নি সেই রাশভারী ব্যক্তিত্ব। 'লাল টিসি'র ভয় নেই, তবুও এখনো তাঁর সামনে দাঁড়ালে বুক কাঁপে। শ্রদ্ধামাখা ভয়ে!
সুবোধ স্যার-বাসুদেব স্যার আমাদের বিতর্ক শেখাতেন। উদারা-মুদারা-তারা থেকে কতদিন একা-একা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনুশীলন করেছি_কণ্ঠে মন্দ্রার মালিকা হে মহেন্দ্র; দ্রুতলয়ে পড়েছি_চাচা চাঁছা চটা চেঁছো না, না চাঁছা চটা চাঁছ; জলে চুন তাজা, তেলে চুল তাজা... আরও কত কী!
বিশ-ত্রিশ বছর পর স্কুলের মাঠে, সেই বটগাছের ছায়া এসে দাঁড়িয়েছেন এমন ছাত্রেরও দেখা মিলল উৎসবে গিয়ে। হঠাৎ হারিয়ে ফেলা বন্ধুর সঙ্গে কয়েক দশক পর দেখা হওয়া, চোখে জল নিয়ে উষ্ণ আলিঙ্গনে বাঁধা_আহা কী সেই দৃশ্য! যে বটগাছের তলায় সেদিনের কিশোর ছাত্রটি কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে আবৃত্তি করেছিল সুকান্তের 'ছাড়পত্র', সেই আনিসুল হককে সেই বটগাছের নিচে বসে অটোগ্রাফ দিচ্ছেন_এই দৃশ্য কি কম উপভোগ্য!
হুট করেই যেন শেষ হয়ে গেল দুদিন। আনন্দের, আবেগের, ভালোবাসার মুহূর্তগুলো এত ছোট হয় কেন! একে একে নিভে যাচ্ছে সব বাতি। মঞ্চে অদ্ভুত অাঁধার এক। চারদিকে শ্মশানের নিস্তবব্ধতা। কুয়াশার চাদর ছিঁড়ে বান ডাকল জোৎস্না। অনেকেরই চোখে জল। দূরে, ২০০০ ব্যাচের তাঁবু থেকে ভেসে এলো গান, 'স্কুল তুমি থাকবে যেমন, আমিও তেমন রব, হাজার বছর পরেও তোমার, কাসে ছুটে যাব!'
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জানুয়ারি, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:০৪
৬টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×