নাইজেরিয়ান গল্প
চিমানদা নগোজি ওদিচি
অনুবাদÑ রাহাদ আবির
চিমানদা নগোজি ওদিচি (ঈযরসধসধহফধ ঘমড়ুর অফরপযরব)-র জন্ম ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৭, নাইজেরিয়া । তার প্রথম উপন্যাস ‘পারপল হিবিসকাস’(২০০৩) বেশ সাড়া ফেলেছে। বইটি ‘অরেঞ্জ ফিকশন প্রাইজ’-র জন্য মনোনীত হয় এবং বেস্ট ফার্স্ট বুক হিসেবে ‘কমনওয়েলথ রাইটার্স প্রাইজ’ লাভ করে। তার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘হাফ অফ এ ইয়োলো সান’ ; একই নামে তার একটি গল্পও রয়েছে। চিমানদা বর্তমানে বছরের কিছু সময় নাইজেরিয়া আর কিছু সময় অ্যামেরিকায় কাটান। ‘আপনি যখন অ্যামেরিকায়’ তার ‘ইউ ইন অ্যামেরিকা’ গল্পের অনুবাদ।
আপনার ধারণা ছিল অ্যামেরিকাতে সবারই গাড়ি আর বন্দুক থাকে। আপনার কাজিন ও আত্মীয়-স্বজনদেরও তাই ধারণা। অ্যামেরিকার ডিভি লটারি জিতার পরই তারা আপনাকে বলেছিল, ওইখানে একমাসের মধ্যেই তোমার গাড়ি হইবো, তারপর বিরাট বাড়ি কিন্তু ওই আমেরিকানগো মতো আবার বন্দুক কিনতে যাইও না ।
তারা লাওসের বস্তিঘরে আপনার চারপাশে জড়ো হয়ে নোনাধরা পেরেক লাগানো দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাড়িঁয়ে ছিল, কারণ চেয়ারে বসে ইচ্ছেমত নড়াচড়া করা যায় না, চেচিয়ে বিদায় জানানো যায় না এবং বড় কথা হলো, ফিসফিসিয়ে তাদের জন্য অ্যামেরিকা থেকে কি কি পাঠাতে হবে তা বলা যায় না। বড়সড় গাড়ি আর বিরাট বাড়ির (এবং বন্দুকের) কাছে তাদের চাওয়াটা কিছুই নাÑ হাতব্যাগ, জুতার মতো সামান্য জিনিস মাত্র। আপনি বলেছিলেন, ঠিক আছে, কোনো ব্যাপার না ।
অ্যামেরিকাতে আপনার যে আংকেল থাকে তিনি আপনাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, আপনার নিজের পায়ে না দাঁড়ানো পর্যন্ত তার বাড়িতেই থাকতে পারেন। তিনি আপনাকে এয়ারপোর্টে নিতে এসেছিলেন, একটা বড়সর হটডগ খাইয়েছিলেন যা সস দিয়ে খেতে গিয়ে আপনার বমিভাব হয়েছিল। তিনি হেসে বলেছিলেন, অ্যামেরিকার সাথে পরিচিত হও। তিনি মেইনের একটি শ্বেতাঙ্গ পাড়ায় থাকেনÑ লেকের পাশে ত্রিশ বছরের পুরনো বাড়ি। তিনি জানালেন, তিনি যে কোম্পানিতে চাকরি করেন সেখান থেকে তাকে আরও কয়েক হাজার শেয়ার দিতে চেয়েছিল কারণ তারা নতুনত্ব চাইছিল। কোম্পানির ব্রশিউরে তার ছবি ছাপিয়েছিল, যদিও তার কাজের সাথে এর কোনো সম্পর্ক ছিল না। হাসতে হাসতেই আরও জানিয়েছেন তার চাকরিটা ভালো এবং শ্বেতাঙ্গ পাড়ার সবচে’ সম্মানজনক, যদিও প্রথমদিকে তার স্ত্রীকে একঘন্টা খুঁজে চুল কালো করা হয় এমন একটা সেলুন বের করতে হয়েছিল। আসলে এসব বলার উদ্দেশ্য ছিল কৌশলে আপনাকে অ্যামেরিকার হাবভাব বোঝানো, লেনদেনের ব্যাপারটা জানানোÑ অ্যামেরিকায় আপনি অনেক দিতে পারলেই শুধু অনেক পেতে পারেন।
তিনি আপনাকে দেখিয়ে দিলেন কিভাবে মেইন স্ট্রিটের গ্যাস স্টেশনে কাজের জন্য অ্যাপ্লাই করতে হবে এবং কমিউনিটি কলেজেও ঢুকিয়ে দিলেন। কলেজের মেয়েরা আপনার চুল দেখে খুব কৌতূহলী হয়ে উঠল, ফিতা খুলে ফেললে চুল কি ফুলে উপরে উঠে যায় নাকি নিচে নেমে যায়? সব চুল খাড়া থাকে? কিভাবে? কেমন করে? আপনি কি চিরুনি ব্যবহার করেন?
তাদের এসব প্রশ্নের উত্তরে আপনি কাষ্ঠ হাসি দ্যান। আপনার আঙ্কেল এসব স্বাভাবিকভাবেই মেনে নেয়ার পরামর্শ দ্যান। এসব নাকি অ্যামেরিকানদের অজ্ঞতা আর ঔদ্ধত্যের প্রকাশ। এরপর তিনি আপনাকে তার অভিজ্ঞতাটির কথা বললেন। তিনি নতুন বাড়িতে ওঠার কয়েক মাসের মধ্যেই নাকি সেখানকার সব কাঠবিড়ালিরা উধাও হয়ে যাচ্ছিল। প্রতিবেশীদের তখন ধারণা হলো আফ্রিকানরা বুঝি সবধরণের বন্যপ্রাণী খায় কারণ তারা ঐরকমই শুনেছে।
আপনি আংকেলের কথায় মজা পান এবং তার বাড়িকে নিজের বাড়ির মতোই মনে করতে শুরু করেন। তার স্ত্রী আপনার সাথে বোন পাতায় আর তার স্কুলবয়সী বাচ্চÍা আপনাকে আনটি ডাকতে শুরু করে। তারা ইগবোতে কথা বলে, লাঞ্চেতে গ্যারি খায়Ñ এ বাড়ির আবহাওয়া প্রায় দেশের মতোই। ট্রাঙ্ক, গাড়ির চাকা আর বইয়ে ঠাসা বেসমেন্টের একটা খুপরি ঘরে আপনাকে ঘুমাতে দেয়া হতো। কষ্ট হলেও চলে যাচ্ছিল কিন্তু আপনার আংকেল সেখানে এসে হঠাৎ এক রাতে গাছ থেকে আম পাড়ার মতো আপনার বুক হাতড়ানো শুরু করে। তিনি আসলে আপনার রক্ত সম্পর্কের কেউ নয়, আপনার খালুর দূর সম্পর্কের কোনো কাজিন।
সেই রাতেই আপনি তল্পিতল্পা বাঁধতে শুরু করলেন। তিনি আপনার বিছানার পাশে বসলেন; যাই বলেন না কেন এটা তারই বাড়ি, এবং ক্রুর হেসে বললেন, আপনার যাওয়ার কোনো জায়গাই নেই। যদি আপনি ওর লোভি হাত দুটিকে সুযোগ দেন তবে তিনি আপনার জন্য অনেক কিছুই করবে। স্মার্ট মেয়েরা সবসময় তাই করে। আপনি ভেবে পাননি এইসব স্মার্ট মেয়েরা কোন মুখে আকর্ষণীয় চাকরি নিয়ে লাওসে ফিরে যায় কিংবা নিউয়র্কেই থাকে?
বাকি রাতটা আপনি বাথরুমে ছিটকিনি আটকে কাটিয়ে সকালে বের হয়ে এলেন। ঝড়ো রাস্তায় লেকের ছোট মাছের খেলা দেখতে দেখতে হেঁটে চললেন। আপনার আংকেল হর্ন না দিয়ে গাড়িতে আপনার পিছু নিলেন; অবশ্য তিনি সবসময়ই আপনাকে মেইন স্ট্রিটে লিফট দিতেন। আপনি ভাবতে লাগলেন, লোকটি তার স্ত্রীকে আপনার চলে যাওয়া নিয়ে কি জবাব দিবে। তখন তার কথাটা আপনার মনে পড়লÑ অ্যামেরিকা হচ্ছে লেনদেনের জায়গা।
আপনি সেই শহরের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে বোনানজা বাসে চড়ে অন্য শহরে এলেন, যেটি ছিল ওই বাসের শেষ স্টপেজ। সেখানকার হাতের কাছের রেস্টুরেন্টটিতে ঢুকে মালিককে বললেন, আপনি অন্যান্য ওয়েট্রেসদের চেয়ে দুই ডলার কমে কাজ করতে চান। কালির মতো কালো চুলের আধিকারী জুআন একটু হেসে তার হলদেটে দাঁত বের করল, বলল, সে কখনো নাইজেরিয়ান কর্মচারি রাখেনি, অবশ্য এদেশে সব অভিবাসীদেরই কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। আরো বলে, সে নাকি নাইজেরিয়ায় গিয়েছিল। আপনাকে বেতনে মাত্র এক ডলার কম দিবে এবং তা টেবিলের নিচ দিয়ে; কর্মচারিদের জন্য কর দেয়া তার পছন্দ না।
এখন আপনার পে পড়াশুনা চালানো সম্ভব হয় না কারণ বিবর্ণ কার্পেটে মোড়ানো একটি ছোট্ট ঘরের ভাড়া আপনাকে যোগাতে হয়। ছোট্ট শহরটিতে কোনো কমিউনিটি কলেজ নেই তাছাড়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পড়াও বেশ খরচ সাপে। তাই শুরু করলেন পাবলিক লাইব্রেরি যাওয়া, সেখানে স্কুল ওয়েবসাইটে কোর্স সিলেবাস দেখে কিছু বই পড়তে শুরু করলেন। আর মাঝে মাঝে আপনার ডাবল বেডের দলা পাকান তোষকে বসে বাড়ির কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফ্যালেন।
আপনার বাবা-মা, জ্ঞাতিগুষ্ঠি আর বন্ধুরা আম ও আকারা ফেরি করে কখনো মুনাফা করতে পারে নি। তাদের দস্তার পাতে তৈরি অস্থায়ী বাড়ি-ঘরÑ যা বর্ষা মরসুমে ভেঙ্গে পড়ে। ডিভিতে অ্যামেরিকার ভিসা পাওয়ার পর অনেক লোকজন আপনাকে বিদায় জানাতে এসেছিল, তাদের আনন্দ উচ্ছাস আর ঈর্ষাও প্রকাশ করেছিল। তাদের ছেলেমেয়েরা যে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ে সেখানকার শিকেরা পর্যন্ত ডিভি পাঠানোর বাদামি খাম পেলে পরীায় ছাত্রদের ‘এ’ দিয়ে দ্যায়।
পরীায় ‘এ’ পাওয়ার জন্য আপনাকে টাকা খরচ করতে হয়নি, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিককে বাদামি খামও দিতে হয়নি। তবে এখন আপনি দেশে মা-বাবার কাছে বাদামি খামেই মাসের অর্ধেক বেতন পাঠিয়ে দ্যান। প্রতিমাসে জুআন আপনাকে যে বিল দ্যায় তা বখশিসের চেয়ে কম বলা যায়। এখন আপনি বাড়িতে চিঠি লিখেন না, আর লিখারই বা কী আছে? প্রথম কয়েক সপ্তাহ লিখতে চাইতেন কারণ তখন অনেক গল্প ছিল। আপনি অ্যামেরিকার আজব মানুষ সম্বন্ধে লিখতে চেয়েছিলেন ঃ তারা কতটা উৎসাহের সাথে তাদের মায়ের ক্যান্সারের কাহিনী আপনাকে বলেছিল, তাদের ভাইয়ের ইচরে পাকা বাচ্চাÍ কথা বলেছিলÑ যা কিনা গোপন রাখার বিষয়, শুধু পরিবারের লোকরাই জানবে এবং শুভ কামনা করবে। আপনি চিঠিতে জানাতে চেয়েছিলেন রেস্টুরেন্টে অ্যামেরিকানরা প্লেটে কত খাবার ফেলে যায় এবং যাওয়ার সময় বিলটা মুচড়ে প্লেটের নিচে রেখে যায় যেন টাকাটা নষ্ট করা খাবারের খেসারত। লিখতে চেয়েছিলেন সেই বাচ্চাটার কথা যে কেঁদে কেঁদে তার ব্লন্ড চুল টানছিল আর ওর মা-বাবা কান্না থামানোর পরিবর্তে ধমকে চুপ করতে বলছিল, তারপর বা”চ্চাটাকে রেখেই তারা উঠে গেল।
আপনি আরও লিখতে চেয়েছিলেন আ্যামেরিকায় সবার বড় বাড়ি আর গাড়ি নেই, তবে এখনো আপনি তাদের বন্দুক থাকা নিয়ে সন্দিহান, যদি থাকে তবে তা হয়তো তাদের ব্যাগের ভিতরে বা পকেটে থাকে।
শুধু আপনার মা-বাবার কাছেই না, আপনার বন্ধু-বান্ধব, কাজিন ও আত্মীয়-স্বজনদেরও এসব বিষয় নিয়ে লিখতে চাইতেন কিন্তু তাদের জন্য আপনার যথেষ্ট পরিমাণ হাতব্যাগ, জুতা ও ভিটামিন জাতীয় খাদ্যদ্রব্য কেনার সামর্থ নেই কারণ এখনও আপনাকে বাড়ি ভাড়া দিতে হয়। অতএব কাউকেই আপনার চিঠি লেখা হয় না।
কেউ জানে না আপনি কোথায় থাকেন, কাউকে জানানওনি। মাঝে মাঝে নিজেকেই আপনার অদৃশ্য লাগে, তখন চেষ্টা করেন আপনার রুমের দেয়াল ভেদ করে হলরুমে যেতে কিন্তু দেয়ালে বাড়ি খেয়ে আপনার হাতে কালশিরা পড়ে যায়। একদিন জুআন আপনাকে জিজ্ঞাসা করে বসল, কোনো ছেলের সাথে আপনার সম্পর্ক আছে কিনা যে আত্মরার্থে আপনাকে মেরেছিল। উত্তরে আপনি রহস্যময় হাসি দিলেন। প্রায় রাতেই আপনার মনে হয়, কিছু একটা গলা পেচিয়ে রয়েছে যা ঘুম ভাঙার আগেই আপনার শ্বাসরোধ করতে চায়।
কিছু লোক মনে করত আপনি জ্যামাইকান কারণ তারা ভাবতো এ ধরণের উচ্চারণ-ভঙ্গীর সব কালোরাই জ্যামাইকা থেকে এসেছে। আবার কিছু লোক মনে করত আপনি অফ্রিকান; তারা জিজ্ঞাসা করত কেনিয়া বা জিম্বাবুয়ে-র অমুক তমুককে আপনি চেনেন কিনাÑ তাদের ধারণা আফ্রিকায় সবাই সবাইকে চেনে।
একদিন রেস্টুরেন্টের আধো অন্ধকারে আপনার টেবিলের কাস্টমারটিকে যখন খাবারের মেন্যু বলছিলেন, তিনি হঠাৎ জানতে চাইলেন, আফ্রিকার কোন দেশ থেকে আপনি এসেছেন। নাইজেরিয়া, উত্তর দিয়ে আপনি পরবর্তী প্রশ্নটার জন্য অপো করতে লাগলেন, যেটা হবেÑ সেনেগাল বা বতসোয়ানা শান্তি মিশনে তিনি যে বন্ধু পাতিয়েছিলেন তাদের আপনি চেনেন কিনা? কিন্তু সে জিজ্ঞেস করলো, আপনি কি ইয়োরুবা নাকি ইগবো স¤প্রদায়ের? যেহেতু আপনার চেহারা ফুলানি-দের মতো না।
আপনি অবাক, ভাবলেন, সে নিশ্চয়ই নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক হবে যদিও বয়সে তরুণ কিন্তু কে বলতে পারে! ইগবো, আপনি উত্তর দিলেন। জুআন আপনার নাম জিজ্ঞেস করলো, বললো একুনা খুবই সুন্দর নাম। ভাগ্য ভালো সে আপনার নামের অর্থ জানতে চায়নি কারণ অনেকে বলতো এর অর্থ নাকি পিতার সম্পত্তি। আপনার কাছে এর অর্থ যথার্থই মনে হয়, যেমন আপনার বাবা স্বামীর আছে আপনাকে বিক্রি করবে।
লোকটি ঘানা কেনিয়া ও তানজানিয়া গিয়েছে এবং আফ্রিকার অন্যান্য দেশ সম্পর্কেও পড়েছে, পড়েছে তাদের ইতিহাস ও সমস্যা নিয়ে। নিজেকে লঘুজ্ঞান করে আপনি তার আজ্ঞাবহতা প্রকাশ করতে চাইলেন, যদিও শ্বেতাঙ্গরা , যারা আফ্রিকা খুব পছন্দ করে আর যারা অল্প পছন্দ করেÑ উভয়ই একই রকম সহানুভূতিশীল।
কিন্তু লোকটি বেশি জানার ভান করেনি, অ্যাংগোলা সম্পর্কে বলতে গিয়ে কমিউনিটি কলেজের অধ্যাপকটির মতো খুব জানার ভান করে মাথাও নাড়ায়নি, কোনো সহানুভূতিও দেখায়নি। পরের দিনও সে আপনার টেবিলে এসে বসলো, আপনি চিকেন স্যুপ দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, রান্না ঠিক আছে তো? তার বদলে সে আপনার কাছে লাওস সম্বন্ধে জানতে চাইলো। দ্বিতীয় দিন এসেও অনেকণ আলাপ করলো, রাজনীতি নিয়ে আপনার মত শুনতে চাইলো, আপনার কি মনে হয় না মবুটু আর ইদি আমিন দু’জনের চরিত্রই এক? আপনি বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, রেস্টুরেন্টে এসব আলাপ নিষিদ্ধ। কফির কাপ টেবিলে রাখার সময় সে আপনার হাত স্পর্শ করলো। আপনি তৃতীয় দিন জুআনকে জানিয়ে দিলেন, ঐ টেবিলে আপনি আর কাজ করবেন না।
সেদিনই সে বাইরে খুটিতে হেলান দিয়ে অপো করতে লাগলো, আপনার কাজের শিফট শেষ হলে অনুরোধ করলো তার সাথে ‘দ্য লায়ন কিং’ ছবিটি দেখতে যেতে কারণ হেকুনা মেতাতা নামটির সাথে আপনার নামের মিল আছে আর ইমোশনাল মুভির মধ্যে একমাত্র ‘দ্য লায়ন কিং’-ই তার ভালো লেগেছে। উজ্জ্বল আলোতে আপনি তার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন তার চোখের রং কচি জলপাই তেলের মতোÑ সবুজাভ সোনালি। অ্যামেরিকায় একমাত্র কচি জলপাই তেলই আপনি পছন্দ করতেন, সত্যিকারভাবে উপভোগ করতেন।
স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সে আপনার সিনিয়র ছিল, তবে বয়সে আনেক বড়। আপনি জানতে চাইলেন কেন তখনও তার গ্রাজুয়েশন শেষ হয়নি। Ñএটা অ্যামেরিকা, এখানকার শিাব্যবস্থা তোমার দেশের মতো নাÑ যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায়ই বন্ধ থাকে, আর লাগাতার ধর্মঘটের ফলে শিকদের লেকচার দেয়া সম্ভব হয় না যার ফলে শিার্থীদের পাশ করে বেরুতে তিন বছর বেশি লাগে। সে বলছিল হাইস্কুল পাশ করার পর সে বেশ কয়েক বছর সময় নিয়েছে নিজেকে জানতে এবং দেশভ্রমন করেছে, যার বেশিরভাগই ছিল আফ্রিকা ও এশিয়ায়। আপনি প্রশ্ন করলেন, কখন তার নিজেকে জানা শেষ হলো। শুনে সে হেসে উঠলো কিন্তু আপনি হাসলেন না। আপনি জানতেন না স্কুলে যাওয়া না-যাওয়ার ব্যাপারটা অ্যামেরিকায় এতটাই সিম্পল যে ছেলেমেয়েরা এটা নিজেরাই ঠিক করে, নিজেরাই জীবনের নির্দেশনা দ্যায়।
জীবন যা দিতে চায় তাই আপনি হাত পেতে নেন, জীবন যেদিকে নির্দেশ করে সেদিকেই আপনি যেতে অভ্যস্ত। পরের তিনদিনও লোকটির সাথে ঘুরতে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলেন। কারণ আপনার কাছে এটা ঠিক মনে হয়নি আর সে যে দৃষ্টিতে আপনার দিকে তাকায় তাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না, যদিও তার সব কথার উত্তরেই আপনি সহজ হাসি দ্যান। কিন্তু চতুর্থ রাতে আপনার কাজ শেষ হলে তাকে আর অপোরত দেখা গেল নাÑ তখন আপনার খারাপ লাগতে লাগলো। এই প্রথম আপনি অনেণ প্রার্থনা করলেন এবং যখন সে সত্যি সত্যি আপনার পিছনে এসে অভিবাদন জানালো আপনি বললেন, হ্যাঁ, এখন আপনি সে অনুরোধ করার আগেই তার সাথে যেতে রাজী আছেন। কিন্তু আপনার ভয় হলো সে আর অফার করবে কিনা।
পরেরদিন সে আপনাকে চেনজস রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেল। সেখানে আপনার কেকের সাথে দুটি লাকি কুপন পাওয়া গেল, অবশ্য দুটিই ব্ল্যাংক ছিল।
অন্য টেবিলে কাজ করতে চাওয়ার পিছনের কারণটি বলতে পেরে আপনি নতুন বয়ফ্রেন্ডের সাথে সহজ হয়ে উঠলেন। বর্ণবাদ, হ্যাঁ, বর্ণবাদÑ রেস্টুরেন্টের টিভি ক্যামেরায় দেখা যায় সবাই টেবিল ভাগ করে বসেÑ অইউরোপীয়, শ্বেতাঙ্গ, কালোÑ সবাই। সব বর্ণের মানুষের মধ্যে আপনি কিছুতেই শ্বেতাঙ্গদের পে নন। আপনার বয়ফ্রেন্ড কথা শুনে হেসে ওঠে, বলে, সে বর্ণবাদে বিশ্বাস করে না, তার মা তাকে এরকমই শিা দিয়েছে।
লাওসে আপনার বাবা স্কুলে শিকতার পাশাপাশি ট্যাক্সি চালায়Ñ এ কথা জানানোর পর আপনি আরও বেশি ঘনিষ্ঠ হতে পেরেছিলেন। একদিন বৃষ্টির দিনে আপনার বাবার ট্যাক্সিতে চড়ে আপনি ভিজে গিয়েছিলেন কারণ ট্যাক্সির জং ধরা ছাদের ফুটা দিয়ে পানি পড়ছিল। লাওসের রাস্তায় যানবাহন সংখ্যাতিরিক্ত, সবসময় জ্যাম লেগে থাকে আর বৃষ্টি হলে তো বিদিকিচ্ছিরি অবস্থা হয়। রাস্তাগুলোর ড্রেনেজ ব্যাবস্থা খুবই খারাপ; বৃষ্টির দিনে রাস্তার বড় খানাখন্দগুলোতে লোকজনের গাড়ি আটকে গেলে আপনার কাজিনরা গাড়ি ধাক্কা মেরে উঠিয়ে দিয়ে টু পাইস কামিয়ে নেয়। বৃষ্টি এবং পানিতে ডোবা রাস্তা বুঝে সেদিন আপনার বাবা সময় মাতো ব্রেক কষতে পারছিল না। তাই মাথায় বাড়ি খেয়ে ব্যথা অনুভূত হওয়ার আগেই আপনি শব্দ পাচ্ছিলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে সামনের যে গাড়িটিকে আপনার বাবা ধাক্কা মারে সেটা গাঢ় সবুজ রঙের একটি বড়সড় বিদেশি গাড়ি আর ওটার হলুদ হেডলাইট দুটো বেড়ালের চোখের মতো জ্বলছিল। ভয়ে আপনার বাবা কাঁদতে শুরু করলো, গাড়ি থেকে বের হয়ে মা চাইতে চাইতে রাস্তার উপর প্রায় শুয়ে পড়লো। সরি স্যার, সরি স্যার, আমারে আর আমার চৌদ্দগুষ্ঠি বেচলেও আপনার গাড়ির একটা টায়ারের দাম উঠবো নাÑ আপনার বাবা অনবরত বলতে লাগলো।
কিন্তু গাড়ির পিছনে বসা বিশাল লোকটি বের হলো না, তার ড্রাইভার বের হয়ে য়-তি পরীা করলো। আপনার বাবার হাত-পা ছড়ানো শরীরটার দিকে চোখের কোণ দিয়ে তাকালো যেন তার কণ্ঠের মিনতি কোনো গান যা সে সবচে’ অপছন্দ করে। শেষমেশ আপনার বাবাকে মাফ করে

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


