রাজধানীতে অনুমোদিত আবাসন প্রকল্প মাত্র ৫ টি : বাকিসব অবৈধ বলছে রাজউক
রহমান মাসুদ
১৯৮৭ -এ ঢাকা মহানগর এলাকায় আবাসিক সংকট নিরসনে ৫টি বেসরকারী প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছিল রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপড়্গ (রাজউক)। এরপর আর কোনো কোম্পানিকে অনুমোদন দেয়া হয়নি। অথচ ঢাকা ও তার চারপাশে আবাসন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কোম্পানির সংখ্য ১০০’র বেশি। দীর্ঘদিন এ এসকল অনুনোমোদিত কোম্পানির পস্নট ও ফ্লাট না কিনতে জনগনকে সতর্ক করে গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে রাজউক। প্রতিষ্ঠানটি এ ব্যবসাকে অবৈধ, অনৈতিক ও প্রতারনামূলক কাজ হিসেবে দেখছে বলে জানিয়েছেন রাজউক চেয়ারম্যান। ঢাকা ডিটেইল এরিয়া পস্নানে এ সকল প্রকল্পকে আমলে নেয়া হচ্ছেনা বলে জানিয়েছেন তিনি। এদিকে এ বিষয়ে সংশিস্নষ্ট ডেভলপার কোম্পানীর সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও কেউ রাজি হননি। পরে রিহ্যাব চেয়ারম্যান তানভীরম্নল হক প্রবাল বলেন, আমরা ক্রেতাদের সবসময়ই অনুমোদিত প্রকল্পর পস্নট কেনার জন্য পরামর্শ দিয়ে থাকি।
১৯৮৭ -এ রাজধানীর আবাসিক সংকট মোকাবেলায় বেসরকারী খাতকে সম্পৃক্ত করার সিদ্ধানত্ম নেয় রাজউক। সে সময় ভূমি উন্নয়ন এবং পস্নট তৈরি করে আগ্রহীদের কাছে বিক্রির জন্য অনুমতি দেয়া হয় তিন কোম্পানির পাঁচ প্রকল্পকে। এগুলো হলো- ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভলপমেন্ট লিমিটেড এর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার প্রথম অংশ, স্বর্নালী ডেভলপমেন্টের স্বদেশ প্রপার্টিজ, ইস্টার্ন হাউজিংয়ের বনশ্রী আবাসিকের রামপুরা অংশ, মহানগনর ও পল্লবী প্রকল্প।
রাজউক সূত্র জানায়, বর্তমানে ঢাকা এবং এর চারপাশে ব্যঙ্গের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে আবাসিক প্রকল্পের সাইনবোর্ড ও নাম সর্বস্ব প্রকল্প। এ কাজে হাত মিলিয়েছে দেশের শীর্ষ ব্যাবসা কোম্পানিগুলোও। যে সরকার যখন ড়্গমতায় আসে তখন তাদের নিকটতম ব্যবসায়ীরা এ সকল আবাসন কোম্পানি গড়ে তোলে। বিনিময়ে ক্ষমতাসীন সরকারী দলকে দেয়া হয় বড় অংকের উপঢৌকন। রাজউকের কর্মকর্তারা বিষয়টি চেপে যাওয়ার জন্য গ্রহন করে ঘুষ।
এবার অননুমোদিত প্রকল্পগুলোকে ঢাকা ডিটেইল এরিয়া প্লন (ড্যাপ) থেকে বাদ দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে রাজউক। বিভিন্ন হাউজিং কোম্পানির এধরনের শতাধিক অননুমোদিত প্রকল্প আছে যেগুলোকে চাপে পড়ে বন্ধ করতে না পেরে ড্যাপ থেকে বাদ দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে রাজউক।
জানা গেছে, ১৯৮৭ -এর পর হাউজিং কোম্পানিগুলো অনত্মত ৭০টি প্রকল্পের লে-আউট জমা দিয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) অনুমোদন দিয়েছে মাত্র ৫ টি প্রকল্প। তবে বাঁকি প্রকল্পগুলোর মালিকরা আর অনুমোদনের অপেক্ষা করেনি। অনুমোদন না নিয়েই তারা ব্যবসা শুরম্ন করেছে। এমনকি অনেক প্রকল্পের প্লট বা ফ্ল্যাট বিক্রিও ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। এসব প্রকল্প গ্রাস করেছে খাল, বিল, পুকুর, গ্রাম, নদী, চাষের জমি, লো ফ্লো জোন, কবরস্থান, বসত বাড়ি, স্কুল, ফলের বাগান ইত্যাদি।
নিয়ম হচ্ছে রাজউকের অনুমোদন না নিয়ে কোন কোম্পানি আবাসন প্রকল্প করতে পারবে না। করলে আইন অনুযায়ী রাজউক ওই প্রকল্প বন্ধ করে দেয়ার ড়্গমতা রাখে। কিন্তু প্রভাবশালী আবাসন কোম্পানির বিরম্নদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পেরে রাজউক কিছুদিন আগে পত্রিকাগুলোতে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি দেয়। এছাড়া আর কোন ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি রাজউকের পক্ষ থেকে। আর এখন এগুলোকে বাদ দিয়ে ডিটেইলড এরিয়া পস্ন্যান (ড্যাপ) করার উদ্যোগ নিচ্ছে রাজউক।
এ প্রসঙ্গে রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নূরম্নল হুদা বলন, যে কোন প্রকল্প বাসত্মবায়নের আগেই তা অনুমোদনের জন্য রাজউকে লে-আউট জমা দিতে হয়। রাজউক প্রকল্প এলাকা সরেজমিন প্রদর্শন করে সে মোতাবেক মতামত দিয়ে মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠায়। তিনি বলেন, অনুমোদন না নিয়ে যে সব প্রকল্প চলছে তাদের বিরম্নদ্ধে করণীয় নিয়ে আমি সরকারের উপর মহলে যোগাযোগ করেছি। তারা গ্রিন সিগন্যাল দিলেই এ্যাকশন শুরম্ন করবো।
রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, আমার এক পা কবরে, আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব। প্রকল্পগুলো ড্যাপ থেকে বাদ দেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেসব প্রকল্পের অনুমোদনই নেই সেগুলো ড্যাপে কীভাবে থাকবে? সেগুলোকে বাদ দিয়ে আমরা ড্যাপ প্রণয়ন করব। তিনি আরো বলেন, যারা অননুমোদিত প্রকল্প বাসত্মবায়ন করছে এবং ব্যবসা করছেন, পত্র-পত্রিকা এবং ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন প্রচার করছে, তারা জনগনের সঙ্গে প্রতারনা করছে। এর বিকল্প হিসেবে রাজউক ও এর বিরম্নদ্ধে জনগনকে সতর্ক করার জন্য বিজ্ঞাপন প্রচার করছে।
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, ড্যাপে যদি কোথাও জলাশয় থাকে সেখানে জলাশয়ই দেখানো হবে। যদি কোন জলাশয় ভরাট করে কোন আবাসন প্রকল্প করা হয় তবে সেটা উৎখাত করা হবে। অনেকে অভিযোগ করেছেন, সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. তপন কুমার নাথ ড্যাপে আবাসন ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিয়েছিলেন। তিনি খাল-জলাশয় দখল করে যেসব প্রকল্প হয়েছে সেগুলোকে সমতল ভূমি বা সেখানে জলাশয়-খাল ছিল না বলে মতামত দেন। এ কারণে ড্যাপের প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়। হাউজিং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ড. তপন কুমার নাথের আঁতাতের কথা বর্তমান চেয়ারম্যানও এ প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেছেন।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে দৈনিক ডেসটিনির পড়্গ থেকে সকল ল্যান্ড ডেভলপারদের সঙ্গে যোযোগ করা হয়। কিন্তু কেউই বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে চাননি। পরে বেসরকারী আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয। রিহ্যাব চেয়ারম্যান তানভীরম্নল হক প্রবাল জানান, রিহ্যাবের ৬৩৭ সদস্য রয়েছে। যারা র্যান্ড, ফ্লাট, এবং ল্যান্ড ও ফ্লাট দুটোরই ব্যবসা করে। তিনি আরো জানান, এরমধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় ল্যান্ড ব্যবসায়ী আছে ৪৭ জন।
প্রবাল বলেন, যে সকল প্রকল্প ঢাকার বাইরে আছে ড্যাপ বাসত্মবায়ন শুরম্ন হওয়ার আগ পর্যনত্ম তাদের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। যে সব ডেভলপারদের প্রকল্প ঢাকার মধ্যে আছে, তা অনুমোদনের জন্য ল্যান্ড ডেভলপার এসোসিয়েশনের সঙ্গে সরকারকে বসার জন্য মন্ত্রীকে অনুরোধ করা হয়েছে। যে সকল কোম্পানী অনুমোদনপ্রাপ্ত বলে পস্নট বিক্রি করছে তাদের বিরম্নদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে তিনি মনত্মব্য করেন।
রিহ্যাব চেয়ারম্যান জানান, রিহ্যাব সব সময়ই জলাধার রড়্গার কথা বলে। এছাড়া পস্নট ক্রেতাদের অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রকল্প থেকে পস্নট কেনার কথাও বলা হয়। যেসব ক্রেতা অননুমোদিত প্রকল্প কিনেছে ড্যাপ পাশ হওয়ার পর সে সব ক্রেতাদের ড়্গতিপূরণ দেয়ার জন্য সরকারকে রিহ্যাবের তরফ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে। পরে ল্যান্ড ডেভলপারদের কাছে থকে সরকার তা ড়্গতিপূরণ হিসেবে নেবে বলে তিনি উলেস্নখ করেন। রাজউক অনুমোদিত প্রকল্পের সংখ্যা পাঁচ বলে তিনি স্বীকার করেন।
রাজউক সরবরাহকৃত উলেস্নখযোগ্য অননুমোদিত আবাসন কোম্পানীর নাম
ইস্টার্ন হাউজিংয়ের বনশ্রী গোড়ান প্রকল্প, আফতাব নগর, রূপ নগর, আশুলিয়া প্রকল্প। যমুনা সিটি, বসুন্ধরার ৮০ ভাগ(বালূ নদী পর্যনত্ম), বসুন্ধরা রিভার ভিউ, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটিেড এর নর্থ টাউন, সাউথ টাউন, ইস্ট টাউন, ওয়েস্ট টাউন, মধুমতি মডেল টাউন, মধুমতি ইকো সিটি, বসুমতি আবসিক প্রকল্প, বিডিডিএল এর নতুন ধারা, পিংক সিটি জেনোভ্যালি, নর্থ সাউথ ডেভেলপমেন্ট, আমিন মোহাম্মদ গ্রম্নপের মাদানী নগর, গ্রীন মডেল টাউন, আশুলিয়া মডেল টাউন, উত্তরণ মডেল টাউন, বাড্ডা মডেল টাউন, বসুমতি হাউজিং, পূর্বাচল রিজেন্ট টাউন, ইউনাইটেড সিটি, পূর্বাচল আমেরিকান সিটি, এন আর বি হাউজিং, স্বদেশ পূর্বাচল সিটি, পূর্বাচল বেস্ট ওয়ে সিটি, নর্শ সাউথ হাউজিংয়ের রিভার ব্রিজ, হামিদ রিয়েল এস্টটের প্রিয় প্রিয়াঙ্গন, এসুরেন্স ডেভেলপমেন্টস এর এসুরেন্স সিটি, ছায়াকুঞ্জ আবাসিক প্রকল্প, আশুলিয়া মডেল টাউন, নবোদয় হাউজিং লিমিটেড, রূপায়ন টাউন, কনকর্ড লেকসিটি, বিএমআই প্রপার্টিজ, আসিয়ান ল্যান্ডস লিমিটেডের আসিয়ান সিটি, বসুুধা সিটি, সাগুপ্তা হাউজিং , যমুনা - বসুন্ধরা সিটি, আশুলিয়া মডেল টাউন, আক্কাস নগর আবাসিক এলাকা, সাত মসজীদ সমবায় সমিতি আবাসিক প্রকল্প, শৈলি আবাসিক প্রকল্প, চাঁদ উদ্যোগ সমবায় সমিতি হাউজিং, বুড়িগঙ্গা হাউজিং প্রকল্প, রাজধানী উদ্যোগ, বছিলা সিটি ডেভলপারস, আর্কিটেকচার রিসার্স ডেভেলপমেন্ট এন্ড হাউজিং, মেট্রো ডেভেলপমেন্ট এন্ড হাউজিং, চৌধুরী রিয়েল এস্টেট কোম্পানি লিমিটেড ইত্যাদি।
(রিপোর্টটি আজ দৈনিক ডেসটিনিতে ছাপা হয়েছে।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



