স্বেচ্ছাচার না করা গেলে তারে স্বাধীনতা বলে না। স্বাধীনতা মানেই স্বেচ্ছাচারের অধিকার।

সত্য মিথ্যা হিপোক্রিসি

৩১ শে মে, ২০১০ দুপুর ১:১২

শেয়ারঃ
0 0 0

এক. কোনটা হিপোক্রিসি: সুযোগ নেওয়া নাকি না নেওয়া?

১.
একটা ব্যাপারে তো আমরা সবাই অভ্যস্ত -- মানে আমি ঢাকা শহরের মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্ত বড়লোকদের নিয়া কথা বলতেছি, আশা করি এর বাইরে অন্য কোথাও এইসব হয় না -- সেইটা হইল আমরা প্রায় সকলেই চাকর পালন করি। যাগোরে ‘কাজের লোক’ বলি আমরা ভদ্র ভাষায়। ভদ্রতা বেশি হইলে মেইড, গভর্নেস, সার্ভিস পারসন ইত্যাদি। কারো কারো চাকর নাই। এখন চাকর কইমা গেছে।

মুখে আমরা সমান বলি, মানুষের প্রতি সমান আচরণ না হইলে রাগ হই। লোকজন লোকজনরে ঠকায় বইলা হিপোক্রিট বইলা গালি দেই। তো আমরা যে চাকর পালি এইটা কী? কম পয়সায় লোক ঠকানো। আমি মনে করি না যে মানুষরে দিয়া গরুর গাড়ি কি রিকশা টানানো যাবে না। বা গাড়ির ড্রাইভারদের ৫/৬ হাজার টাকা দিয়া সারাদিনরাতি গাড়িতে বসাইয়া রাখন যাইব না। অবশ্যই যাবে। দুনিয়া ব্যবসাস্থল। এইখানে কান্ট্রি ম্যানেজার হিসাবে আপনি সাত লাখ টাকা পাইবেন বইলা চাকররে কি ড্রাইভাররে সাত হাজার টাকা দিতে হবে এমন কথা নাই। কেউ কাউরে পারতে টেকা দিতে চায় না। আমি শুনছি চাকর-বাকররা এই দেশে দুই/তিন হাজার টেকার বেশি পায় না বাসা-বাড়িতে। তো দুনিয়ার এই বাংলাখণ্ডে নিজেদের ঠকতে দিয়া কাজ করতে গরীব অসংস্কৃত অভদ্র লোকরা তো আছেনই। আমরা কি সেই সুযোগ নিব না? এই সুযোগ নেওয়াটা হিপোক্রিসি নাকি কেউ নিতে না চাইয়া বেশি পয়সা বা ন্যায্য পয়সায় কাজ করাইলে সেইটা হিপোক্রিসি? আমি প্রশ্ন রাইখা গেলাম। দি ফাস্ট কোশ্চেন। পরে মনে থাকলে এই নিয়া বলব।

২.
আপনারা জানেন ভদ্রতা এক রকমের শক্তি। এইটা মানুষরে বাছাই করার ক্ষমতা দেয়। ভুল জায়গায় ছেলে-মেয়ের বিয়া দেওনের থিকা ভদ্রলোকদের বাঁচায়। অল্প দিনের পয়সার লগে বেশি দিনের পয়সার যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য সেইটা ধরতে শিখায়। সর্বোপরি কালচার বা কৃষ্টি বা সংস্কৃতি ঠিক রাখতে হেল্প করে। জগত ভারসাম্যময় থাকে। ইভেন রেডিক্যালরাও দেখবেন ভদ্রতার বাইরে যায় না। তো হিপোক্রিসি নিয়া অন্তত আমার আলাপ আমি ভদ্র সমাজের চৌহদ্দির বাইরে থিকা দেখতে চাই না। আই লাভ টু বি ভদ্র। আমার শার্ট প্যান্ট জুতা মানে স্যান্ডেল আছে। আমি অভদ্র লোকদের সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপ করি না। অ্যাম আই এ হিপোক্রিট? মনে হয় না। মানুষ তার রুচি বা টেস্টের বাইরে গেলে বরং সেইটাই হিপোক্রিসি হবে। কিন্তু তা হইলে অন্যদের সমস্যাটা কী?

৩.
সো গরীব মানেই হইল যার ভদ্রতা নাই। যদি বাই এনি চান্স গরীব বা সেমাই গরীব ভদ্র হইয়া যায় তারে আমরা বলি বিনয়ী। তবে ‘বিনয়ী ভদ্রলোক’ অন্য জিনিস। আগের দিনে স্কুল মাস্টাররা যখন কম পয়সার বেতন নিয়া বড়লোকদের ছেলে মেয়েদের পড়াইতে যাইতেন তখন ওইরকম ছিল। আগে তো লজিঙ টিচাররাও আছিলেন। এখন স্কুল মাষ্টাররা আর ‘বিনয়ী’ নাই। ওনারা ভদ্রলোক হইছেন। আমি বলতে চাইতেছি, সর্বদা গরীবের ভদ্রতা ভ্রদ্রলোকদের পারপাস সার্ভ করবে -- এইটা তার পেশার অংশ। এইটা ভদ্রলোকদের সেই সৌজন্যমূলক ভদ্রতা না। এইটা প্রায়োগিক ভদ্রতা, আর্থাৎ পেশাদারি বিনয়। ফলে বিনয়ী ড্রাইভার (এই রকম খুব একটা পাওয়া যায় না। তেল গ্যাস চুরির দায় নিয়া থাকেন ইনারা)। বিনয়ী মালী। বিনয়ী দ্বারবান। বিনয়ী সাংবাদিক। বিনয়ী দোকানদার। (কিন্তু বিনয়ী ব্যবসায়ী পাইবেন না। দরকারই নাই। পয়সা থাকলে বিনয় লাগে না।) অনেকে দেখবেন বাড়িওয়ালারা কেন বিনয়ী না এই নিয়া খুব রাগ! বা, দেখবেন মধ্যবিত্ত ভদ্রঘরের কন্যাসন্তান রিকশাঅলারে গালি দিতেছে ‘অভদ্র’ বইলা। অন্য পেশাজীবীদেরও এই উদাহরণে নিয়া আসা যাইত। কিন্তু ভদ্রসমাজের সঙ্গে রিকশাঅলাদের যোগ বেশি। ভদ্রলোকরা শৈশব থিকা রিকশাঅলাদের পিঠ দেখতে দেখতে বড় হয়। তো ‘অভদ্র’ বলে। আগে মধ্যযুগে, সত্তর আশির দশকে স্যান্ডেল দিয়া জুতার বাড়ি মারত। পরে বস্ত্র ব্যবসায় উন্নতির ফলে রিকশাঅলারা আর খালি গায়ে গাড়ি চালান না। মনে হয় সেই কারণেই জুতার বাড়িও কম খান।)

তো রিকশাঅলাদের কেন ‘অভদ্র’ বইলা গালি দেয়? রিকশাঅলা মানেই তো যিনি ভদ্রলোক নন। আপনারা শুনছেন রিকশাঅলাদের কেউ ভদ্রলোক হয়? যেইখানে নাগরিকদের সাধারণ নামই ভদ্রলোক, সেইখানে কায়িক বা গায়ে খাটা লোকেরা আর যাই হউক ভদ্রলোক না। ভদ্র-র একটা অস্থির বা না-ফিক্সড সংজ্ঞা এই রকম হইতে পারে -- যিনি কায়িক শ্রম করেন না।

‘হিপোক্রিট’ এই নামপদ ভদ্রলোকদের সঙ্গে জড়ায়ে আছে। আপনারা কখনো শুনছেন কেউরে বলতে যে এই রিকশাঅলাটা, তরকারিবেচা লোকটা, ফকিন্নির এই বাচ্চাটা -- একটা হিপোক্রিট; এই গালি দিতে। আমি অবশ্য শুনছি, ‘ফকিন্নির বাচ্চা একটা হিপোক্রিট’ এই গালি দিতে আমি শুনছি। আদতে এই গালি দেওয়া হয় এই ভাইবা যে আসলে ফকিরের সন্তান সে না কিন্তু তারে দেখলে বনেদি ভদ্রলোকদের এই ধারণা হয় যে এই হালার পয়সা হইছে অল্পদিন হয়। কালচার আসে নাই। (আহারে কালচার!)

তো এই যে অবিনয়ী ভদ্র স্কুলগামী কি কলেজগামী ইউনিভার্সিটিগামী ছাত্রী রিকশাঅলার কাছ থেকে যে ভদ্রতা আশা করে এর কারণ কী? আপনারা বলবেন, কেন ছাত্ররা/ছেলেরা কি এই আশা করে না? আমার মনে হয় না সেইটা তারা করে। তারা আশা করে বশ্যতা। সেইটা তারা বাসার মা, বোন, মেয়েদের কাছ থিকা যেমন আশা করে রিকশাঅলাদের কাছ থিকাও তেমনটা। চাইলে ধরা যায় যে রিকশাঅলা (পুরুষ) এই জীবটি সোসাইটির ভদ্র পুরুষদের কাছে নারীস্বরূপা। এবং তারা তাদেরকে ‘তুমি’ও ডাকে। তো রিকশাঅলাদের নাগরিক মধ্যবিত্তরা -- ওনারাই চরেন তো -- পুরুষেরা বলেন ‘তুই’ বা ‘তুমি’ -- আর মেয়েরা সচরাচর আপনি বলে। মনে হয় ভয়ে বলে। যাদের গাড়ি আছেন তারা এই অভিশাপ থিকা মুক্ত। তো নাগরিক মধ্যবিত্ত সুশীলা মেয়েদের কী সেই ভয়? নারীস্বরূপাদের প্রতি নারীদের এই ভয় কেন? রিকশা উল্টাইয়া ফেলাইয়া দিতে পারে, এমন কোনো জিনবাহিত ভয়? বা যতদূর যাবে তার আগে নামাইয়া দিয়া হুজ্জত বাঁধাবে? তো কেন বলে মেয়েরা যে ‘অভদ্র রিকশাঅলা’। মনে হয় রিকশাঅলারা ভদ্রলোকদের মেয়েদের বাগে পাওয়ার পর বিনয়ী থাকে না। এবং ছোটযাত্রার বা মাত্রার ভ্রমণকালীন কোনো সম্পর্ক তারা ডেভেলাপ করতে চায়। সেইটা রিকশার চাক্কা জোরে ঘুরাইয়া হউক, তিন চাক্কার সংগীত কইরা হউক, বা কোনো ছোটগল্প জুইড়া দিয়াই হউক। এইটা নিশ্চিতই অপমানজনক। এতে মধ্যবিত্ত জাতিকার, মধ্যবিত্ত মেয়েজীবটির মানহ্রাস ঘটে। এবং তারা যেহেতু পরিবার দ্বারা শোষিত ফলে এইটারে ঠেকানো তাদের জন্য কঠিনও বটে। যে কারণে তারা রিকশাঅলাদের ‘আপনি’ বলতে বাধ্য হয়।

তো এই ভ্রমণকালীন যে অনুভূতিরাশির আগমন সেইটা প্রটেক্ট করতে গিয়া মেয়েরা নিশ্চয়ই অমোচনীয় শ্রেণিপার্থক্যকে ইনডিকেট করার জন্য ‘রিকশাঅলারা অভদ্র’ এমন ভাব নিয়া বইসা থাকে। বা চেহারায় দূরত্ব রক্ষাকারী কুঞ্চিত এক ভাব রক্ষা করে -- যে আপনি অভদ্র আমরা ভদ্র। সেবা বিক্রয়কারীর সেবার অধিক তারা তার দেহখানির নিয়ন্ত্রণও নিয়া নিতে চায়। এবং অবজ্ঞার মারফতে সেটির সামাজিক খোজাকরণ করে। ফলত রিকশাঅলাটি একটি অলিঙ্গবাচক ভারবাহী প্রাণীতে পরিণত হয়। অর্থাৎ ভদ্রর সঙ্গে অভদ্র শ্রেণীর যেহেতু বিবাহ অসম্ভব, সুতরাং রিকশাঅলার উচিত হবে না ভদ্রঘরের মেয়েদের ব্যাপারে কোনো রোমান্টিক চিন্তার বা কল্পনার বা যৌন কল্পনার আশ্রয় নেওয়া। আমার কবিতা থিকা দেই:

মধ্যবিত্তের তিনটি মেয়ে, নিম্নবিত্ত একটি রিকশাঅলা
এক রিকশায় একদিকেই তো যাচ্ছে
তিন মেয়ে সেই কখন থেকে
রিকশাঅলার পিঠের দিকে তাকিয়ে আছে
রিকশাঅলা কি একটিবারও পিছন ফিরে চাচ্ছে?

(কে বেশি অহংকারী, রিকশাঅলা নাকি তিনটি মেযে; বড় মাপের ছোট কবিতা/ছোট মাপের বড় কবিতা; আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি, ২০০১)

ফলে সদাই আমরা এই দুই শ্রেণীর মানুষ এই শহরে বসবাস করি। অভদ্র -- কায়িক শ্রমিক। আর আমরা ভদ্র --লোকেরা। এই ভদ্র লোকেরাই হিপোক্রিসি নিয়া ভাবিত। ফকিন্নির বাচ্চাদের সেই ভাবনা, মনে হয় নাই। তো আমি দেখাইতে চাইলাম যারা হিপো্ক্িরসি নিয়া ভাবেন এবং রাগেন তাদের সবার মধ্যেই হিপোক্রিসি বিরাজমান। এবং তাদের সবার এরিয়া হচ্ছে ভদ্রতা। ভদ্রতা একটা সামাজিক আচরণবিধির নাম। হিপোক্রিসি কি এইটারে সমস্যায় ফেলায় দেয়? দেখা যাউক। অর্থাৎ দি থার্ড কোশ্চেন, হিপোক্রিসি ভদ্রতার কাজে লাগে, নাকি ভদ্রতারে সমস্যায় ফেলায় দেয়?


দুই. মিথ্যার নানা প্রকার

তার আগে আসেন একটা অন্য প্রসঙ্গে যাই। মিথ্যা নিয়া একটু কথা বলি। বুদ্ধিমান সাধু অগাস্টিন মিথ্যারে আট রকমে সাজাইছিলেন। সেগুলা হইল:

১. ধর্মশিক্ষায় মিথ্যা।
২. মিথ্যা যা কারুর ক্ষতি করে এবং কারুরই উপকারে আসে না।
৩. মিথ্যা যা কারুর ক্ষতি করে এবং কারুর উপকারও করে।
৪. মিথ্যা বলার আনন্দে মিথ্যা বলা।
৫. মিথ্যা অন্যের আলাপের সাবলীলতা ঠিক রাখার জন্য বলা। হুঁ হাঁ করা।
৬. মিথ্যা যা কারোই কোনো ক্ষতি করে না বরং কারো কারো উপকার করে।
৭. মিথ্যা যা কারোই কোনো ক্ষতি করে না এবং কারো জীবন বাঁচায়।
৮. মিথ্যা যা কারোই কোনো ক্ষতি করে না এবং কারো ‘পবিত্রতা’ রক্ষা করে।

এ ছাড়াও মিথ্যা আছে। মিথ্যা অনেক রকম।

১. ফেব্রিকেশন। -- আমি নামগুলা ইংরেজিতে বলতেছি। কারণ এগুলা আমি খুঁইজা পাইছি উইকিপিডিয়ায়, ইংরেজিতে। বাংলায় অনুবাদ পাওয়া গেলে বাংলায়ই বলতাম। তো ফ্রেব্রিকেশন হইল, যখন কেউ সত্য হিসাবে কোনো বর্ণনারে উত্থাপন করে। এই বানায়া তোলা বা সত্যের অপলাপ বা ফেব্রিকেশন-এর বিষয় সম্ভবপর হইতে পারে আপাত সত্যও হইতে পারে বাট সত্য না। দেখা গেছে এই রকম সত্য খুবই সম্ভবপর এবং কেউ কেউ খায়ও। উদাহরণ, উইকিতে যেইভাবে আছে আর কি: কুকুরে আমার হোমওয়ার্ক খাইয়া ফেলাইছে -- ভদ্র ভাষায়, কুকুরটি আমার হোমওয়ার্ক খেয়ে ফেলেছে!

২. বোল্ড ফেসড লাই। -- মিথ্যা যে মিথ্যা সেই নিয়া যখন সন্দেহের কোনো কারণই থাকে না। যেমন বান্দরে শহীদুল জহীরের সঙ্গে কলা খাইতে বইসা বলল যে তারা কলা খাইতেছে না।

৩. লাইঙ বাই ওমিশন। -- কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আড়াল কইরা বাকি সত্যটা প্রকাশ করা। কাউকে বুইঝা শুইনা ভুল বোঝানো। বা পুরানা ভুল বুঝুইন্না জায়গায় রাইখা দেওয়া। যথা স্বামীটি বলল একটা কফির দোকানে সে চা খাইতে আসছে কিন্তু বলল না যে তার লগে অন্য মেয়ে আছে। এখন এইটা তথ্য আড়াল হইতে পারে নাও পারে। কারণ স্বামীটি যখন অন্য পুরুষ বন্ধুদের সঙ্গে কফির দোকানে বসে তখনও বলে না। তবে সঙ্গে নারী থাকার বিষয়টি না বলার সঙ্গে অন্য কারণ থাকে। যে কারণে এইটা লাইঙ বাই ওমিশন হওয়াই ভালো।

৪. লাই-টু-চিলড্রেন। -- বাচ্চাদের ঠিক মাথা ঠিক রাখনের জন্য মিথ্যা বলা। বড়দের বিষয়গুলারে চিলড্রেন উপযোগী কইরা সার্ভ করা। যেমন, নরজন্ম বিষয়ে বাচ্চাদের আমরা কত হাবিজাবি বলি।

৫. হোয়াইট লাই। -- সাদা মিথ্যা। সচরাচর যেই মিথ্যা হুদাই বলে মানুষ, তবে তাতে কারো ক্ষতি হয় না সেইটারেই হোয়াইট লাই বলে। যেমন কারো পোশাক-আশাক আপনের ভালো লাগে নাই কিন্তু বললেন, আল্লা কী সুন্দর লাগতেছে!

৬. নোবল লাই। -- মহৎ মিথ্যা। সাধারণত ক্ষমতা চক্রের মানুষজনের দুর্বলতা ঢাকার জন্য এই মিথ্যার আশ্রয় নেয় মানুষ। এই রকম মিথ্যা মানুষরে ঠিক হইয়া যাইতে দিতে পারে বইলা এর এই নাম। ধরা যাক বিল ক্লিনটন সম্পর্কে চাইলে মনিকা লিউনস্কি এই রকম একটা মিথ্যা বলতে পারতেন।

৭. এমার্জেন্সি লাই। -- জরুরি মিথ্যা। তৃতীয় পক্ষ লাভবান হইতে না পারে সেই মিথ্যা। ধরা যাক অবিশ্বাসী স্ত্রীর ব্যাপারে প্রতিবেশীনীর নিরবতা।

৮. পার্জারি। -- আইনের সামনে হলফ কইরা মিথ্যা বলা। এইটা মিথ্যা তো মিথ্যাই আবার শাস্তিযোগ্যও।

৯. ব্লাফিং। -- ধোঁকা প্রদান। ফুলবলারদের কেউ ডান পায়ে গোল করতেছে দেখাইয়া বাম পায়ে গোল করল। এই মোটামুটি সমাজসিদ্ধ মিথ্যা।

১০. মিসলিডিং। -- বিপথে চালনা। মানে খুব যে মিথ্যা বলা হয় তা না। কিন্তুু খেয়াল রাখা হয় যাতে আসল ব্যাপারটা ধরতে না পারে। মানে একটা মিথ্যায় অন্যরে বিশ্বাসী রাখনের চেষ্টা।

১১. এক্সাজারেশন। -- বাড়াইয়া বলা। কোনো একটা সত্য বিষয় ঠিক রাইখা বাকিটা বাড়াইয়া বলা। যেমন কেউ বলে যে সে এমন ক্ষুধার্ত যে চাইলে একট ঘোড়া খাইয়া ফেলতে পারে। এইখানে ক্ষুধা অংশ ঠিক আছে।

১২. জোকোস লাইস। -- এইটারে সবাই মিথ্য বলতে চায় না। টিজ বা মশকরা করার সময় এই রকম মিথ্যা মানুষ বলে। বা কেউ যখন গল্প বলার সময় যেন সে-ই সঠিক তা যতই অবিশ্বাস্য হউক - আর সবাই ভুল এই রকম মিথ্যা যখন বলা হয়।

১৩. কনটেক্সুয়াল লাইস। -- যখন কোনো সত্য কথা বলতে গিয়া মনে হয় যথেষ্ট উপাত্ত না থাকলে তো এইটা মিথ্যা মনে হবে - তখন মূল তথ্যরে শক্তিশালী করার জন্য মানুষ যেই মিথ্যা বলে।

১৪. প্রোমোশন লাইস। -- বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলা এইটা কইরা আসতেছে অনেক দিন হয়। কী করে তা বলার দরকার নাই।

১৫. বিলিফ সিস্টেম। -- ভালোর নিমিত্তে কোনো কোনো বিশ্বাসীরা মিথ্যা বলারে সঠিক মনে করে।

অনেকগুলা মিথ্যা পাওয়া গেল। এখন এগুলি হিপোক্রিসি কিনা? না এইটা কোনো কোশ্চেন না। আমি মনে করি মিথ্যা আর হিপোক্রিসি এক না। মানুষ হিপোক্রিসি করার জন্য টুল হিসাবে যেমন মিথ্যা ব্যবহার করতে পারে -- বা সচরাচর করে -- তেমনি সত্যও ব্যবহার করতে পারে। তাইলে দেখা যায়, সত্য বা মিথ্যা দুইটাই মিথ্যা আচরণের জন্য কাজে লাগে। তাইলে হিপোক্রিসি আসলে মিথ্যা না, মিথ্যা আচরণ। অর্থাৎ কথা সত্য হউক মিথ্যা হউক মিথ্যা আচরণের জন্য কাজে লাগতে পারে। এবং মানুষ লাগায়।


তিন. নৈতিকতার বিবিধ অনুষঙ্গ (মরাল রিলেটিভিজম)

এই ব্যাপারে আমি মরাল রিলেটিভিজমরে টানতে চাই। দর্শনে এইটা এমন একটা অবস্থান যার বিশ্বাসীরা মনে করে নীতি বা আদর্শ কোনো নৈর্ব্যক্তিক বা শ্বাশত সত্য প্রকাশ করে না। বরং সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ব্যক্তিগত অবস্থার প্রতিফলনই আসে নীতি বা আদর্শে। সুতরাং কোনো নির্দিষ্ট মানদন্ড দিয়ে মানুষের আচরণসমূহের বিচার সম্ভব না। এইটারে অনেকে নৈরাজ্যের অবস্থাও মনে করেন। যেহেতু কোনো ব্যক্তিরই সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ব্যক্তিগত অবস্থান এক না সুতরাং আইনের বাইরে কারো কোনো নৈতিক অবস্থানের বিচার আদৌ সম্ভবই না। যদি তাই হয় তাইলে হিপোক্রিসিরে ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছা বা বিবিধ অনুষঙ্গ থেকে পাওয়া পরিগঠন আকারে দেখা ছাড়া উপায় থাকে না। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে হিপোক্রিসিরে একটি সামাজিক বর্গের আত্মপ্রকাশের স্বাভাবিক উপায় হিসাবেই দেখতে হবে। যে কারণে আঞ্চলিক কোনো আচরণবিধিরে সমালোচনা করাটা সাম্প্রদায়িকতায় দুষ্ট হইয়া ওঠে সেই একই কারণে ব্যক্তির বা কোনো বর্গের হিপোক্রিসির সমালোচনাও নিখাদ পরচর্চা বা সাম্প্রদায়িকতার অ্যাকশন মাত্র।


চার. হিপোক্রিসি বনাম ভদ্রতা

আমরা কি ভদ্রতা রক্ষার জন্য হিপোক্রিসি বাদ দিতে চাই কিনা? অনরে দা বালজাক (১৭৯৯-১৮৫০) বইলা গেছেন ম্যানারস আর দি হিপোক্রিসি অফ এ নেশন। যদি ভদ্রতার অপর নাম হিপোক্রিসি হয় তাইলে ভদ্রতা রক্ষার জন্য হিপোক্রিসি বাদ দেওয়ার বিষয়টা কেমন হইয়া দাঁড়ায় না। ভদ্রতা মানেই হইল কৃত্রিম বা কপট আচরণ ও সম্পর্ক। এইটারে আমি খারাপ বলার কে?


পাঁচ. কথা আর কাজের বৈষম্য

ডেভিড হাল বলছেন, হিপোক্রিসি ইজ দি লুব্রিকেন্ট অফ সোসাইটি। সমাজ স্মুথ রাখে হিপোক্রিসি। রালফ ওয়ালডো এমারসন আরো ভালো বলছেন, অ্যাট দি এনট্রেন্স অভ সেকেন্ড পারসন, হিপোক্রিসি বিগিনস। হিপোক্রিসি কোনো সমস্যা না। যারা হিপোক্রিসি নিয়া সমস্যা তৈরি করেন সমস্যা তারাই। হিপোক্রিসির ব্যাপারে নারাজ আকাট আদর্শবাদী সমাজ। যাদের কথা আর কাজে কোনো পার্থক্য নাই। কিন্তু আপনারা জানেন, আদর্শবাদীরা জানে না, কথা আর কাজের (অর্থাৎ কথার প্রয়োগ) মধ্যে সময়ের যে আগপর সেই বাস্তবতারে ইগনোর করলে যেই কাজের জন্য এত কথা তৈরি হয়, সেই কাজ আর কাজ থাকে না। তা মাছিমারা কেরানীর মরা মাছিটি হইয়া থাকে।


ছয়. নিজের জন্য পরের জন্য

জার্মান ভাষায় আছে: (ইংরেজিতে) ‘ড্রিংক ওয়াইন, প্রিচ ওয়াটার।’ নিজে মদ খাও, অন্যরে বলো পানি খাইতে। ইসলামের নবী কী করলেন -- তিনি কোনো এক বালকেরে মিঠাই খাইতে নিষেধ করার আগে নিজে মিঠাই খাওয়া বন্ধ করলেন। যুথবদ্ধ সামন্ত সমাজে সেই রকম দরকার থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের সমাজে, বালকেরে মিঠাই খাওয়া বন্ধ করতে আমরা চাই না। সুতরাং আমরাই মিঠাই খাওয়া বন্ধ করব কেন? বালকের মিঠাই খাওয়া বন্ধ করার জন্য নবীজী মিঠাই খাওয়া বন্ধ করবেন, কিন্তু তাতেও যদি বালকের মিঠাই চাওয়া বন্ধ না হয়? আর নবীজী মিঠাই খাবেন না বইলাই বালক মিঠাই খাবে না কেন? কেউ চাইলে আমরা যা দিতে পারব না, তা নিজেরাও ব্যবহার করব না? কোনটা হিপোক্রিসি?


সাত. মিথ্যা কীভাবে বলতে হয়

সত্য কথা কী জিনিস? ধরা যাক, আপনি আমারে কিছু জিজ্ঞেস করলেন। আমি তখন কী করতে পারি। আপনার কথার উত্তরে আমি সত্য বলতে পরি। মিথ্যা বলতে পারি। চুপ কইরা থাকতে পারি। সেই চুপের আবার ভঙ্গিভেদে সত্যমিথ্যা থাকতে পারে। কিন্তু এই যে আপনের / মহাজীবনের প্রশ্নের উত্তর আমার দিতেই হবে এই অবধারিততা -- ইনিই নিয়তি। ইনিই পরম সত্য। এই বাধকতাই সত্যের পটভূমি তৈরি করে। অর্থাৎ সত্য বলার আগে এই বাধ্যতা বা পটভূমি তৈরি হইয়াই আছে। কী সেই পাটাতন? যে কেউ কিছু জানতে চাইলে তোমাকে উত্তর দিতে হবে। এগুলা শুনলে ধর্মের অমৃত বচন মনে হয়। এবং তিনি যা জানতে চান সেই উত্তরই তোমাকে দিতে হবে। আল্লার দুনিয়ায় এই ফাঁদ পাতা আছে।

ফলে হিপোক্রিটরা যখন এঁনারে, জাগতিক বাস্তবিক প্রকাশ্য নিয়তিরে ফাঁকি দিতে চায় -- অর্থাৎ যেই প্রশ্ন বা সামাজিক ভঙ্গি বা পরিবেশের উত্তর দিতে হিপোক্রিট বাধ্য হয় তার বিরুদ্ধে হিপোক্রিটের কিছু করার থাকে। তারও সত্য এবং মিথ্যার বা চুপ থাকার ভঙ্গিরেই আশ্রয় করতে হয়। কথা হইল এইটারে শেষ পর্যন্ত কেন মিথ্যা আচরণ ধরা হইতেছে?

পরম সত্যের সামনে মিথ্যাচারও এক সত্যের মত। মানে আপনি মিথ্যাই বলেন সত্যই বলেন কিছু যায় আসে না। আপনার যে বলতে হয় সেইটাই বড় সত্য হয়ে দেখা দেয়। এর থিকা বের হইবেন কীভাবে। আপনি তো হিপোক্রিট না, আপনি এইটার মধ্যেই থাকবেন। সকল জিজ্ঞাসার আপনি জবাব দিবেন। কিন্তু তাই কি? বাড়ির চাকর যখন স্যাররে জিজ্ঞেস করে, আব্বা কোথায় গেছিলেন -- তখন সেইটা বেয়াদবি। এবং এই কথার উত্তর মনিবরে দিতে হয় না। কাজেই ইতিহাসে এই রকম প্রশ্নের সাক্ষাৎও পাওয়া যায় না। তথাপি যদি মনিবরে কেউ জিজ্ঞেস কইরা বসে, তখন মনিব কি সত্য উত্তর দিবেন? তখন মনিবের নিরবতার কী অর্থ হবে। মনিব এইটারে কোনো প্রশ্নই মনে করবেন না। কিন্তু ধরা যাক মনিব চাকররে জিগাইলেন, স্যার কোথায় গেছিলেন? গাড়িতে কয় লিটার ডিজেল নিছেন...। এগুলার উত্তর দিতে সে বাধ্য। কাজেই যেখানে বাধ্যতা আছে সে কথা সত্য নয়। মিথ্যা নয়। সেই কথার নাম স্বীকার বা অস্বীকার। আমাদের যখন কর্তা আছে, আমাদের কথা আর নাই। কর্তার জানবার বিষয় ও উত্তরের জোগান দেই আমরা।

এখন সোসাইটিতে যখন মনিব-মনিব একত্রিত হয় তখনও একটা পরোক্ষ, অপ্রকাশ্য, সাটল মনিব-চাকর পরিবেশনার নাট্যমুহূর্ত তৈরি হয়। সেইটা বয়স, কৌলিন্য, দাপট, গাম্ভীর্য, সৌন্দর্য, হামবড়াই নানা কারণেই হইতে পারে। তখন কেউ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে অন্যে তার উত্তর দিতে বাধ্য হয়। প্রশ্ন না করলেও প্রশ্ন থাকতে পারে। সেই প্রশ্নের যে নিরবেও উত্তর দিতে হবে সেইটা দুই পক্ষই বুঝতে পারে। হিপোক্রিসি তখন রক্ষাকর্তা। সমাজ রক্ষার জন্য দুর্বল, ভালনারেবল, অধঃ পক্ষ হিপোক্রিসির আশ্রয় নেয়। এই হিপোক্রিসি শক্তিশালী পক্ষের প্লাটফরমের বিরুদ্ধে বুনতে হয়। কারণ যার সঙ্গে হিপোক্রিসি করা হচ্ছে সে আপনার নিয়মে খেলবেন না বলেই আপনার হিপোক্রিসি করতে হচ্ছে। হিপেক্রিটের কপটতা জিজ্ঞাসাকারীর প্রশ্নকারীর অবমাননাকারীর জিজ্ঞাসাপদ্ধতিরে সমস্যা সঙ্কুল কইরা তোলে। ফলে হিপোক্রিসি হচ্ছে সমাজ বিপ্লবের অংশ। বিধানকে ফাঁকি দেওয়ার মাধ্যমে, ভুল তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে জগতের বহুরূপতার সম্ভাবনা ওপেন করা হয়। জগতরে আপনি বুইঝা ফেললেন বটে -- কিন্তু আপনার নিয়মেই সেইটা ভুল বোঝা। হিপোক্রিটরে বলা যায় না যে আপনি মিথ্যা বলতেছেন। সে সত্য বলার সকল প্রণালীই ব্যবহার করে। হিপোক্রিট আছে বইলাই চতুর ব্রহ্মান্ড অধরা রইয়া যায়। স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটে। মহা আখ্যানের মধ্যে হাজারটা খোড়ল তৈরি হয়। আমরা অক্সিজেন পাই।

ধরা যাক, হিপোক্রিটরা আর নাই। কী হইত তাইলে অবস্থা? সবাই যা বলে তা করে। আর যেহেতু হিপোক্রিট নাই পরচর্চাকারীরাও নাই। স্তূপাকার এক সাইজের আলুদের জীবন। আল্লাহ, তোমার হিপোক্রিটদের তুমি রক্ষা কইরো!


আট. আমি সমাজে বাস করি

আমি সমাজে বাস করি সুতরাং আমাকে সত্য বলতে হবে। আপনাদের মধ্যে যারা সমাজে বিশ্বাস করেন তারা হয়তো বলবেন ‘কেন তুমি যদি সমাজ না মানো সমাজও তোমাকে মানবে না।” এইটা আদিকালের বিধি -- তুমি হত্যা করলে সমাজ তোমাকে হত্যা করবে। কিন্তু এখন অগ্রসর সমাজ (কেউ কেউ হয়তো অগ্রসর বলতে কী বোঝায় তা নিয়া আলাপ করতে চাইবেন -- আমি ‘কী বোঝায়’ বলতে ‘কী বোঝায়’ নিয়াও আলাপে আগ্রহী) তো এখনকার অগ্রসর সমাজ নিজেরে ব্যক্তির বা জনমন্ডলীর কাছে জলাঞ্জলি দিতে বাধ্য হয়েছে। তো সমাজ এমন দাবি করে না যে তুমি সমাজের বিরুদ্ধে এই এই করছো এখন সমাজ তার প্রতিশোধ নেবে।

প্রতিশোধের দায়িত্ব ছিল ধর্মের। এখন সমাজ সেই দায়িত্ব আর নেয় না। কোনো কোনো সমাজ নেয়। (যখন উন্নততর সমাজ-এর উদাহরণ সামনে আছে ক্লদ লেভিস্ট্রসদের বৈচিত্র রক্ষার খাতিরে যে সমাজ ধর্ম বা পুরাণের ভাগাড় সে রকম সমাজের দৃষ্টান্তে আপন সমাজ ভাঙতে কী গড়তে আমি আগ্রহী হবো না।) গ্রাম সমাজ, প্রাচীন কৌম সমাজ এগুলা খুব ভালো সমাজ। কিন্তু আমাদের কাজে আসবে না। আমরা হিপোক্রিটদের রক্ষা করতে পারে, অমর্যাদা করবে না এমন একটা সমাজের কথা বলতেছি। যে সমাজ প্রতিটি ব্যক্তির ইচ্ছা, সুবিধা, কল্যাণ, নিরাময়, শান্তি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। সমাজ মানেই আর যৌথ নয়। বরং যুথের বা গণের বা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত যাতে এককের বা লঘুদের উপর না চাইপা বসে সেইটা ঠিক রাখাই সমাজের কাজ। এখনকার সমাজ আইন, নৈতিকতা, অধিকার ইত্যাদি প্রশ্নের (কী প্রশ্ন আমারে জিগেশ করলে বলতে পারব না) সুরাহা করতে করতে এই জায়গায় আইসা দাঁড়াইছে। কেউ কেউ বলবেন এইটা তো ইউটোপিয়ান সমাজ। আমরাও এইখানে ইউটোপিয়াই তৈরি করতে বসছি। কারণ এই সমাজে হিপোক্রিটদের ব্যাপারে প্রায় সকলের অবস্থান একই রকম। এবং এরা নিজেরা সকলে আবার হিপোক্রিটও। তাইলে কী দাঁড়াইল? হিপোক্রিটরাই হিপোক্রিটদের বিরুদ্ধে অ্যাকটিভ বা প্যাসিভ হইয়া আছে। তো আমি বললাম হিপোক্রিসি ইজ নট আ প্রবলেম আর আপনি ভাবলেন নো প্রবলেম নো প্রবলেম এমন তো হয় না। হিপোক্রিটদের জন্য কোনো জায়গা রাখতে সমাজের কর্ণধাররা রাজি না। হিপোক্রিটরা সমাজের ইহুদি ও রাজাকার? অধিকার যাদের দেওয়া যাবে না এমন একটা বর্গ কি এরা? আধুনিক মানুষ এখন কেবল হিপোক্রিটদেরই ঘৃণা করে। আপনারা কি হিপোক্রিটদের ঘৃণা করেন? (প্রশ্ন)


নয়. হিপোক্রিসি বিষয়ে আইন নাই?

হিপোক্রিটরা আপনার প্রশ্নের মিথ্যা উত্তর দেয়। হিপোক্রিট বলে একটা করে আরেকটা। হিপোক্রিট স্বার্থোদ্ধারের জন্য আপনাকে বিপথে চালনা করে। হিপোক্রিট তাদের হিপোক্রিসি নিয়া থাকুক, আমার কী সমস্যা। আমরা এইটারে নতুন কোনো ধর্মের আকারে নেই না কেন? হিপোক্রিট যখন আইসা আমার উপরে সওয়ার হয় সেইটা একটা সমস্যা। সেইটা তো আর্দশবান নন হিপোক্রিটরা সওয়ার হইলেও সমস্যা। আমি বলতে চাইতেছি সমাজে সুস্থ, পঙ্গু, অর্ধমৃত, চোর, বাটপার, জল্লাদ সবার যেমন বিবিধ অধিকার আছে হিপোক্রিটেরও তা আছে। হিপোক্রিসির বিরুদ্ধে আমি নাই। আমার জানতে ইচ্ছা হয় আপনারা কেন আছেন?

এইজন্যই আইনের প্রতি আমার শ্রদ্ধা। ভালো লোকরা হিপোক্রিটদের বিরুদ্ধে এখনো আইন প্রণয়ন করতে পারে নাই। শেষ পর্যন্ত হিপোক্রিটদের বিরুদ্ধে ভালো মানুষদের অবস্থান একটি রুচিগত অবস্থান। কিছু এক ধরনের লোক অন্য ধরনের লোকদের বিরুদ্ধে একসঙ্গে হয় আর বলে এ হিপোক্রিট ও হিপোক্রিট, জানো এ না এই করছে, ও না ওই করছে। ডট ডট ডট...। এও এক রকমের হিপোক্রিসি। তাতেই বা সমস্যা কোথায়?


দশ. ভদ্রতাই হিপোক্রিসি

আমাদের ঠিক করতে হবে আমরা ভদ্রসমাজ চাই কিনা। যদি ভদ্রসমাজ আশা করি তাইলে এর প্রাণশক্তি হিসাবে হিপোক্রিসিরে আমরা পাবো। আর ভদ্রসমাজ না চাইলে সমাজ বিপ্লবের ডাক দিতে হবে। সেই ডাক দিতে এই অল্পপ্রাণ পেটি বুর্জোয়ারা রাজি হবে না। এইখানকার কম্যুনিস্টরা পর্যন্ত আরো ভদ্র হইতে চায়। সুতরাং নানান প্রাতিষ্ঠানিক হিপোক্রিসির পাশাপাশি বিচিত্রধর্মী হিপোক্রিসিরে ব্যক্তির স্বাভাবিক খায়েশ হিসেবে নেওয়াই ভালো। হিপোক্রিসি সম্পর্কের অ-স্থিরতারে অ-স্থিরই রাইখা দেয়। মানুষ কেবলই নিজের দিকে তাকাবার খানিক অবসর পায়।


এগার. সংজ্ঞা

হিপোক্রিসির বাংলা কপটতা। হিপোক্রিসি সম্পর্কে উইকিপিডিয়ায় আমি যা পাইলাম তা যথেষ্ট সংজ্ঞা। উনি বলতেছেন, হিপোক্রিট হইতেছে এমন মানুষ যে বিশ্বাস, ধর্ম বা জীবনপদ্ধতির বেলায় অন্যের জন্য যা প্রচার করে নিজে সেইটা প্র্যাকটিস করে না। যেমন বয়স আছে লোকরা বয়স নাই লোকদের যথা বাচ্চাদের সিগারেট খাইতে মানা করে কিন্তু নিজেরা খায়।

এইটা একটা ফালতু উদাহরণ। প্রাপ্তবয়স্করা যা যা করে -- যথা যৌনকর্ম, একাকীত্ব উপভোগ -- তা তা বাচ্চাদের করতে নিষেধ করতেই পারে। নিষেধ করার পাড়ে যারা আছে তারা যে কোনো ব্যাপারেই নিষেধ করবে। এইটা অবস্থান চর্চার ব্যাপার। হিপোক্রিসির না।

তো হিপোক্রিসি শব্দটা নাকি গ্রিক hypokrisis শব্দ থিকা আসছে। হুইচ মিনস ‘প্লে অ্যাকটিং’ ‘অ্যাকটিং আউট’ ‘অ্যান অ্যানসার’ ইত্যাদি। আর hypocrite আসছে হইল গ্রিক শব্দ hypokrites থিকা। যার সঙ্গে আবার hypokrinomai শব্দের যোগ আছে। অর্থ ‘আই প্লে এ পার্ট’।

যেসাস খ্রিস্টের জন্মের ৪০০ বছর আগে গ্রিসের বিখ্যাত ভাষ্যকার ডেমোসথিনেস তার প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাসশিনেসকে hypokrites বইলা বিদ্রুপ করতেন। অ্যাসশিনেস রাজনীতিতে নামার আগে সফল অভিনেতা ছিলেন। hypokrites হিসাবে মঞ্চে নানান চরিত্রে অভিনয়ের ইঙ্গিত কইরা ডেমোসথিনেস রাজনীতিক হিসাবে তার বিশ্বাসযোগ্যতারে কটাক্ষ করতেন। আধুনিক কালের শব্দ হিপোক্রিসি হয়তো ওইখান থিকাই নেতিবাচক গুণাগুণ সঙ্গে লইয়া আমাদের সামনে হাজির হইছে। ]

(১৫ নভেম্বর ২০০৮-এ ধানমণ্ডির কজমো লাউনজ-এ দেওয়া ওপেন মাইক বক্তৃতা)

 

প্রকাশ করা হয়েছে: শিক্ষামূলক!  বিভাগে । বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ৩১ শে মে, ২০১০ দুপুর ১:৩৩
সবুজ অঙ্গন বলেছেন: (১৫ নভেম্বর ২০০৮-এ ধানমণ্ডির কজমো লাউনজ-এ দেওয়া ওপেন মাইক বক্তৃতা)


এতো পরের বক্তৃতা এতো আগে প্রচার করলেন যে:)
৩১ শে মে, ২০১০ রাত ১০:৩০

লেখক বলেছেন: এক সময় করলেই হয়।

২. ৩১ শে মে, ২০১০ দুপুর ১:৩৯
বলাক০৪ বলেছেন: আমার একটাই প্রশ্ন, এত্তবড় পোস্ট ল্যাখার সময় পাইলেন ক্যামনে?


পোস্ট মনে হয় ভালো হইছে, তবে হিপোক্রেসি না কইরা বলতে পারি যে পুরাটা বুঝি নাই।
৩. ৩১ শে মে, ২০১০ দুপুর ১:৪৩
জলপাই দেশি বলেছেন: খুব ভালো লাগলো পড়ে। সব কথার সাথে একমত না হলেও আপনার বিশ্লেষণে যুক্তি আছে। ভাষা চমৎকার।
৫. ০৬ ই জুন, ২০১০ দুপুর ১:৩৪
কাঠফুল বলেছেন: যুথের বা গণের বা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত যাতে এককের বা লঘুদের উপর না চাইপা বসে সেইটা ঠিক রাখাই সমাজের কাজ।

 

মোট সময় লেগেছে ১.০২৫৯ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস