(এত লোক এত অন্যায় দুঃখ পাচ্ছে যে, দূরে বসে বসে আরামে থাকতে লজ্জা হয়- তাদের দুঃখের অংশ যদি আমি নিতে পারি তা হলেও দুঃখ অনেকটা লাঘব হয় )
খুব কম বয়সে রবীন্দ্রনাথ ভানু সিংহ ছদ্ম নামে কিছু কবিতা ও গান লিখেছিলেন। কী অপরুপ সুন্দর মানূষটি। দীর্ঘকায়, শক্তিমান পুরুষ, অথচ চক্ষু দুটি ভারী কোমল, মাথায় অনেক চুল, মুখ ভর্তি কাঁচা পাকা দাড়ি, অথচ যখন হাসেন তখন মনে হয়, ওর শরীরে বয়েসের কোনও ছাপই পড়েনি। ভরাট, সুরেলা কন্ঠস্বর, সব সময় মজা করে কথা বলতেন। এ মানুষটার শরীরে বুঝি একটুও রাগ নেই,অবশ্য উনি যখন অন্য মানুষদের সাথে কথা বলতেন, তখন উনি গম্ভীর হতে পারেন, শক্ত কথা বলেন, অন্যদের বকুনিও দিতেন ।
'ভারতবর্ষ' পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন, জলধর সেন।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'ভারতবর্ষ' পত্রিকার লেখক নন, তিনি 'প্রবাসী'র ও 'সবুজপত্রে'র । রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন আর্যদের আদলে শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম স্থাপন করেছিলেন যৌবনকালে। তিনি শুধু বাংলায় নয়, শুধু ভারতের নয়, সমস্ত বিশ্বের জ্ঞান বিনিময়ের কেন্দ্র গড়ে তুলতে চেয়েছেন।যে জ্ঞান সব রকম ধর্মবিশ্বাসেরও উর্ধ্বে
বাঙ্গালিদের আয়োজিত সংবর্ধনা সভাগুলিতে কবি খুব ভয় পেতেন।একবার সাহিত্য পরিষদের সভায় কবি অসীম ধৈর্যের সাথে, হাসি হাসি মুখে সব শুনে গেলেন।বাল্যকাল থেকে এরকমই সহবতের শিক্ষা পেয়েছেন, নিজের অপছন্দের কথা কিছুতেই বলতে পারতেন না মুখ ফুটে।
যুদ্ধের সময় ইংরেজদের বিব্রত করতে না চেয়ে তাদের সাথে সহযোগিতার নীতি নিয়েছিলেন গান্ধীজি, কিন্তু বাধ্য হয়েছিলেন সত্যাগ্রহ আন্দোলন ঘোষনা করতে।বানোয়ারিলাল চৌধুরী নামে একজন শান্তিনিকেতনে এসে কবিকে শুনিয়ে ছিলেন জালিয়ানওয়ালাবাগের মর্মান্তিক সংবাদ।
প্রতি বছরই তিরিশে চৈত্র অমৃতসর শহরে খুব বড় আকারের বৈশাখী উৎসব হয়।কাছাকাছি গ্রাম থেকে হাজার হাজার মানূষ আসে।গ্রামের সাধারণ মানূষ জানত না নিষেধাজ্ঞার কথা। প্রায় হাজার দশেক মানুষ সমবেত হয়েছিল জালিয়ানওয়ালাবাগ নামে একটি পার্কে, সেটি চর্তুদিকে দেয়াল দিয়ে ঘেরা, একটি মাত্র প্রবেশের রাস্তা। জেনারেল ডায়ার তার সেনাবাহিনী নিয়ে এসে সেই প্রবেশ পথ আটকে দেয়।সাধারণ মানুষকে ছত্রভঙ্গ হতে বলা হলো না, কোনও সাবধান বাণী উচ্চারণ করা হলো না, জেনারেল ডায়ার বীরদর্পে হুকুম দিলেন গুলি চালাতে। অস্ত্রহীন, শান্ত, নিরীহ মানুষের দল, তাদের মধ্যে নারী-পুরুষ,শিশু-বৃদ্ধও ছিল, গুলি খেয়ে মরতে লাগল পোকা-মাকড়ের মতন। শত শত নিহত ও আহতের আর্তনাদও ছাপিয়ে গিয়েছিল গুলির শব্দে। রাস্তাটা সরু বলে মেশিনগান আনা যায়নি, বন্ধুকের টোটা একসময় ফুরিয়ে গেল বলেই সকলকেই শেষ করা গেল না
রবীন্দ্রনাথ এই অবস্থার কথা জেনে ক্ষুদ্ধ, ইত্তেজিত। ভাবলেন কিছু একটা অবশ্যই করা দরকার। অ্যান্ডুজকে তিনি দিল্লীতে গান্ধীজির কাছে পাঠালেন একটা প্রস্তাব দিয়ে। গান্ধীজি রাজী থাকলে তিনিও দিল্লি চলে যাবেন। তারপর ওরা দু'জনে একসাথে পাঞ্জাবে প্রবেশ করার চেষ্টা করবেন। পাঞ্জাবের বাইরের লোকের প্রবেশ তখন নিষিদ্ধ ।রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজিকে নিশ্চিত গ্রেফতার করা হবে, সে সংবাদ গোপন রাখা যাবে না, প্রচারিত হবে বিশ্বের সর্বত্র। এটাই হবে প্রতিবাদ
গান্ধীজি এই প্রস্তাবে রাজী হননি।তারপর তিনি চিত্তরঞ্জন দাশের বাড়িতে গেলেন।কবি বললেন,পাঞ্জাবের ঘটনায় বাঙ্গালিরা কেউ প্রতিবাদ করবে না ?তিনি এটা সহ্য করতে পারছিলেন না। তখন কবি মনে মনে ভাবলেন, আমাকেই যদি সব দায়িত্ব নিতে হয়, তা হলে আর সভা ডেকে লোক জড়ো করার দরকার কী, নিজের কথা লিখেই জানাব। ইংরেজ সরকার আমাকে খাতির করে নাইটহুড দিয়েছিল। যে -সরকার আমার দেশের মানুষের ওপর এমন নৃশংস অত্যাচার করে, সেই সরকারের দেওয়া খেতাব আমার দরকার নেই। জালিয়ানওয়ালাবাগের প্রতিবাদে আমি নাইটহুড ফিরিয়ে দিচ্ছি
অনেক কাটাকুটি করে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ( কী জ্বলন্ত ভাষা ) - " The time has come when badges of honour make our shame glaring in their incongruous content of humiliation, and I for my part wish to stand, shorn of all special distinctions, by the side of my countrymen...
[চলবে.....]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

