রাধা চক্রবর্তী এবং ফকরুল আলম রবীন্দ্র-সাহিত্য নতুনভাবে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি করার জন্য দারুন একটি কাজ করেছেন । তারা 'দ্য এসেনশিয়াল টেগোর' শিরোনামে আটশো উনিশ পৃষ্টার এক খন্ডে সমাপ্ত রবীন্দ্রনাথের বিভিন্নধর্মী রচনার ইংরেজি অনুবাদ সম্পাদনা করেছেন । ( এই কাজটি সুন্দরভাবে সমাপ্ত করার জন্য তাদেরকে অনেকে সাহায্য করেছেন । ) প্রকাশ করেছে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসের পক্ষে বেলন্যাপ প্রেস, প্রকাশকাল-২০১১ ।
১৯১৩ সা্লে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পাওয়ার দশ বছর পুরো হতে না হতেই যখন পশ্চিমা বিশ্ব রবীন্দ্রনাথকে ভুলতে শুরু করে এবং অনেককাল পরে তার একটি হদিস বের করার জন্য বুদ্ধদেব বসু ইদ্যেগ নেন, তখন তিনি রবীন্দ্রনাথের নিজের কবিতা অনুবাদের ক্ষেত্রে কয়েকটি সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করলেন । বুদ্ধদেব বললেন- রবীন্দ্রনাথ প্রথম ভুলটি করেছিলেন যে, তিনি নিজের ভালো কবিতাগুলি অনুবাদ না করে অপেক্ষাকৃত সাধারণ কবিতাগুলি অনুবাদ করেছিলেন । বুদ্ধদেব আরো বলেন-রবীন্দ্রনাথন ভালো ইংরেজি জানলেও ততটা ভালো জানতেন না, যা ইয়েটসকে প্রাথমিকভাবে আলোড়িত করলেও পরবর্তী দশোকের প্রধান কবি এলিয়টের মনোরঞ্জন করতে পারে । (বুদ্ধদেব অনুভব করতে পারেন নি যে, রবীন্দ্রনাথের মধ্যে একটি অতিকায় উচ্চাকাঙ্কা ছিল বিশ্বব্যাপী পরিচিতি থাকার ।) রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাইজ অর্জন ও তার দেহত্যাগের মধ্যকার সময়টুকুতে ইউরোপ শুধু যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ করল তা না, তারা পৌছে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জঙ্গম পরিস্থিতির সম্মুখে এবং তার মধ্যে প্রাচ্যের ঋষি কবি রবীন্দ্রনাথের শান্তির ললিত বাণী শুনবে সে ধৈর্য তখন পশ্চিমা সমাজে কোথায় !
রবীন্দ্রনাথ নিজেও তার ইংরেজি ক্ষমতা নিয়ে নিশ্চিত ছিলেন না । ১৯১৫ সালের ১৮ নভেম্বর একটি চিঠিতে, ইংরেজ কবি রর্বাট ব্রিজসকে রবীন্দ্রনাথ সবিশেষ লিখলেন- তার কিছু পান্ডুলিপি দেখে যদি তিনি একটু ভাষাটা ঠিক করে দেন তাহলে তিনি খুব উপকৃত হন । রবীন্দ্রনাথ অধ্যবসায় ও অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি তার ইংরেজিকে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন । রবীন্দ্রনাথ প্রায় দু'হাজার পৃষ্ঠাব্যাপী ইংরেজি লেখেন, যার প্রধানতই গদ্য, এবং সেগুলো দশ খন্ডে প্রকাশিত হয় টেগোরস ইংলিশ রাইটিংস শিরোনামে । রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- 'মাস্টারমশাই মিটমিটে আলোয় পড়াতেন প্যারী সরকারের ফার্স্ট বুক । প্রথমে উঠত হাই, তারপর আসত ঘুম, তারপর চলত চোখ রগড়ানি । অনুবাদ করলে হয়- 'In the dim, flickering, our tutor, Mastermoshai, taught us the First Book of Pyari Sarkar. I would yawn, then become drowsy, and afterwards, rub my eyes to stay awake'.
এলিয়ট একটি সাহিত্যের একটি যুগের প্রধান কবি, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ একটি জাতির সর্বযুগের প্রধান কবি । রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তুলনা চলবে সব জাতির প্রধান কবিদের, এটা নিঃসংশয়ে বলা যায়ঃ গ্রিসের হোমার, ইয়ালির ভার্জিল এবং দান্তে, জা্র্মানির গ্যেটে, ইংরেজদের শেকসপিয়ার কিংবা ঔপন্যাসিক হলেও রাশিয়ার তলস্তয়ের সঙ্গে ।
ডারউইন প্রকৃতির যে পরিচয় উদ্ঘাটন করেছিলেন তা ভংয়কর মৃত্যুকীর্ণ, আবার একই সঙ্গে সৃজনশীলও । তার তত্ত্ব অনুসারে জীববিবর্তনের চালিকা শক্তি হলো 'প্রাকৃতিক নির্বাচন'। প্রকৃতি এখানে অন্ধ ও নির্মুখ । অনেকের কাছে এ-তত্ত্ব ছিল এক প্রচন্ড আঘাত । বার্নার্ড শ'র মতো প্রগতিশীল চিন্তকও ডারউইনের তত্ত্বকে স্বাগত জানাতে পারেন নি । তিনি লিখেছিলেন, গোটা তাৎপর্যটি অনুধাবন করলে আপনার হৃদয় বালুকাস্তূপে তলিয়ে যাবে । এ্তে আছে একটি ভয়ংকর অদৃষ্টবাদ এবং সেই সঙ্গে সৌন্দর্য ও বুদ্ধিমত্তার, শক্তি উদ্দেশ্যের, মর্যাদা ও উচ্চাখাংখার মারাত্মাক বিনষ্টি ।' রবীন্দ্রনাথের তেমন কোনো প্রতক্রিয়ার কথা আমাদের জানা নেই । তিনি কি ডারউইনবাদ অগ্রাহ্য করেছিলেন ? সম্ভবত না । প্রকৃতির নির্মম সৃষ্টিক্রিয়া তার অনেক কবিতায় কবিতায় নানাভাবে ব্যক্ত আর তারই একটি জীবনসায়াহ্নে লেখা পত্রপুট কাব্যের 'পৃথিবী' যাতে আছে প্রকৃতির দ্বৈতসত্তার পরিপক্বতর বর্ণনা এবং আমাদের যথা কর্তব্যের ইঙ্গিত ।
১৯৩৫ সালের ১৬ অক্টোবর-এ লেখা 'পৃথিবী' কবিতাটি । তখন কবির বয়স ৭৬, প্রায় নিশ্চিতই বলা যায় তিনি ততদিনে ডারউইনের তত্ত্ব সম্যক আত্তীকৃত, তার কবিতার ছত্রে ছত্রে উচ্চারিত প্রকৃতিরি নির্মম নির্মুখ স্বরুপ, জীবনের জন্য সংগ্রাম- ডারউইনি প্রতীতি । দৃষ্টান্ত হিসেবেঃ
"মহাবীর্যবতী তুমি বীরভোগ্যা,
বিপরীত তুমি ললিতে কঠোরে।
... মানুষের জীবন দোলায়িত কর তুমি দুঃসহ দ্বন্ধে ।
ডান হাতে পূর্ণ কর সুধা,
বাম হাতে চূর্ণ কর পাত্র,
তোমার লীলাক্ষেত্র মুখরিত কর অট্র বিদ্রুপে,
দুঃস্বাধ্য কর বীরের জীবনকে মহৎ জীবনে যার অধিকার ।
শ্রেয়কে কর দুরমূল্য, কৃপা কর না কৃপাপাত্রকে ।
তোমার গাছে গাছে প্রচ্ছন্ন রেখেছ প্রতি মুহূর্তের সংগ্রাম,
[ চলবে ...]
( আমি খুব দুঃখিত, রবীন্দ্রনাথের কোনো বিকল্প নাই-৫১ পর্ব লিখে শেষ ঘোষনা করেছিলাম । পরে দেখি আরো কিছু বিষয় লেখার বাকি আছে, তাই আবার লিখতে হলো । এর আগে একবার ১৮ পর্ব লিখে শেষ পর্ব ঘোষনা করেছিলাম । আরও কিছু ব্যাপার না লিখলেই নয়, তাই আবার লিখতে হলো । কিছু ঘটনা না লিখলে এই ধারাবাহিক লেখাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে । আর অসম্পূর্ণতা আমার ভালো লাগে না ।
সবাইকে ধন্যবাদ । ভালো থাকুন । )
রবীন্দ্র-রচনাবলী, বিশ্বভারতী ১৪০২, কলকাতা
. আশরাফ সিদ্দিক, “বৃক্ষ প্রেমিক রবীন্দ্রনাথ”
. আবদুশ শাকুর, “মৃত্যুহীন রবীন্দ্রনাথ”, রবীন্দ্র মৃত্যুবার্ষিকী ২০১০-এ বাংলা একাডেমীতে পঠিত প্রবন্ধ।
শিশির মোড়ল, “বন বৃক্ষরোপণ এবং বনায়ন : অতিকথন ও রাজনীতি”
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনী (তৃতীয় খণ্ড)
আবুল হোসেন, “জলবায়ু যুদ্ধের তিন নারী”, প্রথম আলো, ১০ ডিসেম্বর ২০১০
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই অক্টোবর, ২০১২ রাত ১:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



