রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নতুন কিছু কি লেখা সম্ভব ? এমন কিছু যা আগে লেখা হয় নি ? আমার মনে হয় সম্ভব না । তাকে নিয়ে সব কথা বলা হয়ে গিয়েছে । নানান ভাবে বলা হয়েছে । রবীন্দ্রনাথ সিলেটে আসার পর তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয় । সংবর্ধনার ভাষণ শুনে রবীন্দ্রনাথ চমকে গেলেন । কারণ, ভাষন দেওয়া হলো উর্দুতে । ভাষনে বলা হলো- এই বিশ্বকবিকে অশুদ্ধ উচ্চারণের সিলেটি বাংলায় সংবর্ধনা সেওয়া যায় না । ( বক্তার নাম কাপ্তান মিয়া) রবীন্দ্রনাথ সিলেটের নামকরণ করলেন 'সুন্দর শ্রীভূমি' । আইনস্টাইনের সাথে রবীন্দ্রনাথের আলাপ-আলোচনার মধ্যে হঠাৎ করে আইনস্টাইন জানতে চাইলেন, পর্দাথবিদ সত্যেন বসু কেমন আছেন ? রবীন্দ্রনাথ সত্যেন বসুকে চিনতে পারলেন না । আইনস্টাইন খুব অবাক হলেন ।পদার্থবিদ্যার একজন বাঙ্গালি গ্রান্ডমাস্টারকে রবীন্দ্রনাথ চিনতে পারছেন না ! রবীন্দ্রনাথ লজ্জা পেলেন । তার লজ্জা তো আর আমাদের দশজনের লজ্জা না । তার লজ্জাতেও ফসল উঠে আসে । তিনি বিজ্ঞান নিয়ে অনেক লেখা পড়া করে একটা বই লিখলেন, 'বিজ্ঞানের কথা' । এই বইটি উৎসর্গ করলেন সত্যেন বসুকে । এই মানূষটিকে না-চেনার প্রায়শ্চিত্ত এইভাবেই করলেন ।
রবীন্দ্রনাথের অতি আদরের কন্যার নাম- মীরা দেবী । মীরা দেবীর বিয়ে সুখের হয়নি । তাকে কঠিন দুঃসময় পার করতে হয়েছে । মীরা দেবীর বিয়ের স্নান করার জন্যে গোসলখানায় ঢুকলো । সেখানে প্রকান্ড এক খোকরো সাপ কুন্ডুলী পাকিয়ে শুয়ে ছিল । সাপটি ছোবল মারার জন্য ফণা তুলেছিল । মীরার দুঃখে কাতর হয়ে রবীন্দ্রনাথ চিঠিতে তার পুত্র রথীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন-'আজ আমার মনে হয় সে সাপ যদি তখনি ওকে কাটত তা হলে ও পরিত্রান পেত'। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিধবা বিয়ে প্রচলন করার জন্য রথীন্দ্রনাথকে বিয়ে দেন বিধবা প্রতিমা দেবীর সঙ্গে । এই বিয়েস্মসরণীয় করে রাখার জন্য বিয়ের তারিখ বসিয়ে তার বিখ্যাত উপন্যাস গোরা উৎসর্গ করা হয় রথীন্দ্রনাথকে ।
ক্লাশে শিক্ষক ছাত্রদের প্রশ্ন করলেন, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর তারিখ কে জানে ? এক ছাত্র বলল, স্যার ২২শে শ্রাবন । শিক্ষক বললেন গাধা ! কানে ধরে বেঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে থাক । রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু নেই । কিছুদিন আগে রবীন্দ্রনাথের জন্মের সার্ধশতবর্ষ
উৎসব হয়ে গেল বিশেষ করে কোলকাতা এবং বাংলাদেশে । রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সবাই ঝাপিয়ে পড়লেন । টিভি চ্যানেল এবং দৈনিক পত্রিকা গুলো । চ্যানেল আইয়ের লাফালাফিটা ছিল একটু বেশী । চ্যানেল আই কি বোঝে না ব্যাপারটা হাস্যকর ? কেকা ফেরদৌসী ঠাকুর বাড়ির রান্না নিয়ে একটি অনুষ্ঠান করলেন । আবার দেখি রাঁধতে রাঁধতে রবীন্দ্র সংগীত গাইলেন । আমাদের পরম সৌভাগ্য রবীন্দ্রনাথকে এই ধরনের অনুষ্ঠান গুলো দেখতে হয়নি । রবীন্দ্র ফ্যাশন শো হলো । টিভি চ্যানেল গুলোতে টক শো'র মেলা বসলো । শিল্পী'রা রঙতুলি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়লেন । তাদের রঙতুলি থেকে নানান রকম রবীন্দ্রনাথ বের হয়ে এলেন ।
পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসন মৃত্যুর শেষদিনও নোবেলজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা পড়েছিলেন। এছাড়া অস্কারবিজয়ী ভারতের জনপ্রিয় সঙ্গীতস্রষ্টা এআর রহমানের সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা করেছিলেন বলে জানা গেছে। মাইকেল তার নতুন অ্যালবামে দু’জনে মিলে একটি সুর সৃষ্টির পরিকল্পনা করেন। বলা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা পড়ার মাধ্যমে জ্যাকসন ভারতের সঙ্গে একটি বিশেষ সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছিলেন ।
রবীন্দ্রনাথের ব্যাক্তিত্ব ও তার প্রতিভার বিচিত্র দানের কথা অনেকদিন থেকে আমাদের দেশে ও সমস্ত পৃথিবীতে আলোচিত হয়ে আসছে । বাংলা সাহিত্যে আধুনিক কবিতার উদয়ের আগে রবীন্দ্রনাকাব্যের আওতার থেকে বেরিয়ে পড়বার দু-একটা প্রয়াস দেখা গিয়েছিল । ইংরেজ কবিরা যেনব যুগে যুগে ঘুরে ফিতে শেক্সপিয়র- এর কেন্দ্রিকতার থেকে সঞ্চারিত হয়ে বৃত্ত রচনা করে ব্যাপ্ত হয়ে চলেছে আমাদের কবিরাও রবীন্দ্রনাথকে পরিক্রমা করে তাই করবে- এই ধারনা প্রত্যেক যুগসন্ধির মুখে নিতান্তই বিচারসাপেক্ষ বলে বোধ হলেও অনেককাল পর্যন্ত অমূলক বা অসঙ্গত বলে প্রমানিত হবে না ।
এক ফরাসি সমালোচক একবার বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ যখন কবিতা লেখেন, তখন ছবি আঁকেন৷ আর যখন ছবি আঁকেন, তখন লেখেন কাব্য৷ পরে রাণী চন্দের ‘আলাপচারী রবীন্দ্রনাথ'-এ পাওয়া যাবে: রবীন্দ্রনাথ বলছেন, আমার ছবিকে নন্দলাল - অর্থাৎ নন্দলাল বসু - এত বড় কেন বলে জানি না৷ ওরা আমার একটা দর্শন মাত্র৷ একদিন দেখলাম শান্তিনিকেতনের বড় বড় গাছের ডালগুলি নানারকম জন্তু জানোয়ারের মূর্তি নিয়েছে৷ ছবিতে সেই দর্শনটিই রূপায়িত করতে চেষ্টা করলাম৷
রবীন্দ্রনাথের কবিতা লিখতে গিয়ে আঁকিবুকি কাটার অভ্যাস ছিল, ইংরিজিতে যাকে বলে ‘ডুডলিং'৷ অধ্যাপক সুকান্ত চৌধুরী তাঁর ‘মেটাফিসিক্স অফ টেক্স্ট' গ্রন্থটিতে এই ডুডলিং নিয়ে আলোচনা করেছেন৷ তবে তাঁর বক্তব্য শোনার আগে রবীন্দ্রনাথের ডুডলিং'এর দু'তিনটি সহজ দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে । এটা সত্যি একটা আশ্চর্য জিনিস এবং আমার জ্ঞানত কোনো ভাষায়, কোনো দেশে অন্য কোনো কবি বা সাহিত্যিক এটা কখনো করেননি, বা অন্য কোনো চিত্রকরও করেননি৷ ভেবে দেখুন ব্যাপারটা: একসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ দুটো কাজ করছেন৷ একদিকে তিনি একটা কবিতা লিখছেন যেটা শেষ পর্যন্ত শুধু ছাপার অক্ষরে, অর্থাৎ শুধু শব্দের সমষ্টি হিসাবেই বই'য়ে মুদ্রিত হয়ে পাঠকের কাছে যাবে৷ সেই সঙ্গে পাশাপাশি তিনি একটা ছবি আঁকছেন৷ সেই ছবিটা কিন্তু আর কেউ দেখবে না৷ সেটা শুধু কবি নিজে দেখছেন, হয়তো তাঁর খুব কাছের মানুষ দু'চারজনকে তিনি দেখাচ্ছেন৷ একদিকে যেমন কাব্যরচনার শিল্পকর্মটা করছেন পাঠককুলের কথা ভেবে, একই সঙ্গে পাশাপাশি তিনি সম্পূর্ণ নিজের কথা ভেবে যেন একটা নিজের একান্ত, ব্যক্তিগত একটা শিল্পচেতনাকে সন্তুষ্ট করার জন্য আরেকটা শিল্পকীর্তি সৃষ্টি করে চলেছেন৷ একসঙ্গে এই দুটো শিল্পের কাজ একই পাতায়, একই কলমের ডগার থেকে বেরচ্ছে, এটা একটা আশ্চর্য জিনিস৷ এবং আমার জ্ঞানত এটা একমেবাদ্বিতীয়, এটা ইউনিক৷ আর কেউ কখনো করেছেন বলে আমি জানি না৷''
( চলবে )

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



