জীবনান্দ দাশদের আদি বাড়ি বিক্রমপুরের গাউপাড়া গ্রামে । পদ্মা নদীর তীরের গ্রাম গাউপাড়া । জীবনান্দের বাবা ( সত্যানন্দ, আগে নাম ছিল দুর্গামোহন ) ছিলেন বরিশালের ব্রজমোহন স্কুলের প্রধান শিক্ষক । তার ছিল লেখালেখির হাত । ভালো প্রবন্ধ লিখতেন তিনি । জীবনানন্দ দাশের মা কুসুমকুমারীর লেখা ' আদর্শ ছেলে' কবিতাটি বিখ্যাত । কবিতাটি ছিল-" আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে ?/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে ।/ মুখে হাসি, বুকে বল, তেজে ভরা মন,/ 'মানুষ' হইতে হবে, এই তার পণ ।" রবীন্দ্রনাথের বাড়ির মতন জীবনান্দের বাড়িতে সাহিত্যের আসর বসত । পার্থক্য ছিল রবীন্দ্রনাথের ছিল রাজবাড়ি আর জীবনান্দের সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়ি ।
১৯০১ সালে জীবনান্দের খুব কঠিব অসুখ হয়েছিল । একেবারে মরে মরে অবস্থা । কুসুমকুমারী জীবনান্দকে নিয়ে ছুটলেন লখনো, আগ্রা, গিরিডি । বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর পর সুস্থ হলো বাচ্চা জীবনান্দ । ১৯০৮ সালে জীবনানন্দ ৯ বছর বয়সে বরিশালের বি এম স্কুলে ভর্তি হন । জীবনানন্দের শৈশব নিয়ে তার ছোট ভাই অশোকানন্দ লিখেছেন এবং একমাত্র ছোটবোন সুচরিতা দাশও লিখেছেন । (সুচরিতা দাশ ১৯১৫ সালে জন্মগ্রহন করেন, এ বছরই জীবনানন্দ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন । ) জীবনানন্দের বড় মামা প্রিয়নাথ দাশ ছিলেন সাব ডেপুটি কালেক্টর । স্কুলে পড়াকালীন সময়েই মায়ের প্রশ্রয়ে জীবনানন্দ দাশ বাড়িতে কয়েকজন বন্ধুদের নিয়ে সাহিত্যে সভা করতেন । এই আড্ডা মা কুসুমকুমারীও মাঝে মাঝে যোগ দিতেন । কুসুমকুমারী বঙ্কিমের উপন্যাস ও রামায়নের নানা চরিত্র নিয়ে আলোচনা করতেন ।
১৯১৯ সালে জীবনানন্দ ইংরেজিতে অনার্সসহ বির পাশ করেন, তারপর ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে । ১৯২২ সালে কলকাতা সিটি কলেজের চাকরির মাধ্যমে তার কর্মজীবনের শুরু । ১৯২৮ সালে জীবনানন্দ চাকরি থেকে বরখাস্ত হন । কেউ কেউ বলে কবিতায় অশ্লীলতা ছিল তার জন্য । ১৯৩০ সালের ৯ মে তিনি খুলনার রোহিনীকুমার গুপ্তের দ্বিতীয়া কন্যা লাবন্যকে বিয়ে করেন । লাবন্য ৭ বছর বয়সে তার বাবা-মাকে হারান । বিবাহের সময় লাবণ্য ঢাকার ইডেন কলেজের ছাত্রী ছিলেন । ১৯৩২ সালে দিকে জীবনানন্দ কবিতা লেখা ছাড়া লুকিয়ে লুকিতে সবার অজা্ন্তে গল্প লেখায় মন দেন । যেমন- 'প্রেতিনীর রুপকথা', 'নিরুপম যাত্রা' ইত্যাদি ।
১৯৪৬ সালের একটি ঘটনা বলি- একদিদন দুপুরের দিকে কবি বাসায় ফিরছেন । হঠাৎ দেখতে পেলেন রাস্তার লোকেরা দৌড়ে যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে এবং প্রতিটি বাড়ির জানালা দুমদুম শব্দে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । তিনি সামনের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন- একটা মিলিটারি ট্রাক ছুটে আসছে । ট্রাকটা এসে তার সামনে থামল । একজন অফিসার নিচে নেমে বন্দুকের নলটা কবির বুকের সামনে ধরেই জিজ্ঞাসা করলেন- আর য়্যু এ হিন্দু ? কবি উত্তর দিলেন 'ইয়েস' । অফিসারটি বন্ধুক ধরে থাকা অবস্থায় বলল, 'আই থিংক য়্যু আর দা রিংলিডার অফ দিস এরিয়া । যাষ্ গেট অন্ । কবি চিরদিন ধীর স্থির প্রকৃতির সুতরাং তিনি আর একটি কথাও না বলে ট্রাকে উঠে দেখলেন তার মতো আরও কয়েকজন হিন্দু ভদ্রলোককে আগেই ধরে আনা হয়েছে । তারা সবাই চুপচাপ বসে আছে । কবিকে উঠিয়ে ট্রাকটি বহু জায়গা ঘুরে একটি থানায় এসে থামল । সেখানে পৌছে একখানি বেঞ্চে সকলকে বসিয়ে রাখা হলো ।
রবীন্দ্রনাথ এক দীর্ঘ চিঠিতে বুদ্ধদেব বসুকে লেখেন- জীবনানন্দ দাশের চিত্ররুপময় কবিতাটি আ্মাকে আনন্দ দিয়েছে । ১৯৩৭ সালের ৫ মার্চ জীবনানন্দ দাশ 'ধূসর পান্ডুলিপি'র ( এ বইখানা রবীন্দ্রনাথকেই উৎসর্গ করা হয় ) একটা কপি রবীন্দ্রনাথকে ডালে পাঠান । আর সে সঙ্গে একটা চিঠি । চিঠিতে লিখেন-' আমি একজন বাঙ্গালী যুবক, মাঝে মাঝে কবিতা লিখি । অনেকবার দেখেছি আপনাকে, তারপর ভিড়ের ভেতর হারিয়ে গেছি । আমার নিজের জীবনের তুচ্ছতা ও আপনার বিরাট প্রদীপ্তির সব সময়ই মাঝখানে কেমন একটা ব্যব্ধান রেখে গেছে । আমি তা লংঘন করতে পারিনি । আজ যদি St Paul, কিংবা খৃষ্ট, অথবা গৌতম বুদ্ধ পৃথিবীতে ফিরে আসেন আবার, তা হলে ভীড়ে চাপা পড়ে তাদের সঙ্গে দেখা করে আসবো হয়তো, কিন্তু৮ তারপর তারা আমাকে ভিড়ের মানূষ বলে বুঝে নেবেন । প্রায় ন' বছর আগে আমি আমার প্রথম কবিতার বই একখানা আপনাকে পাঠিয়ে ছিলুম । সেই বই পেয়ে আপনি আমাকে চিঠি লিখেছিলেন, চিঠিখানা আমার মূল্যবান সম্পদের ভিতর একটি ।
জীবনানন্দের কবিতাকে অনেক সমালোচক, কবি কবিতাই মনে করতেন না । অনেকে কবিতা মনে করলেও নানা রকম দুর্নাম দিতেন জীবনানন্দের কবিতার উপর । জীবনানন্দ আধুনিক কবি । তার কবিতা বোঝার মতো আধুনিক মন মানসিকতা হয়ত সমালোচকদের মধ্যে ছিল না । জীবনানন্দ দাশের মেয়ে মঞ্জুশ্রী লিখেছেন- বাবা খুব সাদাসিদে ছিলেন । অত্যন্ত সাধারণ ধুতি পাঞ্জাবি পিরতেন । ঘরে শুধু বই আর বই আর লেখার সরঞ্জাম । বাবা অনেক রাত পর্যন্ত লিখতেন পড়তেন । মাঝে মাঝে পেন্সিল দিয়ে লিখতেন । গরমের দুপুরে বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে লিখতেন । জিজ্ঞেস করলে বলতেন- দেখছিস না, কী রকম ইস্পাতের মতো নীলাকাশ ।' বাবা কে কখনও পান সিগারেট খেতে দেখিনি ।
( চলবে ...)
বনলতা সেন এবং বিষন্ন এক কবি'র কথামালা - ৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।