দেশ জাতির আশা ভরসার স্খল, জাতির ভবিষ্যৎ নেতা কর্ণধার ছাত্রছাত্রীরা যেই শিক্ষা পরিবেশে গড়ে উঠবে, যেখানে তাদের নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ সাধিত হবে, যেই শিক্ষকদের সংসর্গ ও জ্ঞানদান তাদের জীবনকে মহত্ত্বের উত্তুঙ্গ চূড়া সমাসীন করবে, সেই পারিপার্শ্বিকতাই যদি কলুষতা দুষ্ট হয়, তা হলে, সেখান থেকে আমরা কি করে আমাদের সন্তানদের কাংক্ষিত চরিত্র ও যোগ্যতা আশা করতে পারি? বরং এরূপ পারিপার্শ্বিকতায় কোনো উত্তম পরিবেশের সন্তানরাও সেখানে গেলে চারিত্রিক কলুষতা ও চরম নৈতিক অবক্ষয় নিয়েই তাকে বের হতে হবে। তার চিন্তা মনন ও আচরণ বিকৃতভাবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনাই বেশি। বলাবাহুল্য, অতপর এই চরিত্রের শিক্ষায় শিক্ষিতদের দ্বারা একটি দেশ, জাতি যে কোথায় গিয়ে পৌঁছাতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়। শিক্ষার পরিবেশ বিশেষ করে দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাঙ্গন সম্পর্কিত এই আশঙ্কার ভাবটি এজন্যেই অন্তরে জাগ্রত হয়েছে যে, আমাদের দেশের শিক্ষার সর্বোচ্চ পাদপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক শিক্ষক সম্পর্কে এমন একটি অভিযোগ উঠেছে যা আলোচনা করতেও প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদাহানির কথা ভেবে লজ্জাবোধ হয়। শুধু লজ্জা নয়, এ সংক্রান্ত আরও তথ্যানুসানে এক শ্রেণীর শিক্ষকের নৈতিক অবক্ষয়ের যেই কুৎসিত চেহারা সামনে আসে, তাতে রীতিমতো হতাশই হতে হয়। এজন্যেই কি এই গরিব দেশের জনগণের কোটি কোটি টাকা এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের পেছনে ব্যয় করা হয়ে থাকে?
গত ১১ মে '০৮ জাতীয় একটি বাংলা দৈনিকে প্রকাশিত এক খবরের শিরোনাম ছিল- যৌন নিপীড়নে অভিযুক্ত ঢাবি শিক্ষকের বহিষ্কার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল।সিঙ্গেল কলামে প্রকাশিত এ খবরটিতে বলা হয়- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. কামালুদ্দীনের বহিষ্কারের দাবিতে গতকাল ১০ই মে ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীরা মিছিল ও মানববন কর্মসূচি পালন করেছে। এদিকে অভিযুক্ত শিক্ষকের পক্ষ নিয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারী ছাত্রদের ওপর হামলা চালায়। এতে দু'জন শিক্ষার্থী আহতও হয়। উল্লেখ্য, কয়েক দিন আগে মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক উক্ত ড. কামালুদ্দীনের বিরুদ্ধে এই বিভাগেরই কয়েকজন ছাত্রী যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনে। বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। অভিযুক্ত শিক্ষকের বহিষ্কারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা ১০মে দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। পরিশেষে তারা অপরাজেয় বাংলায় সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে। সমাবেশে বক্তারা বলেন, ছাত্রীর শ্লীলতা হরণকারী কোনো শিক্ষকের এ পবিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্খান নেই। নৈতিকভাবে বিপর্যস্ত এই শিক্ষককে শিগগির বহিষ্কার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ কলা ভবনের দিকে অগ্রসর হলে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নেতা সিদ্দিকী, নাজমুল আলম এসএম হলের তারেক, জহুরুল হক হলের রায়হান, বেলাল এবং সূর্যসেন হলের সোহাগের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানো হয়। তাতে আন্দোলনকারীদের অনেকে এদিক সেদিক ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও কয়েক জন শিক্ষার্থীকে হামলাকারীরা বেধড়ক মারপিট করে আহত করে।।
এককালে বাংলার অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের ছাত্রী কেন্দ্রিক শিক্ষকের যৌন কেলেঙ্কারীর এ ঘটনাটি আমাদের উচ্চ শিক্ষাঙ্গন পরিবেশের একটি পচনশীলতার দিকই তুলে ধরে, যার জন্যে দায়ী নৈতিকতার শিক্ষাবর্জিত ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষক নামের কলঙ্ক দু'একজন শিক্ষক চলমান শিক্ষাদর্শন এবং পাশ্চাত্যের ভোগবাদী জীবনাচার ও তথাকথিত বস্তুবাদী জীবনদর্শন। তেঁতুল গাছের বীজ বপন করে যেমন সুস্বাদু সুমিষ্ট ফজলী আম পাওয়ার আশা করা যায় না, আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষ পাশ্চাত্য ভোগবাদী শিক্ষাদর্শন ও শিক্ষানীতি চালু করেও আমরা এ শিক্ষা থেকে উল্লেখিত বিকৃত চরিত্রের শিক্ষকের বদলে পিতৃতুল্য শিক্ষক ও নিজ ছাত্রীর সাথে পিতৃসুলভ আচরণকারী চরিত্রের শিক্ষক কিভাবে আশা করতে পারি? পাশ্চাত্যের ভোগবাদী জীবন চিন্তার ধারক একশ্রেণীর শিক্ষক বুদ্ধিজীবীই আমাদের দেশে এই অবাঞ্ছিত দৃষ্টিভঙ্গির আমদানি করেছে যে, আধুনিক প্রগতিশীল যুগের চাহিদামাফিক আমাদের শিক্ষকদের সাথে ছাত্রছাত্রীদের আচরণ হবে বুর মতো, তারা একসঙ্গে চিত্তবিনোদন করবে, তাস খেলবে, ক্যারম খেলবে, সিনেমা দেখবে। সমশ্রেণীর মতো চলবে, পুরাতন মুরুব্বী ও অভিভাবকসুলভ আচরণ পরিহার করবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, শিক্ষার মতো মহামূল্যবান বিষয়ের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের ভোগবাদী এই দৃষ্টিভঙ্গি যে শিক্ষার মূল লক্ষ্য মানবীয় সদগুণাবলীর বিকাশ ও উৎকর্ষ সাধনের পথে বড় অন্তরায়, এ ঘটনাসহ এ দেশের উচ্চ শিক্ষাঙ্গনকেন্দ্রিক আরও অসংখ্য ঘটনা এই বাস্তবতারই সাক্ষী।
আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষাঙ্গনসমূহ অভিন্ন কারণে শুধু আজ নয় আরও বহু আগে থেকেই একশ্রেণীর শিক্ষক ও তাদের একই চরিত্রের ছাত্রদের দ্বারা কলুষিত হয়ে আসছে এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভাবমর্যাদা মারাত্মকভাবে ক্ষুণí করে আসছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত একই ছাত্র সংগঠনের জনৈক ছাত্র নেতার ছাত্রী সম্ভ্রম বিনষ্টকারী হিসাবে সেঞ্চুরী পালন ও তা নিয়ে দেশের সংবাদপত্র যেই তোলকালাম কাণ্ড ঘটে গেছে, নিকট অতীতের সেই ঘৃণ্য কুৎসিত ঘটনার কথা কারও বিস্মৃত হবার কথা নয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই যৌন কেলেঙ্কারীর ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবে আশা করা গিয়েছিল, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাঙ্গনগুলোকে এই পুঁতিগময় অনাচার থেকে মুক্ত রাখার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্খায়ী কোনো ব্যবস্খা করবেন এবং এর উল্লিখিত মূল কার্যকারণসমূহ দূরীভূত করে উচ্চ শিক্ষাঙ্গনের পবিত্রতা বজায় রাখার ব্যবস্খা নিশ্চিত করবেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এ ব্যাপারে অনুরূপ কোনো ব্যবস্খা গ্রহণে কর্মকর্তাগণ ব্যর্থ হন। অবশ্য ঐ ধিকৃত ঘটনার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এরূপ নৈতিকতা বিরোধী তৎপরতা দূরীকরণে কিছুটা উদ্যোগ গৃহীত হতে দেখা যায়। কিন্তু তাতে শিক্ষাঙ্গনসমূহের পবিত্র অঙ্গন কিছু দিন সুস্খ থাকলেও পুনরায় যে তা আবার ঢাবিসহ এ জাতীয় অন্যান্য শিক্ষাঙ্গনকে কলুষিত করছে, পরবর্তী ঘটনাবলী তারই সাক্ষ্য দিচ্ছে।
পাশ্চাত্যের নিছক বস্তুবাদী জীবনদর্শন যাতে মানুষের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহিতার কোনো ভয় থাকে না, তা কিভাবে মানুষকে গড়ে তোলে দেখাবার জন্য। যেমন, ৯/৭/০২ইং সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় যে, জনৈক অনিক ইন্টারনেটে ঢুকিয়ে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরপরাধ এক ছাত্রীর নগ্ন ছবি। ছাত্রীটি নাকি অনিকের ভাবী। বয়স ২১। অনিক তার বাথরুমে একটি ক্যামেরা লুকিয়ে রাখে। ভাবীর অলক্ষ্যে একে একে সে তার ১৪টি নগ্ন ছবি ধারণ করে। মেধার এই বিকৃতির জন্যে মূল দায়ী কে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আপত্তিকর অবস্খায় থাকা যুগলের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে রাতে আটক হয় এক শিক্ষক। (মানবজমিন ৩/৭/০২ইং) ক্যাম্পাসে পরকীয়া জুটি” শিরোনামের খবরে বলা হয়, পরকীয়া চলছে, নির্বিঘেí। নিরাপদ ভেবে তারা আসছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। প্রায় প্রতিদিনই অফিস শেষে পরকীয়া যুগলরা এসে পড়ে এখানে। অকারের আড়ালে বিভিন্ন স্পটে বসে চলে তাদের প্রেম-ভালোবাসা বিনিময়। কোনো বাধা-বিঘí না থাকায় তারা ইতোমধ্যে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্পটের পাশাপাশি কলাভবনের বিভিন্ন কক্ষও দখল করে। (৫/৭/০২ইং)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের ক্লাস রুমে ১২ যুবককে বেশি আপত্তিকর অবস্খায় পাওয়া যায়। তরুণীদের ছেড়ে দিয়ে তরুণদের থানায় চালান দেয়া হয়। (২/৭/০২ইং) ঢাবিতে কেলেঙ্কারীর ছাত্রীর অভিযোগ শিক্ষক তাকে চুম্বন করেছেন। শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীর শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছে। গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগে এ ঘটনা ঘটে। (২৭/৬/০২ইং)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী এবং সেমিনার কক্ষগুলোতে পড়াশোনার পাশাপাশি চলছে ম্যারাথন আড্ডা আর প্রেমচর্চা। ৭০% প্রেমালাপপূর্ণ মধুর ভাষণ ও ফালতু ইয়ার্কি করে সময় কাটায়।-(ঐ)। বাকি ক্যাম্পাসে অনৈতিক ও অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধ ব্যবস্খা.... (১৫/৫/০২ইং)। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সদরে অন্দরে একশ্রেণীর ছাত্রছাত্রী নামধারী নৈতিক পরিবেশ কলুষিত করে চলেছে। (৫/৪/০২ইং)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার সামাজিক পরিবেশ বিপন্ন হয়ে পড়েছে। স্যা নামলেই একশ্রেণীর যুবক-যুবতীর আদিম উন্মাদনায় ক্যাম্পাস এলাকা বিচিত্র রূপ ধারণ করে। এসব তরুণ-তরুণী নেশাগ্রস্ত অবস্খায় বিভিন্ন অপকর্ম ঘটায়। (১৯/৩/০২ইং)। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীর সাথে শিক্ষকের অনৈতিক আচরণ। (১/৭/০২ইং)।
উচ্চশিক্ষাঙ্গনে নৈতিকতার এই অবক্ষয়ের একমাত্র কারণ হলো, ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা, যাতে মৃত্যু পরবর্তী জীবনে নিজের কোনো কাজের হিসাব দেয়ার ভাব জাগ্রত হয় না। বলাবাহুল্য, আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষাঙ্গনসমূহে বিরাজমান অনৈতিকতাদুষ্ট যাবতীয় কর্মকাণ্ড নির্র্মূল করে এগুলোকে সৎ ও যোগ্য ও নিষ্ঠাবান শিক্ষক দ্বারা গড়ে তোলা কর্তব্য। আর এ জন্য প্রয়োজন ইসলামী জীবনবোধসমৃদ্ধ তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাতভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্খা ও শিক্ষাদর্শন। যার অপর কোনো বিকল্প নেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

