কিশোর অপরাধীদের সম্পর্কে প্রথম অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলাম ১৯৯৮ সালে। আওয়ামী লীগের শাসনামলের সুবাদে শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে পরপর দু'বার জেলখানায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। জেলখানা সম্পর্কে আমার তিক্ত অথচ সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতার জন্য সবটুকু কৃতিত্বই পাওয়ার অধিকার রাখে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এবং তার হুকুমের গোলাম সেই সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। আমার এখানে এতটুকুও কৃতিত্ব নেই এ কারণে যে জেলখানায় যাওয়ার মতো কোন রকম যোগ্যতাই আমার ছিল না। তবুও নিয়তির নির্মম পরিহাস আর কি! বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে কেবল তৃতীয় বর্ষে পা রেখেছি। রাত্রি বেলা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আমরা ছাত্রদের নিয়ে তাহাজ্জুদ নামায পড়তাম এই অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছিলো আমরা যারা আয়োজক ছিলাম তাদেরকে। তাদের দৃষ্টিতে আমাদের অপরাধ ছিল আমরা নাকি মসজিদে তাহাজ্জুদ নামাযের নামে ছাত্রদের ডেকে নিয়ে গোপন অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দিতাম। আমাদের একটি বু সংগঠনের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ভাইয়েরা তাদের চাকরি বাঁচানোর তাগিদে অপারেশন চালিয়েছিলেন। অপারেশন চালিয়ে অকার মসজিদে তারা প্রথমে পেয়েছিলেন মোনাজাতরত ছাত্রদের কান্নার শব্দ আর প্রত্যেকের সামনে একখণ্ড করে পবিত্র কুরআন শরীফ। যা মুমিনের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। তবু আমাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু কেন যেন কারাগারে ছিল আমাদের মুক্তজীবন। থানা হাজতে একরাত্রি থাকার পর কোর্টে চালান করে দেয়া হলো। কোর্ট থেকে কারাগারে গিয়ে দেখি অবাক কাণ্ড। অসংখ্য তরুণ কিশোররা লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার গ্রহণ করছে। জেল সুবেদার আমার বয়স জিজ্ঞেস করলে আমি বললাম, আমার বয়স ২৪ বছর, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলায় তৃতীয় বর্ষে পড়ি। চেহারার দিকে তাকিয়ে অনেকটা ধমকের সুরে আমাকে বলল, মিথ্যা বলার আর জায়গা পাওনা। আমি অনেক বুঝিয়েও শুধুমাত্র শারীরিক গঠনের কারণে যুবক হওয়ার পরও কিশোর পর্যায়ে উপনীত হতে বাধ্য হলাম। একরকম জোরপূর্বক ঢুকিয়ে দেয়া হলো কিশোর ওয়ার্ডে। আমি ঐ ওয়ার্ডের তরুণ তাজা টগবগে কিশোর ছেলেদের চেহারার দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। মুহূর্তের মধ্যেই ভুলে গেলাম আমার নিজের কষ্ট। আলাপচারিতায় জানতে পারলাম তাদের অকার জীবনের ঘৃণিত আর নির্মম ফিরিস্তি। আমি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেছি, তারা প্রত্যেকেই নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে। কেউ দোষারোপ করছে সমাজ বাস্তবতাকে, কেউ করেছে শিক্ষাঙ্গন-শিক্ষাব্যবস্খাকে, কেউ বা আবার সরাসরি দোষারোপ করছে নিজের প্রিয়জন বাবা-মাকে। সবচেয়ে অবাক হয়েছিলাম যে বিষয় তাহলো তারা প্রত্যেকেই প্রায় এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে যে অপরাধ করেছি কিংবা করেনি তার চেয়ে বড় কথা হলো যে কারণে জেলখানায় এসেছি বদনাম যেহেতু হয়েছে এবার জেল থেকে বের হয়ে চূড়ান্ত কিছু করবো। পরস্পর অভিজ্ঞতা বিনিময় করার অবারিত সুযোগ নিচ্ছে হরদম। যে প্রথম পকেট কেটে ঢুকেছিলো সে এবার ঢুকেছে অস্ত্রবাজি করে। যে ঢুকেছিলো পাড়ায় মারামারি করে তারপরে ঢুকেছে সন্ত্রাসী গ্রুপের অন্যতম সদস্য হয়ে। যে ঢুকেছিলো ছিনতাই করে পরেরবার ঢুকেছে ডাকাতি গ্রুপের সদস্য হয়ে এবং তার পরেরবার আরও বড় কিছু অন্যায় করার প্রত্যয় তার ভবিষ্যত জীবনে।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য সেই ১৯৯৮ সাল পেরিয়ে এখন কিশোর জগত আরও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। রাজধানীর অপরাধ জগৎ এখন নিয়ন্ত্রণ করছে কিশোর অপরাধীরা। ঢাকা মহানগরীর পুরো এলাকা উঠতি বয়সের শত শত সন্ত্রাসীর নিয়ন্ত্রণে। পলাতক সন্ত্রাসীদের হাল ধরেছে ঐ কিশোর অপরাধী চক্র। খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, অস্ত্র কেনাবেচা, অপহরণ পর্যন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এরা। এসব কিশোর নেপথ্যে রয়েছে নগরীর তালিকাভুক্ত ও পলাতক সন্ত্রাসীদের কয়েকটি গ্রুপ। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে যেমন এগিয়ে চলছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঠিক তেমনি প্রতিনিয়ত বাড়ছে এর পরিধি। পরিবর্তিত হচ্ছে আকার, অবয়ব। কেবল রাজধানীতেই সহস্রাধিক কিশোর-তরুণ সন্ত্রাসী কাজের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পরিবর্তিত সময়ে বড় বড় সন্ত্রাসীরা পালিয়ে বেড়ালেও এরা নির্বিঘেí সন্ত্রাসী কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি যতিন (১১) নামক এক কিশোরকে হত্যার অভিযোগে র্যাব ৭ ভয়ানক কিশোর সন্ত্রাসীকে আটক করে। স্বীকারোক্তি অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডসহ সকল ধরনের সন্ত্রাসী কাজ করে তারা। যে বয়সে তাদের স্কুল কলেজে পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা, ঠিক সে বয়সেই এরা ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অভিমত অনুযায়ী সমাজ ও পরিবারের নৈতিক অবক্ষয় কোমলমতি কিশোর তরুণদের ভয়ানক পথে টেনে এনেছে। উঠতি বয়সের সন্ত্রাসীরা উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। এমনকি মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানরাও আজ এ পঙ্কিল পথে পা বাড়িয়েছে। সাধারণত কিশোর বয়সে সবাই নায়কোচিত ও বিলাস বহুল জীবন পরিচালনায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এ সুযোগে অর্থের লোভ দেখিয়ে পেছনের বড় সন্ত্রাসীরা তাদেরকে কাজে লাগায়। পেশাদার সন্ত্রাসীদের খপ্পরে পড়েই তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। কয়েক বছর আগে রাজধানীতে সক্রিয় কিশোর সন্ত্রাসীদের তালিকা করে সংশ্লিষ্ট থানাগুলো সে সময়কার হিসাব মতে কিশোর সন্ত্রাসীর সংখ্যা ১ হাজার হলেও আজ তা প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি। কিন্তু আজও পর্যন্ত না তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, না তাদের সংশোধনের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যে কারণে আজ তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
সাধারণত তিন ধরনের পরিবেশ থেকে সন্ত্রাসী কিশোরদের যাত্রা। এদের মধ্যে রাস্তার টোকাই অবহেলিত যাদের দেখার, আদর কিংবা শাসন করার কেউ নেই। যাদের জীবনের নেই কোন লক্ষ্য। জীবনে যাদের কোন ভাবনা নেই। ভালোমন্দ বুঝার মত শিক্ষার অভাব যেখানে চিরশাশ্বত। দ্বিতীয়ত মধ্যবিত্ত শ্রেণী যারা সঙ্গদোষ ও লোভে পড়ে ভয়ানক পথে পা বাড়াচ্ছে। তৃতীয়ত উচ্চবিত্তের সন্তানেরা যারা বরাবরই অভাব বোধ করে অভিভাবকদের সঠিক পরিচর্যার আর যার কারণে পাপ-পঙ্কিল কিংবা অশ্লীলতার পথে পা বাড়ায় তারা। আর সন্তানের ঐ পথটি এতই অকার যে যেখানে সামনের দিকেই শুধু হাঁটা যায় পিছনে ফেরার কোন পথ রেখে যাওয়া হয় না। ফলশ্রুতিতে তারা শুধু সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই ভালোবাসে। এই পথে চলতে শুরু করা একজন কিশোর অপরাধীকে ভালো পথে হাঁটতে শুরু করানো যত কঠিন তার অনেক সহজ জীবনের প্রথম থেকেই এদেরকে সঠিক পরিচর্যা আর আদর্শ শিক্ষার মাধ্যমে জীবনের মূল্য তাদের সামনে তুলে ধরে তাদেরকে সতর্ক করা। রোগমুক্ত করার যত প্রচেষ্টা তার চেয়ে অনেক বেশি প্রচেষ্টা থাকা প্রয়োজন রোগাক্রান্ত না হওয়ার পরিবেশ দেয়া। সত্যিকার অর্থেই আমরা কিন্তু সেই পরিবেশ দিতে প্রায় শতভাগ ব্যর্থ হয়েছি। যার প্রমাণ আজকের বাংলাদেশেও আমরা যখন সন্ত্রাস, দুর্নীতি, অন্যায় দমন করে সুন্দর, সঠিক আর ন্যায়ের সমাজ গঠনের কথা বলছি ঠিক এ সময়েও আমাদের দেশে মাত্র গত ৯ মাসে কিশোর অপরাধীদের হাতে খুন হয়েছে অন্তত ৬ জন। শুধু খুন করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না তারা, লাশ গুম করার মতো অভিনব কায়দাও বের করেছে এরা। উত্তরখান থানা এলাকায় একদল কিশোর তাদেরই এক সতীর্থ কিশোরকে হত্যার পর তার মুখে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে বিকৃত করে দেয়ার মতো নিষ্ঠুরতা দেখাতেও তাদের বিবেকে একটু বাধেনি। একটি জাতীয় দৈনিকের সাক্ষাৎকারে রাজধানীতে কিশোর অপরাধ বেড়েছে স্বীকার করে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা বলেন, “কিশোর অপরাধীদের ঠেকাতে হবে। তা না হলে যেসব কিশোর এখন খুন করা শুরু করেছে, তারা এক সময় শীর্ষ খুনী হয়ে উঠবে। সিরিয়াস কিলার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। শুধু পুলিশ দিয়ে কিশোর অপরাধ কমানো যাবে না। এ অপরাধ দমনে সমাজ, রাষ্ট্র, অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে।”
তাছাড়া এই তো মাত্র কিছুদিন আগে যাদের বয়স ১৬ বছরের বেশি হবে না এমন একদল দুর্ধর্ষ কিশোর ছিনতাইকারী দলের কাহিনী জেনেছি আমরা। বয়সে কম হলে কি হবে, এরা সবাই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও দুর্ধর্ষ প্রকৃতির। মগজ ধোলাই করে এদের দানব বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এরা শুধু ছিনতাইকারী নয় ধারণা করা হয় যে এরা ভাড়ায় মানুষ খুনের সঙ্গেও জড়িত। ছোটখাটো ইস্যুকে কেন্দ্র করেই এরা খুনের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে নিমিষেই। মদের আসরে মোবাইল চুরির টাকা নিয়ে গণ্ডগোল বাধিয়ে আকাশ নামের এক কিশোর অন্য কিশোর যতীনকে ছুরিকাঘাত করেছিল। পরে অন্যরা মিলে তাকে জবাই করে একটি পরিত্যক্ত সেপটিক ট্যাঙ্কে ফেলে দেয়। পায়ে ইট বেঁধে ফেলা হয় যাতে লাশ ভেসে না ওঠে। পরে ব্লিচিং পাউডার কিনে ট্যাংকে ছড়িয়ে দেয়া হয় যাতে লাশ পচে যায়। গা শিউরে ওঠার মতো এই সব লোমহর্ষক ঘটনাই সংঘটিত করছে সব কিশোর সন্ত্রাসের সাথে জড়িত আমাদের সমাজের আগামী দিনের সব ফুটন্ত গোলাপ কিশোর তরুণরা। এদের ফেরাবার কোন উদ্যোগ আমাদের চোখে পড়ে না।
প্রিয় মাতৃভূমি এই বাংলাদেশকে আগামী দিনে সুন্দর করে গড়ে তুলতে চাইলে তার প্রধান নেয়ামক শক্তি যে আজকের কিশোর-তরুণেরা। সেই তরুণ কিশোরদের এই ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু উপলব্ধি করছি আমরা? কে নেবে এই সুন্দর ভবিষ্যৎকে রক্ষা করার দায়িত্ব? কোন রাজনৈতিক কিংবা অরাজনৈতিক সরকার এমন কি কেউ নেই? যিনি বা যারা এই ভবিষ্যতের সম্পদ রক্ষায় ইতিবাচক কোন বৈপ্লবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন। যে পদক্ষেপের ফলে শুধু রাজধানীতেই রক্ষা পাবে প্রায় সহস্রাধিক কিশোর নির্মম আর ঘৃণিত সন্ত্রাসের পথ থেকে। যে বয়সে কিশোরদের বই হাতে স্কুলে যাওয়ার কথা, বুদের সাথে মেতে ওঠার কথা খেলার মাঠে, সেই বয়সে কিশোর তরুণরা জড়িয়ে পড়ছে খুন, ছিনতাই, মাদকসহ নানা জঘন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। আমাদের এই কিশোর তরুণরা আজ বিপথগামী না শুধু, তারা আজ প্রশিক্ষিত সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী চক্রের সদস্য। যাদের সকলের বয়সই প্রায় ১৬ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। এরা প্রশিক্ষণ পায় কিভাবে পকেট মারতে হবে, কি করে আলতোভাবে ব্লেড মেরে পাঞ্জাবীর পকেট কাটতে হবে, পানির গামলায় পিংপং বল দিয়ে দু'আঙ্গুলে বল তুলে আনার মধ্য দিয়ে পকেট মারার প্রথম পদক্ষেপ শুরু। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গিয়ে ঠিকমত প্রশিক্ষণ না নিলে চলে বেত্রাঘাত, মুরগী বানিয়ে রাখার শাস্তি, এমনকি বিদ্যুতের শক পর্যন্ত দেয়া হয় তাদের। এসব কিছুর নেপথ্যে যেসব কারণ কাজ করে তাতে শুধুমাত্র কিশোর তরুণরাই দায়ী নয়। বরং তার জন্য দায়ী এক. সুষ্ঠু পারিবারিক অনুশাসন। দুই. শিক্ষা ব্যবস্খায় নৈতিক প্রশিক্ষণের অভাব। তিন. অতিমাত্রায় দারিদ্র্য। চার. আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব। পাঁচ. পারিবারিক পরিবেশে মূল অভিভাবকের সরাসরি সাহচর্য থেকে বঞ্চিত। ছয়. সামাজিকভাবে ভাল পরিবেশ প্রদান করতে না পারা। সাত. ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার প্রশিক্ষণের অভাব। সর্বোপরি কিশোর বয়সেই তাদের সামনে উন্নত জীবনের দিক নির্দেশনা তুলে ধরে যে শিক্ষা থাকার কথা তা বর্তমান রাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্র কোনটাই দিতে পারছে না প্রয়োজন মতো। ফলশ্রুতিতে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে চলছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। প্রতিনিয়ত বাড়ছে এর পরিধি, পরিবর্তিত হচ্ছে এর আকার অবয়ব আর সেই সাথে ভয়ানকভাবে গ্রাস করছে কিশোরদের। এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, কেবল রাজধানীতেই সহস্রাধিক কিশোর তরুণ সন্ত্রাসী কাজের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে। পরিবর্তিত সময়ে বড় বড় সন্ত্রাসীরা পালিয়ে বেড়ালেও এরা নির্বিঘেí সন্ত্রাসী কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ধারণা অনুযায়ী কিশোর সন্ত্রাসীদের মধ্যে বিশেষ তালিকায়- মতিঝিল থানায় ১১, পল্টন থানায় ০৮, সূত্রাপুর থানায় ৪৪, ডেমরা থানায় ৩৩, শ্যামপুরে ৪৬, সবুজবাগে ৩১, খিলগাঁওয়ে ০৯, রমনায় ১১, ধানমন্ডিতে ০৮, নিউমার্কেটে ১৭, হাজারীবাগে ০৫, কামরাঙ্গীরচরে ০৭, লালবাগে ০৯, কোতয়ালীতে ০৮, তেজগাঁওয়ে ০৫, মোহাম্মদপুরে ০৮, মিরপুরে ০৯, পল্লবীতে ০৬, কাফরুলে ০৭, শাহআলীতে ১৩, আদাবরে ০৮, গুলশানে ২০, বাড্ডায় ১৭, ক্যান্টনমেন্টে ০৪, খিলক্ষেতে ০২, বিমানবন্দরে ০৭ এবং উত্তরা থানায় ১৪ জন রয়েছে। নামকাওয়াস্তে একটি কিশোর অপরাধী তালিকা প্রস্তুত করা হলেও এদের আটক করে সংশোধনের কোন ব্যবস্খা নেয়া হচ্ছে না। যে কারণে সন্ত্রাসী কিশোর তরুণদের সংখ্যা ক্রমানðয়ে বেড়েই চলছে। যা দেশ, জাতি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য খুবই উদ্বেগের ব্যাপার। অপরাধ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাজ ও পরিবারের নৈতিক অবক্ষয়ে কোমলমতি কিশোর তরুণদের ভয়ানক পথে টেনে এনেছে। উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চবিত্তের সন্তানরা অভিভাবকদের সঠিক পরিচর্যার অভাবে পঙ্কিলপথে পা বাড়াচ্ছে। অনেক সময় উচ্চবিত্ত লোকেরা সময়ের অভাবে নিজেরা সন্তানদের প্রতিপালন করেন না। বেতনভুক্ত লোকেরাই এ কাজ করে থাকে। ফলে সঠিকভাবে তারা গড়ে ওঠে না। অনুমান করা হয়ে থাকে এসব তরুণ কিশোররা নানান কারণে সন্ত্রাসের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে। এক. বয়সের কারণে এরা অনেকটা না বুঝেই বুদের পাল্লায় পড়ে অথবা কারো ইশারায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। দুই. জীবন সম্পর্কে ধ্যান ধারণা না থাকায় সামান্য কারণেই এরা বড় অপরাধ কর্মকাণ্ড করে ফেলছে। তিন. মাদকাসক্তি, দারিদ্র্য, আর অবহেলার শিকার হয়ে সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয় অনেক সোনার তরুণ কিশোররা।
বহুল আলোচিত সানজিদুল ইসলাম ইমন আজ ভয়ঙ্কর শীর্ষ সন্ত্রাসী। এই ইমন কিশোর বয়স থেকেই সন্ত্রাসের সাথে সম্পৃক্ত, ইমনের মা বঙ্গবু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গাইনী ও প্রসূতি বিদ্যা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ডা. সুলতানা জাহান একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, এসএসসি পাসের পর তাকে একটি মোটর সাইকেল কিনে দিয়েছিলাম। সেটাই তার কাল হলো। ওই মোটর সাইকেলের কারণেই ইমন সন্ত্রাসী হয়ে গেল। তিনি আরও বলেন, এমন সন্তান যে কোনো মায়ের জন্য দুর্ভাগ্যের। আমার যে চরম শত্রু তার পেটেও যেন এমন সন্তান জন্ম না নেয়। আমার বোধ হয় কিশোর থেকে গড়ে ওঠা এ রকম সন্ত্রাসী ইমন আর কেউ দেখতে চাই না আমরা। আমাদের ফুলের মত তরুণ কিশোরদের ভয়ঙ্কর শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন হওয়া থেকে বাঁচানোর উদ্যোগ নিতে হবে এখনই আর তার জন্য প্রয়োজন ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিভিন্ন সমাজসেবী প্রতিষ্ঠানের সমনিðত উদ্যোগ। সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে আমাদের হতে হবে আরও যত্নবান।
১. সন্তানের বাবা-মায়ের প্রতি নিবিড় তত্ত্বাবধান।
২. কিশোর বয়সেই সন্তানদের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেয়া।
৩. পারিবারিক বনেই অভিভাবকদের সাথে সন্তানদের বুত্বসুলভ সম্পর্ক তৈরি।
৪. ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন জানার ও মেনে চলার পরিবেশ তৈরি করে দেয়া।
৫. সৎসঙ্গ প্রদানের ক্ষেত্রে বু নির্বাচনের ব্যাপারে অভিভাবকদের সতর্ক দৃষ্টি।
৬. প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অপসংস্কৃতির সয়লাব থেকে মুক্ত রাখার জন্য বিকল্প বিনোদনের ব্যবস্খা রাখা।
৭. রাগ-অনুরাগ, মান-অভিমান আর সংশোধনের ক্ষেত্রে আদর আর শাসনের সমনðয় করা প্রয়োজন।
৮. শিক্ষাব্যবস্খা আর শিক্ষাঙ্গনে নৈতিক, মানবিক, আর আদর্শিক মূল্যবোধের চর্চার কার্যকরী ব্যবস্খা রাখা।
মোটকথা কিশোর আর তরুণদের জন্য পারিবারিক সুশিক্ষা আর নিবিড় তত্ত্বাবধানকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবেও আমাদের ফুলের মতো তরুণ কিশোরদের রক্ষায় নিতে হবে নানাবিধ কার্যকরী পদক্ষেপ। যাতে আমরা কেউই এর দায়বদ্ধতা থেকে এড়িয়ে যেতে না পারি। তাহলেই হয়ত তরুণ কিশোরদের দ্বারা গড়ে ওঠা সোনালী ভবিষ্যৎ আমাদের পদ চুম্বন করবে অনায়াসেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



